ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে(সিজন-৩)

55

লেখক: ফারজানা মনি

আহিয়ান তৃধাকে নিজের কাছে আড়াল করে রেখেই সকলের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলল: আমরা বিয়ে করবো .... প্লিজ আপনার ভিডিও করা বন্ধ করুন...

অতঃপর তৃধার উদ্দেশ্যে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল: পরিস্থিতি আমাদের বিপরীতে, বিয়ে করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আমি চাইনা তোর বা আমার জন্য খান বাড়ির কারো প্রতি আঙ্গুল তুলে কথা বলুক। আশা করছি তুই আমার কথা বুঝতে পারছিস। তৃধা আহিয়ানের কথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে দৃঢ় কণ্ঠে বলল: হুম।

উপস্থিত লোকজনদের মধ্যে একজন সকলের উদ্দেশ্যে বলল: পোলা তো কইছে মাইয়ারে বিয়ে করবো...এখন তোমারা ভিডিও করা বন্ধ করো। অতঃপর একটা ছেলেকে আদেশ দিয়ে বলল: সামনের মসজিদ থেকে একটা হুজুরের ডাক দিয়ে নিয়ে আয়...

আমার নাম বলবি তাহলে তাড়াতাড়ি আইবো।

ছেলেটার সঙ্গে সঙ্গে গেল মসজিদে ওদিকে। মিনিট দশেকের মধ্যে হুজুর নিয়ে চলে আসলো। গাছ তলায় কোন রেজিস্ট্রি পেপার ছাড়া শরীয়ত মতে হুজুর দিয়ে ওদের বিয়ে পড়ানো হলো। তৃধা এখনো প্রচুর কাঁদছে,,,, ফর্সা লালগুলো রক্ত জবার মতো লাল হয়ে উঠেছে।

বিয়ে শেষ হতে না হতে আহিয়ান সকলের উদ্দেশ্যে বলল: আমরা কি এখন যেতে পারি?

জবাবে একজন মুরুব্বী বলল: হ যাও যাও কিন্তু মাইয়ারে একটু খেয়াল রাইখো?

আহিয়ান কাউকে কিছু বলল না চুপচাপ বাইক স্টার দিল ।বাইক চলুক খান বাড়ির পথে।

বেলা ৯ টা ছুই ছুই ওরা দুজনে বাড়িতে প্রবেশ করল।

সদর দরজা পেরিয়ে চোখ করল ডাইনিং রুমে। চিন্ততো মুখে বসা সকলের দিকে। ওদের দেখে বন্যা এগিয়ে এসে উতলা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল: তুই ঠিক আছিস তো মা? ফোন বন্ধ কেন তোর? তৃধা মিনমি নিয়ে বলল: আমি ঠিক আছি... বৃষ্টির পানিতে ফোন বন্ধ হয়ে গেছে...

আহিয়ান তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: তুই রুমে যা,,

তৃধা সঙ্গে সঙ্গে নিজের রুমের দিকে হাঁটলো।

আহিয়া সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দুজনকে দেখছে।

তার কেন জানি মনে হচ্ছে ভাইয়া ও তৃধা দুজনই কিছু লুকচ্ছে‌। আহিয়ান এর তৃধাকে রুমে পাঠানোর পাঁয়ে তারা দেখে মনে হচ্ছে। ও এখানে থাকলে গোপন কিছু ফাঁস হয়ে যাবে। আবির এগিয়ে এসে ছেলে উদ্দেশ্যে কর্কট কন্ঠে বলল: তুমি কি দেশে ফিরেছো আমাকে টেনশন দেওয়ার জন্য?

আহিয়ান পাপার মত গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল :আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করিনি...

আবির: ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করোনি....? সারারাত কইছিলে ?

আহিয়ান: এক বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম...

আবির: একটা ফোন দিয়ে জানাতে পারতে...

তোমার চিন্তায় চিন্তায় তোমার মা কাল রাত থেকে কান্না করছে।

আহিয়ান: ফোন বন্ধ হয়ে গেছে....

আবির: তোমার বন্ধুরও কি ফোন বন্ধ হয়ে গেছে? তার ফোন দিয়ে জানাতে পারতে?

বৃষ্টিতে ভিজে মাথা ব্যাথা করছে আমি উপরে যাচ্ছি। বলে আহিয়ান বড় বড় পায়ে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল তৃতীয় তলা । সকলে তাকিয়ে রইল ওর যাওয়ার পানে। আবির ছেলে ঘার ত্যারামি আমি সহ্য করতে না পেরে টি টেবিলে লাথি মেরে বলল: এই ঘাড়ত্যারা ছেলেটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না।

তখনই আলী আহমেদ খান মৃদু এসে বলল: বিশ্বাস করা না করার কি আছে বাপ,,, তুমিও এককালে এমন ত্যারামি করে আমায় জ্বালিয়েছো.....এখন তোমার ছেলেও তোমার মত ত্যারাই হয়েছে।এখানে অবিশ্বাসের কিছু নেই।

আব্বুর কথাটা আবিরের আগুনে ঘি ঢালার মতো লাগলো। কিছু না বলেই গম্ভীর মুখ নিয়ে চলে গেল দ্বিতীয় তলায়। দ্বিতীয় তালার দরজা বন্ধ করার শব্দটা নিচ থেকেও শোনা গেল। মেঘ ও বন্যা, কান্নাকাটি বন্ধ করে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল দ্বিতীয় তলার বাপ ও তৃতীয় তলা র ছেলের দিকে।

সকাল গড়িয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। কিন্তু আজকের তৃধা রোজা না থাকার সত্বেও নিচে খেতে আসিনি। বন্যা রুমে গিয়ে দেখল তৃধা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। কম্বল সরিয়ে মেয়ের কপালে হাত রাখতে আঁতকে উঠল। জ্বরের শরীর পুড়ে যাচ্ছে তৃধার।

বন্যার সঙ্গে সঙ্গে নিচ তলায় ছুটে গেল। ড্রয়িংরুমে বসে আলী আহমেদ খান ওয়াজ শুনছিল। ওনাকে দেখে বন্যা বলল: বড় আব্বু তৃধার অনেক জ্বর এসেছে। আপনার কাছে তো ডক্টরের নাম্বার আছে। কল দিয়ে এখনই আসতে বলুন। ওর কথা শুনে আহিয়া, মেঘ, রাই, হালিমা খান, আকলিমা খান, ও মালিয়া খান ও ছুটে গেল তৃতীয় তলার দিকে। আলী আহমেদ খান সঙ্গে সঙ্গে কল দিলে ডাক্তারকে। প্রচন্ড জোরে তৃধার হুশ নেই বললেই চলে। বন্যা মেয়ের মাথায় অনেকক্ষণ পানি ঢাললো। বাড়ির মহিলারা এখনো তৃধার রুমে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু একটা মনে পড়তেই মেঘ ছুটে গেল পাশের রুমে ছেলের কাছে। আট খোলা দরজাটা ধাক্কা দিয়ে। ভিতরে ঢুকতেই দেখলো আহিয়া কপালের উপর একটা হাত দিয়ে শুয়ে আছে।

রুমে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে আহিয়ান চোখ মেলে তাকালো। চোখগুলো লাল টকটকে হয়ে আছে।

মেঘ এগিয়ে গিয়ে ছেলের কপালে হাত রাখল দেখলে শরীল জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। মাম্মাম কে দেখে আহিয়ান উঠে বসতে চাইলে কিন্তু মেঘ থামিয়ে দিল।

মেঘ কাথোর কন্ঠে বলল: এত জল নিয়ে শুয়ে আছিস আমাকে বলিস নি কেন?

আহিয়ান চোখ বন্ধ করে বলল; আমি ঠিক আছি কিছু হয়নি আমার।

মেঘ; বললেই হল? আমি দেখতে পাচ্ছি তো শরীর অনেক জ্বর। ওইদিকে ত্রিধাটাও একই কাজ করেছে।

সারাদিন জ্বর নিয়ে বিছানায় পড়ে আছে কাউকে কিছু জানায়নি। বন্যা রুমে না গেলে তো জানতোই না মেয়ের এরকম অবস্থা।

আহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলো: তৃধার জ্বর এসেছে?

মেঘ: হুম

আহিয়ান: ডাক্তার ডেকেছে? মেডিসিন খাইয়েছে?

মেঘ: ডক্টর ডেকেছি... কিন্তু এখনো আসেনি...!

আহিয়ান: ডক্টর কে গিয়ে আবার কল দাও আমি ঠিক আছি। আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করতে হবে না।

মেঘ গিয়ে পাশের রুমে দেখল ডক্টর এসেছে, তৃধাকে দেখছে। আলী আহমেদ খানের হাতে প্রেসক্রিপশন ধরে দিয়ে যখন বেরিয়ে যাবে। তখনই মেঘ ডক্টরকে নিয়ে গেল আহিয়ান এর রুমে। মন না চল সত্বেও আহিয়ান ডক্টরকে চেকআপ করতে দিল। ডক্টর বেরিয়ে যেতেই নাক মুখে কম্বল দিয়ে আবার শুয়ে রইলো।

তানভীর অফিস থেকে ফিরিয়ে মেয়ে রুমে ছুটে আসে।

তৃধা এখনো বিভোর ঘুমাচ্ছি। তানভীর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে কন্ঠে ডাকলো: মা ও মা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখো পাপা এসেছি। কিন্তু মেয়ের কোন সাড়াশব্দ নেই। তানভীর আবারও ডাকলো: তৃধা মা তোমার কি মাথা ব্যথা করছে... পাপা মেসাচ করে দেই?

এবার তৃধা হালকা নড়ে উঠলো। চোখ দুটো ফুলে ছোট ছোট হয়ে আছে। আস্তে করে বলল পাপা তুমি এসেছ।

তানভীর উতলা কণ্ঠে মেঘে প্রশ্ন করল: এখন কেমন লাগছে মা? তৃধা আসতে করে বলল: ভালো ।

তারপর পাপার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে মেয়েটা ঝরঝর করে কেঁদে দিল।তানভীর মেয়ের কান্না দেখে প্রচণ্ড বিচলিত হলো বারবার প্রশ্ন করছে: কি হয়েছে মা? বাড়ি ফিরতে লেট হয়েছে বলে কি তোমার মাম্মম বকেছে। নাকি গতকাল ইফতার পার্টিতে কিছু হয়েছে। তুমি কি বৃষ্টিতে অনেক ভয় পেয়েছো। এত প্রশ্নের পরেও তৃধা তখনও উত্তর দিল না। তাও উতলা কন্ঠে তানভীর একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। তৃধা কাঁপা কন্ঠে বলল: সরি পাপা ভীষণ সরি...

তানভীর: সরি কেন বলছ? আম্মু কি হয়েছে?

তুই তো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেদে বলল: এমনি.... আমার কিছু ভালো লাগছে না..।

তখনই দরজার পাশ থেকে কেউ বলল :আসবো?

তানভীর তাকিয়ে দেখলো, আবির ,আদি, আলী আহমেদ খান ,ইকবাল খান ও মোজাম্মেল খান এসেছে। তানভীর আব্বু চাচু ও ভাইদের ভিতরে আসতে বলল। তৃধা চোখের পানি ঝটপট মুছে নিল কিন্তু চোখ মুখ এখনো ফুলে লাল হয়ে আছে।

তানভীর উঠে দাঁড়ায় দাঁড়াতেই আবীর তৃধার মাথার কাছে বসলো ও বলল: এখন কেমন লাগছে আম্মু?

বড় পাপ আর কণ্ঠ শুনে তৃধা আস্তে করে বলল: ভালো।

আবির: কিছু খেতে মন চায়? কি খাবে বলো আমি এনে দিচ্ছি..

তৃধা মাথা মেজ দুলিয়ে জানায় তার কিছু খেতে মন চাচ্ছে না।

মোজাম্মেল খান এগিয়ে গিয়ে আদরের নাতনির আর এক পাশে বসলো।

মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিলেন। আবির কিছুক্ষণ থাকার পর পাশে রুমে গেল। বাড়ি ফিরে মেঘের কাছ থেকে শুনেছে ছেলের জ্বর এসেছে। ছেলে রুমে প্রবেশ করে দেখ আহিয়ান নাকে মুখে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। তাই আর ডাকলো না। কপালে হাত রাখল ভালোই জ্বর এসেছে। কিছুক্ষণ ছেলের পাশে চুপচাপ বসে রইল। তার ছেলেটা একটু ত্যারা স্বভাবের।

নিজে যেটা ভালো মনে হয় সেটা করতে স্বাচ্ছন্ন বোধ করে। আমি অনেক সময় বুঝেও ছেলেকে মানাতে পারে না। অবশ্য ছেলেকে দোষ দিয়ে আর লাভ কি।

সে নিজেও তো সারা জীবন নিজস্ব মতামতে চলতে স্বাচ্ছন্ন বোধ করত। এখন তার ছেলেদের পাপার মতে চলবে সেটা ভাবা বিলাসিতা। সবকিছু ভেবে একমাত্র সেজন্য ভীষণ চিন্তা হয়। সব সময় নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে গিয়ে কোন সময় যেন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে না নেয়। আবির কিছুক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে চলে আসলো। ইফতারের সময় হয়ে যাচ্ছে তাই ডাইনিং রুমে যাওয়াও জরুরী।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 55 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন