তৃধা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
আজকে তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ওর পাপ্পা ও মাম্মমা।
তারা তাকে অনেক ভালোবাসে। তারা যখন জানতে পারবে তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে তাদের সকলের অজান্তে তাদের বাড়ির ছেলেকে বিয়ে করেছি। তাহলে তারা কতটা কষ্ট পাবে।
সে কি করে দাঁড়াবে পাপ্পু মাম্মাম এর সামনে?
তার পাপা কি ওকে ক্ষমা করবে এত বড় অপরাধ করার জন্য?
বাবা মায়ের প্রতি তার ভালোবাসাটা যেমন সত্যি। তেমন সত্যি আহিয়ান ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা।
সে কাউকে ছাড়তে পারবে না।
সেদিন আহিয়ান ভাইকে তো বলল সব সময় পাশে থাকবে।
যদি কখনো বাবা-মা আর স্বামী থেকে যেকোন একজনকে বেছে নিতে হয়। তখন কি পারবে সে স্বামী কি বেছে নিতে।
এসব ভেবে আজকাল বিরক্ত লাগে,,,,
ভাবনা শেষে একটার উত্তরই সামনে আসে বাবা-মা স্বামী সবাইকেই পাশে চাই।
তাদের সবাইকে ভালোবাসি।
তৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা পুরুশালী হাত জড়িয়ে ধরল। তৃধা ভয়ে চিৎকার দিতে চাইলো।
কিন্তু তার আগেই একটা হাতার মুখ চেপে ধরল।
অতঃপর কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল: আরে আমি ভয় পাস না..
আহিয়ানের কন্ঠ কর্ণ কুহুরিতে তৃধা স্বাভাবিক হয়ে পিছনে ঘুরলো।
তারপর আহিয়ানের বুকে দুইটা কিল দিয়ে বলল: এরকম ভূতের মত এসে হঠাৎ পিছনে কেন দাঁড়িয়ে আছেন.. আমি অনেক ভয় পেয়ে গেছি..
আহিয়ান ঠোঁটের কোন রহস্যকর হাসি রেখে কাছে টেনে বলল: কাছে আয় ভয় তাড়িয়ে দিচ্ছি...
তৃধা আহিয়ান এর কাছ থেকে ছোটার জন্য মুসা মুচকি করতে করতে বলল: ছি ছি ছি! রোজা রমজানের দিনে এসব কি অসভ্য কথা? আপনি না রোজা আছেন? আপনার রোজা হালকা হয়ে যাবে ছাড়ুন আমায়।
আহিয়ান ছাড়লো না। বরং কোমরের শক্ত করে ধরে কাছে এনে কন্ঠে মাদুরতা মিশিয়ে বলল: বউ,,
আহিয়ানা রেস্পর্শে তিদা এখন মুছরা গেছে মাথা নত করে জবাব দিল: হুম,,..
আহিয়ান: আজকে শপিংয়ে না গেলে হয় না।
তৃধা মাথা তুলে বলল: কেন? আজকে কি হয়েছে?
আহিয়ান: না মানে... জরুরী প্রয়োজনে আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে... তোমাদের নিয়ে আগামীকাল শপিংয়ে যাব।
তৃধা : ঠিক আছে... এখন বের হন রুম থেকে,,,
কেউ চলে আসছে সমস্যা হবে।
আহিয়ান তৃধাকে ঘুরিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। থুতনি রাখল তার মসৃণ কাঁদে। মেয়েটা বোধহয় মৃদূ কেঁপে উঠলো। যা আহিয়ান টের পেয়ে নিঃশব্দে হাসলো।
ওর কানের কাছে ঠোঁট রেখে ফিসফিসিয়ে বলল: একটা সত্যি কথা বলবি..?
তৃধা: মিথ্যা বলেছি কখনো?
আহিয়ান: আমাদের বিষয় কি আহিয়া সব জানে?
তৃধা কথা ঘুরালো না: হ্যাঁ জানে.....
আহিয়ান: কবে থেকে...?
তৃধা: শুরু থেকে...
আহিয়ান: ওহ ভালো আমাদের পক্ষে একজন সাপোর্টার পেলাম...
তৃধা হাসলো: শিশির ভেজা ঘাসের মতো নির্মল সেই হাসি...
আহিয়ান পিছনে দাঁড়িয়েটা দেখতে পেল না। কিন্তু উপলব্ধি করলেও মেয়েটার সরলতা।
তৃধা এবার ঘুরে বললো: কথা শেষ হলে এখন আমার রুম থেকে যান প্লিজ...
এমন হুটহাট করে দিনের বেলায় আমার রুমে আসবেন না কেউ দেখে ফেললে আমরা অনেক সমস্যায় পড়বো।
আহিয়ান: তুমি কি আমায় indirectly রাতে আসার অফার দিচ্ছিস?
তৃধা অবাক চোখে তাকিয়ে বলল: সেটা কখন বললাম..
আহিয়ান: এইতো এখনই বললি...
তৃধা: আমি তো শুধু বললাম এভাবে দেখা করতে না আসতে,
কিন্তু রাতে আসতে বলিনি...
আহিয়ান ঠোট বাকি হাসলো তারপর বলল: তুই জানিস আমি আসবো,,, নিষেধ করলেও শুনবো না।
তুই আমাকে দিনে আসতে নিষেধ করছিস। তার মানে, রাতে আসতে বলছি।
তৃধা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল: এই আপনি জানতো নিজের কথাগুলো আমার মুখে বসাতে চাচ্ছেন...
আহিয়ান: তুই ডাবল টাইমিং করে কথা বলবি আর আমি বুঝলেই সমস্যা তাই না...?
তুই তো উত্তরে কিছু বলল না তার আগে দরজায় কারো টোকা পরল।
জুঁই এখনো নিচের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে।
মেহেদী তাকে অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে কিন্তু সে বুঝতে চাইছে না।
জুঁই বিশ্বাস করো আমার ভিতরে লুকানো যা সত্যি ছিল আমি সব তোমাকে বলে দিয়েছি।
আর কিছুই তোমার অজানা নয়। আর ভবিষ্যতে কিছু লুকাবো না প্লিজ কান্না বন্ধ করো।
জুই কাঁদতে কাঁদতে বলল :আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম মেহেদী কিন্তু আপনি আমাকে ঠকিয়েছেন...
এখন আমি আপনাকে ক্ষমা করলে আমি নিজের কাছে অনেক ছোট হয়ে যাব।
আপনার মনে হবে আপনি ভাল পজিশনে আছেন সেজন্য আমি আপনার সকল মিথ্যা সহজেই ক্ষমা করে দিয়েছি। আপনাকে ক্ষমা করা মানে আমার নিজেকে নিজে লোভিও স্বার্থপর ভাবা। তার চেয়ে ভালো আপনি বাড়ি ফিরে যান। আমার যদি কখনো রাগ ভাঙ্গে বা মন নরম হয়। আমি নিজে থেকে আপনার সাথে যোগাযোগ করব। সে পর্যন্ত আমাকে একা থাকতে দিন।
মেহেদী কি বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। কর্মব্যস্ততার মাঝে আগে কখনো প্রেম করা হয়নি।
শুধু কর্মব্যস্ততা বললে ভুল হবে। কখনো কাউকে তেমন মনে ধরেনি।
একমাত্র জুইয়ে সেই মেয়ে যাকে সেই হৃদয়ের গভীর থেকে গভীর স্থল পর্যন্ত চেয়েছে।
কিন্তু আজ সেই মেয়েটাকে ভুল বুঝছে।
বিষয়গুলো ভাবনায় আসতে মেহেদি নিজের চুল খামচে ধরল।
এই পিচ্চি মেয়েটাকে নিয়ে এসে কত শত স্বপ্ন এঁকেছে তা কি মেয়েটা জানে।
হয়তো না,,,, জানলে কখনো ওর ভালবাসা এভাবে প্রত্যাখ্যান করত না।
মেহেদির জুইকে বোঝানোর জন্য বলল: জান এবারের জন্য ক্ষমা করে দাও, আর জীবনেও কোন কিছু লুকাবো না তোমার থেকে।
জয় পার্স হাতে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল: আমাকে বাড়ি যেতে হবে.... আপনিও বাড়ি চলে যান..
বলে দুই হাটা দিলো কফি সাপের বাইরে।
মেহেদি কিছুক্ষণ ওখানেই নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
একজন ওয়েটার এসে বলল: স্যার আপনার কি আরো কিছু প্রয়োজন কিছু লাগবে..?
মেয়েদের তপ্ত মেজাজে বলল: ওই মিয়া রোজার দিনে আর কি লাগে।
আমরা দুজনেই রোজা।
যেই কফি একটু আগে দিয়েছিলেন সেটা ফেরত নিয়ে যান। এখানে বসার জন্য অর্ডার দিয়েছিলাম। আর বিল নিয়ে আসুন আমি পেমেন্ট করে চলে যাব। আচমকা মেহেদির তপ্ত মেজাজের কথাগুলো শুনে ওয়েটার ভরকে গেল।
কাশি দিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল: আজব পাবলিক...
বড়লোকের বিরাট কারবার।
বসার জন্য কফি অর্ডার দিয়েছেন শুধু শুধু টাকা খরচ করে। এখানে বসার কি ছিল?
কথা তো হাঁটতে হাঁটতে বলা যায়।
মেহেদী বিল পেয়ে করে বেরিয়ে গেল।
দরজায় অনবরত শব্দ শুনেই তৃধা থর থর করে কাঁপছে।
তার ভয়ের একমাত্র কারণ হচ্ছে আহিয়ান। আহিয়ান তার রুমে আছে এটা কেউ দেখলে তারা বিরাট বড় সমস্যায় পড়বে।
তৃধা ভেবে পাচ্ছি না কি করবে... ঝটপট আহিয়ানকে টেনে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে গেল।
আহিয়ান অবশ্য যেতে চাইনি।
সে বেল করেছে দাঁড়িয়ে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু তৃধা ভিষণ ভয় হচ্ছিল। দিনের বেলা রুম থেকে বেলকনিতে অনেক কিছুই দেখা যায়।
তাছাড়া যে এসেছে বেলকনিতে যায় তখন কি হবে। তৃধার ভয় এর কারনে অবশেষে আহিয়ান
ওয়াশরুমে দাঁড়ালো।
তৃধা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গিয়ে দরজা খুলল, দরজার পালিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তার মামমাম।
কিরে দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে?
তৃধা আমতা আমতা
করে বলল না মানে মাম্মাম আমি ওয়াশরুমে ছিলাম।
বন্যার একটু রুমে উকি উকি দিয়ে বলল: ইস রুমটার কি অবস্থা করে রেখেছিস? খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে সর রুমটা গুছিয়ে দিয়ে যাই...
তৃধা তড়িঘড়ি করে বলল :মামমা তোমাকে গোছাতে হবে না আমি গুছিয়ে নিচ্ছি।
বন্যা রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল: তোর যদি গোছানোর হত তো আগেই গোছাতি.. আমাকে এসে রুমের এই হাল দেখতে হতো না...
বলেই বন্যা রুমটা পোছাতে শুরু করল।
তৃধা উসখুস করছে মাকে কিভাবে রুম থেকে বের করবে।
তৃধা মায়ের উদ্দেশ্যে বলল: কেন এসেছ বললে না তো?
বন্যা রুমের এলোমেলো কাপড় গুলো গোছাতে গোছাতে বলল: আহিয়ানের একটা জরুরী কাজ আছে ...
তাই আজকে তোদের শপিংয়ে নিয়ে যেতে পারবে না ।আগামীকাল নিয়ে যাবে...
তৃধা ভাবুক ভঙ্গিতে নকে কামড় দিতে দিতে বলল :আচ্ছা ঠিক আছে..
বন্যা রুম গোছানো শেষে,,, ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল: নোংরা কাপড় গুলো ওয়াশরুমে রেখে যাচ্ছি পদ্মা সে কেছে দিয়ে যাবে।
সঙ্গে সঙ্গে তৃধা দৌড়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ালো,, হাত থেকে টান দিয়ে ময়লা কাপড় গুলো নিয়ে বলল,: আমি রেখে দিব তোমাকে এত কষ্ট করতে হবে না। তুমি শুধু নিচে গিয়ে পদ্মকে পাঠিয়ে দাও।
বন্যা আর চোখে মেয়ে দিকে তাকিয়ে বলল: রোজা থেকে কি মাথা উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে তোর...
এভাবে ব্যাঙের মতো লাফাচ্ছিস কেন?
আমি রেখে গেলে কি সমস্যা? ত্রিধা কিছু বলবে তার আগেই দরজার সামনে আহিয়া দাঁড়িয়ে বলল: মামনি তোমাকে মাম মাম ডাকছে.. এটা শুনে বন্যার কথা বাড়ালো না।
রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তৃধা আহিয়ার উদ্দেশ্যে বলল: থ্যাংক ইউ আপু...
আহিয়া নিজের রুমে যেতে যেতে বলল: শুকনো থ্যাংক ইউ দিয়ে কাজ হবে না.... বিনিময়ে অন্য কিছু চাই।
তৃধা নিজের রুম থেকে চেঁচিয়ে বলল: কি চাও?
আহিয়া নিজের রুমে ঢুকতে ঢুকতে চেয়েছি উত্তর দিল: সময় হলে চেয়ে নেব .....