কেন করলেন এমন...? আমার কথা একবারও মনে পরল না.... ? যতবড়ই সমস্যা হোক আমাকে জানিয়ে যাওয়া যেত না....? বলেই তৃধা হাউমাউ করে কাদছে।
কথাগুলো অনেকটাই অস্পষ্ট। কিন্তু আহিয়ান সব কথাই সুনছে । চুপচাপ তৃধার মাথা তার বুকে চেপে ধরে মেয়েটাকে কাঁদতে দিল। সে আজ সকল অভিযোগগুলো শুনতে চায়।তৃধা নাক টেনে টেনে আবারো বলল আপনি অনেক খারাপ আহিয়ান ভাই,,.. স্বার্থপর আপনি অনেক। আপনার ডিভোর্স ও আমি চাই না। আপনাকেও আমি চাইনা। আমি যেভাবে আছি ভালো আছি। বলে আবারও হু হু করে কেঁদে দিল।
অতঃপর আহিয়ান নিজের হাঁটু গেড়ে বসলো ওর সামনে।
তৃধা এখনো মাথা নিচু করে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।
আহিয়ান তৃধার নরম তুলতুলে হাত দুটো নিজের পুরুষালি হাতে নিয়ে অসহায় কন্ঠে ডাকলো: পরী.....
আচমকা অন্যরকম ডাকে তৃধা মাতা তুলে তাকালো।
আহিয়ান কয়েক পলক তাকিয়ে রইল...... তার পরীর অশ্রু ভেজা পল্লবের দিকে। পুরো চেহারা রক্ত জবার ন্যায়ের লাল হয়ে আছে। গায়ের ওড়না টাও এলোমেলো।
আহিয়ান হাত দুটো ঠোঁটের কাছে নিয়েই চুমু খেয়ে ভেজা কন্ঠে বলল: সরি পরি.....বিশ্বাস কর আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি। হঠাৎ করে লন্ডনে চলে যাওয়ার খবরটা আমার কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। তাই নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে তোকে রাগ দেখিয়েছি। তোকে কষ্ট দিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট আমি পেয়েছি। সেদিন যদি তোকে ফুপির বাড়িতে যেতে না দিতাম। তাহলে তোর সামনে দিয়ে কোনভাবেই আমি লন্ডনে ফিরে যেতে পারতাম না। আমি আমাদের ভালোর জন্যই স্বার্থপর হয়েছি....দুজন ভাগাভাগি করে কষ্ট পেয়েছি। ফিরে যাওয়ার পর যখন শুনতে পাই তুই হাসপাত ভর্তি। আমার ইচ্ছে করছে নিজেকে নিজে খুন করতে। কিন্তু আমাদের ফিউচারের কথা ভেবে। আমি সব ফেলে তোর কাছে ফিরে আসতে পারিনি। এই দুই বছর তুই আমার সাথে একটা বার যোগাযোগ করিস নি। জানিস আমি কতটা কষ্টে ছিলাম। প্রতিদিন সকাল হলেই বাড়িতে কল করতাম। জানতাম সকালবেলা তোকে বাড়িতেই পাওয়া যাবে। কথা হোক না হোক। দেখা হোক না হোক। ফোনের পাশে তুই আছিস ভেবেই সান্তনা পেতাম। বিশ্বাস কর পাখি তোকে কষ্ট দিয়ে এই দুই বছর আমি নিজেই মরণ যন্ত্রণায় পেয়েছি। তৃধা কান্না থামিয়ে তাকিয়ে রইল আহিয়ান ভাইয়ের দিকে।
মাথার চুল গুলো ব্যালকনিতে থেকে আসা মৃদু বাতাসে এলোমেলো দুলছে। গোলাপের ঠোঁট জোড়া এই দুই বছরে একটু কালচে রং ধারণ করেছে। চোখের নিচে কালো হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে লোকটা কত রাত ঘুমায়নি। আহিয়ান ঘনঘন শাসে নিশ্বাস নিয়ে আবার বলল: দূরে ছিলাম কিন্তু তোকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলিনি। তোর খোঁজ খবর সর্বদা আমার কাছে ছিল।
তুই শুধু আমাকে একটা বার সুযোগ দিয়ে দেখ। আমি তোর লাইফের বেস্ট লাইফ পার্টনার হব। আর কখনো কোন অভিযোগ করার সুযোগ দিব না। মামা ও বাবা কে আমি সামলে নেব। তুই শুধু সকল পরিস্থিতিতে আমার হাতটা ধরে সামনে দাঁড়াবি। আমি দুনিয়া জয় করে তোর কাছে ফিরে আসব। থাকবি তো আমার পাশে? ভালোবাসি আমায়....?
কথাগুলো শেষ করে আহিয়ান তৃধার মুখের পানে উত্তরের আশায় তাকিয়ে রইল। তৃধা এখনো নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রায় মিনিট পাঁচেক হল কিন্তু অপর পাশ থেকে কোন উত্তর এলো না।
আহিয়ান এবার নিরাশ হয়ে তৃধার হাত ছাড়তে ছাড়তে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু লক্ষ্য করল তৃধা তার হাত শক্ত করে ধরে আছে।আহিয়ান কিছুটা আশার আলো দেখতে পেল বোধহয়।
তাই হালকা উজ্জ্বল হাসি নিয়ে তাকিয়ে রইল তার প্রিয় তমার দিকে। তৃধা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে ঐদিকে।
আচমকা আহিয়ান কে অবাক করে দিয়ে তৃধা সোপায় বসে থেকে আহীয়ানের কোমর চেপে ধরে পেটে মাথা রাখলো। তারপর মিনমিনি নিয়ে গলায় বলল: ভালোবাসবো.... ভীষণ ভালোবাসো❤️... যতটা ভালবাসলে আপনি আর আমাকে ছেড়ে যেতে পারবেন না ততোটা । যত কিছুই হোক আমি সব সময় আপনার পাশে আছি। আপনি আপনার মত কাজে মন দিন.... আমি অপেক্ষা করবো।
আহিয়ান কথাটা খুশি হয়েছে তা হয়তো ছেলেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না। তৃধা কে এক টানে বসা থেকে দাঁড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তৃধা প্রশান্তির শ্বাস নিল স্বামীর বুকে মাথা রেখে। দুজনেই দীর্ঘদিনের মান-অভিমান আজকে শীতল জলে পরিণত হলো।
আজকের চেয়ে খুশির দিন আর কোনটা হতে পারে?
আহিয়ান তৃধার মুখ দুহাতের আজলায়ই নিয়ে, কপালে একটা গভীর চুমু একে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। রন্ধে রন্ধে পৌঁছে গেল স্বামীর দেওয়া প্রথম ভালোবাসার ছোঁয়া। তৃধা চোখ খিচে বন্ধ করে আছে। আহিয়ান সেই বন্ধ চোখের পাতায় তাকিয়ে মিষ্টি সরে ডাক দিল: বউ...
কথাটা কর্ণ কুহুল এ পৌঁছাতে তৃধা লজ্জায় চোখ আরও একটু খিচে নিলো। সেটা দেখে আহিয়ান হাসলো। অতঃপর ডাকলো: এই বউ....
তৃধা চোখ বন্ধ রেখে জবাব দিল: হুম ..
আচমকা আহিয়ান তৃধার ঠোঁটের ঠোঁট ডুবাল।
চুষে নিতে লাগলো তার কোমলমতি পরীর গোলাপি ঠোঁট জোড়া.....☺️। মাঝে মাঝে ছোট ছোট কয়েকটা কামড় বসিয়ে দিল। মিনিট বিসেক পর জীবে নোনতা কিছুর স্বাদ পেয়ে। তৃধা ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিল।
এরপর কয়েকটি ঘন নিশ্বাস নিয়ে বলল : সরি যখন শুনেছি তুই এহসানের সাথে দেখা করতে গেছিস।
তখন অনেক রাগ হয়েছিল। তখন যদি সামনে পেতাম এর থেকে এর থেকে বেশি ভয়ানক শাস্তি দিতাম।
এরপর আহিয়ান টুপ করে আরেকটা চুমু দিয়ে বলল : এরকম ভুল আর জীবনে করবি না। তা না হলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।
তৃধা হালকা ফুঁ দিয়ে উঠলো....অতঃপর নিচু কন্ঠে বলল : আমি যেতে চাইনি বাবার জেড়াজুড়িতে যেতে হয়েছে....
আহিয়ানোর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল : হয়েছে আর কাঁদতে হবে না এবার শান্ত হ...
অতঃপর আহিয়ান হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল : রাত একটা বাজে। এখন নিজের রুমে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু মন মানছে না। নিজের মনের অযাচিত চাওয়া গুলোকে সাইটে রেখে তৃধার উদ্দেশ্যে বলল:
আমি রুমে যাই তুই ঘুমা.... তৃধা মৃদু মাথা নারিয়ে সম্মতি জানালো।
আহিয়ান দুষ্টুমি করে বলল : অভদ্র বউ জামাইকে একবার থাকতেও বললি না...? তৃধা এবার ফিক করে হেসে দিল।
তারপর আহিয়ান কে রুমের বাইরে বের করে দিয়ে দরজা লক করে দিল। বুকের ভেতরে অনাবরত কেউ যেন ঢোল পেটাচ্ছে।
বারবার মনে পড়ছে কিছুক্ষণ আগের মুহূর্তগুলো।
তৃধা লজ্জায় বালিশের নিচে মুখ বুজে বিছানায় পড়ে রইল। তার ঠোঁটের নিচে মিষ্টি হাসি। সেহেরী দুই ঘন্টা আসছে ঘুমাইনি। আহিয়ান ও তার একটু আগের মুহূর্তগুলো মনে করতে করতে সময় পেরিয়ে গেছে।
সেহরির সময় হয়ে আসতে সকলেই ফ্রেস হয়ে নিচে গেল। চারিদিকে লক্ষ্য করে দেখলো সকলেই থাকলেও আহিয়ান ভাইকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
মনে মনে ভাবলো লোকটা হয়তো গভীর রাতে ঘুমিয়েছে তাই এখনো জাগতে পারেনি। ঠিক তখনই কানের পাশে কেউ বলল: ভাইয়াকে খুঁজছিস?
তৃধা হক চকিয়ে তাকাতেই দেখল আহিয়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছে।
হৃদয় খানিকটা লাজুক ভঙ্গিতে বলল: ইস আপু তুমি যে কি বলো না..
আহিয়া কানের সামনে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল: আমি কিন্তু জানি ভাইয়া কালকে তোর রুমে ছিল....
তৃধা নিচের দিকে তাকিয়ে খাওয়ার মনোযোগ দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল: মিথ্যে কথা...
আহিয়া এবার তৃধার পিঠের চিমটি কেটে বলল: মোটেও মিথ্যে কথা নয়....
আমি রাতে গেছিলাম একটা দরকারে তো রুমের সামনে।
আমি তখন ভাইয়া ও তোর কথা শুনেছি।
তাছাড়া ভাইয়া নিজেও রুমে ছিল না।
তৃধা এবার বাঁ হাতে আহিয়ার ঠোঁট চেপে ধরে বলল: আল্লাহর ওয়াস্তে চুপ কর আপু কেউ শুনলে রক্ষা থাকবে না।
আহিয়া মিটি মিটি এসে বলল: তাহলে স্বীকার কর...
ঠিক তখনই মেঘ ওদের দুজনকে ধমক দিয়ে বলল: কি হয়েছে? এত কথা কিসের?
এবার ওরা দুজন কথা রেখে খাওয়ায় মন দিল।
কিন্তু তুই যা বারবার সেই দিকে তাকাচ্ছে।
সেটা দেখে আহিয়া আবার ফুসফুসিয়ে বলল: ভাইয়া একটু আগেই খেয়ে নিজের রুমে চলে গেছে....এবার মনোযোগ দিয়ে খায় সেহরির সময় চলে যাচ্ছি।
তৃধা কি খানিকটা মন খারাপ হলো. বোঝা গেল না সে আবার খাওয়াই মনোযোগ দিয়েছে।।
সকাল ১০ টা বাজে। ঘরগুলো এখনো অদ্ভুত শান্ত। সকলের সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে আবার ক্লান্তির ঘুম ঘুমিয়েছে।
পরদার ফাক দিয়ে নরম রোদের আলো পড়ছে তৃধার বালিশে। ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। মাথাটা একটু ভারী গলা শুকিয়ে এসেছে। রোজার দিন সকালগুলোতে এমনটা হওয়ার স্বাভাবিক। রুমের বাইরে নরম করণ কুরআন তেলোয়াতের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আহিয়া কুরআন তেলাওয়াত করছে। তৃধা,
পিটপিট করে উঠে বসলো। রোজার দিনে সকালগুলো তো বাড়িতে যেন আরো শান্ত আরো নম্র। ঘুম ভাঙলেই প্রথমে মানুষের নিজে রোজার কথা মনে পড়ে।
এটা যেন ভেতরে ভেতরে পবিত্র শান্তি জাগিয়ে জাগিয়ে তোলে। জানালার দিকে এগিয়ে পর্দা সারাতে ঠান্ডা বাতাস ঢুকলো ঘরে। বাইরে রোদ্দুর ঝিলমিল করছে। পাখিরা ডাকছে। সব মিলিয়ে একটা তৃপ্তির আবহাওয়া....