ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে(সিজন-৩)

74

লেখক: ফারজানা মনি

জান্নাত চলে যেতেই দুই চুপচাপ ওয়াশরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আসলো। ‌মিম প্রিয়জনীয় সব জিনিস ড্রেসিং টেবিলের সামনে রেখে চলে গেল। ‌এই সুযোগে জুই বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে মেহেদী কে টেক্সট করলো।

জুই : কোথায় আপনি মেহেদী.... আমাকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসছে প্লিজ কিছু করুন.....? অন্য কারো সাথে বিয়ে হলে সত্যিই আমি মরে যাব...?কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে টেক্সটের কোন রিপ্লাই আসলো না। জুই কয়েকটা কল দিল কিন্তু এতেও লাভ হলো না। ফোন বেজে যাচ্ছে কেউ রিসিভ করছে না। রাগে কষ্টে জুই এর কান্না পাচ্ছে বেশ। এর মাঝে সামনে উপস্থিত হলো কাকি মনি। হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বিছানায় রেখে ওকে রেডি করে দেওয়া শুরু করল। জান্নাত ঘরে সবকিছু গোছাচ্ছেন। সাথে দাড়িয়ে আছে মাহ মুদা খান। তার হতে চায়ের কাপ। হঠাৎই শোনা গেল কলিংবেলের শব্দ। রিহান এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। তাদের ধারণাই সত্যি ছেলেপক্ষের অতীতে এসেছে। আবির, তানভীর, রাকিব, আসিফ, আরিফ, সদরে এগিয়ে গিয়ে ওদেরকে এনে সোফায় বসালো।

সকলকে সালাম দেওয়া হ্যান্ডশপ করা স্বাভাবিক মনে হলেও একটা ছেলে আবির ওতানভীরের সাথে হ্যান্ডশেক করে কোলাকুলি করলো। ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে সে আগে থেকেই ওদেরকে চেনে। আহিয়ান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইল সেদিকে।

ঊষা ছুটে গেল জুইয়েল রুমে। গিয়ে দেখল জুঁই কে গারো বেগুনি রঙের একটা শাড়ি পরে বসিয়ে রাখা হয়েছে।‌ মুখে আলাদা করে তেমন প্রসাধনের ছোঁয়া নেই। লিপস্টিক কাজল ও হালকা গহনায় জুয়ের চেহারাটা অনেক স্নিগ্ধ লাগছে। কিন্তু চোখ দুটো এখনো লাল হয়ে আছে। ঊষা খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বোনের পাশে গিয়ে বলল: আপু মেহমান চলে এসেছে... জানো দুলাভাইটা অনেক সুন্দর..... অনেক লম্বা... কিন্তু একটু শ্যামলা...!

ঊষা মুখে শ্যামলা কথা শুনে চুলের বুকটা কেঁপে উঠল।

মুহূর্তে চোখের পাতায় ভেসে উঠল মেহেদির শ্যাম বর্ণ মুখ। ফোনটা আরেকবার হাতে নিল। পরপর মেহেদী কে কয়েকটা মেসেজ দিল।

জুইকে হতবাক করে দিয়ে দীর্ঘ সময় পর মেহেদীর রিপ্লাই আসলো।

মেহেদী: আর কত বসেই রাখবে....? তাড়াতাড়ি এসো আর সাজতে হবে না। আমি দীর্ঘক্ষণ যাবৎ অপেক্ষা করছি তোমাকে দেখার।

মেহেদির এই একটা মেসেজে জুই এর বক্ষপিঞ্জরে থাকা হৃদপিণ্ড এলোপাতাড়ি ছোটাছুটি করছে।

সে কি বলবে, কি করবে, কিছুই বুঝতে পারছে না।

মনে হচ্ছে মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। আচমকা ঊষা জুইয়কে জড়িয়ে ধরল। জুইয়ের এমন কাজে ছোট্ট মে টা বেশ ঘুরতে গেছে।

আহিয়ান সকলের সাথে সোফার এক কোণে বসে আছে। তার কেন জানি একটু দম বন্ধ লাগছে। কিন্তু কেন, কারণ জানে না। মেহেদির সাথে মেহেদির আব্বু আম্মু তার ছোট বোন ও এক বন্ধু এসেছে। মেহেদির বন্ধুকে তার শুরু থেকেই কেমন জানি বিরক্ত লাগছে।

ওকে দেখে মনে হচ্ছে বন্ধুর জন্য নয় নিজের জন্য মেয়ে দেখতে এসেছে। তাছাড়া পাপা ও মামাকে দেখে মনে হচ্ছে ওই ছেলের সাথে তাদের পূর্ব পরিচিত আছে।

আচমকা সামনের ছেলেটা আহিয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল: হাই আপনি নিশ্চয় মহাদিব খান আহিয়ান...?

আহিয়ান একটু ইতস্তৃত বোধ করে ভদ্রতার খাতিরে হ্যান্ডশেক করে বলল : হ্যালো.... আপনি কি আমাকে আগে থেকেই চেনেন....?

ছেলেটা সোজা হয়ে বসতে বসতে বলল: সরাসরি দেখা হয়নি কখনো.... তবে আবিরত তানভির আঙ্কেলের কাছ থেকে আপনার অনেক কথা শুনেছি।

আহিয়ান খানিকটা ভ্রু কুচকালো অতঃপর বড়দের দিকে একবার তাকালো। সবাই মেহেদির পরিবারের সাথে কথাবার্তা বলছে।

তারপর সামনে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা: আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারিনি....

ছেলেটা মৃদু হাসলো। তারপর স্বাভাবিক কন্ঠে বলল: আমি এহসান নেওয়াজ.... মেহেদির বেস্ট ফ্রেন্ড...

কর্মক্ষেত্রে মেহেদির সিনিয়র। তোমার ফ্যামিলির সকলেই কমবেশি আমাকে চেনে। হয়তো আপনি বাইরে ছিলেন তাই আমাকে চিনতে পারছেন না।

এহসান নেওয়ার নামটা কানে আসতে আহিয়ানের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হলো। এতক্ষণে স্বাভাবিক মুখশ্রীতে

গাম্ভীর্য নেমে এলো। এহসান মুখভঙ্গি স্বাভাবিক রেখে আহিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল: পরিবারের সকলে ভালো আছে....? আর আপনার বোন কেমন আছে....? আহিয়ান গম্ভীর মুখে তাকিয়ে বলল: বোন....?

এহসান নেওয়াজ একটু ইতস্তৃত করে বলল: না মানে আপনার কাজিন তৃধা কথা বলছি..? আসলে কয়েকদিন ধরে ওকে ফোনে পাচ্ছি না। ওকি ফোন নাম্বার পাল্টিয়েছে। আহিয়ানে শরীরে রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। নিজেকে কিছুতে স্থির রাখতে পারছে না।

এটা যদি বাড়ি না হত আর ফ্যামিলির লোকগুলো যদি এভাবে সামনে না থাকতো। যে মুখ দিয়ে এহসান তৃধার নাম উচ্চারণ করেছে সে মুখ অনেক আগেই ভেঙ্গে ফেলত। কিন্তু পাপ আর সম্মানের কথা ভেবে কিছুই করতে পারছে না। তাছাড়া তার একটা ভুল পদক্ষেপ এই মুহূর্তে জুঁই এর বিয়েটা ভাঙ্গার কারণ হতে পারে।

তাই কিছু না বলে হাত মুষ্টি করে চুপচাপ বসে রইল।

এহসান নেওয়াজ আবার বলল: না মানে কিছু মনে না করলে....তৃধার নতুন নাম্বারটা কি দেওয়া যাবে....?

আহিয়ান নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারছে না।

কিন্তু এই মুহূর্তে নিজেকে কন্ট্রোল করা অতি প্রয়োজন

তাই সে এহসানের উদ্দেশ্যে বলল: excuse me...

বলে এসে উঠে দাঁড়ালো।

ওকে উঠে যেতে দেখে রিহান এসে বলল: কিরে কোন সমস্যা...?

আহিয়ান দাঁতের দাঁত চেপে বলল: আমি ছাদে যাচ্ছি আগামী এক ঘন্টা আমাকে ডাকবি না।বলে হন হন করে উঠে গেল সিঁড়ির দিকে। এহসান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরিয়ানের যাওয়ার পানে।

পুরো খান বাড়ির পরিবার জানে তৃধার সাথে তার বিয়ে ঠিক।‌কিন্তু এই ছেলেটার অদ্ভুত আচরণ তাকে ভাবাচ্ছে। ‌সে এতটা রিয়েক্ট করার মত কিছু বলেনি।

রিহান হাসির আড়ালে গম্ভীর্য ঢেকে বলল: ও একটু কথা কম বলতে পছন্দ করি কিছু মনে করবেন না।

এহসান ঠোঁটের কোনে হাসি টেনে রেখে বলল: it's okay...কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারলাম না....

রিহান মৃদু হেসে বলল: আমি জুঁইয়ের কাজিন রিহান...

এবার এহসান বলল: আমি এহসান নেওয়াজ মেহেদির বেস্ট ফ্রেন্ড...

মুহূর্তের এখানে ভ্রু কুঁচকে এলো। এই লোকটার ব্যাপারে আগে পড়ে অনেক খোঁজখবর নিল কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি। তাই আজকে চিনতে পারিনি। রিহান এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে আহিয়ানের গম্ভীর চেহারার কারণ। রিহান ওখানে আর দাঁড়ালো না। চুপচাপ নিজেও হাটলো ছাদের দিকে। পাগলটা আবার কি করছে কে জানে....? ভাবতে ছেলেটা পায়ের গতি বাড়ালো। ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলো আহিয়ান উল্টো ঘুরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

এক হাত পকেটে গোছানো অন্য হাতে জ্বলছে একটা সিগারেট। রিহান ধীরপায়ে এগিয়ে গেল সামনে।

ছাদের বাল্বের মৃদু আলোতে দেখা গেল কয়েকটা ফুলের টপ পড়ে আছে। রিহান জানি এগুলো কার কাজ.... ভাঙ্গা টপ গুলো পেরিয়ে হেঁটে দাঁড়ালো আহিয়ানের পাশে। কিন্তু এতেও আহিয়ানের কোন ভাবনা অন্তর হলো না। নিজের মনে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। সিগারেট ফুকিয়ে যাচ্ছে। এত সুন্দর ভদ্র বেশধারী একটা যুবকের হাতে সিগারেট মোটেও শোভা পাচ্ছে না। রিহান কিছুক্ষণ থাম মেরে দিয়েছে দাঁড়িয়ে থেকে বলল: আবারো সিগারেট খাওয়া শুরু করে দিয়েছিস কেন....?

আহিয়ানের শান্ত কন্ঠে জবাব: ছেড়েছিলাম কবে...?

রিহান: এবার দেশে ফেরার পর তো খেতে দেখিনি....?

আহিয়ান মৃদু হাসলো..... যা হয়তো অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। হাতের আধ খাওয়া সিগারেটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে আগুন বন্ধ করে বলল: প্রয়োজন পরনি তাই খাইনি.....!

আহিয়ানের শান্ত কন্ঠের কথাগুলো কেন জানি ভয়ংকর লাগলো রিহানের কাছে....।

ছেলেটাকে স্বাভাবিক করতে বলল: তোর বউ জানে তুই সিগারেট খাস.?

আরিয়ান ছোট্ট করে বলল: না...

রিহান মজা করে বলল: জানলে তোর কি হাল করবে সেটা ভেবেই আমার কান্না পাচ্ছে....

রিহানের মজা করা কথা শুনে আহিয়ান বোধ হয় বিরক্ত হলো খুব। ‌এতক্ষণে শান্ত মেজাজটা আবারো চটে গেল।

কটমট করে তাকালো রিহানের দিকে। ছেলেটা ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারছে: তুই এখানে বসে বসে তোর বউ সামলানোর প্রস্তুতি নে। আমি যাই নিচে অতিথিদের কাছে। বলেই রিহান হাটলো সেই দিকে।

আহিয়ান মাঝেমধ্যে হাসিখুশি হলেও বেশিরভাগ সময় গম্ভীর টাইপের লোক।‌এই মুহূর্তে ছেলেটা প্রচন্ড রেগে আছে তাই ওকে ঘাটানোই ভালো না।এদিকে অতিথিদের ডিনার করা শেষ। সকলেই মেয়েকে দেখতে চাইছে। রিহান এখনো জুইয়ের ফ্যামিলির কাউকে বলেনি মেহেদির সাথে জুইয়ের সম্পর্কের কথা।

ও তাই পারিবারিকভাবে সবটা মিটে যাক।

আর হচ্ছেও তাই। রিহানের কথা অনুযায়ী মেহেদী ও তাদের প্রেম সংক্রান্ত ব্যাপারটি পরিবারকে জানাইনি।

শুধু বলেছে একটা মেয়েকে তার পছন্দ হয়েছে বিয়ে করতে চায়। এটা শুনে মেহেদির মা সোফিয়া বেগম বেশ খুশি হয়েছে। যেহেতু ঈদের পর মেহেদী ও এহসান আবারো যাবে দেশের বাইরে একটা সিক্রেট মিশনে বছরখানেকের জন্য। তাই সুফিয়া বেগম চায় ছেলের বিয়ের ঝামেলা মিটে ফেলতে। এতে অবশ্য মেহেদির কোন আপত্তি নেই। জুইয়ের মত আত্মমর্যাদা পূর্ণ মেয়েকে। নিজের জীবনে বেধে রাখার একমাত্র উপায় হল বিয়ে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 74 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন