সবাই মিলে সরাসরি চলে গেল রেস্টুরেন্টের রুফটপে।
যেখানে ওদের টেবিল আগে থেকেই বুকিং দেওয়া ছিল। খোলা আকাশের নিচে রুফটপের চারপাশে রংবেরঙের লাইভ জ্বলছে।গোলটেবিলটার চারপাশে সবাই মিলে বসল।ইফতারের টাইম হতে এখনো ৩০ মিনিটের মত বাকি। মূলত সবাই একসাথে আড্ডা দেওয়ার জন্যই সময়ের আগে এসেছে।
তৃধা এলোমেলো চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
সে জানে কিছুক্ষণের মধ্যে তার বন্ধুরা তাকে কথা দিয়ে হামলা করবে। ভাবতে দেরি কিন্তু নাজমুলের প্রশ্ন করতে দেরি দেরি হলো না। নাজমুল বসতে না বসতেই তৃধার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো: এদিক সেদিক তাকিয়ে লাভ নেই... কি হয়েছে ঝেড়ে কাস।ওর কথা শুনে না চাইতেও তৃধার কাশি পেল। বাবলা সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে থাকা মোম পানির বোতলটা হাতে তুলে দিল। তা দেখে নীল বাবলার হাতে একটা থাপ্পড় দিয়ে বললো আস্তাগফিরুল্লাহ রোজা রমজান মাসে এসব কি করতাছোস?
সজীব চোখ ছোট ছোট করে তৃধার দিকে তাকিয়ে তার ভাব গতি বোঝার চেষ্টা করতেছে,,,
জুই রাগের দৃষ্টিতে তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল: তুই বলবি নাকি আমার হাতে মার খাবি?
তৃধা এক নজর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে মেনমিনিয়ে গলায় বলল: আহিয়ান ভাই দেশে ফিরেছে ১৫ দিন আগে।
শুনেছি আর নাকি যাবে না লন্ডনেএখানে ইন্টারশীপ করবে....
সজীব সচেতন কন্ঠে প্রশ্ন করব: হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন নিল?
তৃধা : আমি জানিনা...
তৃধার এমন রিলাক্স মুড এর কথায় নাজমুলের মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে। তাই তপ্ত স্বরে বলল: যা কইবার স্পষ্ট কইরা ক....মেজাজটা হট করিস না।
তৃধা হালকা গলা খ্যাকারী দিয়ে সবগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করল। অতঃপর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল ঘটনা খুলে বলল।
আশিক হেসে লুটুপুটি খেয়ে বলল: এমন প্রেম আমি বাপের জন্ম দেখি নাই।
শোভা তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল: আমার তো ওই ডায়লগটা সেই লাগছে.....
নীল প্রশ্ন করল: কোনটা.... ?
সোভার থেকে উত্তর জানতে সবাই তাহলে সোভারর দিকে। সেটা দেখে শোভা একটু ভাত নিয়ে গলার স্বর মোটা করে অভিনয় করে বলল: ধরে বস পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙলে তোর বাপকে আমি কৈফিয়ত দিতে পারব না। ওর অভিনয় দেখে উপস্থিত সকলেই হেসে দিল। তৃধা মেজাজ গরম হচ্ছে। এজন্যই আহিয়ান ভাইয়ের সাথে আসতে চাইনি।সে তো আগেই জানতো। তার বন্ধুরা এসব নিয়ে মজা করবে। আর হলোও তাই।
জুই একটু অভিমান নিয়ে বলল: ভাইয়া দেশে ফিরছে তুই আমাকে আগে জানাস নি কেন?
তৃধা একটু রাগ মেশানো কণ্ঠে বলল: আগে জানালে কি করতি? তোদের বাড়ি দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাতি?
জুই নিরেট কন্ঠে বলল: সেটা তো ভাইয়া এমনিতেও যাবে ছোট আম্মুকে দেখতে....
তৃধা জুইয়ের সাথে আর কথা বাড়ালো না।
নাজমুল তুই ঝড় মাথায় হাত রেখে দোয়া করার ভঙ্গিতে বলল: দিলাম দোয়া কইরা আহিয়ান আব্বার সাথে সুখে শান্তিতে প্রেম কইরা তারপর বিয়া কইরা একজন বাচ্চার জননী হও আম্মা।তৃধা এবার প্রচন্ড রেগে গেল চারপাশে কথা না ভেবেই নাজমুলের কাদের ধুম ধুম কয়টা কিল দিল। সজীব চারপাশের দৃষ্টি বুলিয়ে তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: চারপাশের সবাই দেখছে তৃধা এবার থাম।
ঠিক তখনই ওয়েটার ওদের খাবার দেওয়া শুরু করল।
তৃধা থেমে গেল নাজমুলকে শাসিয়ে বলল ফালতু কথা না বলতে।নাজমুল নাকমুখ কুঁচকে তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: এই অধমকে বিনা দোষে অত্যাচার করলি তো.... দেখবি আমার দোয়া কবুল হয়ে যাবে.... তোর কপালে আহিয়ান আব্বাস আছে ফু ফু ফু ,,, বদদোয়া দিলাম তৃধা বাদে বাকি সকলেই না চাইতেও হাসলো।
তৃধা গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই চারিদিকে মাগরিবের আজান পড়ছে।
বন্ধুরা সবাই দুষ্টুমি ছেড়ে ইফতারের দোয়া পড়ে রোজা ভাঙলো।
বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়টা হাসি আড্ডায় কখন যে চলে যায় তা বোঝা দায়।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে আসলো। গত কয়েকদিন থেকে সন্ধ্যার পর হালকা হালকা ঠান্ডা পড়ে।
কিন্তু আজকে প্রকৃতির নিয়ম ভেঙ্গে কিছুক্ষণ আগ থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।
সেটা দেখে তৃধা আরিয়ানকে ছোট্ট একটা টেক্সট করলো তাকে এসে নিয়ে যেতে। রুপটাফে বৃষ্টি থাকায় ওরা সকলে নিচে নেমে আসলো। বৃষ্টি ভাড়ার আগে সজিব শোভা নিল জুইকে গাড়িতে তুলে দিল ।তৃধাকে নিতে আহিয়ান আসবে তাই নাজমুল ও সজীবদের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
আহিয়ান এর কাছে বুঝিয়ে দিয়ে তবেই ওরা যাবে।
ইতিমধ্যে তুই তো অনেকবার ওদের চলে যেতে বলেছে।
চারিদিকে বৃষ্টির তাণ্ডব বাড়ছে এটা দেখে ওরা তিন বন্ধু আহিয়ানের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল।
হাত ঘড়িটাতে যখন সাতটা বেজে ২৫ মিনিট তখনই আহিয়ানের বাড়িতে এসে থামলে ওদের সামনে।
ছেলেটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে।
ওকে দেখে সজিব নাজমুলও আশিক সৌজন্যমূলক এসে বিদায় নিল।
আহিয়ান বাইক থেকে নেমে কপালের সামনের ভেজা চুল গুলো ছাড়তে ছাড়তে তৃধার সামনে এসে দাঁড়ালো।
তৃধা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আহিয়ান আর চোখে দেখে মৃদু কন্ঠে বলল: তোকে নিতে এসে বৃষ্টিতে ভিজে আজকে আমার এই হল চুলগুলো তো একটু মুছে দিলেও পারিস। তৃধা ভুরু কুঁচকে আর চোখে দেখায় আহিয়ানের দিকে।ছেলেটা সত্যি কাঁদ ভেজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃধা একটু মায়া হল বোধহয়। তাই পার্স হাতে একটা টিস্যু প্যাকেট বের করে অন্যদিকে তাকিয়ে বাড়িয়ে দিল আহিয়ানের দিকে।
আহিয়ান ফুটবলকে একটু হাসলো।তৃধা এখনো ঝমঝমের শব্দের বৃষ্টি দেখায় ব্যস্ত।ঠিক তখনই কাঁধে ঝুলানো গোলাপি অন্যটাই টান পরল পারলো।
চোখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতেই তৃধার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। দেখলো আহিয়ান নিশ্চিন্তে তার ওড়না দিয়ে মাথার চুল মূছছে। মেয়েটা বারবার ওড়না টানছে আহিয়ানের হাত থেকে ছুটানোর জন্য। কিন্তু এতে আহিয়ানের কোনো ভাবনা অন্তর হলো না।
সে তার ইচ্ছেমতো মাথার চুল মুছে তারপর ওড়না ছেড়ে দিল।
ইতিমধ্যেই বৃষ্টির দাপট কিছুটা কমে আসতে আহিয়ান গিয়ে বাইকে বসলো। তৃধা কিছু না বলে চুপচাপ গিয়ে বসলো আহিয়ানের পিছনে।
না চাইতেও হাত রাখলে আহিয়ানের পুরুষালি কাঁদে।
সপ্তপদ তো পুরুষ হলে সুঠামদেহে কালো টি শার্টটা চেপে লেগে আছে।তৃধার না চাই তো চোখ গেল সেদিকে। সে আবার চোখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু সমস্যা হল এবার... কিছু দূর যেতেই। আকাশ কাঁপিয়ে বজ্রপাত শুরু হলো। বৃষ্টির রূপ নিলো আরো তান্ডব করা ঝরে। চলন্ত বাইকে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো যেন কাটার মত শরীরে বিদচ্ছে। আহিয়ান বাইক নেয়ার সামনে এগোতে পারল না।
এরমধ্যেই তৃধা অনেকটা ভিজে গেছে। আহিয়ান তাই বাইক সাইড করলে একটা টঙ্গের দোকানের পাশে।
দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো দোকানের ছাউনিতে। সেখানে আগে থেকেই অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে। আরিয়ান লক্ষ করল সেখানে সকল মানুষের নজর তৃধার দিকে
প্রথমে না বুঝলে পরে ঠিকই বুঝেছে মানুষের
দৃষ্টি কারণ।তার ইচ্ছে করছে তৃধাকে ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পর লাগাই দিতে।
কিন্তু সে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করল। তৃধার দিকে ফিরে ওর পরানের গোলাপি ওড়নাটা দিয়ে ওর সারা শরীর পেচিয়ে দিলো।
তৃধা ছল ছল করে তাকিয়ে রইল আহিয়ানের গম্ভীর মুখের দিকে। আহিয়ান নিজের কাজ শেষ করে তার সামনে দাঁড় করালো। তৃধর একদম পিট ঘেসে দাঁড়িয়ে আছে আহিয়ান।তৃধা বুঝলো না ওর এমন ব্যবহারের কারণ। ঠিক তখনই কানের কাছে শুনতে পেল আহিয়ানের ফিসফিসানি আওয়াজ। আহিয়ান হালকা ঝুকে তৃধার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে দৃঢ় কিন্তু রাগী কন্ঠে বলল: তোকে না বলছি বোরখা ছাড়া বের হবি না বাইরে.....
তৃধা চুপ করে রইল....
আহিয়ান আবারও ত প্ত স্বরে বলল: ইচ্ছে করছে থাপরে তোর গাল দুটো লাল করে দেবে বেয়াদব।
বিকেলবেলা আকাশ খারাপ দিকে সাদা ড্রেস পরে কেন বের হইচ্ছিস।
আহিয়ানের হালকা ধমকেই তৃধা কেঁপে উঠলো কিন্তু কেন জানি তার কোন উত্তর দিতে ইচ্ছে করছে না।
এদিকে আহিয়ানের মেজাজ প্রচণ্ড গরম হচ্ছে।
চারিদিকে বুড়ো থেকে যুবক সকলের দৃষ্টি তৃধার দিকে
সাদা ড্রেস বৃষ্টিতে ভিজে গায়ের সাথে লেপটি আছে।
আহিয়ান তৃধাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে।
তবুও কিছু কিছু পুরুষ চেষ্টা করছে আর চোখে তৃধাকে দেখার।
তৃধা এবার চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল আহিয়ানের রাগের কারণ।
আশেপাশের পুরুষদের দৃষ্টি দেখতে পেয়ে তার ভীষণ ভয় করছে।
একটু পিছনে চেপে আহিয়ানের সাথে লেগে দাঁড়ানো।
তৃধার কোমল মসৃণ পিঠ বাড়ি খেলো আহিয়ানের শক্ত ভক্ত কোমল শীতল বুকে।
কিন্তু ছেলেটা আজকে খুশি হতে পারছে না.... চারিদিকের পরিস্থিতি তাকে বিচলিত করে।
ঝড় বৃষ্টির তাণ্ডব বাড়ছে। এই মুহূর্তে আহিয়ান চায়না কারো সাথে ঝামেলা করতে। তাই চুপচাপ বৃষ্টির মধ্যে তৃধা কে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিলো।