আহিয়া ও তৃধা লক্ষ্য করলো গাড়ির ভেতর থেকে ওরা দুই বন্ধু কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করছে। রিহান কয়েকবার তাকিয়েছে গাড়ির দিকে। আহিয়া সেটা দেখে নিজেকে আড়াল করে বসেছে। কিন্তু সে নিজেও রিহানকে দেখতে কয়েকবার উঁকি ঝুঁকি দিল। দেশে ফেরার পর রিহান সাথে সামনাসামনি একবার দেখা হয়েছিল। বাকিটা সময় ভিডিও দেখা হয়েছে।
আহিয়া মাঝে মাঝে রিহানের দিকে তাকাচ্ছে আবার চোখ নামিয়ে নক খুটছে। সেটা দেখে তৃধা মিটিমিটি হাসছে। আচমকা গাড়ির ডোর খুলতে আহিয়া চমকে উঠল। দেখলো তার ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে।
আহিয়ান শান্ত কন্ঠে বলল: রিহান এর সাথে যা....
কোন সমস্যা হলে আমাকে কল দিবি...
আহিয়া নির্বাক নয়নে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের দিকে।
তার চোখে লজ্জা ভয় দ্বিধা সবকিছু একসাথে মিশ্রিত অনুভূতি। আহিয়ান বোধহয় বোনের চোখের ভাষা বুঝলো...
তাই আবারও স্থির কন্ঠে বলল: it's okay....
আমি কিছু মনে করছি না। তুই যা ওর সাথে। কোন প্রবলেম হলে তুই আমাকে ফোন দিস। বাড়ি ফেরার আগে তোকে পিক করে নেব। আহিয়া চুপচাপ করে মাথা নিচু করে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো।
আহিয়ান বোনের হাত ধরে এগিয়ে গেল রিহানের দিকে।
অতঃপর রিহানের উদ্দেশ্যে বলল : আমার বোনের খেয়াল রাখবে... যেমন নিয়ে যাচ্ছিস তেমনভাবে যেন ফেরত পাই। আমি বাড়ি ফেরার আগে তোকে কল দেব।
রিহান মজা করে বলল: আচ্ছা ভাইজান...
আহিয়ান একটু করা দৃষ্টিতে তাকালো রিহানের দিকে।
রিহান সঙ্গে সঙ্গে নজর ঘুরিয়ে আহিয়ার জন্য গাড়ির ডোর খুলে দিল। আহিয়া চুপচাপ গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে। তারপর রিহান আহিয়ান কে বিধায় জানিয়ে বসলো ড্রাইভিং সিটে। মুহূর্তেই ওদের গাড়িটি সামনের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল। আহিয়ানো ফিরে এসে বসলো ড্রাইভিং সিটি। তৃধা রিহান ও আহিয়ার যাওয়ার পানে দেখে মিটিমিটি হাসছে।
কিন্তু আহিয়ান কে দেখে মুখ গম্ভীর করে বসে থাকলো।
আহিয়ান গাড়ি ঘুরিয়ে উল্টা রাস্তা ধরল।
তৃধা তড়িঘড়ি করে বলল : গাড়ি কেন ঘুরাচ্ছেন?
আমরা শপিং মলে যাব না...?
আহিয়ান গাড়ির স্টিয়ারিংয় ঘুরাতে ঘুরাতে বলল: দুনিয়াতে কি একটা শপিংমল আছে যে ওই দিকে যেতে হবে। আমরা অন্যদিকে যাব।
তৃধা মুখ ভোঁতা করে বসে রইল।
সেটা দেখে আহিয়ান আবারো ওকে জোর করে নিজের সাথে চেপে বসালো...
মেয়েটা পছন্ড ছটফট করছে। এই লোকটার ছোঁয়ায় বুকের ভিতর ভয়ংকর ভূমিকম্প হয় তা কি এই লোকটা জানে। জানলে বোধহয় এমনটা করত না।
ওর ছটফটানি দেখে আহিয়ান সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল: আর একবার নড়াচড়া করলে কোলে এনে বসাবো।
মুহূর্তে তৃধাত থেমে গেল। সেটা দেখে আহিয়ানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা দেখা গেল বোধয়।
কিন্তু মেয়েটা তো দেখলো না। আহিয়ান গাড়ি থেকে নেমে তৃধার সাইটের ডোর খুলে দিল। তৃধা নেমে এসে দাঁড়ালো আহিয়ানের পাশে। চারপাশে এক তাকিয়ে দেখলো ।ঈদের কাছাকাছি সময় হয়েও অনেক ভিড় শপিংমলে। দুজনে এগিয়ে গেল শপিংমলের ভেতরের দিকে। আহিয়ান তৃধার এক হাত ধরে আছে। সেটা দেখে তৃধারা আড়াই বছর আগের স্মৃতি মনে পড়ে গেল। সেদিনও তারা এভাবে শপিংমলে হেঁটে গেছিল।
সেদিন মেয়েটার চোখে এসেছিল বিরক্তিবোধ ও দ্বিধা।
কিন্তু আস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আহিয়ান ভাইয়ের হাত ধরাতে মনে হচ্ছে। সে আহিয়ান ভাইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ রত্ন।
এই হাত ধরাতে আছে অধিকার ও দায়িত্ববোধ।
যা চোখে দেখার নয় শুধু অনুভবের বিষয়।
ওরা দুজন ঢুকলো রেডিমেট ড্রেসের দোকানে।
আহিয়ান তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: তোর ফ্রেন্ড এর মত যে ড্রেসটা নিতে চেয়েছিলি ওটার ছবি আছে তোর কাছে...
তৃধা মাতা থাকি বললো: হ্যাঁ আছে....
তারপর কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল: কিন্তু আমার ফোনটাই তো নেই...
বলেই গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকালো।।
সেটা দেখে আহিয়ান দোকানে কে প্রশ্ন করল: এই যে ছোট ভাই যেসব ড্রেস সামনে শো করানো আছে আপনাদের কাছে কি শুধু এই কালেকশন গুলোই আছে?...
দোকানের ছেলেটা এগিয়ে এসে বলল: জ্বী ভাইয়া....
কোনটা চয়েস বলুন... কালার কালেকশন এভেল এভেল আছে।
আহিয়ান তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: তাকিয়ে দেখ তোর পছন্দের ড্রেস আছে কিনা...?. তৃধা পুরো দোকানটা তারা ভালো কিন্তু পছন্দের ড্রেসটা না পেয়ে হতাশ হলো..
এরপর আহিয়ান ওকে নিয়ে গেল অন্য দোকানে। পরপর অনেকগুলো দোকান খোজার পরেও কাঙ্খিত ড্রেসটি খুঁজে পাইনি...
ওদের এত খোঁজাখুঁজি দেখে দোকানদার ছেলেটি আহিয়ান কে ডাকে বলল: ভাইয়া সেই ড্রেস কেন নিতে হবে? সেটা ছাড়া আরও সুন্দর সুন্দর কালেকশন আছে... একবার ভালোভাবে দোকানে ঢুকে দেখুন. ।
আহিয়ান যেভাবে বলল: আমার বউয়ের পছন্দ ওই ড্রেসটা । প্রয়োজনে বাংলাদেশের সব শপিং মল খুঁজে ওই ড্রেস বের করব। আপনার কোন সমস্যা?
ছেলেটার মাথা নত করে বলল: জি না ভাইয়া...
খুঁজতে খুঁজতে তৃধা বিরক্ত হয়ে গেল কিন্তু আহিয়ানের মস্তিষ্ক এখনো ঠান্ডা। রোজা থেকে বিকেলে তৃধা এমনিতেই খুব ক্লান্ত। এর মাঝে এত ঘোরাঘুরিতে শরীরে আর শক্তি পাচ্ছে না। তাই আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল :আহিয়ান ভাই
ওই ড্রেসটা আর আমার চাই না। চলুন অন্য কিছু কিনে বাড়িতে যাই। আহিয়ান কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল: তোর ফ্রেন্ড তোকে ড্রেসের পিক কিসে পাঠিয়েছে.. হোয়াটসঅ্যাপ নাকি মেসেঞ্জার?
তৃধা ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল: মেসেঞ্জারে....
আহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল: তোর ফেসবুক পাসওয়ার্ড বল?
তৃধা চোখ গোল করে তাকিয়ে আছে তারপর বোকার মত প্রশ্ন করল: কেন? ফেসবুক পাসওয়ার্ড দিয়ে আপনি কি করবেন?
আহিয়ান ভাবলেন ভঙ্গিতে বলল: চেক করব.. সারাদিন তুই এহসানের সাথে কথা বলেছিস কিনা..
তৃধার আগে দাঁত চেপে বলল :আবার শুরু করলেন আপনি?
আহিয়ান ওর কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল: পাসওয়ার্ড বলবি নাকি এত মানুষের সামনে থাপ্পড় খাবি?
সকালে রাগ এখনো কমেনি। এর মাঝে লোকটা আবারো শুরু করে দিয়েছে। তৃধা অভিমানে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে পাসওয়ার্ডটা বললো। আহিয়ান মৃদু হাসলো ফেসবুক পাসওয়ার্ডে তার নাম দেখে। কিন্তু বোকা মেয়েটা দেখলোই না। আহিয়ান ঝটপট মিনিটের সামনে ড্রেসের পিকটা ধরল। এই ড্রেসটা...?
তৃধা অবাক এবং মাথা ঝাঁকিয়ে খুশি হয়ে বলল:আপনি কিভাবে বুঝলেন?
আহিয়ান ভাব নিয়ে বলল: বিকজ আমি তোর মত গাধী না......
তারপর ওরা দুজন গেল অন্য দোকানে, তিনটা দোকান খোজার পর কাঙ্খিত ড্রেসটা পেল।
পিক থাকার কারণে ড্রেসটা খুঁজতে ওদের কোন সমস্যা হয়নি।। কিন্তু সমস্যা হল অন্য জায়গায়। এত ঘোরাঘুরি করে খোঁজার পর ড্রেসটা পেয়ে তৃধা এখন বলছে নিবে না। দোকানদার ড্রেসের দাম বলেছে তেরো হাজার টাকা। তৃধা আহিয়ানকে বারবার বলছে। ওর ফ্রেন্ড এই ড্রেসটা ৯৫০০ টাকা দিয়ে নিয়েছে। আহিয়ান তৃধাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে ঈদের আগে ড্রেসের দাম একটু বেশিই থাকে। কিন্তু তৃধা মানতে নারাজ। তাই আহিয়ান বেশি কথা না বাড়িয়ে ড্রেসটা দোকান থেকে কেনে বেরিয়ে গেল।
তৃধা ওর পায়ে হাত পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল। আমি নিষেধ করার পরেও কেন নিয়েছেন।
আহিয়ান সরাসরি বলল: আমার গার্লফ্রেন্ড কে দিব...
তৃধা রেগে মেগে বললো: কে আপনার গার্লফ্রেন্ড?
আহিয়ান : তোকে বলবো কেন?
তৃধা: আমি আপনার বউ তাই?
আহিয়ান কিছু মনে করার ভঙ্গিতে বলল: কিন্তু আমার তো তেমন কিছু মনে পড়ছে না...
তৃধা থমকে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল: আপনি কি ভুলে গেছেন আপনি বিবাহিত?
আহিয়ান: হয়তো...
তৃধা: হয়তো মানে! কেন?
আহিয়ান: বিকজ এখনো আমি রাতে একাই ঘুমাই.. বিয়ে করলে আর বউ থাকলে কি একা ঘুমাতাম?
তৃধা মুখ ভেনসি দিয়ে হাটলো সামনে...
আহিয়ান এগিয়ে গিয়ে ওর হাত টেনে ঢুকালো শাড়ি দোকানে। তৃধাকে নিয়ে চেয়ারে বসালো।
দোকানদারের উদ্দেশ্যে বলল: লাল বেনারসি দেখান তো......
তৃধা অবাক কন্ঠে বলল: বেনারসি কেন কিনছেন?
আহিয়ান দোকানের শাড়ি গুলো দেখতে দেখতে বলল: আরেকটা বিয়ে করব তাই....
সবকিছু যেন তৃধার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
আজকে যে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছে কে জানে...
তার সাথেই সব উল্টাপাল্টা কাজ হতে হলো।
তৃধা আবারো গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকালো। আহিয়ান কিছু বলল না।
দোকানদার চাচা লাল টকটকে কয়েকটা সুন্দর সুন্দর বেনারসি শাড়ি খুলে ধরলেন।
তারপর তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: দেখতো আম্মা এগুলোর মধ্যে পছন্দ হয় কিনা.....
আরো অনেকগুলো কালইলেকশন আছে। প্রয়োজন হলে ওগুলো খুলে দেখাবো।
তৃধা শাড়ির দিকে না তাকিয়ে বলল: যার বউকে দেবে তাকেই দেখান...আমি এসব দেখতে ইন্টারেস্ট না।
আহিয়ান দোকানদারকে ইশারা করে শাড়িগুলো নিজের দিকে আনলো।
টকটকে লাল সোনালী গর্জিয়াস কারু কাজ করা একটা শাড়ি চয়েস করে বললো প্যাকেট করে দেন।
জর্জেট এর মধ্যে সোনালী পায়ের বালা লাল একটা শাড়ি আঁচল মাথায় দিয়ে বললো। আমার গার্লফ্রেন্ডকে বেশ মানাবে তাই না তৃধা,...
এই কথা বলে দোকানদারকে বলল এটাও প্যাকেট করে দিতে...
ত্রিধা রেগে ফুলে ফুলে বোমা হচ্ছে।
মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্লাস্ট হবে।
+
আহিয়ান সেদিকে না তাকিয়ে শাড়ি দেখায় মনোযোগ দিল। মাম্মা,মামনি ,কাকি ,আহিয়া ও দাদু-নানুদের জন্য শাড়ি নিল। পুরোটা সময় তৃধা অন্যদিকে তাকিয়ে বসে রইল।
শাড়ি নেওয়া শেষ হলে আহিয়ান বিল পেমেন্ট করে তৃধার হাত ধরে দোকান থেকে বের হলো। তৃধা আশেপাশে পাশে এক নজর তাকিয়ে আহিয়ানের হাত থেকে নিজের হাত ছুটিয়ে নিল। আহিয়ান আবারও ধরল। চারদিকের কথা ভেবে
তৃধা আর কিছু বলল না।
আহিয়ান মুখটাকে একটু দুঃখীদুঃখী করে বলল : এক হাতে বউ আরেক হাতে এতগুলো শাড়ি.... তোর কি একটু জামাইয়ের জন্য মায়া হয় না? তৃধা মুখ ভেংচি দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল: আপনার গার্লফ্রেন্ডকে এসে হেল্প করতে বলুন। আমি পারবো না।
_আমার গার্লফ্রেন্ড আসা পর্যন্ত কয়েকটা ব্যাগ হাতে নে..
_পারবো না আমি.. যার জন্য শাড়ি নিয়েছেন, তার হাতে গিয়ে ব্যাগ দিন।
দুজন ঝগড়া করতে করতে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। অতঃপর আহিয়ান গাড়ির ব্যাগ সিটে শপিং ব্যাগ গুলো রেখে ডোর লক করে দিল। তৃধা গাড়িতে উঠতে চাইলে আহিয়ান ওকে নিয়ে আবারও শপিংমলে ঢুকলো।
রিহান ও আহিয়া এসেছে যমুনা ফিউচার পার্কে। ফোনে অনেক কথা বললেও সামনাসামনি আহিয়া একদম চুপচাপ। রিহান কখন থেকে একা একাই কথা বলে যাচ্ছে। আর আহিয়া শুধু হ্যাঁ...হু... বলে মাথা নাড়ছে।
গাড়ি থেকে নামার পরে রিহান মেয়েটার হাত ধরেছে। সেই থেকে শুরু হয়েছে ওর কাঁপাকাঁপি। কিন্তু রিহান ছাড়লো না। শক্ত করে চেপে ধরেই শপিংমলে ঘুরছে। বারবার আহিয়াকে প্রশ্ন করছে ওর কি কি লাগবে? কিন্তু মেয়েটা কিছুই বলছে না।
রিহান তার নিজের ইচ্ছামতো দুইটা ড্রেস, একটা শাড়ি ও অনেকগুলো কসমেটিক্স কিনে দিল। যদিও ওর এসব বিষয়ে জ্ঞান নেই। কসমেটিক্স এর দোকানে গিয়ে ছেলেটাকে বলছে মেয়েদের সাজগোজ এর জন্য যা যা লাগে তা তা দিতে। ছেলেটার সেই অনুযায়ী সবকিছু গুছিয়ে দিয়েছে। প্রায় ঘন্টা খানেক পার করার পর আসিয়া উসখুস করে বলল: রিহান..
_হুম..
_না মানে... চলুন আমরা শপিংমল থেকে বেরিয়ে যাই।
_কেন?
_আমার ভয় হচ্ছে.. ঈদের সময় তো অনেকেই কেনাকাটা করতে আসে। যদি পাপার পরিচিত কেউ আমাকে দেখে চিনে ফেলে। রিহান কিছু একটা ভেবে সামনে এগিয়ে গেল। দুইটা মাক্স কিনে একটা নিজে পড়লো এবং আরেকটা যত্ন সহকারে আহিয়াকে পরিয়ে দিল। পুরোটা সময় আহিয়া ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল রিহানের দিকে।
রিহান চোখ মেরে বলল:now perfect...
তারপর আবারও আহিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল: আহিয়া.. তুমি কি আমায় আপন ভাবতে পারছ না? আহিয়া চমকে তাকিয়ে বলল: আপনার এমন কেন মনে হচ্ছে?
রিহান আহিয়ার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল: তুমি শপিংয়ে এসেছ নিশ্চয়ই কিছু না কিছু কিনতে.. কিন্তু আমার কাছে তুমি কিছুই বলছো না। বাড়িতে যাওয়ার পর আন্টি কে কি বলবে? ভাইয়া কয়েক সেকেন্ড ভাবল.. রিহান ঠিকই বলছে, বাড়িতে যাওয়ার পর মাম্মা নিশ্চয়ই হিজাবের কথা জিজ্ঞেস করবে... তখন কি বলবো? মাম্মা তো স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে শপিংয়ে আর আসা যাবেনা ঈদের আগে।
আহিয়ার ভাবনার মাঝে রিহান আবারও ডাকলো: এই আহিয়া পাখি.. কি ভাবছো? তুমি কোন কিছু নিচ্ছ না? আহিয়া আমতা আমতা করে বলল: না মানে আমাদের তো এখনো বিয়ে হয়নি। তাই আপনার কাছ থেকে কিছু নিতে আমার ভালো লাগছে না।
রিহান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল: কাউকে আপন ভাবার জন্য কি বিয়ে করা লাগে? তাহলে চলো এখন এই মুহূর্তে বিয়ে করবো।
বলেই আহিয়ার হাত ধরে শপিং মল থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল। আহিয়া রিহানকে টেনে ধরে দাঁড় করালো। তারপর টলোমলো চোখে তাকিয়ে বলল: সরি রিহান, আপনি এত রেগে কেন যাচ্ছেন?
রিহান আহিয়ার মুখটাকে দুই হাতের আজলায় নিয়ে কোমল কন্ঠে বললো: আপন হওয়ার জন্য বিয়ের সম্পর্কের কোন প্রয়োজন নেই। আপন হতে দুটো আত্মার সম্পর্কই যথেষ্ট। বিয়ে তো সমাজের এক বৈধ নিয়ম মাত্র।
তাছাড়া বিয়ে ছাড়াও আমি কিন্তু নিজেকে বিবাহিতই মনে করি। তোমাকে মন থেকে কবুল করেছি আরো বহু আগেই। তুমি আমার একমাত্র ভালবাসার বউ। আর মাত্র কয়েকদিন তারপর বৈধভাবে স্বীকৃতি দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসবো। তাই কখনো আর এসব কথা বলবে না।
আহিয়া চোখের কোনে জমে থাকা টলটলে জল গুলোকে ছেড়ে দিয়ে বলল: সরি রিহান... আমি আপনাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলেছি। অনেক অনেক সরি।
রিহান মৃদু হেসে ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল: আমি একটুও কষ্ট পাইনি বোকা মেয়ে। শুধু একটু অবাক হয়েছি তুমি আমাকে এখনো পর ভাবো সেটা ভেবে।
আহিয়া খানিকটা স্বাভাবিক হলো। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে মিনমিনে গলায় বলল: ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করে আমার কয়েকটা হিজাব লাগবে।
দীর্ঘ সময় পর আহিয়া কিছু চাওয়ায় রিহান বেশ খুশি হয়েছে। তা তার চেহারা দেখেই বোঝা যায়। অতঃপর দুজন গেল হিজাবের দোকানে।
এদিকে আহিয়ান পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলো ইফতারের সময় হয়ে আসছে। ইতিমধ্যেই তৃধার জন্য আরও অনেক কিছু কিনেছে। মেয়েটা সেই কখন থেকে চুপ করে আছে কথাই বলছে না। আহিয়ান ওকে আরও জ্বালানোর জন্য একটা কসমেটিক্স এর দোকানে ঢুকতে ঢুকতে বলল: চল আমার দ্বিতীয় বউয়ের জন্য আরো কিছু কেনাকাটা করি।
তৃধা রাগে কটমট করছে। পারলে এই মুহূর্তে কোন কিছু দিয়ে বাড়ি দিয়ে আহিয়ানের মাথা ফাটিয়ে দেয়।
আহিয়ান দোকানে ঢুকে সুন্দর দুই সেট চুরি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দোকানদারকে দিতে বলল। দোকানদার চুরিগুলো এগিয়ে দিতে আহিয়ান হাতে নিয়ে তৃধাকে বলল : হাতটা দে তো.... তোকে পরিয়ে দেখি আমার দ্বিতীয় বউয়ের হাতে লাগবে কিনা....
মেয়েটা অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সেটা দেখে আহিয়ান ওর হাত টেনে চুরিগুলো পরিয়ে দিতে লাগলো।
তৃধা হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল লালের মধ্যে সোনালী কারু কাজ করা অসম্ভব সুন্দর চুরি। তার ফর্সা হাতে মানিয়েছে বেশ।
আহিয়ান মিটমিট হেসে বলল: আমার দ্বিতীয় বউকে কিন্তু ভালোই লাগবে এগুলো পড়লে বল তৃধা....?
তৃধা আরো রেগে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মনে এক কোমল অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন তা আবারও বিরক্তিতে রূপ নিয়েছে। হাতে চুড়িগুলো টেনে খুলতে খুলতে বলল: আমি জানিনা....
আহিয়ান: আরে বউ রাগ কেন করছ..? সতীন হল ছোট বোনের মত.. তাকে হিংসা করা ভালো বউদের কাজ নয়। তৃধার রাগ এবার চরম মাত্রায় বেড়ে গেল। হন হন করে বেরিয়ে হাঁটলো পার্কিং এরিয়ার দিকে। আহিয়া সেদিকে তাকিয়ে স্বঃশব্দে হেসে উঠলো।
দোকানদার ছেলেটি নিজেও হেসে দিয়ে বলল : ভাই ভাবি কে এভাবে রাগাচ্ছেন কেন..?
আহিয়ান আবারও হেসে দিয়ে বলল : মাঝেমধ্যে বউকে রাগানো স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো বলেই সে টুকটাক আরো কিছু নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
ছেলেটা মৃদু হেসে বলল: অন্যের ভালোবাসা দেখতেও ভালো লাগে...
আসিয়ান গাড়ির সামনে গিয়ে দেখল তৃধা মুখ ভোতা করে বসে আছে। সে হাতের ব্যাগগুলো ব্যাক সিটে রেখে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো। মেয়েটা এখনো কিছু বলছে না। ইফতারের সময় হয়ে যাচ্ছে তাই ওকে না জ্বালিয়ে সে গাড়ি স্টার্ট দিল।
ওদের গাড়িটি গিয়ে থামল এক বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে। তৃধা সেটা দেখে বলল: আপনি এখানে কেন এসেছেন? আমি আপনার সাথে ইফতার করব না.. বাড়িতে চলুন।
কিন্তু আহিয়ান ওর কথা শুনলে তো.... সে গাড়ি পার্কিং করে তৃধাকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। মেয়েটা এখনও প্রচন্ড রেগে আছে। চারদিকে মাগরিবের আযান পড়ছে শুনে দুজনেই রোজা ভাঙলো। কিন্তু তৃধা একটা খেজুর ও শরবত খেয়ে আর কিছু মুখে নিচ্ছে না।
সেটা দেখে আহিয়ান প্রশ্ন করলো: সমস্যা কি? আর কিছু লাগবে?
তৃধা জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল। ছেলেটা বুঝলো তার বউ এখনো রেগে আছে। আজকে জ্বালানোর পরিমাণটা একটু বেশিই ছিল। চুপচাপ এসে পাশের চেয়ারে বসে নিজের প্লেট থেকে খাবার তুলে ধরল তৃধার মুখের সামনে। মেয়েটা অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। সেটা দেখে আহিয়ান এবার শান্ত কন্ঠে বলল: সরি বউ.. আমিতো দুষ্টুমি করেছি তোমার সাথে। এতক্ষণ যা যা কিনেছি সব তোমার জন্য।
তৃধা এবার ফুঁপিয়ে উঠলো। ভেজা কন্ঠে বলল: আহিয়ান ভাই.. আপনি আবার আরেকটা বিয়ে করবেন?
আহিয়ান এর পেট ফেটে হাসি আসছে। কিন্তু এটা হাসার মুহূর্ত নয়। এখন হাসলে তার মহারানী আরো রেগে যাবে।
তৃধা ঝর ঝর করে কেঁদে দিল। সেটা দেখে আহিয়ান খাবারের প্লেট রেখে বা হাতে ওর ঘাড়ের পেছন দিয়ে অপর কাঁধে হাত রাখল। মেয়েটা বোধহয় আশ্রয় খুঁজে পেল। মুহূর্তেই আহিয়ানের বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে দিলো।
ছেলেটা এলোমেলো দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকাচ্ছে। তারপর নজর ঘুরিয়ে তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল: তুমি তো পুরা সিরিয়াস হয়ে গেছো বউ.. আমি তো দুষ্টুমি করেছিলাম। আমাকে কি পাগলা কুত্তায় কামড় দিছে আরও একটা বিয়ে করবো....? এক বিয়ে করেই তো হেয়ারফল শুরু হয়েছে। আরেকটা আনলে তো মাথায় চুল ই থাকবে না।
তৃধা কাঁদতে কাঁদতে হেসে দিল। অতঃপর ওর বুকে কয়েকটা কিল দিয়ে বলল: সত্যি বলছেন আপনি আর বিয়ে করবেন না?
আহিয়ান মিটি মিটি হেসে বলল: চার বিয়ে করা মোবাহ বউ...তৃধা এবার সোজা হয়ে বসে বললো: তাহলে কুরবানী দেওয়া ওয়াজ স্বামী..
এটা শুনে আহিয়ান জীবে কামড় দিয়ে বলল: থাক বউ আমার আর বিয়ে করা লাগবে না।
তৃধা এবার হেসে দিল। আহিয়ান ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে নিজের হাতে খাইয়ে দিল। আশেপাশের কয়েকজন যুবক-যুবতী ওদের দেখে মিষ্টি হাসল।
+
ইফতার শেষ ওরা দুজন রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলো।
গাড়িতে উঠে বসে তৃধা প্রশ্ন করল: আহিয়ান ভাই আমরা কি এখন বাড়িতে চলে যাব.....?
আহিয়ান কিছুক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আচমকা তৃধার বাহু টেনে কাছে এনে থুতনিতে কামড় দিয়ে পরলো: আমি তোর ভাই?
মেয়েটা মৃদু চিৎকার দিয়ে বলল: উফ ব্যাথা বাচ্চা আহিয়ান ভা.......
তৃধা নিজের ভুল বুঝতে পেরে দুই হাতে মুখ চেপে ধরল।
আহিয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল: তোর কি আর একটা বাইট প্রয়োজন...... ?
মেয়েটা চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে দুই হাতে মুখ চেপে ধরে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বোঝালো তার দরকার নেই আর,,...
আহিয়ান মৃদু হেসে বলল: জীবনেও ভাই ডাকবি আর?
তৃধা মুখটা একটু কাঁদো কাঁদো করে বলল: তাহলে কি বলে ডাকবো?
আহিয়ান সরাসরি কণ্ঠে বলবো: আহিয়ান বলে ডাকবি
মেয়েটার লাজুক কন্ঠে মাথা নিচু করে বলল: আমি নাম ধরে ডাকতে পারবো না...
ওর কথা শুনে আহিয়ান মৃদু হেসে বলল: ওগো হ্যাঁগো শুনছো গো এসব বলে ডাকতে পারিস....
এতে অবশ্য একটা লাভ আছে বিবাহিত বিবাহিত ফিল আসবে।
তৃধা বোধায় লজ্জা পেলো খুব ...তাই কথা না বাড়িয়ে গাড়ির কাছে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
আহিয়ানো মেয়েটাকে আর ঘাটালো না। ওদের গাড়িটি রাতের শহরের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।
গভীর রাতে পিন পতন নীরবতা।
নীরবতা ভেঙে আহিয়ানের ফোনটি বেজে উঠলো। কল রিসিভ করে লাউড স্পিকার করে দিল।
আহিয়ান: আসসালামু আলাইকুম পাপা....
আবির: ওয়ালাইকুম আসসালাম... কোথায় তোমরা?
আহিয়ান :এইতো ইফতার করে বের হলাম?
আবির :কেনাকাটা শেষ হয়েছে....? কখন বাড়ি ফিরবে...?
আহিয়ান গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল: দুইটা মেয়েমানুষ সাথে দিয়েছো,
কেনাকাটা শেষ করে, ইফতার করলাম, কিন্তু তৃধা এখন বলছে ওর নাকি আরো কিছু কেনার বাকি আছে। তাই আবার শপিংমলে যাচ্ছি, ফিরতে একটু দেরি হবে।
কথাগুলো শুনে তৃধা চোখ গোল করে তাকিয়ে আছে। কত সহজে লোকটা তার নামে মিথ্যা কথা বলে দিল।
তখনই ফোনের ওপার থেকে আবির বলল কেনাকাটা শেষ হলে ওদেরকে নিয়ে সাবধানে বাড়ি ফিরো।।
আহিয়ান: আচ্ছা বাবা....
বলেই আহিয়ান ফোনটা কেটে দিল। তৃধা এতক্ষণ এমন ভাব নিয়েছিল যেন ফোনটা কাটলেই ওকে কাচা চিবিয়ে খাবে। কিন্তু রাস্তার পাশের কিছু একটা নজর পড়তে তৃধার অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণে হাসি জমিয়ে আহিয়ানের বাহু ঝাকাতে ঝাকাতে বলল : ওই শোন না প্লিজ গাড়িটা থামান ।
আহিয়ান সেদিকে না তাকিয়ে বলল; এভাবে ঝাকাচ্ছিস কেন অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে তো?
কিন্তু তৃধা শুনলো না। ও যে কোন মূল্যে গাড়ি থামাতে চায়।
অতঃপর আহিয়ান একটা ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়ি সাইড করলো.. বিরক্তি কন্ঠে বলল: কি সমস্যা?
এমন করছিস কেন?
তৃধা দূরে ভঙ্গিতে বলল :শুনুন না...
মুহূর্তে আহিয়ান এর দৃষ্টি শীতল হয়ে আসলো কোমল কন্ঠে বলল: বলো...
মেয়েটা মিষ্টি আবদার করে বলল: চলুন না ফুচকা খেতে যাই...
আহিয়ান অবাক কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল :এখন?
তৃধা: হুম এখন..
আহিয়ান: ওকে সামনে একটা ফুচকা স্টল আছে... পার্সেল করে নেব...
তৃধা গো ধরে বলল: না? আমি এখানেই খাব...
পিছনে একটু ফুচকার দোকান রেখে এসেছি সেখানে খাব।
আরিয়ারের চোখে মুখে অবাকতা। বিস্মিত কণ্ঠে বলল: what!!!.. তুই পাশে দাঁড়িয়ে খোলামেলা দোকানের ফুচকা খাবি।
তৃধা: হ্যাঁ খাব... ওসব দোকানের ফুচকা অনেক মজা হয়..
আহিয়ান কন্ঠে গম্ভীর জন্য বলল: ওখান থেকে খেতে হবে না ওখানকার ফুচকা মজা নয় বরং unhealthy হয়..
Unhealthy food স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
তৃধা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে আহিয়ান এর এক বাহুল জড়িয়ে ধরে বলল: শুনুন না...
আহিয়ান ঘর তাকালো একবার নিজের বাহুর দিকে তারপর ঘোর লাগানো কন্ঠে বলল: আমাকে শিডিউল করার চেষ্টা করছেন মিসেজ খান।
তৃধা সঙ্গে সঙ্গে ওর হাত ছেড়ে দিল তারপর আমতা আমতা করে বলল: না মানে চলুন না প্লিজ।
আহিয়ান আচমকা ওর কোমরে হাত রেখে টেনে কাছে এনে বলল: তোমার ইচ্ছে রাখলে আমি কি পাবো?
মেয়েটা লজ্জার মাথা নয়েনিল। এই লোকের মুখে তুমি ডাক শুনলে আফিমের থেকেও বেশি নেশা তোর লাগে।
অতঃপর আহিয়ানের টি-শার্টের সামনের বোতামটাতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল: আপনার কি চাই আমার থেকে.....?
ছেলেটা মোহ মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নেসাত্মক কন্ঠে বলল: তোমাকে চাই.....
তৃধা ছটফট করে উঠে বলল: আপনি দিন দিন নির্লজ্জ পুরুষ হয়ে যাচ্ছেন...
আহিয়ান ঠোঁট বাঁকি বাঁকা হাসি দিয়ে বলল: শুদ্ধ পুরুষ হয়ে থাকলে তো বউ টিকবে না...
তখন তো আবার বিয়ে করতে হবে।
আহিয়ানের মুখে এমন বেপরোয়া কথা শুনে মেয়েটার কান গরম হয়ে গেল।
নিজেকে শুটাতে চেয়ে বলল: আমার ফুচকা খাওয়া লাগবে না...
চলুন বাড়িতে চলুন.....
আহিয়ান এবার সহ শব্দে হেসে উঠলো কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল: এবার ছেড়ে দিলাম কারণ তোমাকে আমি ধরার উদ্দেশ্যে ধরিনি।
তবে যেদিন ধরবে পালাবার রাস্তা খুঁজে পাবে না। ।
মেয়েটা বুঝলো না ওর কথার মানে...... সব যেন মাথার উপর দিয়ে গেল।।
রিহান আহিয়ার হাত ধরে লেকের পাড়ে হাঁটছে।
ইফতারের পর তারা হাতিরঝিলে এসেছে।
এখানকার রাস্তায় ও ব্রীজ গুলোতে জলে থাকা রঙ্গিন আলোয় সন্ধ্যার পরের সময়টা মনোমুগ্ধকর দেখায়।
হঠাৎ রিহান দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল :তুমি একটু দাঁড়াও আমি আসছি.....?
আহিয়া লেকের পানির দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। চারিদিকে রঙ্গিন আলোতে লেকের পানি ঝলমল করছে। বিষয়টা খুব উপভোগ করে আহিয়া।
এসব জায়গাগুলোতে কখনো তার আসা হয়ে ওঠেনি কখনো। তাছাড়া কিভাবে বা আসবে? সে তো ছোটবেলা থেকেই দেশের বাইরে ছিল...
ভাবনার মাঝে রিহান আইসক্রিম হাতে নিয়ে হাজির হলো। আহিয়া বেশ অবাক হলো।
চারিদিকের পরিবেশ মৃদু শীতল। এরকম পরিবেশে কেউ আইসক্রিম খায়.....?
তখনই মনে পড়লো সে নিজেই তো খায়। শীতের দিনে আইসক্রিম খেয়ে কাঁপাকাঁপি অনুভূতিটা অন্যরকম রোমাঞ্চকর। কিন্তু সে যে ঠান্ডা পরিবেশ আইসক্রিম খেতে পছন্দ করে এটা রিহান কিভাবে জানলো?
ওর ভাবনার মাঝে রিহান অধিকার আইসক্রিম বাড়িয়ে দিল। আহিয়া আইসক্রিম হাতে নিয়ে স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রেহানের দিকে।
রিহান আর ভাবনা অন্তর বুঝতে পেরে মৃদু কন্ঠে বলল: কি ভাবছো আমি কিভাবে জানলাম তুমি ঠাণ্ডা পরিবেশ আইসক্রিম পছন্দ কর?
আহিয়া উপন্যাস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল: হ্যাঁ...
রিহান ওকে নিয়ে একটা সান বাঁধানো সিঁড়িতে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে বলল: আমাকে আহিয়ান বলেছে...আহিয়া আইসক্রিম মুখে দিতে বলল: ভাইয়া আমার কথা ঠিকই বলেছে...?
রিহান বাদাম ছিল মুখে দিতে দিতে বলল: আরো অনেক কিছুই বলেছে... কিন্তু তুমি টেনশন করো না পার্সোনালি তোমার সম্পর্কে কিছু বলেনি।
দুই বন্ধুর গল্প করার সময় অনেক সময় পরিবার নিয়ে কথা হত। তখন কথায় কথায় বলেছে আর কি।
আহিয়া কিছু একটা বলতে চাইলো কিন্তু কথা যেন ঠোঁটে জড়িয়ে যাচ্ছে শীতে ঠোট কাঁপছে।
বুঝতে পেরে বলল: শীত লাগছে....?
আহিয়া মৃদু হেসে বলল: হুম...
রিহান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল :এমন শীতল পরিবেশে আইসক্রিম খেলে তো শীত লাগবেই...?
আহিয়া আইসক্রিম মুখে দিতে বলল সমস্যা নেই। আমার অভ্যাস আছে এই শীতল পরিবেশে আইসক্রিম খাওয়া অনুভূতিটা আমার বেশ ভালো লাগে।
রিহান সরাসরি মিটিং অ্যাটেন্ড করে আশায়। সাদা শার্টের উপর কালো ব্লেজার টা ছিল। ছেলেটা এক মুহূর্ত না ভেবে ব্লেজারটা খুলে আহিয়ার পেছনে জড়িয়ে দিল।
মেয়েটা বেশ আজকে উঠলো। রিহান বাদাম ছিলে মুখে দিতে দিতে বলল: এবার ভালো লাগছে...?
আহিয়া লেকের পানির দিকে তাকিয়ে কাঁপা কন্ঠে বলল: হুম...
কিন্তু এখানে ওর কন্ঠ কাঁপুনি দেখে রিহান একটু চিন্তিত হল। ইতিমধ্যে আহিয়ার আইসক্রিম খাওয়া শেষ।
রিহান কিছু বলল না । আজকে অনুমতি ও চাইলো না।
আহিয়ার দিকে গা ঘেসে বসে। ওর ঘরের পিছনে হাত দিয়ে নিজের কাছে টেনে আনলো।
মুহূর্তে আহিয়ার মাথা ঠেকলো রিহানের বুকে।
এক হাতে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরে বলল: আহিয়া পাখি...
আহিয়া কাপা কন্ঠে জবাব দিল :হুম...
রিহান: তোমাকে খুব ভালোবাসি।
আহিয়া লজ্জায় রেহানের বুকে গুটি আছে ওর সাদা শার্টের বোতাম গুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলল: আমিও..
যেটা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু একে দিল।
মুহূর্তে যেন আহিয়ার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল।
রিহান টের পাচ্ছে মেয়েটা শরীরের কাঁপুনি।
রিহান দুষ্টু কন্ঠে বলল: তোমাকে আজকে আমি আমার বাড়ি নিয়ে যাব.. আর খান বাড়িতে ফিরতে হবে না.. চলো আমরা বিয়ে করে নেই..
আহিয়া ওর বুক থেকে মাথা তুলে কিছু বলতে চাইলো। কিন্তু রিহান শেষ সুযোগ দিল না শক্ত করে মাথা চেপে ধরলে ওর বুকের মাঝে।
অতঃপর কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল: তোমায় বুকে নিয়ে প্রতিটা রাত ঘুমাতে চাই। ঘুম থেকে উঠে তোমার মিষ্টি চেহারা দেখে দিন শুরু করতে চাই।
অফিস থেকে ফিরে তোমার হাতের বানানো কফি খেয়ে সমস্ত ক্লান্তি বিলীন করতে চাই। আহিয়া পাখি... বিয়ে করবে আমায়...
আহিয়া চোখ বন্ধ করে মৃত উত্তর দিল: করব, তিন দিন পর ঈদ, ঈদের পর আঙ্কেল আন্টিকে পাঠাবেন প্রস্তাব নিয়ে। আমি অপেক্ষায় থাকবো আপনার ঘরনি হওয়ার। রিহান আহিয়ার আঙ্গুলে একটা ডায়মন্ড রিং পরিয়ে দিল। আচমকা কাজে মেয়েটা বেশ ভোরকে গেছে। রিহন ওর হাতে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বলল: এই যে এখন আমাকে জালাচ্ছো। তার শাস্তি স্বরূপ বিয়ের পর একদিনো বাপের বাড়িতে থাকতে দেবো না মনে রেখো।