জুই আজকে নিজেকে কিছুতেই আটকাতে পারছে না।
তার চোখের পানি কিছুতেই বাধা মানছে না।
হু হু করে কেঁদে উঠে বলল: আমি বিয়ে করবো না ভাইয়া... তুমি আব্বু আম্মুকে বুঝিয়ে বল।
রিহান এতক্ষন বিছানায় বসে ছিল। ওর কথা শুনে উঠে দাঁড়ালো। অতঃপর করা কন্ঠে বলল : ছেলে যথেষ্ট ভালো এবং তোর যোগ্য... তাছাড়া তোর দোকানদার মেহেদীর থেকে অনেক ভালো। তাই এমন সুপাত্র হাতছাড়া করার প্রশ্নই ওঠে না। আর রয়েছে তোর পড়ালেখার কথা। তোর শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ডাক্তার হবি।
এতে পাত্রপক্ষের কারো কোনো অসুবিধা নেই। বলেই রিহান রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল। বিছানায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে মেয়েটা কাঁদতে শুরু করল। কেন জানি ফ্যামিলির কেউ আজ তোর কান্না দেখতে আসছে না।
কেউ জানতে চাইছে না ওর এত কষ্টের কারণ। সবাই অনেক খুশিতে অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা করছে।
তার মনের অবস্থাটা কেউ বুঝতে পারছে না। ঊষা কয়েকবার এসে ঘুরে গেল বোনের রুমের আশেপাশ থেকে। আপু কেন কান্না করছে তা সে জানেনা। কিন্তু এসব দেখে তার ছোট্ট মনে অনেক কষ্ট হচ্ছে। তবে এতোটুকু বুঝতে পেরেছে তার বোন বিয়ে করতে চায় না। সে যদি পারতো বাড়িতে কোন অতিথি ঢুকতেই দিত না। কিন্তু আফসোস এগুলো করাটাই সাধ্যের বাইরে। ঘড়ির কাঁটায় বিকেল পাঁচটা বেজে আসছে।
তৃধা পেটে একটা ওড়না বেধে সোফায় হেলেন দিয়ে বসে আছে। ওর সাথে এসে বসলো আহিয়া আদিবা ও আকলিমা খান। আদিবা দাদুর কোলে বসে চকলেট ছিরে খাচ্ছে। হঠাৎই চোখ গেল তাই একটু সামনে।
চোখ গোল গোল করে বলল : আহিয়ান কোথায় যাও তুমি.....? আমিও যাব....!!
বলেই আদিবা আকলিমা খানের কোল থেকে নেমে ছুটে ওইদিকে গেল। আহিয়ান আদিবা কে কোলে নিল।
আদিবার মুখে আহিয়ান নামটা শুনে তৃধার সাথে সাথে ওদিকে তাকালো। উফ তার জামাই টা এত কিউট কেন....? এই এক মাসে কম করে হলেও ৫০০ বার ফিদা হয়েছে ওই লোকটার উপর। এই যে এখন মেরুন রং এর শার্টের সাথে কালো প্যান্ট ইন করে পড়েছে।
পায়ে কালো সু জুতো। চোখের সানগ্লাস চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করা। ইস কি সুন্দর যে লাগছে... পুরাই চকলেট বয়। এরমধ্যে শার্টের হাতা ফোল্ড করে। হাতের কবজিতে কালো বেল্ডের গরিব পড়েছে। উফ পুরাই আগুন। আচমকা তৃধা হালকা একটু জোরে গেয়ে উঠলো :
বেবি তুই আগুন ছুইলে পুড়ে যাই.....🔥
.... তোর চোখে ঝড় বুকটা কাপে ভয়....👀
চুল উড়ছে হাওয়ায় লাল নীল শাড়ি.....
তুই ঘুরলে মনে বাজে হার মানি.....
তুই আগুন আগুন আমি পেট্রোল......
বাকিটা আর গাইতে পারলো না। পাশ থেকে আহিয়া শুনে জোর একটা চিমটি কাটল। মুহূর্তের মেয়েটা গান থামিয়ে ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বসে থাকলো। আহিয়ান এক পলক তাকালো ত্রিধার দিকে। অতঃপর দৃষ্টি ঘুরে কিচেন এর দিকে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল: মামমাম বের হচ্ছি...বলে আদিবার কানে কানে কিছু একটা বলে কোল থেকে নামিয়ে দিল। আদিবা ও কি বুঝলো কে জানে... ভদ্র মেয়ের মত এসে দাদুর কোলে বসলো।
মেঘ রান্নাঘর থেকে ছেলেকে বিদায় জানালো।
তৃধা এখনো ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে তাকিয়ে আছে আহিয়ানের দিকে। আহিয়ান একপলক চারদিকে তাকালো। আকলিমা খান আদিবার সাথে কথা বলছে। আর আহিয়া ফোনে স্ক্রল করছে। তারপর নজর ঘুরে তৃধার দিকে ঠোঁট গোল করে চুমু দেখিয়ে বেরিয়ে গেল।
তৃধা যেন বড়সড়ো কোন ঝাঁকুনি খেয়েছি। দুই হাতে চোখ কোচলে আবারও তাকালো। লোকটা কি সুন্দর করে হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছে। উফ ফফফ এ লোকের চালচরণ দেখলেও ভালো লাগে। অতঃপর তৃধা রানী বুকের বা পাশে চেপে ধরে সবাই হেলান দিয়ে বলল: ইয়া আল্লাহ এত ভালো লাগা রাখবো কই...?
আহিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
ইফতারের কিছুক্ষণ আগে ঊষার সকল পছন্দের খাবার নিয়ে মাহমুদা খানের বাড়িতে গেল আহিয়ান।
এবার দেশে ফেরার পর এই বাড়িতে আসা হয়নি।
মিম তো এতদিন পর ভাইপোকে দেখে বিয়ে বাড়িকে কান্নাকাটি করে মরা বাড়িতে রূপান্তর করে ফেলেছে।
আরিফ ওকে অনেক বুঝিয়ে থামিয়েছে। ইফতারের সময় হয়ে আসছে। জান্নাত ও মিম বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। ওদের দেখে মনে হচ্ছে ইফতারের আগে আরো কেউ আসার কথা। অবশেষে ওদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবির তানভীর ও রাকিব ঢুকলো বাড়িতে। দুজনের হাত ভরা ফল মিষ্টি।
ওরা তিনজন আজকে অফিসের শেষে বাড়ি যাইনি।
মাহমুদা খান বারবার ফোন করি অফিস থেকে সরাসরি এখানে আসতে বলেছে। আহিয়ান মামা বাবাকে দেখে বেশ অবাক হয়েছে। সে জানতো না তারা আসবে। আবির নিজেও ছেলেকে দেখে হতবাক।
আবির গিয়ে ছেলের পাশে সোফায় বসলো। অনেকদিন বাপ ছেলের আগের মত একসাথে বসা হয় না। আগের মত মন খুলে কথা বলা হয় না। আহিয়ানের হঠাৎ দেশে ফেরাটা আবির মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু এখন ভালই লাগছে একমাত্র আদরের ছেলে চোখের সামনে আছে।
তাই আর রাগ ধরে নাড়া রেখে ছেলের উদ্দেশ্যে বলল: কখন এসেছ....?
আহিয়ান মৃদু হেসে বলল: এইতো একটু আগেই?
তুমি আসবে আমি জানতাম না....
আবির স্বাভাবিক কণ্ঠে আস্তে করে বললাম: আমি আসবো জানলে কি আসতা না,?
আহিয়ান নিজেও আস্তে করে বলল: তেমন কিছু নয়? জানলে তোমার অফিসে গিয়ে তোমার নিয়ে একসাথে আসতাম।্যআবির মৃদু হাসলো। তার ছেলে এখনো বাচ্চাই আছে। আহিয়ান ও বাবার দিকে চেয়ে মৃদু হাসলো। আজান দিতেই.. আবির, তানভীর, আহিয়ান, রাকিব, এবং মাহমুদা খানের সকল পরিবার একসাথে ইফতারি বসলো...
জুই এক টুকরো খেজুর মুখে দিয়ে। এক গ্লাস শরবত খেলো। অতঃপর টিস্যু দিয়ে হাত মুছে উঠে দাঁড়াতে জান্নাত প্রশ্ন করলো: না খেয়ে উঠে কোথায় যাচ্ছিস....?
জুই আব্বু আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল: খিদে নেই আর... তারপর সে আর দাঁড়াবে না চুপচাপ উঠে চলে গেল নিজের রুমে। উপস্থিত সকলের কম বেশি জানেও চলে যাওয়ার কারণ।
রাকিব আসিফের দিকে তাকিয়ে বলল: বিয়েটা এখন না দিলে চলে না.... ও যখন এখন বিয়ে করতে চায় না তাহলে জড়াজড়ির কি আছে,?
মেয়েটাকে আমাদের কাছে বোঝা হয়ে গেছে?
যদি এমনটা হয় তাহলে জুইকে আমার কাছে দিয়ে দাও। আমি ওকে আমার কাছে রেখেই পড়ালেখা করাবো। ওর কথা শুনে সকলেই সে দিকে তাকালো। আসিফ কিছু বলবে তার আগেই জান্নাত বললো: ভাইয়া তুমি বিষয়টা যেভাবে ভাবছো আসলে তেমন কিছুই না। ছেলেটা আমাদের মনের মতো।
তাছাড়া জরুরী কাজে ছেলেটা দেশের বাইরে চলে যাবে ঈদের পরেই। তাই তারা বিয়ের জন্য একটু তাড়াহুড়ো করছে। নয়তো এই রোজার দিন বিয়ের কথাবার্তা বলতাম না। তাছাড়া ছেলে দেশের বাইরে যাওয়ার পর থেকে আমাদের কাছেই থাকবে। ওর লেখাপড়ার কোন সমস্যাই হবে না তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। ভালো ছেলে সব সময় হাতের কাছে পাওয়া যায় না। মেয়ে এখনো ছোট তাই নিজের ভালো বুঝতে পারছে না। কিন্তু ভবিষ্যতে ঠিকই এই সিদ্ধান্তই খুশি হবে। জান্নাতের দীর্ঘ কথা শুনে রাখিবার কিছু বলল না। কিন্তু পাশ থেকে রিহান সকলের উদ্দেশ্যে বলল: তোমরা এত চিন্তা করিও না। আগে ছেলে পক্ষকে আসতে দাও। দেখো ছেলে কেমন... তারপর যদি জুয়ের পছন্দ না হয় পরেরটা পরে ভাবা যাবে.... দেখলেই তোর বিয়ে হয়ে যায় না। ওর কথা সকলেই সহমত দিল।
ইফতারের পর মিম এসেছে জুয়েল রুমে। দুই বালিশে মুখ বুজে শুয়ে আছে। সেটা দেখে ওকে কয়েকবার ডাকলো। মেয়েটা জানে কাকি মনির এখানে আসার কারণ..... তাই সে চুপ করে ঘুমের ভান ধরে রইলো।
মিম ওর শরীরে হাত বুলিয়ে দিয়ে ডাকলো। কিন্তু মেয়েটা নড়ছেই না। মিম বোধায় বুঝলো সবকিছু। তাই উঠে গিয়ে জান্নাত কে পাঠালো।
জান্নাত রুমে প্রবেশ করতে করতে বলল: তুই কি ভদ্র মেয়ের মত উঠে বসবি নাকি আমি এই ভর সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ছাড়বো।
কথাটা বলার সাথে সাথে জুঁই উঠে বসলো।
মেয়েটার চোখ দুটো ফুলে ছোট ছোট হয়ে আছে।
কান্নার দাপটে পুরো চেহারা লাল হয়ে আছে।
জান্নাত এক পলক তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাড়ালো।
তারপর করা কন্ঠে বলল: তুই কি উঠে ভদ্র মেয়ের মত রেডি হবি নাকি আমি আজকেই তোর মামার সাথে বাপের বাড়ি চলে যাব....? এই সংসারে তুই তোর বাপ চাচা সকলকে নিয়ে থাক। যেখানে আমার কথার দাম নেই সেই খানে আমি থাকবো না। বলে জান্নাত রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু জুই ছুটে এসে মাকে পিছন থেকে জাপড়ে ধরল।
তারপর হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল: আম্মু
প্লিজ তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না... তুমি যা বলবে আমি তাই শুনবো।
জান্নাত মিমকে চোখের ইশারায় বোঝালো ওকে রেডি করে দিতে। মিম জুঁই কে টেনে নিজের কাছে আনতে জান্নাত বেরিয়ে চলে গেল। মেয়েকে কথা শোনানোর জন্য এই মুহূর্তে তাকে শক্ত হওয়া প্রয়োজন অপরিসীম।
ওর সাথে দুর্বল হয়ে কথা বললে কান্নাকাটি করে আরো ভাসিয়ে দিবে। পক্ষ এসেছি ওদের সামনে মান সম্মানটা রক্ষা করা অতি জরুরী.....