ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে(সিজন-৩)

57

লেখক: ফারজানা মনি

আহিয়া বলল: নিচে গিয়ে বল আমরা আসছি...

আদিবা কোমরে এক হাত রেখে দাঁড়িয়ে থেকে বলল: বড় আম্মা বলেছে তোমাদের দুজনকে নিচে নিয়ে যেতে।

আহিয়া হাসলো ওর ভাব দেখে। উঠে দাঁড়িয়ে আদিবা কেকোলে তুলে নিল। তারপর আর এক হাতে তৃধার হাত ধরে বলল: চলেন ভাবি নিচে যাই।এতদিন পর ননদ বাড়িতে বেড়াতে আসছে একটু সেবা যত্ন করেন।

তৃধা এবার হাসি দিল.....

নিচে গিয়ে দেখলে ইতিমধ্যে সেখানে সবাই উপস্থিত।

ইফতারের সময় হতে মাত্র চার মিনিট বাকি। আহিয়া ও তৃধা চেয়ার টেনে বসলো। তৃধা সামনে দাঁড়াতেই নজর গাথলো আহিয়ানের চোখে।তৃধা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল।এদিকে রিহান রিহানের দাদু, রকিব রিয়া সকলেই একসাথে ইফতার করছে.....

রিহান অল্প কিছু খেয়ে উঠে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিল। তখনই ওর আম্মু বলে উঠলো: রিহান

রিহান : জি আম্মু...

রিয়া : তোর রুমের টেবিলের উপর কয়েকটা মেয়ের ফটো আছে। কোনটা পছন্দ হয় দেখে জানাশ।

রিহান থমকে দাঁড়িয়ে গেল। এসব আজ নতুন নয় গত এক বছর যাবত হয়ে আসছে।

রিয়ান মায়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো: আম্মু প্লিজ ...তোমাকে কতবার বলেছি ।আমাকে এসব মেয়ের ছবি এনে দেখাবে না.....!

ওর আম্মু কিছু বলার আগে, ওর আব্বু সরাসরি বলল: তোমার কি অন্য কাউকে পছন্দ আছে?

রিহান থতমতো খেলো।

তবুও জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল: হুম আছে।

রাকিব: মেয়েকে? বাবার নাম কি?

রিহান ইতস্তত করে বলল : আব্বু এখন না আর কয়েকদিন যাক। ঈদের পরে আমি নিজেই তোমাদের মেয়ের বাড়ির ঠিকানা দিব।

রকিব কিছু বলল না। রিয়া হাবলার মতো তাকিয়ে আছে বাপ ছেলের দিকে। ছেলের জন্য মেয়ে খুঁজতে খুঁজতে তার চোখ কানা হয়ে যাচ্ছে।আর এদিকে ছেলের মেয়ে পছন্দ করাই আছে। রিহান নামাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতেই, রাকিব রিয়ার উদ্দেশ্যে বলল: দেখলে তো তোমায় ছেলে প্রেম করছে আমি আগেই বলেছিলাম। তুমি আমার কথা বিশ্বাস করো নি। শান্তি হয়েছে এবার? মেয়ে দেখা বন্ধ কর...

রিয়া: আমি কি জানতাম তোমার ছেলে প্রেম করে... তাহলে কি ঘটক দিয়ে মেয়ে খুজতাম।

রাকিব: আমি জানি, তুমি জানতে না তাইতো আগেই বলেছিলাম তোমার ছেলেকে জিজ্ঞাসা কর। কিন্তু তুমি কি বলেছ ,না আমার ছেলে প্রেম করতেই পারে না। ওর একটা মেয়ের বান্ধবী আছে তাও আবার দেশে না বিদেশে থাকে। ওর পছন্দ থাকলে অন্তত আমাকে বলতো....

রিয়া কথা হেরে যাওয়ার ভয়ে উঠে কিসিনের দিকে গেল।বউকে জব্দ করতে পেরে রাকিব মৃদু হাসলো।

পাশ থেকে রিয়ানের দাদু বলল: তোর পোলার যেহেতু পছন্দ আছে মাইয়া ভালো হইলে আর দেরি করিস না। ঈদের পরেই বিয়েটা দিয়া দে....

রাকিবের ব্যাচিংয়ে হাত দুটি দিতে বলল: আচ্ছা আম্মু...

রাকিবের আম্মু আবার বলল: জান্নাত তো একটা কল দিয়ে দে তো...মাইয়াডারে কতদিন থেকে দেখিনা।

জুইরে কতদিন কইছি, এই বাড়িতে আইয়া কয়টা দিন থাক,কিন্তু আইলো না। বাড়িতে আমরা হাউরি বউ দুইজন,সারাক্ষণ একলা একলা লাগে।

রাকিব মৃদু হেসে বলল : জুইয়ের লেখাপড়া আছে আম্মা। এখানে এসে কি করে থাকবে।

তারপর ফোনটা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল: এই নাও মেয়ের সাথে কথা কও...

রিহানের দাদু ফোন হাতে নিতে নিতে বলল: ঈদের পর তাড়াতাড়ি আমার নাতিরে বিয়ে করা...তখন আর পরের বাড়ির নাতিনরে বারবার আইতে জন্য জোর করবো না।

রাকিব টুপি মাথায় দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল: বিয়ে তো আর কইলেই হয়ে যায় না ।আগে দেখে ছেলের পছন্দ তারপর না হয় এসব নিয়ে আগানো যাবে।

রাত এগারোটা খান বাড়ির সকলে তারাবির নামাজ পড়ে ।খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মাত্র যে যার যার রুমে ঢুকলো।তৃধা বিছানা গুছাচ্ছিল। দরজায় নক করার শব্দ শুনে। তৃধা বালিশটা মাথার দিকে দিতে দিতে বলল: দরজা খোলা আছে ভিতরে আসো, তৃধা মনে করেছে আহিয়া এসেছে।তাই পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি।কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে দরজা লক করা শব্দ কানে আসলো। আচমকা পিছনে তাকিয়ে দেখলো আহিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।

তৃধা তড়িহরি করে বিছানার কোনে রাখা ওরনা গায়ে জড়ালো।অতঃপর মেন মেনিয়ে গলায় বলল: আআ আপনি?

আহিয়ান এগিয়ে আসলো। তৃধার সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট গলায় বলল: তোর সাথে আমার কথা আছে...

তৃধা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল: কি কথা?

আরিয়ান গলা ফেকারি দিয়ে বলা শুরু করল: আমাদের দুজনের বিয়েটা অপ্রত্যাশিকভাবে হয়েছে। আমরা কেউ হয়তো এভাবে চাইনি। কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে। আমার তোকে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মেনে নিতে কোন অসুবিধা নেই। পরিবার কি বলল, কি ভাবলো, সেসব নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না। আমি সবকিছু সামনে নেব। আপাতত আমার এক-দেড় বছর সময় চাই। সেটা কেন চাই তুই নিজেও জানিস। এই সময়টুকু পর আমি নিজেই পরিবারকে সব জানিয়ে দিব।

তারপর একটা খাম বের করে তৃধার সামনে ধরে বলল: যেহেতু আমাদের বিয়েটা শরীয়ত মোতাবেক হুজুর দিয়েছে। তাই আমাদের বিয়ের আইনগত কোন প্রমাণ নেই। আমি চাই আমাদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশনটা এবার হয়ে যাক। কিন্তু শুধু আমি চাইলেও হবে না তোকে চাইতে হবে।

যাইহোক এতক্ষণ আমার নিজের দিকে কথাগুলো বললাম তোকে।

এখন তোর কথায় আসি.... এটা আমাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি পেপার। তোর যদি মনে হয় তোর জন্য আমি যোগ্য। সারা জীবন আমার সাথে কাটাতে পারবি তাহলে এটাতে একটা সাইন করে দিস। আর তোর যদি মনে হয় সকলের অগোচরে হওয়া বিয়েটা তুই এখানেই শেষ করে দিতে চাস। এবং এহসান বা অন্য কাউকে বিয়ে করতে চায়। তাহলে কাল আমার সাথে বের হবে। কোন হুজুরের সামনে শরীয়ত মোতাবে আমি তোকে তালাক দিব। তৃধা চট করে মুখ তুলে তাকালো।

কিন্তু কিছুই বলল না।

আহিয়ান ওর হাতে কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে বলল: ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিস। আমাদের যদি একবার ডিভোর্সটা হয়ে যায় আমি কিন্তু আর এই দেশে থাকব না। সারা জীবন কাঁদলেও তুই আমাকে আর দেশে ফিরাতে পারবে না। আর যদি সম্পর্কটা রাখতে চাস। তাহলে ভেবেচিন্তে রাখিস, জীবনের কোন এক জায়গায় গিয়ে সম্পর্কটা যেন তোর কাছে বোঝা মনে না হয়। আজকের রাতে ভাব কালকে আমাকে সিদ্ধান্ত জানাস। বলে আহিয়ান বেরিয়ে যেতে চাইলো।

ঠিক তখনই তৃধা মৃদু কিন্তু রাগেশ্বরে বলল: দাঁড়ান.... আহিয়ান থমকে দাঁড়ালো। তৃধার দিকে তাকিয়ে দেখল রেগে মেয়েটার নাকের পাটা ফুলে লাল হয়ে আছে।

তৃধা আহিয়ান এর উদ্দেশ্যে তেজী কণ্ঠে বললো: আমাকে আপনার মানুষ মনে হয় না না? যখন ইচ্ছা হবে জীবনে আসবেন। আবার যখন ইচ্ছা হবে চলে যাবেন। প্রতিবার এসে কোনো না কোনো বিষয়ে আমাকে কাঁদাবেন। আর আমি কি সব চুপচাপ মেনে নিব। তৃধা আহিয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল: আগেরবার যাওয়ার আগে কি যেন বলেছিলে... আমাদের আবার দেখা হবে মান অভিমানী হিসাবটা কোষে নিবেন তাই না। তাহলে সেই হিসাব না দিয়ে আপনি আবার কোন লন্ডনে পালিয়ে যাচ্ছেন?

আহিয়ান কিছু বলল না। ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার পাগলীটার দিকে। তৃধা এবার কেদে দিলো বোধয়।

আবারো আহিয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে জড়ানো কন্ঠে বলল: কেন আমাকে অনুভূতির সাগরে ভাসিয়ে আপনি পালিয়ে গেছিলেন? আমার মন নিয়ে আপনি কেন খেলছিলেন? থাগুলো বলতে গিয়ে তৃধা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে ভাঙ্গা কন্ঠে বলল: আমি আপনাকে ভীষণ ঘৃণা করি... সব আপনার অভিনয়। আপনি সারা জীবন আমার সাথে কাটাবেন না.... শুধু শুধু এসব বলে দায়সারা হচ্ছে। আহিয়ান এককদম এগিয়ে গিয়ে তৃধার দুই কাঁধে হাত রাখল।কিন্তু তৃধা এতে আরো বেশি পাগলামি শুরু করল। আহিয়ানের হাতছাড়া মেরে সরিয়ে দিল। কাঁদতে কাঁদতে বলল: একদম ছুবেন না আমায়.. বেইমান বিশ্বাসঘাতক পুরুষ... অনাকাঙ্খিতভাবে বিয়েটা হয়েছে বলে দায় সারহতে এসেছেন। এসব পুরুষদের আমি মন থেকে ঘৃণা করি।

আজকে আহিয়ানের নিজেকে অনেক অসহায় লাগছে।

সে সত্যিই দোষী। সেদিন না চাইতেও মেয়েটাকে অনেক আঘাত দিয়ে ফেলেছে। হ্যাঁ সে তো সত্যিই অপরাধী।

আহিয়ান তৃধাকে কি বলবে এই মুহূর্তে কিছুই বুঝতে পারছে না।

ঠিক তখনই শোনা গেল দরজার বাইরে কারো হেটে আসার আওয়াজ।

ঠিক তখনই আহিয়ান তৃদাকে টেনে বেলকনিতে নিয়ে গিয়ে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল।

তৃধা ছটফট করে আহিয়ানের বুকে কয়েকটা কিল ঘুসি দিল।

কিন্তু ছেলেটা ছারলো না। শক্ত করে মাথাটা চেপে রাখলে নিজের বক্ষে। শান্ত করতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল: সরি আমি কখনো তোকে রেখে কোথাও যাবো না। যদিও যাই তোকে সাথে করে নিয়ে যাব। প্লিজ পাখি একটু থাম। দরজার বাইরে কে যেন আছে। তোর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাবে। কিন্তু তৃধা আজ থামলো না। শক্ত করে আহিয়ানের ভেতরে কাঁদতে থাকলো।দুই বছরের জমানো কান্না আজ ঢেলে দিল। প্রিয় মানুষের বুকে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 57 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন