রাত প্রায় এগারোটা ছুই ছুই শহরের বাতাসে রমজান মাসের এক অদ্ভুত শান্তি মিশে আছে। রাস্তার ধারের মৃদু আলো, ও আকাশের পূর্ণচাদ,রিহান তৃধার পাঠানো লোকেশন অনুযায়ী গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। তৃধার কণ্ঠে যে আতঙ্কটা শুনেছিল, সেটা এখন কানে বাজছে।রিহান গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। তৃধার দেওয়া লোকেশন অনুযায়ী জায়গাটা খান বাড়ির আশেপাশে,,
রিহান সেখানে পৌঁছে দেখল এটা একটা লেকেরপার
আকাশের পূর্ণচন্দ্রের আলো লেকের পানি সুন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
মৃদু মৃদু বাতাস বইছে চারিদিকে।
রিহানে এগিয়ে গেল সামনে কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। তাই আবারো কল দিল তৃধাকে। প্রশ্ন করল সে কোথায়?
তৃধা জবাব দিল: ভাইয়া আর একটু সামনে আসুন....
বলেই কল কেটে দিল,,
রিহানকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করার সুযোগ দিল না।
রিহান চাঁদের আলোতে পথ দেখে লেকের পথ ধরে এগোয় সামনে।
একটু দূরে লক্ষ্য করল সামনের দিকে একটা মেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে।
পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় তার অবয়ব স্পষ্ট।
মেয়েটার পরনে নীল শাড়ি আঁচল মৃধু বাতাসে দুলছে
লম্বা খোলা চুল গুলো বাতাসের ঝাপটা এলোমেলো দুলছে।
রিহান বুঝতেছেনা,, এসবের মানে,, তার ধারণা তৃধা কোনো বিপদে পড়েছে।
এখানে এসে তো দেখছি মেয়েটা শাড়ি পরে চন্দ্র বিলাস করছে।
রিহান গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে মেয়ে অবায়ব টির পাশে দাঁড়িয়ে বলল: কি হয়েছে তৃধা?
আমি তোমাকে কি হেল্প করতে পারি?
ঠিক তখনই মেয়েটি ওর দিকে ফিরে তাকালো।
রিহান স্তব্ধ নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইল সামনে।
জোসনার পূণ্য আলোতে দেখলে তার প্রিয়তমা মায়াবী অদল।
কি করবে কি বলবে সে কিছুই বুঝতে পারছে না,,,
আহিয়া ঠোঁটের কোনে মিষ্টি হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে।
রিহান মোহনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল: আমি যা দেখছি তা কি ঠিক দেখছি....
ওর কথা শুনে আহিয়া খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।
রিহান বড় অভাব কণ্ঠে বলল: আমি কি তোমার হাত স্পর্শ করতে পারি আহিয়া পাখি...?
আহিয়ে মৃদু হেসে হাত সামনে বাড়িয়ে দিল....
মুহূর্তে রেশমি ঝনঝন আওয়াজ রিহানকে আরো মাতোয়ারা করে তুললো।
রিহান কাঁপা হাতে স্পর্শ করল আহিয়ার একটি হাত,,,
দেখলো সত্যিই সে আহিয়াকে ছুঁতে পারছে।
আহিয়া তোর চোখের ভ্রম নয়।
সঙ্গে সঙ্গে রিহান আহিয়া কে হেচকা টানে বুকে জড়িয়ে নিল।
এত জোরে ধরল মনে হয় মেয়েটাকে বুকের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলবে।
উতাল কন্ঠে বলল: আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছিনা। তুমি এভাবে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছো। তোমাকে আমি বলে বোঝাতে পারবো না আমি কতটা খুশি।
এতদিন তোমাকে অনেক মিস করছি আহিয়া পাখি।
আহিয়া নিজের শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শান্তির মাথা রাখলো তার প্রিয় মানুষটির বুকে।
অতঃপর কোমল কন্ঠে বলল: আমিও আপনাকে অনেক মিস করছি রেহান....
রিহান আহিয়াকে বুক থেকে তুলে পুরো চেহারা টুকরো টুকরো চুমু দিল।
আহিয়া রিহান কে বাধা দিলো না।
রিহানের বুকে ধুকপুকুনি জানান দিচ্ছে হৃদয়ের উতল পাতল।
কিছুক্ষণ এরকম পাগলামি করে।
তারপর আহিয়ার কপালে কপাল থেকে রিহান ঘন ঘন কয়েকটা নিশ্বাস নিল।
মৃদু কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল: ভালোবাসি আহিয়া পাখি.
আহিয়া দরজার চোখ বন্ধ করে বলল: আমিও ভালোবাসি।
আরে দুলাভাই রোমান্স বিয়ের পরের জন্য তুলে রাখেন।
আপাতত আমাদের বাড়ি যেতে হবে। মশা আমাকে খেয়ে ফেলতেছে।
আচমকা অন্য কারো শব্দে রিহান হক চকিয়ে গেল
ওর অবস্থা দেখে আহিয়া খিলখিলিয়ে হেসে দিল।
রিহান ভালোমতো লক্ষ্য করতেই দেখল একটু দূরে গাছের নিচে তৃধা দাঁড়িয়ে আছে।
রিহান মুহূর্তেই আহিয়া কে ছেড়ে দাঁড়ালো দূরত্ব বজায় রেখে আহিয়া কে বলল: কবে দেশে ফিরেছো? আমাকে কিছু জানালে না কেন?
আহিয়া কিছু বলার আগেই তৃধা এগিয়ে আসতে আসতে বলল: আগে কিছু জানালে এই সিনেমাটিক সিনটা দেখতে পারতাম না ভাইয়া।
রিহান মৃদু হেসলো অতঃপর তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল: তুমি তো আমাকে ফোন দিয়ে ভয় পাইয়ে দিছিলে।
ভেবেছি তোমার কোন বিপদ হলো কিনা।
তৃধা মৃদু হেসে বলল: আপনাকে ভয় পাওয়াতে পেরে আমি ধন্য...
ওর কথা শুনে আহিয়া ও রিহান দুজনেই হেসে দিল।
অতঃপর আহিয়ার রিহানের উদ্দেশ্যে বলল: গতকাল রাতে ফিরেছি....
আপনার সাথে দেখা করে আপনাকে সারপ্রাইজ দিব বলে ফোনে কিছু বলিনি।
রিহান হেসে বলল: দারুন সারপ্রাইজ দিয়েছো এখনো হৃদপিন্ড লাফাচ্ছে।
ওরা আবারও হাসলো এবার তৃধা তারা দিল বলল: ভাইয়া এখন আমাদের যেতে হবে বাড়ি থেকে লুকিয়ে বের হয়েছি।
রিহান বুজদারের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল: হ্যা চলো আমি তোমাদের পৌঁছে দিচ্ছি,,,,,
তিনজন হাঁটছে গাড়ির দিকে। তৃধা সামনে আগে আগে এগিয়ে যাচ্ছে। পেছনে রিহানও আহিয়া।
রিহান শক্ত করে আহিয়ার হাতটা ধরে আছে। মনে হচ্ছে ছেড়ে দিলেই পালিয়ে যাবে।
আহিয়া অন্য দিকে তাকিয়ে হাসছে।
রিহান তাকিয়ে আছে আহিয়ার দিকে।
রিহান হালকা কন্ঠে বলল: জান
আহিয়া মৃদু মাথা তুলে জবাব দিল: হুম
রিহান: তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে...
আহিয়ার লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে আসলো
যা হয়তো রিহান আধো আলো আঁধারিতে দেখতে পাচ্ছে না।
রিহান সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলো তৃধা গাড়িতে উঠে বসেছে।
আচমকা রিহান আহিয়ার হাতটা টান দিয়ে থমে গেল
আহিয়া নিজেও থতমতো খেলে রেহানের কাজে।
রিহান দুই হাতে আজলায় আহিয়ার মুখটা নিয়ে মাতোয়ারা কন্ঠে বলল: জান সামনে পেয়ে খুশিতে
I can control myself....
I can kiss you.. just once..
লজ্জায় মেয়েটার কান গরম হয়ে উঠলো।
কি বলছে ,,,এসব রিহান,, আহিয়া মাথা তুলে তাকালো রিহানের নিশাক্ত তো চোখের দিকে।
অতঃপর আবারও মাথা নামিয়ে নিল।
রিহান বুঝতে পারল সে ভুল প্রশ্ন করে ফেলেছে।
তাই অপরাধী কণ্ঠে বলল: sorry পাখি খুশিতে কি বলতে কি বলে ফেলেছি আমি নিজেও জানিনা প্লিজ তুমি রাগ করোনা।
আহিয়া একটু এগিয়ে দাঁড়িয়ে রিহানের বুকে মাথা রাখলো। বলল: রিহান আমি আমাকে আপনার কাছে হালালভাবে সমর্পণ করতে চাই। প্লিজ আপনি ব্যবস্থা করুন।
রিহানের চোখে খুশির ঝিলিক দেখা দিল।
খুশিতে নিজের হাতের মুঠোয় আহিয়ার হাতটাকে নিয়ে একটা চুমু দিয়ে বলল: আমি আগামী শুক্রবার আব্বু আম্মুকে তোমাদের বাড়ি পাঠাবো।
আহিয়া বাধা দিয়ে বলল: আপনি সবকিছু তাড়াতাড়ি ম্যানেজ করবেন। কিন্তু রমজান মাসের পর।
আঙ্কেল আন্টিকে আপনি ঈদের পর পাঠাবেন।
রিহান খানিকটা মন খারাপ করে গম্ভীর কণ্ঠে বললো: ঠিক আছে চলো তোমাদের বাড়িতে এগিয়ে দিয়ে আসি...
আহিয়া রিহানের হাত ধরে যেতে যেতে বলল: ভাইয়া দেশে ফিরেছে জানেন,?
রিহান আশ্চর্য কন্ঠে বলল; আহিয়ান দেশে ফিরেছে...
আহিয়া: হুম আপনি ভাইয়াকে একটু বুঝিয়ে বলবেন তৃধা পাগলিটার অভিমান ভাঙ্গিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে নিতে।
রিহান: আমাদের আর কিছুই করতে হবে না তোমার ভাই দেশে ফিরেছে সবকিছু ঠিকঠাক করতে
আহিয়া ছোট ছোট চোখ করে বলল :আপনি কিভাবে জানেন?
এইমাত্র তো বললেন ভাই এ দেশে ফিরেছে আপনি জানেন না...
রিহান দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল: গত একমাস যাবত তোমার ভাই চিন্তিত সেই খবর আমার কাছে আছে।
কিন্তু চিন্তায় চিন্তায় যে ইন্টারর্শিপ না করেই দেশে ফিরবে সেটা ভাবি নি।
আহিয়া: ভাইয়া কি নিয়ে এত চিন্তায় আছে?
রিহান দুই আঙ্গুলের মাথা দিয়ে আহি আর নাক টেনে বলল: এসব তোমাকে ভাবতে হবে না,,, আমরা বন্ধুরা আছি কোন দিনের জন্য,,,, প্রিয়জন পড়লে তৃধাকে খান বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আমার সম্বন্ধে সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিব সারা জীবনের জন্য কিচ্ছা খতম।
রিহানের আবোলতাবোল কথা শুনে আহিয়া হাসলো।
ঠিক তখনই তৃধা গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে দিয়ে বলল :তোমরা কি আসবে নাকি আমি ড্রাইভিং করে চলে যাব।
রিহান অবাক কন্ঠে তাহিয়াকে প্রশ্ন করল: এই পিচ্চিটা ড্রাইভিং করতেও জানে।
আহিয়া মৃদু হেসে মাথা দুলিয়ে জবাব দিল: হ্যাঁ...
তৃধা অনেক শখ ছিল ড্রাইভিং শেখার তাই বড় মামা শিখিয়েছে।
রিহান মনে মনে বিড়বিড় করে বলল: এই পিচ্চি কে বিয়ে করার পর আহিয়ানের কপালে দুঃখ আছে...
অতঃপর এগিয়ে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো,,
তৃধা বলার পরেও আহিয়ার রিহানের সাথে না বসে পিছনে তৃধার সঙ্গে বসল।
গাড়ি গিয়ে থেমেছে খান বাড়ির পিছনে রাস্তায়।
তৃধা ও আহিয়া রিহানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অনেক কষ্টে অর্ধ ভাঙ্গা দেয়াল টপকে বাড়িতে প্রবেশ করল। এত রাতে ড্রয়িং রুমে কাউকে না দেখে স্বস্তি নিঃশ্বাস ফেললো।
দুজনে গেল নিজেদের রুমে।