তৃধা ফ্রেশ হয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়ালো। অনেকক্ষণ ধরে ধরে ঠোঁটে টানটান লাগছিল ,তাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে নজর পড়লো ঠোঁটে। তৃধা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে নিল। তারপর আবার খুলে হাত দিলে ঠোঁটে। নিচের ঠোঁট ফুলে কলাগাছ হয়ে আছে।
তার সাথে জায়গায় জায়গায় কাটা। তৃধা টেনশন এ হাত দিয়ে দুই ঠোট চেপে ধরল। তারপর পিছেতে পিছাতে বিছানায় গিয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়ল।
ওকে দেখে মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে গেছে। কিন্তু না, সে সামরিক সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়েছে মাত্র। তৃধার মাথা ঘুরাচ্ছে....এই অবস্থায় সে কি করে নিচে যাবে। ঠিক তখনই বাইরের করিডর থেকে আদিবার গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। ওর কন্ঠ শুনে মনে হচ্ছে ওদিকেই আছে। তৃধা ওড়না দিয়ে বড় এক টা ঘোমটা দিল। তারপর ওড়নার এক্সাইড দিয়ে মুখ ঢেকে নিল যাতে ঠোট দেখানো যায়। এই পাকনা বুড়ি একবার দেখলে প্রশ্ন করতে করতে প্রশ্ন নানীর চার দিনের পায়েতারার আয়োজন করে ফেলবে। আগের দিনের নারীদের যেমন বিয়েতে গীত গাইতো। ঠিক তেমনি একটা গীত গাইতে গাইতে মনের সুখে আদিবা ঢুকলো আহিয়ার রুমে। কিন্তু পার্থক্য এতোটুকু ওর বিদেশ সুর হয় কিন্তু গান হয় না। মনে হয় ওর গানের আগা মাথা কেউ কিছু বুঝবে না। আপু....আপু....
আদিবার চিল্লানির ডাকে.....মিনিট কয়েক পর আহিয়া কোরআন তেলাওয়াত বন্ধ করে জবাব দিল: কি হয়েছে তোর....? এত চিল্লাচ্ছিস কেন?
আদিবা ফুকলা দাঁত বের করে হেসে বলল: বড় আম্মু তোমাকে ডাকছে...
আহায়া: কেন....?
আদিবা রুম থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বলল :জানিনা.....
তারপর ঢুকলো তৃধার রুমে..... তৃধা এমন হুজরানি সেজে বসে থাকতে দেখে আদিবা বলল: ছোট আপু, আমাকে তোমার সাথে নামাজে নেবে?
তৃধা আদিবাকে তাড়ানোর জন্য বলল: আমি নামাজ পরছি না, তুই কি করছিস আমার রুমে? যা এখান থেকে.... তৃধার ধমক শুনে আদিবা ভ্যা ভ্যা করে কেদে দিল। ওর কান্না শব্দ শুনে পাশের রুম থেকে আহিয়া ও আহিয়ান বের হয়ে আসলো। আহিয়ান আদিবাকে কোলে নিতে নিতে বলল: কি হয়েছে আপু? ব্যথা পেয়েছো? আদিবা কাঁদতে কাঁদতে তৃধার দিকে আঙ্গুল তুলে বলল: আপু কিছু খাচ্ছিল কিন্তু আমায় দিচ্ছিল না। ওর কথা শুনে আহিয়া ও আহিয়ান তাকালো তৃধার দিকে।
তৃধা এখনো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আদিবার দিকে।
আহিয়া এগিয়ে গিয়ে বলল: কিরে আদিবা কি বলে এসব? ছি ছি রোজার দিনে এসব কেমন কথা?..
তখনই পাশ থেকে আহিয়ান আসতে শব্দ করে বলল: ছি ছি ছি ছি.....।
তৃধার টাস্কি খেয়ে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এই পিচ্চিটাকে এভাবে ফাঁসিয়ে দিবে কখনো কল্পনা করতেও পারিনি। তৃধা সকলের উদ্দেশ্যে বলল : আমি কিছু খাচ্ছি না ...ওই বিচ্ছু মিথ্যা কথা বলছে।
তখনই আদিবা কাঁদতে কাঁদতে বলল: মিথ্যা কথা বলছে ছোট আপু।
আহিয়ান আদিবা কে শান্ত স্বরে বলল: কান্না থামাও আপু ভাইয়া তোমাকে অনেক চিপস কিনে দিবো...
চিপসের কথা শুনে আদিব একটু থামলো।
আহিয়া আদিবা প্রশ্ন করল: তুই তৃধাকে খেতে দেখেছিস।
আদিবা মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বলল: আমি এসে দেখি আপু ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে।
আমি ভাবছি নামাজ পড়বে...
তাই বলেছে আমাকে সাথে নিতে... কিন্তু আপু আমাকে বকেছে।
এবার আহিয়ান বলল: তাহলে তুমি মিথ্যা কেন বলছো আপুনি? কেন বলেছ তোমার আপু খাচ্ছিল,?
এবার আদিবা ঠোঁট বেঁকে কেঁদে বলল: আম্মুর সাথে মুভিতে দেখেছি মেয়েরা এভাবে মুখ ভেঙ্গে চুরি করে খাবার খায়। মানে আপুও খাচ্ছিল।
ওর কথা শুনেই তৃধা এগিয়ে এসে ওকে ধমক দিতে চাইলো। কিন্তু তার আগে আহিয়া এগিয়ে গিয়ে বলল: ঠিক তো তুই এমন চোরের মত মুখ লুকিয়ে আছিস কেন?
তৃধা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল মুখ লুকালাম কই।।
আমি তো জাস্ট রোজার দিন একটু পর্দা করছিলাম
আহিয়া : বেশ ভালো তো, তুই রুমের মধ্যে একা একা পর্দা করছিস... কিন্তু আমি যে তোর চেহারাটা একটু দেখতে চাই..
তৃধা লাফিয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেল,, চেহারা দেখার কি আছে। তুমি জীবনে আমাকে দেখনি নাকি।
আহিয়ান ওদের দু'বোনের দুষ্টুমি দেখে আদিবাকে নিয়ে, ডাইনিং রুমের দিকে গেল।
তৃধা র মুখ লুকানোর বিষয়টা আহিয়ার এবার সন্দেহজনক লাগছে। সে এগিয়ে গেল তৃধার দিকে।
তখনই দরজার কাছে রাই এসে ধমক দিল: তোমরা দুজন এখনো এখানে কেন? তোমাদের দুজনকে কখন থেকে বড় ভাবি নিচে ডাকছে আদিবা খবর দেয় নি।
তৃধা নিজের মাথার ওড়নাটি আরেকটু নিচে ঢেকে দিল। আহিয়া ভদ্র সুরে বলল: জি ছোট আম্মু বলেছে।
আমরা এখনই আসছি,
অতঃপর রাই আহিয়া ও তৃধা, গেল নিচতলার দিকে।
ড্রয়িং রুমে আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল খান, মালিহা খান, হালিমা খান, আকলিমা খান, আহিয়ান মেঘ ও বন্যা বসে আছে। রাই এসে সকলের পাশে বসলো। মামমাম কে দেখে আদিবা ভাইয়ের কোল থেকে নেমে মায়ের কোলে উঠলো।
মেঘ ওদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবে: তার আগেই বন্যার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল: এভাবে মুখ ঢেকে আছিস কেন?
তৃধা মালিহা খানের পাশে বসতে বসতে বলল: এমনি....
তখন মালিহা খান ওর ওড়নাটা হালকা টান দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল: কি হয়েছে চেহারা ঢেকে যাচ্ছিস কেন?
তৃধা তখনই দুই হাত ঠোঁটে চেপে ধরে ভয়ক্ত চোখে তাকালো। ওর চোখ দেখে সকলের সন্দেহ আরো বাড়লো। বন্যা ধমক দিয়ে বলল : মুখ থেকে হাতছাড়া বলছি..
ধমকের চোটে তৃধা মুখ থেকে হাত সড়িয়ে, সবার দিকে কাঁদো কাঁদো চোখে তাকালো।
তখনই ফোন স্ক্রল করা রেখে আহিয়ান তাকালো, মেয়েটা ঠোঁট ফুলে কলাগাছ হয়ে আছে।
না চাইতেও মৃদু হেসে দিল। যা তৃধার চোখ আড়াল হলো না। তৃধা মনে মনে কয়েকটা গালি ছুড়ে দিল ওর দিকে। শয়তান বদমাশ লুচ্চা জামাই.....
কিন্তু মুখে কিছু বলল না। তখনই ওর ঘর কাটে,
মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে বলে উঠলো: তোর ঠোটে এ অবস্থায় কি করে হলো?
আহিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তৃধার দিকে।
তৃধা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তোতলাতে তোতলাতে বলল: না মানে ফুপি...
মেঘ:কি
তৃধা কি বলবে কিছু বুঝতে পারছিনা। তাই আবারও চুপ করে রইল।
আহিয়ান ফোন স্ক্রল করতে করতে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল: মাম্মাম বাড়িতে মধু আছে কি?
মেঘ তৃধার থেকে চোখ ঘুরিয়ে আহিয়ান এর উদ্দেশ্যে জবাব দিল: মধু দিয়ে কি করবি?
আহিয়ান: লাগবে... ইফতারের পর মনে করে দিও তো...
সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল তৃধার কন্ঠে: আমার ঠোঁটে মৌমাছি কামড় দিয়েছে ফুপি...
উপস্থিত সকলে তাকাল তৃধার দিকে বন্যা এগিয়ে এসে তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: মৌমাছি কিভাবে কামড় দিল?
অনেকটা ফুলে গেছে তো আ্যন্টিসেপটিক লাগাস নি কেন?
তৃধা বুকে সাহস নিয়ে বলল: গতকাল রাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়েছিলাম তখন হঠাৎ একটা মৌমাছি কোথা থেকে এসে কামড়ে দিয়ে চলে গেল....
আহিয়ান ফোনের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।
তৃধার মন চাচ্ছিল লোকটার মাথার চুলগুলো টেনে ছিড়ে ফেলতে।
পাশ থেকে আহিয়া মুখ দিয়ে চু চু শব্দ বের করে, আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: মৌমাছিটা খুব বড় ছিল তাই নারে? তোরটা অনেকখানি ফুলে গেছে। তৃধা অস্বস্তিতে মাথা নুয়ে নিলো।
মেঘ নিজের জায়গায় বসতে বসতে বলল: আন্টিসেপটিক লাগিয়ে নে কমে যাবে।
তৃধা মনে মনে ভরকরো। বিড়বিড় করে বলল : যেমন মা তেমন ছেলে। ছেলে কামরিয়ে ঠোট ফুলে দিয়েছে। মা আ্যন্টিসেপটিক লাগাতে বলছে। ভাবা যায়। ওর ভাবনার মাঝে মেঘ তৃধা ও আহিয়ার উদ্দেশ্যে বলল: বাড়িতে সকলের সব ঈদের শপিং শেষ...
তোমরা বাড়িতে দুজন মেয়ে, মেয়েদের শপিং এর শেষ নেই।...
তোমাদেরকে আরো কিছু প্রয়োজন? না মানে আরো কিছু কেনার বাকি আছে?
আহিয়া মায়ের উদ্দেশ্যে বলল: মাম্মাম আমার ড্রেসগুলোর সাথে এখনো ম্যাচিং হিজাব আনা হয়নি। তুমি প্লিজ কালার গুলো দেখে আনিয়ে দিবে। তখনই তৃধা পাশ থেকে বলল: আমার টুকটাক কিছু আনার বাকি আছে ওগুলো এনে দিতে হবে..
এটা শুনে বন্যা মেয়ের উদ্দেশ্যে বলল: তোর আবার কি আনার বাকি আছে?এইতো সেদিন আমার সাথে শপিংমলে গিয়ে দেখে দেখে সব নিয়ে আসলি?তৃধা মায়ের দিকে তাকিয়ে বায়না করে বলল: মামমাম আমার একটা কালো ড্রেস চাই। আমার ফ্রেন্ড শোভা নিয়েছে। সেটা দেখে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তাছাড়া আমার এখনো টুকটাক কিছু কেনাকাটা করার বাকি আছে। জবাবে বন্যা বলল: এই ঈদে অলরেডি তো ছয়টা ড্রেস কিনা শেষ.. তারপর আবার কিসের ড্রেস?
মায়ের কথাটি তৃধার মনে হয় পছন্দ হয়নি তাই গাল ফুলিয়ে নিচের দিকে চেয়ে রইল।
সেটা দেখে আলী আহমেদ খান পত্রিকা পড়া বাদ দিয়ে বন্যার উদ্দেশ্যে বলল: আমার নাতনি ছয়টার দামে সাতটার ড্রেস কিনলে তোমার সমস্যা কি?
আমার কি কম আছে নাকি আমার ছেলের কম আছে?
বন্যা এবার বোঝার ভঙ্গিতে বলল: না আমি এটা বোঝাতে চাইনি। প্রতির ঈদে এত রাতে ড্রেস কিনে কিন্তু সেগুলো পড়ে না। গত ঈদের চারটা ড্রেস এখনো আলমারিতে পড়ে আছে। এখনো ছুয়েও দেখেনি।
তাই আমি ওকে শুধু শুধু কিনতে নিষেধ করছি।
আলী আহমেদ খান: থাক কিনুক... মেয়ে মানুষের ভাগ্যের কথা কেউ বলতে পারেনা...। বাপের বাড়ি থেকে যা করুক। কেউ বাধা দিও না। বন্যা আর কিছু বলল না।