বহু বছর পর এবারে রোজায় হালকা হালকা শীত পড়েছে।
আসরের নামাজের পরেই চারিদিকে হালকা কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার নেমে এসে জানান দেয় আগাম সন্ধ্যার বার্তা।
সেই সময় থেকে পরিবেশ অনেকটা শীতল থাকে।
ইফতারের সময় ঘনিয়ে এসেছে খান বাড়ির ডাইনিং টেবিলে এবং কিচেনে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।
মেঘ ও বন্যা কিচেন থেকে খাবার এনে ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখছে।
রাই কয়েক রকমের শরবত বানাতে ব্যস্ত।
আকলিমা খান একটা চেয়ারে বসে ফল কাটছে।
আহিয়া এগিয়ে এসে আকলিমা খানের হাত থেকে ফলে ঝুড়িটা ও ছুড়িটা নিয়ে নিজে ফল কাটতে বসলো।
রাই সেটা দেখে আহিয়াকে বারবার সাবধান করল হাত কেটে যাবে।
আহিয়া মৃদু হেসে জবাব দিল লন্ডনে ভাইয়া ও আমার রান্নার কাজ আমি নিজেই করতাম। এসব কাজ আমি ভালোই পারি। তাই তোমরা এসব নিয়ে চিন্তা করিও না।
বন্যা সোফায় পেটে হাত দিয়ে বসে থাকা তৃধার দিকে তাকায়ে বলল: বোনকে দেখে কিছু তো শিখতে পারিস...
তোর বোন কত কিছু করতে পারে,,,
তোকে তো কাজের কথা বললে গঙ্গা ফড়িং এর মত লাভ দিস তিনটা,,,,,
তৃধা দুর্বল শরীরে পেটে হাত দিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল: আমার এত কাজ শেখার প্রয়োজন নেই মাম্মাম
আপুকে তো বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবো তাই তার কাজ শেখার প্রয়োজন।কিন্তু আমি তো সারা জীবন এই বাড়িতেই থাকবো,,
বাপের বাড়িতে কি মেয়েদের কাজ করতে হয় ?
বন্যা ভুরু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে মেয়ের উদ্দেশ্যে বলল:,,
তুমি কেন শ্বশুরবাড়িতে যাবে না মা?
তোমাকে কি আমি খান বাড়িতে পাল্লা দেবো?
মায়ের কথা শুনে তৃধা খানিকটা শব্দ করে হেসে বলল: আমি তো বিয়ে করব না মাম্মা সারা জীবন খান বাড়িতে থেকে তোমাদের জ্বালাবো।
কথাটা বলেই তৃধা সিঁড়ির দিকে তাকালো, দেখলো আহিয়ান গম্ভীর মুখে এই দিকেই তাকিয়ে আছে।
মনে মনে বলল: এই বেটা মীরজাফর আবার কখন আসলো?
আহিয়ান এগিয়ে এসে সোফায় বসতে বসতে বলল: মামনি তোমার মেয়ের রান্না শেখার প্রয়োজন নেই।
তুমি বরং তোমার মেয়েকে পেঁয়াজ কাটতে দেবে।
ভবিষ্যৎ ডাক্তার বলে কথা হাতের কাটাকাটির স্কীল ভালো হবে।
তৃধা ঠোঁট বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল: রক্তচোষা বাঁদরটা একটুও পরিবর্তন হয়নি।
আমার মামমাম কে বুদ্ধি শিখিয়ে দিচ্ছে, আমাকে কাঁদানোর। সুযোগ মতো পাই আমিও ছেড়ে দিব না।
বন্যা কিছু বলার আগে আলী আহমেদ খান এগিয়ে এসে তৃধার পাশে বসতে বসতে বলল: আমার নাতনি কে নিয়ে এত কথা কিসের সবার? আমার নাতনি কে আমি বিয়ে করে খান বাড়ির ছোট বউ বানিয়ে খান বাড়িতেই রেখে দিব। আর তোমরা বাড়ির বউরা সবাই ওকে কাজ করে খাওয়াবা।
ওনার কথা শুনে মেঘ বন্যা রাই ঠোট টিপে হাসলো কিন্তু কিছু না বলে কিচেন চলে গেল। আহিয়ান দাদুর উদ্দেশ্যে দুষ্টুমি করে বলল: তোমার সাদা মুলা মতন নাতনি কে তোমার মত বুড়োর সাথে একটুও মানাচ্ছে না দাদু।
আলী আহমেদ খান স্বঃশব্দে হেসে বলল তাহলে কার সাথে মানাবে ?তোর মত যুবকের সাথে?
আহিয়ান থতমত খেয়ে বলল: সেটা আমি কখন বললাম?
আহিয়া ভাইকে এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে আফিয়া এগিয়ে এসে বলল: ভাইয়া, বাবা চাচ্চু ও দাদুকে কল দাও ইফতারের সময় হয়ে যাচ্ছে ওর এখনো বাড়িতে ফেরেনি।
আহিয়ান সুযোগে সদ্ব্যবহার করে আগের কথা বন্ধ রেখে সবাইকে কল দেওয়া শুরু করলো।
এদিকে যাকে নিয়ে এত কথা সে সোফায় হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে আছে।
আর দুই মিনিট পরপর আহিয়কে প্রশ্ন করছে: আপু আর কয় মিনিট বাকি আছে...
আদিবা দৌড়ে এসে আহি আর কোলে চরে বসলো,,,,
অতঃপর ত্রিধাকে দেখিয়ে দিয়ে বলল: বড় আপু দেখছো আমি লোতা লেখে কাঁদি না ছোট আপু কাঁদছে।
ওর কথা শুনে তৃধা তড়িৎ চোখ মেলে তাকালো।
কটমট চোখে আদিবার দিকে তাকিয়ে বলল: সারাদিনে পাঁচবার খাওয়া শেষ তোর আবার কিসের রোজা?
আদিবা খিলখিলিয়ে হেসে বলল: আমার পাশ টা রোতা হয়েছে আপুনি।
তৃধা এগিয়ে এসে আদিবাকে ধরতে চাইলে সে দৌড়ে গিয়ে আহিয়ানের কোলে উঠলো।
তৃধা আদিবার দিকে তাকাতে গিয়ে না চাইতেও নজর গুলো আহিয়ানর দিকে।
আহিয়ানের মুখাবয়ক স্বাভাবিক থাকলেও চোখ দুটো যেন হাসছে।
তৃধার কেন জানি মনে হল আহিয়ান ওকে ইশারায় বলছে: এবার পারলে নিয়ে যাও.....
তৃধা থেমে গিয়ে সোফায় বসলো,, আহিয়ার উদ্দেশ্যে বলল: আর কত মিনিট বাকি আছে আপু?
ঠিক তখনই সদর দরজা দিয়ে ঢুকলো তানভীর।
মেয়ের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল এখনো ১৮ মিনিট বাকি আছে মামমাম।
তৃধা বিরক্তিতে চ জাতীয় উচ্চারণ করল।
আহিয়ান তৃধার অবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসছে।
তৃধা লক্ষ্য করতে মুখ বাকি অন্যদিকে তাকালো।
তানভীর বাড়িতে আসার দুই মিনিটের মাথায় সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করল আদি, আবির, মোজাম্মেল খান, ওই ইকবাল খান,। হাতে সময় অল্প থাকায় কেউ ডাইনিং রুমের সময় ব্যয় করল না। ঝটপট চলে গেল নিজের রুমে ফ্রেশ হতে।
বন্যা তৃধার উদ্দেশ্যে ধমকেশ্বরে বলল: এখানে মরার মত বসে না থেকে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বস কিছুক্ষণের মধ্যেই আজান দেবে....
তৃধা ক্লান্ত শরীরটাকে টেনেটুনে নিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসলো। ধীরে ধীরে আহিয়া, আহিয়ান, আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান, হালিমা খান, আকলিমা খান, মালিহা খান, তানভীর, আবির, আদি , আদিবা, মেঘ, বন্যা, রাই, সকলে এসে বসলো। ডাইনিং টেবিল ভরে আছে নানা রকম ফল, জুস , ও নানারকম ইফতারের আয়োজন। আচমকা মেঘ উঠে গিয়ে পদ্মকে ডেকে নিজেদের পাশের চেয়ারে টেনে বসালো।
মালিহা খান পদ্মের উদ্দেশ্যে বলল: কিরে তুই আজকে এখনো বাসায় যাসনি।
পদ্ম কিছু বলার আগেই মেঘ বলে উঠলো: আজকে প্রথম রোজা বলে পদ্মকে বাড়িতে যেতে দেইনি বড় আম্মু। বলেছি আমাদের সাথে ইফতার করতে।
মালিহা খান হেসে বলল; ভালো করেছিস মা...
শুধু আজকে কেন পদ্ম এখন থেকে পুরো রমজান মাস আমাদের সাথে ইফতার করবে।
কিন্তু পদ্ম বাধা দিয়ে বলল: না আম্মাজান আমি বাকি ইফতার গুলো বাড়িতে আব্বা আম্মার সঙ্গে একসাথে করমু।
মালিহা খান এসে জবাব দিল :আচ্ছা ঠিক আছে তোর যেটা ভালো হয়..
ইতিমধ্যেই মাগরিবের আজান দেওয়া শুরু হলো। বিসমিল্লাহ বলে ইফতারের দোয়া পড়ে খান বাড়ির সকলে ইফতার শুরু করলো।
তৃধার কেমন জানি লাগছে ডাইনিং টেবিলে বসে। মনে হচ্ছে সে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।
সামনে তাহলেই তো চোখে পড়বে আহিয়ান ভাইয়ের মুখ।
টুপটাপ কয়েকটা ফল খেয়ে তৃধা উঠে চলে যেতে চাইলো। আবির বাধা দিয়ে বলল: কি হয়েছে মামনি,, কিছু না খেয়ে চলে যাচ্ছ কেন?
তৃধা মৃদু হেসে জবাব দিল: খেয়েছি বড় পাপা পেট ভরে গেছে...
আহিয়ান এখন এতক্ষণ চুপচাপ লক্ষ্য করছিল তৃধার গতিবিধি। মেয়েটা তেমন কিছু খাইনি। কিন্তু সে কিছুই বলল না।
নিজের খাওয়া শেষে বাপ চাচাদের সাথে মাগরিবের নামাজ পড়তে মসজিদে এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
রাত দশটা রিহান তারাবির নামাজ পড়ে এইমাত্র বাড়ি ফিরেছি।
মাথার টুপি বিছানার উপর রাখতে লক্ষ্য করল ফোন ভাইব্রেশন করছে আননোন নাম্বার দেখে খানিকটা ভুরু কুচকালো ।
ইতিমধ্যেই কলটা কেটে গেছে। বিছানায় বসতে না বসতে আবারো ফোন বেজে উঠলো। আবারো ওই একই নাম্বারে কল এসেছে।
রিহান ফোন রিসিভ করে শান্ত কণ্ঠে বললো: আসসালামু আলাইকুম.... কে বলছেন?
ফোনের ওপাশ থেকে শোনা গেল এক মেইলি কন্ঠ ওয়ালাইকুম সালাম ভাইয়া আমি তৃধা।
রেহান কিছুটা অবাক হলো তারপর বলল: কেমন আছো ত্রিধা?
তৃধা: আমি ভালো নেই ভাইয়া!
রিহান: কেন কি হয়েছে?
তৃধা: আমি একটা প্রবলেমে আছি ভাই আপনার সাহায্য প্রয়োজন......
রিহান খানিকটা চিন্তা তো ভঙ্গিতে বলল কি হয়েছে?
আর আমি তোমাকে কিভাবে হেল্প করতে পারি?
তৃধা আশঙ্কায় হুহু করে কেটে দিল।
ফোনের ওপাশ থেকে রিহান বিচলিত কন্ঠে বলল: কি হয়েছে তৃধা?তুমি কান্না করতেছ কেন?
তৃধা কাঁদতে কাঁদতে বলল: ভাইয়া আমি আপনাকে একটা লোকেশন পাঠাচ্ছি আপনি তাড়াতাড়ি আসুন।
প্লিজ। আমি আপনার সাথে এখনই দেখা করতে চাই।
রিহান বুঝলো না তৃধার এই কান্নাকাটির কারণ।
কিন্তু মেয়েটা নিশ্চয়ই কোন বিপদে আছে।
কথাটা মাথায় আসতেই রিহান ঝটপট গাড়ির চাবি ও ওয়ালেরটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তৃধার উদ্দেশ্যে বলল:
আমি এক্ষুনি আসছি?
নিচতলা আসতেই রিহানের আম্মু রিয়া পিছন থেকে ডাকলো।
ছেলেকে জিজ্ঞাসা করল এত রাতে কোথায় যাচ্ছ?
রিহান উত্তরে শুধু বলল: একটা জরুরী কাজ আছে আম্মু তাড়াতাড়ি চলে আসব....
বলে আর দারালোনা দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।
রিয়া শাশুড়ি অর্থাৎ রিহানের দাদু রিয়ার উদ্দেশ্যে বলল: শোনো বৌমা একখন কথা কই পোলাডারে এবার বিয়া দাও.... দেখবা ঘরে মন বইব...
রাত বিরাতে আর বাইরে বাইরে ঘুরবেনা।
রিয়া বলল: আমার ছেলেটা জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যায় না আম্মা।
আর বিয়ের কথা তো আমি ওকে অনেক বলি কিন্তু ও বিয়ে করতে না চাইলে আমি কি করবো?
রিহানের দাদু পান চিবুতে চিবুতে বলল: মানুষের বাড়ির পোলাপান দেহি বিয়ের জন্য লাফায়,, আর আমার নাতি দামরা হইয়া যাইতেছে বিয়ে করতে চায় না।রাতে শাশুড়ির সাথে কথা বাড়াতে চায়না রিহানের আম্মু। তাই সে কাজের কথা বলে হাঁটলো কিচন এর দিকে।