কিন্তু প্রবল বাতাসের ঝাপটায় বাড়ির সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। এর মাঝে একের পর এক বজ্রপাত। সব মিলিয়ে বড়সড়ো একটা দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে তারা। তবু আহিয়ান চেষ্টা করছে তৃধাকে নিয়ে সেফ জেনো পৌছাবে।তৃধার মেরি মন ভয়ে গুটি আছে।প্রকৃতি আজ ঠিক করে নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে চলবে। তাই বৃষ্টিও বজ্রপাতের তান্ডব কমার বদলে বেড়েই চলেছে।আচমকা দূরে কোথাও বজ্রপাত পড়ায়। তৃধা জোরে চিৎকার দিয়ে আহিয়ানের কোমর পিছন থেকে জাপটে ধরে ঢুকরে কেঁদে উঠলো।
আহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বাইকের গতি কমিয়ে আনলো।
বারবার পিছনে তাকিয়ে তৃধার উদ্দেশ্যে কিছু বলল।
কিন্তু বাতাসে শো শো শব্দ টা মিলিয়ে গেল।
তৃধা এখনো আহিয়ানের পিঠে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।
রাস্তার পাশে বড় একটা বটগাছ দেখতে আহিয়ান বাইক সাইট করল। অতঃপর মেয়েটার হাত ধরে নিয়ে গেল গাছের নিচে।
তৃধা এখনো মাথা নিচু করে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।
আহিয়ান একটু ওর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল: কি হয়েছে বাচ্চাদের মত এত কান্নাকাটি কিসের? আমি আছি তো এত ভয় পাওয়ার কি আছে?
তৃধা হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল: আহিয়ান ভাই আমার অনেক ভয় লাগছে।
এমন দুর্গম পরিস্থিতি হতেও কেন জানি আহিয়ান এর বড্ড হাসি পাচ্ছে।কিন্তু সে হাসলো না।
গম্ভীর মুখে বলল: ভয় পাওয়ার কিছু নেই একটু পর বৃষ্টি পড়লেই আমরা বাড়ি চলে যাব....
আহিয়ান নিজের পকেট থেকে ফোন বের করল বৃষ্টির বাড়িতে ফোন ভিজে নাজিরার অবস্থা।
ফোনে ৩৮ টা মিস কল তাও সবগুলো বাড়ি থেকে।
আহিয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর বাবার কল ব্যাক করল।
ফোন রিসিভ করতে শোনা গেল ফোনের ওপাশ থেকে পাপার বিচলিত কন্ঠ: কোথায় তোরা আহিয়ান? কল রিসিভ করতেছিস না কেন?
আহিয়ান: আমরা বৃষ্টি কমার অপেক্ষায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি...বৃষ্টি কমলে চলে আসব,,
পাপা: লোকেশন বল,,, আমি বাড়ির গাড়ি পাঠাচ্ছি।
আহিয়ান উত্তরে কিছু বলার আগেই দেখল ফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে। বিরক্তির কন্ঠে বলল উফ সীট,,,,,
অতঃপর পিছনে তাকিয়ে দেখলো তৃধা গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বজ্রপাতের আলোতে আহিয়ানের চোখ গেল আশঙ্কা তৃধার পেটের দিকে।
ভেজাসাদা জামাটা লেপ্টে আছে। যার কারনে পেট অনেকটা স্পষ্ট।আহিয়ান চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে রাস্তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
অতঃপর কিছু একটা ভেবে নিজের শার্ট খুলে তৃধার গায়ে জড়িয়ে দিল।
আচমকা কাজের মেয়েটা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করল তার সামনে আহিয়ান ভাই সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তৃধা মিনি মিলিয়ে বলল: কি করছেন এসব?
শর্ট পড়ে নিন,,,আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
আহিয়ান তৃধা ঠোঁটে তর্জনী আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলল: চুপ আমি চাইনা একটু আগের ঘটনা আবারও রিপিট হোক। আর তোর আমাকে এভাবে দেখতে এত অস্বস্তি হলে দেখিস না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাক।
দেখতে দেখতে রাত এগারোটা বেজে গেল। প্রকৃতি আজ ঠিক করেছে বৃষ্টি কমবে না।
তাইতো এখনো আগের মতোই ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে।
তৃধার কিছু একটা মনে পড়তে, পার্স নিজের মোবাইল বের করল।
কিন্তু কোন লাভ নেই মোবাইল বৃষ্টিতে ভিজে বন্ধ হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যেই তৃধা কয়েকবার হাসি দিয়ে ফেলেছে। এবারের বৃষ্টিতে তাকে বড়সড়ো কোন অসুস্থতা চলবে সেটা তারা অজানা নয়। আজ সাতেই নভেম্বর।
সারারাত বৃষ্টির তাণ্ডব শেষ করে ধরা দিয়েছে এক সোনালী সকাল। বৃষ্টির পানিতে সবকিছু ধুয়ে গিয়ে প্রকৃতি যেন সতেজ হয়ে উঠেছে। ভোর সকালের হাওয়ায় রাস্তা দিয়ে দুই একজন মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। পথযাত্রীদের অনেকেই নজরে পড়ল গাছের নিচে এক প্রাপ্তবয়স্ক যুবকের বুকে এক প্রাপ্তবয়স্কী যুবতী মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছে।এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনজন নেশাখোর বন্ধুর চোখে পড়লো আহিয়ান ত্রিধা ও ওদের বাইক। অচেনা যুবক-যুবতীকে কট খাইয়ে ২ টাকা পাওয়ার আশায় তারা আরো দুই চার জনকে ডাক দিলো।
এই যে মামনি সারারাত এত রংটং করছ এখন ঘুম থেকে জাগো। কানের একদম কাছে কোন পুরুষের কন্ঠ পেতেই তৃধা চোখ মেলে তাকালো।দেখলে কতগুলো ছেলে তাদের দিকে তাকিয়ে বিশ্রী ভাবে হাসছে।
তৃধা ভয়ে আরও কিছুটা গুটিয়ে গেল আসিয়ানের দিকে। তৃধা নড়াচড়া টের পেয়ে আহিয়ান চোখ মেলে তাকালো।
প্রথমে তাদের এই অবস্থা দেখে আহিয়ান কিছুটা অবাক লাগলোও পরে মনে পড়ে গেল কালকে রাত থেকে আজ সকাল অব্দি সমস্ত ঘটনা।
মস্তিষ্ক সজাগ হতে আহিয়ান চোখ মিলে তাকালো সামনে। দেখল একদল ছেলেপেলে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সে আর কিছু ভাবলো না তৃধার হাত ধরে দাঁড়িয়ে বাইক নিয়ে চলে যেতে চাইলো।
কিন্তু আচমকার ছেলেগুলোর মধ্যে কেউ একজন তৃধার হাত ধরে বলল: কই যাও মামনি?
আহিয়ান এক পলক তাকালো তৃধার হাত ধরা ছেলেটার হাতের দিকে।সঙ্গে সঙ্গে সে ছেলেটার মুখ বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে দিল। চিকন চাকন পাতলা গরনের নেশা করে ছেলেটা ধুপ করে পড়ে গেল কাদামাখা মাটিতে।
ছেলেটার এই অবস্থা দেখে বাকি ছেলেরাও রেগে এগিয়েল আহিয়ানের দিকে।
আহিয়ানের মত সুটান দেহি পুরুষ 6-7 জন রোগা পাতলা নেশাখোর ছেলেকে পেটাতে কোন অসুবিধা হলো না।এখানে এত গন্ডগোল দেখে মর্নিং ওয়াকে আসা কয়েকজন মুরুব্বী এগিয়ে আসলো।
মুহূর্তে সেখানে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হল।
ছেলেরা মুরুব্বীদের উদ্দেশ্যে বলল: পোলা মাইয়া এইখানে খারাপ ভাবে শুয়ে আছিল।
আমরা এসে এগরে ধরছি। এই কারণেই পোলা আমাগো মাইরা কিরকম অবস্থা করছে....
আহিয়ান রক্তরঙ্গার চোখে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলল: এই তোরা মিথ্যা কথা কেন বলিস? আমাদের নিয়ে আরেকটা উল্টা পাল্টা মিথ্যা কথা বললে পাথর মেরে তোর কান আমি বয়রা করে দিব।
আহিয়ানের কর্কট কন্ঠ কানে আসতে মুরুব্বীগুলো ওদের দিকে তাকালো।ছেলেটার গায়ে শার্ট নেই শুধু গেঞ্জি পরা।মেয়েটা জামার উপরে শার্ট পড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার হিজাব এলোমেলো।
একজন মুরুব্বী এগিয়ে এসে আহিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল: দেখে তো ভদ্র ঘরের ছেলে মনে হচ্ছে? চরিত্রের এমন হাল কেন?
আহিয়ান কিছু বলার প্রস্তুতি নিল.... ঠিক তখনই পাশে আরেকজন বলে উঠলো: এখন অন্তত এটা বলো না এটা তোমার বোন বা বান্ধবী লাগে। বৃষ্টির কারণে এখানে আটকে গেছিলে। আহিয়ান কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অন্য আরেকজন মুরুব্বী উঠে বলল: আপনি যে কি বলছেন ভাই পৃথিবীতে কি বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়ার জন্য জায়গার কোনো অভাব আছে।
গাছ তলায় কে আশ্রয় নেয়?
তাছাড়া বৃষ্টিতে মধ্যরাতেই থেমে গেছে ওরা বাড়ি ফিরে গেল না কেন?
আহিয়ান তৃধার হাতের মুঠো বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।
ওকে কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিচ্ছে না।
মুরুব্বিদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল: আমাদের এলাকায় এমন পাপ কর্জন কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না...
এদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত।
তৃধা আরিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।
সেটা দেখে আহিয়ান কে আশ্বস্ত করে বলল: কাদিস না আমি আছি তো....
আমি থাকতে কেউ তোকে ছুতেও পারবে না।
তখনই একজন মুরুব্বী এগিয়ে এসে বলল এই পোলায় ছেমড়ি তোর কি হ য়।
আহিয়ান স্পষ্ট কন্ঠে জবাব দিল: আমার মামাতো বোন।
মুরুব্বী আবারো বলল: মামাতো বোনকে যদি এত পছন্দ তো মামাকে বলে বিয়ে করতা। এত রং ঢং এর কি আছে?
আহিয়ান: আপনারা আমাদের ভুল বুঝছেন,,,
ছেলেগুলো মিথ্যে বলছে। তারা আমাদের কোন অপ্রীতিকর অবস্থায় পায়নি।
আমরা বিপদে পড়ে রাতে এখানে আশ্রয় নিছিলাম।
ঠিক তখনই এক রিক্সাওয়ালা রাস্তা থেকে এসে জবাব দিল: মিথ্যা কথা তো তোমরা কইতাছো,,,, আমি যখন সকালবেলা রিকশা নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাইতাছি,, তখনই দেখছি। এরা দুইজন একজন আরেকজনরে জরাইয়া ঘুমাইতেছে। উপস্থিত সকলের মাঝে আবারও গুঞ্জন শুরু হলো। অল্প বয়সী এক ছেলে ওদের দুজনের ভিডিও করছে। আহিয়ানের নজরে পড়তে ফোনটা কেড়ে নিয়ে রাস্তায় আছাড় মেরে ভেঙ্গে দিল।
একদম তো বলেই উঠলো: আজকে বিয়ে না পড়াইয়া ছাড়মু না। হয়তো এই পোলা এই মাইয়ারে বিয়া করবে নয়তো দুজনের ভিডিও কইরা ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম টিকটক সব জায়গায় ছরাইয়া দিমু। এই কথা বলেই পকেট থেকে আরেকটা ফোন বের করে ধরল ওদের দিকে। আহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে ত্রিধার দিকে ঘুরে ওকে আড়াল করে নিজের বাহুতে জড়িয়ে নিল।
একজন সাদা দাড়ি ওয়ালা মুরুব্বি বলে উঠলো: এইতো ভালোই দেখা যায় তাহলে বিয়ে করতে সমস্যা কি?