কাশি কমতেই সামনে তাকাতেই মিলন ঘটলো দুই জোড়া চোখের। চোখ পড়তেই আহিয়ান চোখ নামিয়ে নিল কিন্তু তৃধা হোয়াট সেকেন্ড তাকিয়ে রইল সামনে থাকা বেইমান পুরুষটির দিকে কিন্তু তার চোখ থেকে দু ফোঁটা পানি গাল বেয়ে পড়লো তার ভাতের প্লেটে। তানভীর বলে উঠলো: কিরে মা এখনো কষ্ট হচ্ছে...? তোর চোখ লাল হয়ে চোখ থেকে পানি পড়ছে...?
তৃধা: হ্যাঁ বাবা... কিন্তু আগের থেকে অনেকটা কম।
আহিয়ার কেন জানি মনে হল এই কথাটা তার ভাইকে বলেছে। এবার যেহেতু দেশে ফিরেছে নিজেরটা নিজেরা মিটমাট করে নিবে তাই আহিয়া নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
তৃধা ঝটপট খাবার খেয়ে আহিয়ার উদ্দেশ্যে বলল: আপু কালকে সকালে কথা হবে আমার খুব ঘুম পাচ্ছে আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।
আহিয়া বুঝলো মেয়েটার বেকুলতা তাই কিছু বলল না।
তৃধা রুমে গিয়ে দরজাটাকে শব্দ করে লাগিয়ে দিল। তার হাত-পা সব কাঁপছে কেন জানি দুর্বল শরীরটা নিচ্ছে বিছানার দিকে সোবার সাথে সাথেই অন্ধকারে নেমে এলো দু'চোখের চারপাশে।
আবির: আমি যা বলছ ভেবেচিন্তে বলছো তো আহিয়ান...?
আহিয়ান এবার পাপার কথা ভয় না পেয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বললো: হ্যাঁ বাবা আমি ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি বাংলাদেশের থেকে ইন্টার সেপশন কমপ্লিট করব । আমি অলরেডি আমার MBBS সার্টিফিকেট জমা দিয়েছি ফর্মালিটির জন্য।
আবির: তুমি এত বড় একটা ডিসিশন নিয়েছো আর আমাদেরকে একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না আহিয়ান..
আহিয়ান: আমি ভাবতেও পারিনি পাপা আমি দেশে ফেরাতে তুমি এতটা রাগ করবে...
আবির শান্ত কন্ঠে বলল: তুমি দেশের সাথে আমার কোন সমস্যা হচ্ছে না আহিয়ান। আমি চেয়েছিলাম তুমি যেহেতু লেখাপড়া লন্ডন থেকে করেছ তাই ইন্টার শিপ ওখান থেকে কমপ্লিট করে পরিপূর্ণ ডাক্তার হয়ে দেশে ফিরে আসবে।
আহিয়ান পাপাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল: বাবা তোমরা সবাই চলে এসো তো, দুই বছর হয়েছে তার মধ্যে আহিও চলে এসেছে আমার এখানে খুব একা একা লাগছে পাপা। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাংলা সে থেকেই ইন্টারসিপ কমপ্লিট করব। আর আমি বেস্ট কিছু হসপিটালে এপ্লাই করেছি আশা করছি হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।
আবির: as you wish....
বলেই হনহন পায়ে বেরিয়ে গেল ছেলের রুম থেকে।
মেঘ এতক্ষন দর্শক ছিল বাপ ছেলের মাঝখানে আবির বেরিয়ে যেতেই মেয়ে ছেলের উদ্দেশ্যে বলল: ভালো করেছিস আব্বা দেশে ফিরে এসেছিস। আমি খুব খুশি হয়েছি। এই দুই বছরে কত শুকিয়ে গিয়েছিস।
আহিয়ান: থ্যাংক ইউ মামা তুমি আমাকে বুঝলে।
তৃধার ঘুম ভেঙেছে বারোটার দিকে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হাটা ধরল আহিয়ার রুমের দিকে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল আসবো আপু..?
আহিয়া পিছনে তাকিয়ে দেখলো তৃধা এসেছে সে মূলত টাওয়াল রোদে দেওয়ার জন্য ব্যালকনিতে এসেছিল। তৃধা আচমকা গিয়ে আহিয়া কে জড়িয়ে ধরল ও বলল: আপু আমি সত্যিই অনেক খুশি হয়েছি আমি ভেবেছিলাম ঘুম থেকে উঠে এগুলো সব স্বপ্ন কিন্তু তুমি সত্যিই চলে এসেছ আমি অনেক খুশি হয়েছি আপু।
আহিয়া তৃধাকে বলল: তাতো বুঝলাম তা এত খুশি তাকে দেখে হয়েছিস তুই আমাকে দেখে নাকি আমার ভাইকে দেখে...?
কথাটা কর্ণ কহরে পৌঁছতেই তৃধা লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে অভিমানী কন্ঠে বলল: না অন্য কারো জন্য আমার কোন মাথা ব্যথা নেই আমি খুশি হয়েছি তুমি এসেছ তাই।
আহিয়া বলল: ও তাই... কে যেন আমার ভাইয়ের জন্য লেখাপড়া ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে ঘুরছিল...
তৃধা: ওগুলো কিশোরী বয়সের আবেগে আপু। আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি।
আহিয়া: হুম কোনটা আবেগ কোনটা ভালোবাসা সেটা তো দেখাই জাবে। আমি না হয় না বললাম। সময় সেটা বলে দেবে।
তৃধা কথা এরাতে বলল: তুমি যে দেশে ফিরেছো সেটা কি রিহান ভাইয়া জানে...?
আহিয়া: না জানে না....ভাবছি সারপ্রাইজ দিবো...
তৃধা: ওয়াও আপু... আমার দুলাভাই তো পুরাই অজ্ঞান হয়ে জাবে তোমাকে দেখে।
আহিয়ার গাল লজ্জায় লাল হলো।সেটা দেখে তৃধা বলল: হয়েছে আর লজ্জা পেতে হবে না... এখন বলো কিভাবে কখন সারপ্রাইজ দিবে...
আহিয়া: আমার মাথায় কিছু আসছে না বাড়ি থেকে কি বলে বের হবো...তুই বল কি করবো...তা ছাড়া ভাইয়ার দিকটাও মাথায় রাখতে হবে...
তৃধা বিজ্ঞানের ন্যায় বলল: ভাবতে হবে....
তৃধা আবারো প্রশ্ন করল: আচ্ছা তোমার দেশে আসবে আমাকে জানাওনি কেন...?
আহিয়া: বললে কি সেহেরির সময় টাস্কি খাওয়া দেখতাম...
তৃধা: আপু বাদ দাও তো তোমার ওই বিলেতি বাঁদর ভাইয়ের কথা...
আহিয়া হাসলো...তৃধা আবারো প্রশ্ন করল: আপু কখন এসেছো তোমারা ....
আহিয়া: রাত ১২টায় , পাপা মামা গিয়েছিল আনতে। তারা জানতো আমি কাউকে বলতে নিষেধ করেছিলাম তাই বলেনি। এসে দেখি তুই ঘুমিয়ে ছিলি তাই ডাকি নি..
তৃধা খুশি মনে প্রশ্ন করল: আপু তুমি আর যাবে না তো....?
আহিয়া বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল: না যাব না আর ভাইয়াও যাবে না...
তৃধা আমতা আমতা করে বলল: আমি কি তোমার ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করেছি...? উনি থাকলেই কি আর না থাকলেই কি..?
আহিয়া: এত রাগ তোর কবে ভাঙবে তৃধা...?
তৃধা: জানিনা আপু...
অতঃপর আহিয়ার থেকে বিদায় নিয়ে নিজের রুমের দিকে হেটে যাচ্ছে তৃধা। তৃধার কেন জানি সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে কিন্তু আহিয়া আর আহিয়ান ভাইকে দেখে তার খুশিই লাগছে। অন্যদিকে আহিয়ান ভাই তার পাশের রুমেই আছে ভাবতেই বিব্রত লাগছে।
ভাবনার মাঝে সামনে কারো উপস্থিতি টের পেল তৃধা। মাথা তুলে তাকাতেই সামনে দেখতে পেল আহিয়ান ভাইকে তৃধা আহিয়ান ভাইকে এড়িয়ে যেতে চাইলে ডান পাশ দিয়ে যাওয়া ধরল কিন্তু আহিয়ানো ডানপাশ দিয়ে যেতে নিয়েছে তারপর তৃধা আবারো বাম পাশ দিয়ে যেতে নিল কিন্তু আহিয়ান ভাই এবারও বাম পাশে গেল তারপর আহিয়ান ভ্রু বাকিয়ে একটা সাইট করে দাঁড়ালো।তৃধা সুযোগ পেতেই দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেল। আহিয়ানও নিচ তলার দিকে চলে গেল।
রোজার দিনে সারাদিন খাওয়া-দাওয়া ঝামেলা না থাকলে বিকাল থেকে রান্নাঘরে টুংটাং শব্দ যেন বেড়েই চলেছে। তাছাড়া আজকে আবার বাড়ির দুই রত্ন বাড়িতে ফিরছে তাই মেঘ হবো বন্যা রাতের ও সেহেরির খাবারের আয়োজন করছে তার পাশে রাই ইফতারি তৈরি করছে। পদ্ম যার যা প্রয়োজন সেটাই এগিয়ে দিচ্ছে।
আসরের নামাজ শেষে তৃধা নিচে এসে ড্রয়িং রুমের সোফাতে বসলো এর মধ্যেই আদিবা তৃধার কাছে এসে তার সাথে দুষ্টুমি শুরু করলো। তৃধা আদিবার সাথে দুষ্টুমি করতে করতে হঠাৎ চোখ গেল তৃতীয় তলার করিডরের দিকে। দেখলো আহিয়ান ভাই রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছে সেদিকে চোখ পড়তেই চোখ নামিয়ে নিল তৃধা। তৃধা চোখ নামাতেই আহিয়ান তাকিয়ে রইল ড্রইংরুমে সোফায় বসা সাদা থ্রিপিস পরা মায়াবী তৃধার দিকে। এই দুই বছরে মেয়েটার অনেক পরিবর্তন এসেছে আগের থেকে অনেক সৌন্দর্য পেয়েছে কিশোরী থেকে যৌবনের পা দিয়েছে মাত্র তাই বোধহয় এত সুন্দর লাগছে। তার কাছে এই মেয়েটাকে অন্যতম এক পরী লাগে তার মনে আছে যে পরী তার নামই হলো তৃধা পরি.....