অনবরত ফোনের ভাইব্রেশন আহিয়ার ঘুম ভাঙলো।
ফোন হাতে নিয়ে দেশে রাত বারোটা বাজে ৪০ মিনিট।
ঘুম ঘুম চোখে ফোন রিসিভ করে বলল: হ্যালো কে?
রিহান : ঘুমিয়ে গেছো....?
রিহানের কণ্ঠস্বর শুনতে আহিয়ার ঘুম ভেঙ্গে ঠোঁটের কোন হাসি ফোটলো।
আহিয়া : এটা কার নাম্বার....?
রিহান : আমার....!
আহিয়া : এই নাম্বারটা তো আমার কাছে নেই......!
রিহান : নতুন নিয়েছি তাই তোমার কাছে নেই....
আহিয়া : আজকে এত দেরিতে কল দিলেন যে....?
রিহান : জরুরী কাজ ছিল তাই বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছে আজ....
আহুয়া : খেয়েছেন....?
রিহান : হুম। তুমি খেয়েছ....?
আহিয়া : হ্যাঁ অনেক আগেই....
রিহান : আহিয়া পাখি.....মিস ইউ....!!
রিহানের ব্যাকুল কণ্ঠস্বর শুনে মৃদু হেসে আহিয়া বলল : Same to you আমিও......
রিহান ইতস্তত কন্ঠে বলল :জানো আজকাল নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয়...।
জবাবে আহিয়া বলল: কেন?
ঈদের পর তো আব্বু আম্মুকে বলে তোমাদের বাড়ি পাঠাবো।
রিহান থেমে যেতে আহিয়া প্রশ্ন করল: হুম তো।
রিহান অপরাধী কন্ঠে বলল: না মানে আমি অনেক টেনশনে আছি আহিয়ানকে নিয়ে।
ওকি আমার কে ভুল বুঝবে? আমাদের বন্ধুত্বটা আগের মত কি থাকবে আহিয়া.....?
এবার আহিয়ে নিজেও চিন্তিত হইল। কিন্তু নিজের ভেতরের চিন্তাগুলো সে রিহানকে জানাতে চাইল না।
তাই সান্ত্বনা দিয়ে বলল: থাকবে.... এত টেনশন করছ কেন....?
ভাইয়া যদি প্রথমে রাগও করে পরে ঠিক আপনাকে মেনে নিবে। ভাইয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড আপনি আপনাকে সে ভুল বুঝতেই পারে না। তাছাড়া তো আমি আছি। আমি ভাইয়াকে ঠিক বুঝিয়ে নিব।
রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহিয়ার উদ্দেশ্যে বলল: অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে থাকো.. একটু পর আবার সেহরি খাওয়ার জন্য উঠতে হবে...
হুম আপনিও ঘুমান। সারাদিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে।
গুড নাইট।
রিহান : গুড নাইট।
রাত দুইটা বাজে। চারিদিকে শুনশান নিরবতা।
অন্ধকারের মাঝে তৃধার রুমের দরজা ঠেলেই ভিতরে ঢুকলো আহিয়ান।
হালকা আলো-আঁধারীতে রুমটা ছেয়ে আছে।চুপচাপ নিঃশব্দে বসে তৃধা র মাথার কাছে। কপালে হাত ছোয়াতে গিয়ে আহিয়ানের হাতটা চেপে উঠলো। এই মেয়েটা এখন শুধু তার ভালোবাসার মানুষ নয়। এখন তার একমাত্র বউ। অনেক শখের বউ....ভালোবাসার বউ.....আদরের বউ.....তার হৃদয়ের রানী.....তার অর্ধাঙ্গিনী.....হঠাৎ করে জীবনটা কেমন পাল্টে গেল.....সে কখনো ভাবতেও পারেনি তাদের বিয়েটা এভাবে হবে....। বিয়ের প্রথম রাত নিয়ে তার কত জল্পনা কল্পনা ছিল। সবই আজ ধূসর রং হারিয়েছে।
দুইজন দুই রুমের জ্বর নিয়ে পড়ে আছে।
তাছাড়া আর সারাদিন ধরে আহিয়ান অনেক ভাবনা চিন্তা করেছে...... তবুও মন থেকে ভয়ে সরাতে পারচ্ছে না।
আচ্ছা তৃধাকি তাকে আগের ভুল গুলোর জন্য ক্ষমা করবে।নাকি আহিয়ানের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে অভিমানী তৃধা ডিভোর্স চেয়ে বসবে। আর এসব যদি বাড়িতে জানাজানি হয় পাপা ও মামমাকে কি জবাব দেবে। তারা যদি বিয়েটা একটা এক্সিডেন্ট ভেবে ডিভোর্স করাতে চায়.....
উফ এসব ভাবতে বিরক্ত লাগছে। মাথা ব্যথায় মাথাটা বুঝি ছিড়ে পড়ছে।
আহিয়ান ধীরে ধীরে তৃধার কপালে হাত রাখল।
মেয়েটার শরীরে এখনো জ্বর আছে। একদিনের ঝড়ে মেয়ে টার চেহারা মলিন হয়ে গেছে।আহিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সেদিকে। হঠাৎ শুনতে পেল তৃধা মৃদু কন্ঠে আওয়াজ করছে মামমাম মাথা ব্যথা করছে।
আহিয়ান এবার হাত রাখল তৃণার মাথায়। অনেকক্ষণ মাথা টিপে দিল। চুল টেনে দিল। তৃধা আরামে ঘুমাচ্ছি। এদিকে তার কোন খেয়াল নেই। অদূর থেকে ভেসে আসছে। মসজিদে মাইকের শব্দ। বারবার জানান দিচ্ছে। সেহরির সময় হয়ে গেছে। আহিয়ান তৃধার কপালে একটা শক্ত চুমু বসিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
আরো মিনিট পাশের দাঁড়িয়ে থেকে ।হাঁটলে রুমের দিকে।
দরজা ঠেলে রুমে ঢোকার আগেই পিছন থেকে কেউ ডাকলো ভাইয়া। আহিয়ান পিছন ফিরে দেখল। পেছনে আহিয়া দাঁড়িয়ে। মেয়েটার চোখের কোন অবাক কথা নেই। আহিয়ান জানি তার বোন তাকে তৃধা রুম থেকে বের হতে দেখেছি। এতে তার কোন ভাবনা অন্তর হলো না। স্পষ্ট কণ্ঠে বললো: কি?
আহিয়া এগিয়ে এসে বলল: শরীর এখন কেমন? জ্বর ভালো হয়েছে?
আহিয়া : ভালো..... তুই নিচে যা আমি সেহরি খেতে আসছি। বলেই আহিয়ান রুমে যেতে চাইলো।
আহিয়া পেছন থেকে বলল: তুমি সুস্থ নও....তোমার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে.... আজকে রোজা না রাখলে হয় না?
আহিয়ান ফিরে এসে, বোনের কপালে একটা টোকা দিয়ে বলল,,: আমি ঠিক আছি আমাকে নিয়ে তোকে এত চিন্তা করতে হবে না তুই নিচে যা আমি আসছি....
বলেই আহিয়ান রুমে গেল। আহিয়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের যাওয়ার পানে।
সেদিনের পর কেটে গেল এক সপ্তাহ। আহিয়ান ও তৃধা দুজনই এখন সুস্থ।
কিন্তু এক সপ্তাহই দুজনের তেমন দেখা হয়নি।
দেখা হয়নি বললে ভুল হবে তৃধা আহিয়ান সামনাসামনি পড়তে চাইনি।
তাই সেহরির সময় আহিয়ান এর আগেই খেয়ে চলে আসতো।
শুধু ইফতারের সময় দুজনে সামনাসামনি হতো, তাও আবার অল্প সময়ের জন্য।
আহিয়ান বলছে মেয়েটার বিব্রতীকর অবস্থা।। তাই সে নিজেও তৃধার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করে।
তাছাড়া গত কয়েকদিন থেকে আহিয়ান দিনের বেলা বাড়িতে কম থাকে। মেঘ জিজ্ঞাসা করলে জানায় বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল।
আজ ২৪ শে রমজান আসরের নামাজ পড়ে তৃধা বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ বাইকের শব্দ কানে এলো। নিচে তাকাতেই দেখল আহিয়ান বাড়িতে প্রবেশ করছে। দেখেই তৃধা বেলকনি থেকে সরে দাঁড়ালো।
আহিয়ান ভিতরে ঢুকে যেতেই সে আবার বেলকনিতে আসলো।
তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটা জীবন ভিট কেমন নড়েচড়ে দিয়েছে।আজকাল তৃধা সারাক্ষণ চিন্তায় থাকে পাপা যেদিন জানবে সেদিন কি হবে? পাপা সহ্য করতে পারবে তো? এত বড় সত্যি?
তাছাড়া আহিয়ান ভাই.....উনিও তো নিশ্চয়ই এই বিয়েটা মানেন না। তৃধা তো এতোটুকু পর্যন্ত জানে না আহিয়ান ভাই কি তাকে কখনো চেয়েছিল।
না চাইনি বোধহয়.....চাইলে কি আগের বারের মত কাপুরুষের মত ছেড়ে চলে যেত। না চাইতো মেয়েটার চোখ দিয়ে গালবে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
অভিমান করে গত দুই বছর যে মানুষটার থেকে পালিয়ে বেড়েছে। আল্লাহতালা সেই মানুষটার সাথে পবিত্র বন্ধনে বেধে দিল। কিন্তু মানুষটা কি চায় এ বন্ধন থাকুক।
রুমে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে তৃধা ঘার ঘুরিয়ে তাকালো।তৃধা ঝটপট চোখের পানি মুছে রুমে গেল।
আহিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তৃধার দিকে।
সেটা দেখে তৃধা চোখ নামিয়ে নিল। আহিয়া তৃধার হাত টেনে নিয়ে বিছানায় বসালো। অতঃপর সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো: তোর ব্যাপার কি বলত কি লুকাচ্ছিস আমার থেকে?
তৃধা : কিছু না।
আহিয়া : আজকাল তোর অনেক পরিবর্তন এসেছে জানিস....?
তৃধা মাথা তুলে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে: কি পরিবর্তন...?
আহিয়া মুখ গম্ভীর করে বলল: অনেক পরিবর্তন যা আমাকে স্পষ্ট ধারণা দেয় তোর ভিতরে কোন ঘাপলা আছে?
আহিয়া আবার বলল: ভাইয়া তোর ব্যাপারটা কি বলতো দুজন একই এরকম মান অভিমান করে সারা জীবন কাটিয়ে দিবি...?
তৃধা কিছু বলল না চুপ করে শুনলো আহিয়ার কথা।
আহিয়া তৃধার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল : কিরে, তুই কি শুনছিস আমার কথা?
আমি তো ভেবেছি সেদিন দুজনে একসাথে বের হয়েছি সব ঠিকঠাক করেই ফিরবি। কিন্তু না তোরা আগের থেকে আরো গম্ভীর হয়ে ফিরেছিস। তোরা কি আবার ঝগড়া করে ফিরেছিস।
তৃধা এবার আহিয়াকে জাপটে ধরে কেঁদে উঠলো।
আহিয়া,অবাক, তার ভাইটা যে কি করে না মেয়েটাকে হয়তো আবার কষ্ট দিয়েছে।
এই বাড়িতে থাকা অবস্থায় এদের দুটোর মিল বুঝে শে আর দেখবে না।
তখন এই কানে এলো তৃধা অস্পষ্ট কিছু আওয়াজ।
কিন্তু কান্নার দাপটে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
আহিয়া তৃধাকে সোজা করে বসিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল: কি হয়েছে স্পষ্ট করে বল? তৃধা আহিয়ার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল: আগে বলো তুমি কাউকে কিছু বলবে না।
আহিয়া :ঠিক আছে বলবো না।
তৃধা মেনমিনিয়ে কাঁপা গলায় বলল: আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে,
আহিয়া চোখদুটো বড় বড় করে হালকা মৃদু চেচিয়ে বলল :কিহ...কবে..?কিভাবে..?কখন..?তুই কি ডেট ফেল গাঞ্জা খাইছস?
তৃধা আমতা আমতা করে বলল: আমি যা বলছি সব সত্যি বলছি.. আমার আর আহিয়ান ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
আহিয়া বুকে হাত দিয়ে অভিনয় করে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
তারপর অভিনয় করে বলল :আমি মনে হয় আর বেশি দিন বাঁচবো নারে,
এত বড় শকট নিতে পারছে না আমার ছোট্ট হৃদয়। অতঃপর উঠে বসে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো: দয়া করে ঝেড়ে কাস,,,
আমি সবকিছু স্পষ্টভাবে শুনতে চাই।
তৃধা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলো সেদিনের সকল ঘটনা।
আহিয়া ইতিমধ্যে চরম আশ্চর্যের পর্যায়ে। কিন্তু এদিকে সে ভীষণ খুশি। দুজন ভালবাসার মানুষ দুজনকে পেয়ে গেল হালাল ভাবে। কিন্তু অন্যদিকে পরিবারের কথা ভেবে তার রুহু বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা।
বলা শেষে তৃধা তা আবার কেড়ে দিল আহিয়া এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল: কান্নাকাটি করিস না..
আমাদের প্লান সাথে গড প্লান কখনো মেলেনা।
তিনি সবকিছু আমাদের ভালোর জন্যই করেন।
তখনই ছোট্ট আদিবা রুমে এসে বলল: আপু তোমাদের নিচে ডাকছে ইফতারের সময় হয়েছে...
আদিবা কে দেশে তৃধা তাড়াতাড়ি চোখ মুখ মুছে নিল।
এই পাকনা বুড়ি কাউকে কাঁদতে দেখলে সারা বাড়ি ঢোল পিটিয়ে বেড়ায়।
সে নিজেও যে একটু পরপর কাঁদে তার কোন দোষ নেই।