আহিয়া যেতে তৃধা দরজা চাপিয়ে ওয়াশরুমে নক করল। আহিয়ান বেরিয়ে এসে বলল: এত নাটক না করলেও পারতি..... মামনি ব্যালকনিতে যেত না...
তৃধা মুখ ভেংচি দিয়ে বলল: বলেছে আপনাকে... আমি কোন রিক্স নিতে চাই না।
আহিয়ান: রিক্স নিলে কি হবে?
তৃধা: ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে....
আহিয়ান: ধরা পড়ে গেলে কি হবে?
তৃধা: কি হবে আপনি বোঝেনা... নাকি না বোঝার ভান করেন?
আরিয়ান ভাবলেসহিন হয়ে জবাব দিলো: বুঝি তো...
তৃধা: কি বোঝেন.......?
আহিয়ান: তোকে বুকে নিয়ে রাতে ঘুমানোর টিকিট পাব..... সামনে এমনিতেই শীতকাল....
তৃধা এবার রেগে গিয়ে আহিয়ান টেনে রুম থেকে বের করে দিল। আহিয়ান মৃদু হেসে নিজের রুমে গেল।
বিকেল চারটা বাজে। আহিয়া ড্রইং রুমে বসে সকলের পর্যবেক্ষণ করছে। পাশে ফোনটা সাইলেন্ট করে অবহেলায় ফেলে রেখেছে। সেখানে একটার পর একটা কল বেড়েই যাচ্ছে। টেক্স জমা হয়েছে অগণিত।
সকল কল ও ট্রেকস রিহানের। রিহান ভেবেছে আহিয়া রাগ করেছে আহিয়ান ও তৃধার বিয়ের খবর না জানানোর কারণে। আসলে তেমন কিছুই না। রিহানের মুখে মরার কথা শুনে রেগে গেছে মেয়েটা। এই লোক কি পেয়েছে কথায় কথায় মজা করে কেন মরার কথা বলবে। ঠিক তখনই ওর পাশে এসে বসলো মালিহা খান। কারো উপস্থিতি টের পেয়ে আহিয়া ধ্যান ভাঙল।
রিহানের এত ফোন কল দেখে তারও ইচ্ছে হচ্ছে রিসিভ করে কথা বলতে। কিন্তু লোকটারে একটু শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। সে বারবার ভুলে যায়....
তার কিছু হয়ে গেলে পরিবার ছাড়াও আর একজন আছে যে সেও একেবারে শেষ হয়ে যাবে।
আহিয়া ঠিক করে নিয়েছে যে সে কল রিসিভ করবে না। বড়সড়ো একটা শাস্তি দিয়ে আগামীকাল কথা বলবে।
মালিয়া খান জিজ্ঞাসা করল: কি হয়েছে দাদুভাই?
এমন বিষন্ন দেখাচ্ছে কেন মুখটা?
আহিয়া কিছু বলল না। চুপচাপ মাথা রাখলে দাদুর কোলে। মালিহা খান ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বিলে কেটে দিতে দিতে বলল: জানিস তোদের জন্মের আগে তোর মাও এভাবে আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকতো। আর আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম। অনেক সময় দেখা যেত মেঘ আবিরের অপেক্ষায় আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেত। আর আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অপেক্ষা করতাম ছেলে বাড়ি ফেরার। আহিয়া আগ্রহী কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল : পাপাই যে মাম্মাকে ডাকতো।
মালিয়া খান :তোর বাবা এসে কখনো ডাকত না... এখান থেকে রুমে নিয়ে গিয়ে শুয়ে দিত।
মাহিয়া মৃদু হাসলো.. আস্তে করে বলল এটার নাম কি অপ্রকাশিত ভালোবাসা?
কিন্তু আসতে বলা কথাটা মালিয়া খান শুনে নিলেন। তারপর মৃদু হেসে জবাব দিলেন :অপ্রকাশিত ভালোবাসার বলতে পারিস। আমার ছেলেটা যে তোর মাকে এতটা পছন্দ করে তা তো আমরা পরিবারের কেউই জানতাম না। এই বাড়িতে থেকে কিছু বুঝতে পারিনি। তোর দাদুরা তো তোর আব্বুকে জব্দ করার জন্য একদিন নাটক করেছিল তোর আম্মুর বিয়ে হয়ে গেছে। সেদিন তোর আব্বুর সে কি পাগলামি....
সবচেয়ে মজার ব্যাপার কি জানিস?
আহিয়া আগ্রহী কন্ঠত্বর বলল: কি?
মালি এখন হাসতে হাসতে বললো :আমি বাড়িতেই ছিলাম না। বাড়ি ফিরে যখন দেখি ছেলে বিধ্বস্ত অবস্থা। তখন আমি ছেলেকে বোকার মত প্রশ্ন করেছিলাম। তোর এ বিয়েতে মত আছে তো আব্বা?
সেদিন তোর আব্বু আমাকে কিছুই বলেনি শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে...
আমার ছেলেটার চোখে ছিল এক রাসভরা অসহায়ত্ববোধ। আহিয়া না চাইতেও মৃদু হেসে দিল। মালিহা খান হাসতে হাসতে বললেন: তুই কি বুঝতে পেরেছিস আমি কি বোকার মত প্রশ্ন করেছিল
যেখানে আমার ছেলে মেঘকে পাওয়ার জন্য পাগলামি করছে। সেখানে আমি ওকে প্রশ্ন করছি তুই এ বিয়েতে রাজি আছিস কিনা। এবার মালিয়া খান আহিয়া একসাথে হাসি দিল।
তখনই আহিয়ান ড্রইংরুম পেরিয়ে যেতে যেতে কিসিনের দিকে তাকিয়ে বলল: মামমাম আমি বের হচ্ছি। ইফতারের পর ফিরব।
মেঘের সঙ্গে সঙ্গে কিচেন থেকে বের হয়ে এসে বলল: ইফতার বাইরে কেন করবে?
তোর বাবা তোকে ইফতারের সময় খুজবে।
আহিয়ান পিছনে না তাকিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল। পাপাকে বইলো বন্ধুদের সাথে ইফতার পার্টি আছে আজকে। মেঘ হতাশ হয়ে আবার চলল কিচেন এদিকে।
নিজের রুমের বিছান কাছে জানালার পাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে জুই । ফোন সাইলেন্ট করা। তবুও জুই তাকিয়ে আছে ফোনের দিকে। একটার পর একটা কল আসছে আবার কেটে যাচ্ছে। জুই সেদিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছে। মেহেদির সাথে কথা বলতে না পেরে তার হৃদয় পুড়ছে। কিন্তু কথা বলতে গেলেও বিবেগে নাড়া দিচ্ছে। মেহেদী একদম পাওয়ারফুল অফিসার জানার পর ড্যাং ড্যাং খুশিতে লাফানোর মেয়ে জুইনা। সবার আগে তার আত্মসম্মানবোধ। দুই বছরের সম্পর্ক থাকার পরেও মেহেদী তাকে বিশ্বাস করাতে পারেনি। তাদের সম্পর্কটা শুরু হয়েছে যে সম্পূর্ণ মিথ্যা দিয়ে বিষয়গুলো জুউ কিছুতেই মানতে পাচ্ছে না।
মন ও বিবেকের লড়াইয়ে ক্লান্ত সে। আহিয়া যেখানে অফিসে পৌঁছে গেল। গিয়ে দেখল ইতিমধ্যে মৃদুল অলক ও নির্জন উপস্থিত। পাশের চেয়ারে বসে আছে রিহান। কিন্তু মুখটা কেমন বিষন্ন। ছেলেটাকে অনেক চিন্তিত দেখাচ্ছে। আহিয়ান একটা চেয়ারে বসতে বসতে বলল: কিরে রিহান রোজা কি তুই একলায় রাখস মামা... মুখ শুকাইয়া একেবারে শুকনো কলাপাতা হয়ে গেছে।
আহিয়ানের ঠাট্টা করার কথায় রিহান মৃদু হাসলো রিহান কোন কিছু নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। আহিয়ান তা বুঝলো..... তাকে প্রশ্ন করল কিন্তু আশা অনুরূপ তেমন উত্তর পেল না।
অলক নির্জন ও মৃদুল দুষ্টুমি করছে.... তাদের দুষ্টুমি টপিক গার্লফ্রেন্ড... ।
মৃদুল দুষ্টুমি করে অলক কে বলল: তুই তো মামা চকলেট বয়... গার্লফ্রেন্ডের কোন অভাব নেই।
একটা গেলে তিনটাতেই অফার দেয়। কিন্তু আমাদের তো ফাটা কপাল।
আহিয়ান হু হু করে হেসে অলকের কাঁধে দুটো চাকর দিয়ে বলল: মামা কি কয়?
তারপর নির্জন মৃদুলের দিকে তাকিয়ে বলল: আমারও তো কোন গার্লফ্রেন্ড নাই.....তবুও দেখছি আমি কেমন সবসময় চিল মুডে থাকি গার্লফ্রেন্ড একটা আস্ত প্যারা।
মৃদুল নির্জন এর উদ্দেশ্যে বলল: তোর মত কালারে কে আবার বয়ফ্রেন্ড বানাবে। তাছাড়া আঙ্গুর ফল খাইতে না পারলে টক লাগে জানো। নির্জন এবার রেগে গেল। রেগে কটমট করে বলল: আমারে আর কালা বলবি না তোরে কতবার বলবো আমার গায়ের রং ডেঞ্জারাস শ্যামলা। কিন্তু তুই তো সুন্দর তা তো পারলি না একটা গার্লফ্রেন্ড পটাতে। মৃদুল কিছু বলবে তার আগে আহিয়ান ধমক দিয়ে বলল: এই তোরা থামবি, একটু পর আজান দিবে। ইফতারের আগে এত কথা বলতে নেই। তারপর আহিয়ান রেহানের উদ্দেশ্যে বলল: কি হয়েছে স্পষ্ট ভাবে বলবি তো নাকি...
না বললে বুঝবো কি করে?
রিহান মাথা দিলে তাকালো আহিয়ানের দিকে। তারপর স্পষ্ট কণ্ঠে বললো বলার জন্য তোকে এখানে ডেকেছি।
আগে সবাই একসাথে ইফতার করে তারপর এসব নিয়ে কথা বলব।
আহিয়ান: সবই বুঝলাম কিন্তু মুখটা এমন প্যাঁচার মতো করে রেখেছিস কেন...?
রিহান এবার মৃদু হাসি তারপর আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল: এবার ঠিক আছে...?
আহিয়ান: মোটামুটি চলে...
উপস্থিত সকলেই হাসলো।
দরজায় নক পাওয়ার শব্দ শুনে রিহান মৃদু কন্ঠে বলল :কামিং....
দরজা খুলে ঢুকলো রিহানের অ্যাসিস্ট্যান্ট। তার পিছনে আরো কয়েকজন সারভেন্ট।
একে একে সকলের রুমের কর্ণারে সেন্টার টেবিলের উপর নাস্তা প্লেটগুলো রাখল। একজন ছেলে সকল কিছু সুন্দরভাবে গুছিয়ে রেখে গেল। ইফতারের যখন পাঁচ মিনিট বাকি রিহান সকলকে নিয়ে রুমের কর্নারে থাকা সোফায় বসলো। তারপর আজান দিতে আল্লাহ তায়ালার নামে তারা ইফতার করা শুরু করলো।
হাসি আড্ডায় সময় ভালোই কাটল সকল বন্ধুদের।
রাত যখন আটটা একে একে সকলেই বাড়ি যেতে চাইল। রিহান আহিয়ানকে আটটার দিকে বলল :তোর সাথে আমার ইম্পরট্যান্ট কথা আছে...
ওদেরকে যেতে দে কিন্তু তুই একটু পরে যা....
আহিয়ান কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পেরে থেকে গেল।
আর বাকি বন্ধুরা একে একে বিদায় নিল সেখান থেকে।
আহিয়ান ও রিহান দুজনে সিঙ্গেল সোফায় মুখোমুখি হয়ে বসলো। আহিয়ান বুঝলো রিহান সিরিয়াস কিছু বলতে চায়। তাই তাকে বলার জন্য তারা দিল না।
রিহানের কথা শোনার জন্য সে অপেক্ষা করে আছে।
কিছু সময় নিয়ে রিহান আস্তে ধীরে বলল: আহিয়ান তুই কি আমায় বেস্ট ফ্রেন্ড মানিস?
আহিয়ান ভাবলেসিন জবাব দিল : সেটা কি তোর অজানা....? নতুন করে প্রশ্ন করে জানার কি আছে....?
রিহান গলাশ্বর নিচু করেই বলল: তবুও আজকে জানতে চাচ্ছি....?
আহিয়ান ভুরু কুঁজতে তাকিয়ে বলল : মানে......
রিহান : তোর বেস্ট ফ্রেন্ড যদি বড় কোন অপরাধ করে তাহলে কি তুই তাকে ভুল বুঝবি?
আহিয়ান: আরে ভাই যা বলতে চাচ্ছো স্পষ্ট ভাবে বল.....?
তোর এমন ঘোরানো পেছনে কথা আমি কিছু বুঝতে পারছি না...?
রিহান অপরাধী কন্ঠে বলল: আমি তোর নজরে খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছি....!
আমার কাছে এটা ভুল নয় কারণ আমি জেনে শুনে এই অপরাধটা করেছি....।