মেঘ আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল: আহিয়ান....
আহিয়ান: জি মামমাম।
মেঘ: বিকেলে বোনদের নিয়ে শপিংয়ে যাবে... ওদের কি কি প্রয়োজন কিনে দিবে...
আহিয়ান মাথা তুলে তাকিয়ে বলল: আমি ?
মেঘ: হ্যাঁ তুমি... সারাদিন রোজা থেকে আমার শপিং এ যেতে ভালো লাগছে না... তাই তুমি যাবে...!!
আহিয়ান: আচ্ছা...!
তারপর মেঘ আহিয়া ও তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল: আজকে লাস্ট বার.... সবকিছু মনে করে কিনে নিয়ে আসবে.....!
আহিয়া ও তৃধা সম্মতি জানিয়ে মাথা নারীয়ে একসাথে বলে উঠলো: ওকে.....
আলী আহমেদ খান পত্রিকায় নজর রেখে মেঘের উদ্দেশ্যে বলল: প্রতি বছর যে গরিব অসহায় লোকদের প্রাণ দেওয়া হয় সে সম্পর্কে আবির তোকে কিছু বলেছে?
মেঘ: ২৭ রমজান থেকে ভাইয়া ও আপনার ছেলের অফিস বন্ধ দিয়ে দিবে.... তারপর ওরা বাড়ি থেকে এসব ব্যবস্থা করবে।
আলী আহমেদ খান: ও আচ্ছা....
মেঘ : পদ্ম... এই পদ্ম....
মেঘের ডাক শুনে কিচেন থেকে ওর আচলে মুছতে মুছতে বের হয়ে আসলো পদ্ম। ডেকেছেন বড় ভাবি।
বড় আম্মুর কাছে যা। বলেই মেঘ মালিয়া খানের দিকে কয়েকটা শপিং ব্যাগ এগিয়ে দিলো।
এখানে তোর ও তোর বাবা মা ভাই বোনের ঈদের কাপড় আছে। আর সাথে আছে বেতন ও বোনাস। আটাশে রমজান থেকে দশ দিন তোর ছুটি। বাবা মাকে নিয়ে দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে আয়। পদ্ম খুশিতে তিন কর্তৃক পাথরের সালাম করল। তারপর শপিং ব্যাগগুলো নিয়ে কিচেনের দিকে হাটা দিল।
আকলিমা খান মালিহা খানের উদ্দেশ্যে বলল: মেয়েটা ভদ্র আছে তাইনা আপা? একটু সচ্ছল পরিবারের জন্ম গ্রহণ করলে লেখাপড়া করে মানুষের মত মানুষ হতে পারত....
হালিমা খান : হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস... বাইরে বের হলে দেখা যায় কত মানুষ কত কষ্টে আছে....
মেসেজের টুংটাং শব্দ বেজে উঠতে....আহিয়া ঝটপট ফোনটা সাইলেন্ট করে নিল।
রিহান মেসেজ দিচ্ছে সেটা দেখে আহিয়া নিজের রুমে আসলো।
দরজা চাপিয়ে ফোন দিল রিহানকে।
আহিয়া: আসসালামু আলাইকুম.....
রিহান:ওয়ালাইকুম আসসালাম....কেমন আছো...?
আহিয়া:আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি...আপনি কেমন আছেন...?
রিহান : আলহামদুলিল্লাহ ভালো....
আহিয়া : অফিস কবে থেকে বন্ধ দিবেন ভাবছেন....?
রিহান : ২৮ শে রমজান থেকে দেবো ভাবছি...!
আহিয়া: ও ও.....
রিহান: শোনো...... ?
আহিয়া : জি বলুন.....
রেহান : সেদিন আম্মু আব্বুকে জানিয়েছি... আমার পছন্দের কথা...!
আহিয়া ভীতু কন্ঠে বলল : আমার কথা বলেছেন....?
আন্টি আঙ্কেল কি বলেছে....?
রিহান হেসে জবাব দিল: রিলাক্স এতো প্যানিক কেন করছো.....?
আমি তোমার নাম জানাইনি....শুধু জানিয়েছি আমার মেয়ে পছন্দ করা আছে...!!
ঈদের পর ঠিকানা দিব তাদের তোমার বাড়ির।
আহিয়া বড় একটা শাঁস ছেড়ে বলল: আচ্ছা ....
রিহান : ভয় পেয়ে গেছিলে?
আহিয়া: কিছুটা...
রিহান হাসলো আহিয়ার কান্ড দেখে🙂তারপর বলল: এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই..... তুমি নিশ্চিন্তে থাকো আব্বু আম্মু তোমাকে মেনে নেবে... আহিয়া মৃদু হাসলো....
তারপর বলল : রিহান
রিহান: বল আহিয়া পাখি...
আহিয়া: আপনি কি আমার থেকে আরও কিছু লুকাচ্ছেন?
রিহান খানিকটা ভাবুক ভঙ্গিতে বলল: কই আমার তো তেমন কিছু মনে পড়ছে না।
আহিয়া: ভালো করে ভেবে বলুন?
রিহান: কিছু মনে পড়ছে না তুমি সামান্য একটু ক্লু দাও..
অথবা সরাসরি বল কি জানতে চাও।
আহিয়ে গালাত ফ্যাকড়ি দিয়ে বলল: আপনি রিসেন্টলি ভাইয়া ও তৃধাকে নিয়ে কি জানেন...?
রিহান আবারও হাসলো তারপর ঠোঁটের কোনে হাসি রেখেই বলল: ম্যাডামকে তদন্ত শেষে শাস্তি দিতে এসেছেন....নাকি সত্যিই কিছু জানেন না? এখন তো ভুল বললেও গর্দান যাবে? না বললেও গর্দান যাবে? তাহলে আমার কি হবে?
আহিয়া মিটিমিটি হাসি লুকিয়ে রাগে কন্ঠ করার চেষ্টা করলো: একটাও মিথ্যা কথা নয়.. সত্যি করে বলুন জানেন ?
রিহান এবার আহিয়ান ও তৃধার বিয়ের কথা জানালো। আহিয়া এমন একটা ভাব ধরে অবাক হল মনে হয় সে কিছু জানতো না আগে।
রিহান অপরাধী কণ্ঠে বলল : সরি পাখি...
আহিয়া আবার রাগ ধরার ভঙ্গিতে বলল: এখন সরি বলে কি হবে?
আপনি তো আমার আগে কিছুই জানেন নি?
রিহান : তুমি তো আমার থেকে আগে কিছুই জানতে চাও নি... তুমি জানতে চাইলে আমি বলতাম।
আহিয়া : ধুর আমি আপনার সাথে কথাই বলব না।
রিহান: এই আহিয়া পাখি...সরি বলছি তো... তুমি ভিডিও কল দাও আমি কানে ধরে সরি বলবো তাও তুমি রাগ করো না প্লিজ......
আহিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল: এক শর্তে মাফ করতে পারি...
রিহান: কি সর্ত ....?
আহিয়া: আজ বিকেলে দেখা করবেন....
রিহান: কিন্তু কিভাবে? তুমি কি বের হবে?
আহিয়া: হুম ভাইয়া আমিও তৃধা শপিংয়ে যাব আজকে.. সেখানেই আসবেন।,
রিহানে একটু নাটক করে বলল: ওই তোমার ভিলেন ভাইয়ের সামনে ধরা পড়লে.. আজকে আমাকে জানাজা ছাড়াই মাটি দিয়ে দিবে..
আহিয়া রাগি কন্ঠে বলল: এগুলো কেমন কথা.....? আপনাকে না কতবার বলছি এসব ধরনের কথা বলবেন না?
এই ফোন কাটেন আপনার সাথে কথা নেই।
বলেই আহিয়া ফোন কেটে দিল।
রিহান অনেকবার কল দিয়েছে কিন্তু আহিয়া আর রিসিভ করেনি।
রাতের বেলা হালকা ঠান্ডা পড়লেও। দুপুরে তপ্ত রোদে মানুষের শরীর দিয়ে ঘাম বের হয়ে যায়।
জুঁই ও মেহেদি লেকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু নিয়ে জুই হয়তো রাগ করেছে বেশ।
মেহেদী টাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে।
এমন সময় একটা লোক পাশ দিয়ে যেতে যেতে যেতে মেহেদী কে ছুরি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করল।
কিন্তু মেহেদীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সহজেই ধরে ফেলল।
নিজের দিক থেকে ছুড়িটা ফেরাতে পারলেও হালকা আঁছড় লেগেছে জুঁইয়ের হাতে।
মেহেদি কিছুক্ষণ লোকটার পিছনে ছুটলো। কিন্তু ধরার জন্য বেশি সামনে যায়নি।
এদিকে জুইয়ের হাত থেকে রক্ত পড়ছে। তাই মেহেদী এগিয়ে এসে হাতে রুমাল পেঁচিয়ে হাসপাতালের দিকে গেল।
সেখানে ড্রেসিং করিয়ে দুজনে একটা কপিশপে বসলো।
মেহেদী চুপচাপ বসে আছে।
জুঁই রাগী কন্ঠে জানতে চাচ্ছে: আর কি কি লুকানো আছে আপনার ভেতরে..?
আপনি তো পুরাটাই ফ্রড। আপনি আমাকে যা দেখিয়েছেন যা বলেছেন তার কিছুই না।
আপনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ। আমি আপনার সাধারণ রূপ তাকে ভালোবাসছিলাম।
কিন্তু আপনি তো সাধারণ কেউ নন।
মেহেদী অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল জুইয়ার দিকে। তারপর কিছুটা নিচু কন্ঠে বলল: বিশ্বাস করো আমি অনৈতিক কিছু করিনি। একটা সিক্রেট মিশনে ছিলাম। তাই তোমাকে বা তোমার আশেপাশের কাউকে আমার পরিচয় বলিনি।
জুঁই আশ্চর্য কন্ঠে বলল: সিক্রেট মিশন..?
মেহেদি: হুম আমি একজন অতিরিক্ত যে প্রতি ইন্সপেক্টর জেনারেল (addl. Dig,CID) এহসানের সরকারি প্রধান হিসেবে কাজ করি। তাছাড়া আমরা দুজন ভালো বন্ধু। আমার বাড়ি ঢাকার বাইরে নয়।
আমি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা। আমি যখন তোমাকে বলতাম গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। তখন আমি দেশের বাইরে যেতাম গুরুত্বপূর্ণ মিশনে।
বহুবার তোমাকে বলতে চেয়েছি সবকিছু কিন্তু এহসান আমাকে বাধা দিয়েছে। বলেছে তুমি অল্প বয়সের মেয়ে বোকা বয়সে বন্ধুদের সব কিছু বলে দিতে পারো।
তখন আমাদের কাজে সমস্যা হতে পারে।
তাই আমি বলিনি।
তাছাড়া আমার শত্রুর অভাব নেই... তার নমুনা আজকে তো দেখলেই..
তারপর মেহেদী আবার বলল: বিশ্বাস করো আমার আইডেন্টিটি মিথ্যা হতে পারে.. কিন্তু আমি মানুষটা মিথ্যা নই.. আগে যেমন ছিলাম এখনো তেমন আছি..
তোমার প্রতি আমার ফিলিংসটা মিথ্যা নয়।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল: যার প্রতি ভালোবাসা দাবি করছেন তাকে একটু বিশ্বাস করতে পারলেন না। আমাকে আপনি কোন কিছু বলতে মানা করলে আমি কখনো কাউকে কিছু বলতাম না।
মেহেদি: আমি জানি তুমি কাউকে কিছু বলতে না.. কিন্তু এহসান যেহেতু আমার কর্মক্ষেত্রে স্যার তাই তার কথা মানাটাও আমার কর্তব্য।
তাছাড়া কোন কারনে তোমার জন্য যদি মিশনে ব্যাঘাত ঘটতো। ডিপার্টমেন্টের কাছে আমি খুব ছোট হয়ে যেতাম। এহসানের কাছে বলার মত কোন ভাষা থাকতো না।
আমি আমার কাজ আর আমার পার্সোনাল লাইফ সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে চাই।
আমার কাজ বা আমার আইডেন্টির সাথে আমার ভালোবাসার কোন তুলনা নেই।
আমি আগে যা ছিলাম এখনো তাই আছি তোমার সামনে।
তোমার সহজ সরল মেহেদী হয়ে থাকতে চাই আজীবন।
জুঁই এবার ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলল: আমি আবারো আপনাকে বিশ্বাস করি কিভাবে?
আপনার আমার সম্পর্কটা তো শুরুই হয়েছিল মিথ্যা দিয়ে।। আপনি যে এখন আমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না তার কোন সত্যতা আছে।
মেহেদী টেবিলের উপর রাখা জুইয়ের হাতটা ধরতে ধরতে বলল: জুঁই....জুই আমি তোমাকে ঠকাইনি বিশ্বাস কর। তাছাড়া তোমার রিহান ভাইয়া কিন্তু আগে থেকেই সবকিছু জানত। উনি আমার ব্যাপারে আগেই খোঁজখবর নিয়েছে সব। উনার সাথে আমি সরাসরি কথা বলেছি। উনাকে আমি আমার জায়গা থেকে সবকিছু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে এই খবরও আছে উনি আমার কথা সততা যাচাই করার জন্য অনেক জায়গায় খোঁজখবরও নিয়েছি। এমনকি আমার বন্ধুর পরিচয় আমার বাড়িতেও গিয়েছিলেন।
আমার কথার কোন মিথ্যা খুঁজে পাইনি তাই তুমি এখনো আমার সামনে বসে আছো। নয়তো উনি আরো আগে বাঁধা দিত আমার সাথে মিশতে।