মিশকা খানিকটা মৃদু হাসলো। তার মতে আহিয়ান মিথ্যা কথা বলছে। কারণ সে একটু আগেই শুনেছে আহিয়ানের পাপা একজনের সাথে কথা বলছিল।
কথার এক ফাঁকে উনি বলেন উনার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে মেয়ের একজনেরও এখনো বিয়ে হয়নি।
মিশকার ভালোই লাগলো আহিয়ানের মেয়েদের থেকে দূরে থাকার টেকনিকটা। সে আরো কিছু বলতে চাইলে আহিয়ান বলল: সরি মিস আমি আপনার পাসে দাঁড়িয়ে সময় দিতে পারছি না। জরুরি প্রয়োজনে আমার নিচে যাওয়া প্রয়োজন। বলে দূরন্ত পায়ে ছাদ থেকে নেমে গেল। আহিয়ান চলে যাওয়ায় মিশকা নিজেও আর দাঁড়ালো না। চুপচাপ নিচতলার দিকে।
এদিকে মেহেদী ও জুইয়ের রিং পরানো হয়ে গেছে।
মেহেদির পরিবার আগেই বলেছে তাদের হাতে সময় কম। তাই এনগেজমেন্ট পার্টির জন্য আলাদা করে সময় ব্যয় করতে পারবে না। হঠাৎ করে সবকিছু হওয়ায় আইনের হাজবেন্ড ও আইরিন থাকতে পারেনি।
তবে আইরিন ও তার হাজব্যান্ড ভিডিও কলে যোগ হয়েছিল। যাইহোক অবশেষে ওদের বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করা হলো। ঈদের সাত দিন পর ১২ই ডিসেম্বর মেহেদী ও জুইয়ের বিয়ে।
এহসান যেহেতু আগে থেকেই বন্ধু সবকিছু জানে তাই বন্ধুর একটা উপকার করল।
হঠাৎ করে সকলের মাঝে বলে উঠলো: আপনারা যদি কিছু মনে না করেন তো ছেলে মেয়ের আলাদা ভাবে কথা বলার ব্যবস্থা করা যাবে....?না মানে বুঝতেই তো পারছেন হঠাৎ করে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে.... তাই তাদের একটু চেনা চেনা প্রয়োজন আছে....
এই কথা শুনে আরিফ রিহানের উদ্দেশ্যে বলল: রিহান মেহেদী কে নিয়ে ছাদে যাও। কিছুক্ষণের মধ্যে জুইকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। মেহেদী বোধহয় খুব খুশি হয়েছে। কিন্তু তার কঠোর মুখভঙ্গির মাঝে তা প্রকাশ পেল না।
তবে মনে মনে বন্ধুকে অনেক থ্যাংক ইউ জানালো।
এদিকে তৃধা তৃতীয় তলার করিডরে পায়চারি করছে।
তখনই আহিয়ান ভাইয়ের ছাদ থেকে নিচে নামার সময় কল করছে। তারপর থেকে আর কল দেয়নি। না জানি ওই মেয়েটা কে...?এখনো কিছুই বলেনি...! না জানি এখন আহিয়ান ভাই কি করছে....? নিশ্চয়ই ওই বেহায়া মেয়েটা তার ভোলা ভোলা আহিয়ান ভাইকে বিরক্ত করছে... উফফফফ ভাবতে মেয়েটার মাথা রেগে আগুন হয়ে যাচ্ছে। তৃধা চিন্তিত ভঙ্গিতে সামনের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ পিছনে ঘুরল। দেখল তার একদম সামনে দাঁড়িয়ে কেউ। আকস্মিক ঘটনায় দুজনেই চিৎকার দিয়ে দূরে সরে গেল। তৃধা বুকে থুথু দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল আহিয়া দাঁড়িয়ে আছে।। মূলত আহিয়া নিজেও ভয় পেয়েছে। আহিয়া নিচ থেকে মাত্র এসেছে। এসেই দেখল তৃধা ভূতের মত পাইচারি করছে। তাই সে এগিয়ে গিয়ে ওকে ডাকতে চেয়ে ছিল। কিন্তু তৃধা আচমকায় পিছনে ঘোরায় দুজনেই ভয় পেয়ে যায়।
তৃধা এগিয়ে এসে বলল: আপু তুমি.... আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম'...
আহিয়া : তুই ভূতের মত পায়চারি কেন করছিস এখানে....?
তৃধা : এমনি... ভালো লাগছে না..
আহিয়া মিটিমিটি হেসে বলল: আমার ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিস....?
অন্য সময়ের মতো তৃধা আজ লজ্জা পেল না। টেনসনে টেনশনে সরাসরি বলল: হ্যাঁ.... তোমার ভাইকে নিয়ে তো আমার যত সব চিন্তা... তোমার ভাইকে এত কিউট হ্যান্ডসাম সুন্দর কে হতে বলেছে.। ? আমি বলেছি...? আমি তো বলিনি এত সুন্দর জামাই লাগবে....
উফস জামাই নিয়ে টেনশনে আমার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার অবস্থা,,,,,
আহিয়া এবার শব্দ করে হেসে উঠলো ওর হাসির শব্দে তৃধার ঘোর কাটলো বোধ হয়। এতক্ষণ সবকিছু উল্টাপাল্টা বলেছে মাথাই আসতে। দুহাতে ঠোঁট চেপে ধরল।
তারপর ও অস্পষ্ট কণ্ঠে বললো: আসলে আপু আমি যা বলতে চেয়েছি তা আমি বলিনি। আবার আমি যা বলেছি তা আমি বলতে চাইনি। তুমি ভেবে নাও তুমি কিছু শুনিনি। এটাও ভেবে নিও তোমার সাথে আমার দেখায় হয়নি এখনো। বলেই তৃধা রুমের দিকে দৌড় দিল।
আহিয়া পিছন থেকে কয়েকবার বলল: আরে খেয়ে যা সকলের খাওয়া শেষ....
তৃধা রুমের দরজা চাপিয়ে দিতে দিতে বলল: আমার জামাই বাড়ি ফিরলে খাব...
সে আবারো ভুল বলেছে। তার মুখটা আজকাল আগের মতই অতিরিক্ত চলছে বুঝতে পেরে আবারও ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে ঠোট চেপে ধরল। মাঝখানে আড়াই বছর তো মুখ দিয়ে কথাই বের হতো না। এই আহিয়ান ভাই তার মুখের তালা খুলে ছে। উফ এখন উল্টাপাল্টা কথা যখন তখন বের হয়ে যায় মুখ থেকে। ভেবে তৃধা বিরক্ত হলো। আকাশের চাঁদ নেই। অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ছাদের এক কর্নারে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জুই
পাশে দাঁড়িয়ে আছে মেহেদী। তার নজর জুইয়ের দিকে।
জুই এখানে আসার পর থেকেই মেহেদী অপলক তাকিয়ে আছে জুই সারাদিন মেহেদী কে মেসেজে যত কিছুই বলুক না কেন। এখন সামনে দাঁড়িয়ে আবারো আগের কথা মনে পড়ে গেছে। তাই সে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছে।
মেহেদী দীর্ঘশ্বাস ফেলল: তারপর জুইয়েল উদ্দেশ্যে বলল: রাগ কমেনি মহারানীর....?
মেয়েটা কিছুই বলল না। এমনকি ওর দিকে তাকালো ও না ।
মেহেদী আরো কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলো।
জুঁই এখনো আগের মতো অন্য দিকে তাকিয়ে আছে।
ছেলেটা এবার কোন কিছু না ভেবে জুঁইয়ের বাহু টেনে কাছে আনলো।মেহেদির আচমকা কাজে মেয়েটা বেশ ভোরকে গেছে। মেহেদী আলতো হাতে ওর চোখের কাছে আসা ছোট ছোট চুল গুলোকে কানের কাছে গুঁজে দিল। জুঁই নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর ভাব ভঙ্গি বোঝা যাচ্ছে না।
সেটা দেখে মেহেদী কোমল কণ্ঠে বললো: এই জান সরি তো... আর জীবনে এমন ভুল হবে না। তোমার থেকে কখনো কিছু লুকাবো না। প্রমিজ...
জুঁই এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। তার এই কয়েক
দিনের কষ্ট গুলো সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না।
মেহেদি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দেখলো ওর কান্না।
তারপর জোর করে জুঁইয়ের মাথা চেপে ওর বুকে ধরল।
মেয়েটা কিছুক্ষণ ছটফট করল কিন্তু মেহেদি ছরলো না। অতঃপর কেঁদে কেঁদে মেহেদির বুক চোখের পানি দিয়ে ভাসিয়ে দিল। জুই যতক্ষণ কান্না করলো। মেহেদী ওকে কিছুই বলল না। শুধু শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে রাখো। প্রায় ১০ মিনিট পর জুয়ের কান্নার দাপট কমে এসেছে। সেটা দেখে মেহেদী জুইয়ের মাথা বুক থেকে তুলে দুই হাতে গাল আলতো করে আঁকড়ে ধরলো। ছাদের মৃদু আলোতে দেখা যাচ্ছে মেয়েটার নাক মুখ কান্নার দাপটে লাল হয়ে আছে। বন্ধ চোখের ভেজা পাতা গুলো এখনো মৃদু মৃদু কাঁদছে। মেহেদি কিছুক্ষণ তাকিয়ে খুঁটে খুঁটে দেখলে চেহারা সকল কিছু । তারপর আচমকা কপালে একটা গভীর চুমু একে দিল। মুহূর্তে যেন কারেন্টের শক খাওয়ার মত জুইয়েল এর শরীর কেঁপে উঠলো। ওর কাঁপুনি মেহেদি বুঝতে পেরে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল: এই জুই... এই ... কথা বল.. তুমি না বলতে আমার বউ হতে চাও। আমাদের একটা ছোট সংসার সাজাতে যাও। আমাদের স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে জুই.... তুমি আমার বউ হবে..আমাদের একটা সুন্দর সংসার হবে... আমি তোমাকে আর একটুও কাঁদতে দিব না প্রমিস। সামনে বিয়ে একবার অন্তত একটু হাসো। তোমার মন খারাপ দেখে গেলে বাড়িতে গিয়ে বিয়ের আয়োজনে আমার মন বসবে না। ইচ্ছা করবে ছুটে আসি তোমার কাছে। কিন্তু তোমার ভার্সিটি তো বন্ধ। তাই তোমার সাথে দেখা করতেই বাড়িতেই ছুটে আসতে হবে। তুমি কি চাও বিয়ের আগে আমি এসব পাগলামি করি।
এবার জুই হালকা এদিক সেদিক মাথা নাড়ালো।
যার দ্বারা বোঝা যায় সে চায় না।।অনেকক্ষণ পর মেয়েটার রেসপন্স পেয়ে মেহেদি খুব খুশি হয়েছে।। বুকে আরেকটু চেপে ধরে আবেগী কন্ঠে বলল: I love you jaan...I love you more deeply then words can explain...
জুঁই মেহেদীর বুকে মুখ গুজেই বলল: I love you too..
বিয়ে ঠিক হওয়ার খুশিতে নিচে সবাই মিষ্টিমুখ করছে।
কিন্তু আহিয়ান চুপচাপ কর্নারের সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করায় ব্যস্ত। এহসান নেওয়াজ ও আবির তানভীর এর আড্ডা জমেছে বেশ। এগুলো দেখে নিজের বাবা ও শ্বশুরের উপর প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হচ্ছে আহিয়ানের । শ্বশুররা নিজের মেয়ের প্রেমে একটু একটু ভিলেন হয় সেটা সব জায়গায় দেখা যায়। কিন্তু তারা তার বউয়ের সবচেয়ে বড় ভিলেন তার নিজের বাপ। ইস ছেলেটার সোনায় বাধানো কপাল।
হঠাৎ কেউ একজন এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলল : ভাইয়া মিষ্টি মুখ করুন,,,,,,,!
মেয়েলি কন্ঠস্বর পেতে আহিয়ান মাথা তুলে তাকালো।
দেখলো সামনে মিশকা মিষ্টি ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে ।
বিরক্তিকর বিষয়... এই মেয়েটার ছাদ থেকে নামার পর দেখে মনে হচ্ছিল চোখ দিয়ে গিলে খাবে...
এখন আবার মিষ্টির উসিলায় কথা বলতে চলে এসেছে।
আহিয়ান ফোনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল: sorry miss..I am not a fan of sweet's...
মিশকা কিঞ্চিত হেসে বলল: আমার নাম মিসকা আগেই বলেছি।
আহিয়ান ওর দিকে না তাকিয়ে বলল : I know..... বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই.....
মিসকা: তাহলে দেখছেন কেন...?
আহিয়ান: অপরিচিত কাউকে নাম ধরে ডাকা আমার পছন্দ না। মিশকা এবার ভুরু বাঁচিয়ে বলল: সন্ধ্যা থেকে দুইবার পরিচিত হয়েছি তারপর বলছেন আমি অপরিচিত?
আহিয়ান আছে বিপদে... এই মেয়ে এসেছে থেকে পিছনে জোকের মত পড়ে আছে.. হঠাৎ সামনে দেখলে রিহান এসেছে। রিহানকে দেখে মনে হল তার প্রাণ ফিরে পেল। রিহানের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে বসা থেকে উঠে অন্য দিকে চলে গেল।