ড়ির কাঁটায় রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। তৃধা রুমের ভেতর পায়েচারি করছে। মেয়েটা কে ছিল সেটা না জানা পর্যন্ত আর আজকে ঘুম আসবে না মনে হয়।
তখনই গেট দিয়ে গাড়ি প্রবেশ করার শব্দ শোনা গেল।
তৃধা ছুটে গেল বেলকনিতে। দেখলো গেট দিয়ে প্রথমে আহিয়ান ভাইয়ের বাইক ডুকছে। তারপর পাপা ও বড় পাপার গাড়ি। তৃধা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে রুমে এসে আবার পায়চারি শুরু করলো।আহিয়ান ভাই রুমে আসার সময়টাও যেন তার সহ্য হচ্ছে না। হঠাৎই মেয়েটাকে অবাক করে দিয়ে এত রাতে দরজায় কেউ নক করল। তৃধা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখলো আহিয়ান ভাই দাঁড়িয়ে আছে। ওর যেন আর তর সইছে না। আহিয়ান কে দেখামাত্রই কিছু বলতে চাইলে।
কিন্তু আহিয়ান তাকে আরেক দফা অবাক করে দিয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
তৃধাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আহিয়ান প্রশ্ন করল : কিরে এত রাত পর্যন্ত জেগে আছিস কেন....?
😏তৃধা খানিকটা মুখ বাকি অন্যদিকে তাকিয়ে বলল : আপনি কি করে জানেন....? আমি এত রাত পর্যন্ত জেগে আছি...
আহিয়ান বেলকনি দরজাটা লাগিয়ে দিতে দিতে বলল : মধ্য রাতে ঘরে লাইট জ্বালিয়ে বেলকনিতে ভূতের মত দাঁড়িয়ে থাকলে ... আমি কেন যে কেউ বলতে পারবে ওই রুমের মালিক জেগে আছে....
তৃধা এবার অলস ভঙ্গিতে বিছানায় গিয়ে বসলো।
সে আহিয়ান ভাইকে কিছুতেই বুঝতে দিতে চায় না তার ভেতরের অস্থিরতা। তাই একটু ব্যঙ্গ করে বলল: দিন কাল কেমন যাচ্ছে.....? নিশ্চয়ই খুব ভালো.....?
আহিয়ান একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল: হঠাৎ আমার খবর নিচ্ছিস তুই....? উফস ভাবা যায় বিয়ে করেছে এক মাস হল এখন পর্যন্ত একদিনও তো আমার খবর নিলি না....!😒
আহিয়ানের কন্ঠে স্পষ্ট অভিমান। কিন্তু তৃধা আজকে সেদিকে পাত্তা দিল না। অকপটে বলে উঠলো: মেয়েটা কে ছিল....?
আহিয়ান ঘড়িটা খুলে তৃধার ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল: কোন মেয়েটা....?
তৃধা প্রচন্ড রেগে যাচ্ছি। কিন্তু এই মুহূর্তে রাখতে চাচ্ছে না। তাই ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে নিজেকেই নিজে বলল: কুল তৃধা কুল... সুন্দর জামাইয়ের পেছনে প্যারা তো একটু সইতেই হবে।
তারপর আহিয়ান এর উদ্দেশ্যে আবারো বলল: যে মেয়েটা ছাদে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে চেয়েছিল... সে কে ছিল.... ?
আচমকা আহিয়ান তৃধার করে মাথা রেখে শুয়ে বলল:
চুলে হাত বুলিয়ে দে, মাথা ব্যাথা করছে....
মেয়েটা এখনো স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। সেটা দেখে আহিয়ান ওর একটা হাত চুলে রেখে চোখ বন্ধ করব।।
তৃধা আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করল: মেয়েটা কে ছিল....?
আহিয়ান চোখ বন্ধ করেই বলল: মেহেদির বোন...
তৃধা: বুঝলাম কিন্তু এই মেয়ে আপনার সাথে কি করছিল.....?
আহিয়ান : তুই তো ফোনে সবই শুনেছিস তাহলে প্রশ্ন করছিস কে.... ?
তৃধা আর কিছু বলার পেল না। কারণ মেয়েটা কথা বলতে চাইলেও আহিয়ান ভাই কথা বলতে চাইনি সে নিজের কানেই শুনেছে। তাছাড়া মেয়েটার কাছে আহিয়ান ভাই তার পরিচয় স্বামীর পরিচয় দিয়েছে।
এতেই সে খুশি । তবুও কেন জানি উনি বাড়ি ফেরা না পর্যন্ত বুকের ভিতর অস্থিওতা কাজ করছিল। এই যে লোকটা তৃধার হাটুর উপর মাথা দিয়ে শুয়ে আছে তার মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ যেন এসে ধরা দিয়েছে
হঠাৎ আহিয়ান নড়েচড়ে ওঠে তৃধার কোমর ধরে পেটে মাথা গুঁজলো। আহিয়ান এর নিঃশ্বাস তৃধার পেট ছুটে সারা শরীরে যেন শিহরণ বয়ে যাচ্ছে।
আচমকা আহিয়ান বলল : তৃধা...?
তৃধা কাঁপা কন্ঠে জবাব দিল : হুম...
তুই কি আগে থেকে মেহেদী কে চিনতি....?
_হ্যাঁ..
_কবে থেকে...?
_কলেজ জীবন থেকেই.... তখন থেকেই জুইয়ের সাথে সম্পর্ক....
__ওহ আর এহসানকে...?
__ভার্সিটিতে উঠার পর পরিচয় হয়েছিল....
__তোদের পরিচয়টা কি মেহেদির মাধ্যমে হয়েছে...
__হুম... মেহেদী ভাইয়ের বন্ধু এহসান নেওয়াজ..
__l know but... তোদের পরিচয়টা কিভাবে হয়েছে আমি জানতে পারি....?
তৃধা খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল : এই সময় এসব প্রশ্ন কে.....?
__এমনি.. বল কিভাবে হয়েছে.....?
তৃধা বর্ণিতা না করে সরাসরি বললো : একদিন জুঁই ভার্সিটির কাছাকাছি একটা কফি শপে মেহেদী ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। সাথে আমিও ছিলাম। সেদিনই প্রথমবার দেখি এহসান কে। একটু-আধটু পরিচিত হই। তার কিছুদিন পর মন্ত্রীর বাড়ি থেকে খান বাড়িতে সবাইকে ইনভাইট করে। আমি পাপা বড় পাপা। আম্মু ফুফি ও আদিবা সেখানে যাই। সেখানে আবারও দেখা হয় এহসেনের সাথে। পরবর্তীতে জানতে পারি এহসান মন্ত্রীর নাতি। আমরা মূলত মন্ত্রীর বাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম। তারপর কিছুদিন পর হঠাৎই শুনি মন্ত্রীর ফ্যামিলি এহসান এর জন্য আমার বিয়ের প্রস্তাব রেখেছে। তারপর থেকে বাকিটা তো আপনিও জানেন।
হঠাৎ এই তৃধার পেটের ভেতর থেকে হালকা একটু শব্দ হলো খিদাতে। জামাইয়ের টেনশনে টেনসনে সন্ধ্যা থেকে এখন পর্যন্ত কিছু খাইনি। এতক্ষণ আহিয়ান ওর পেটে মুখ গুজে সকল কথা শুনেছে।
হঠাৎ এমন শব্দে মুখ তুলে তাকিয়ে বলল: তোর কি খিদে পেয়েছে.....?এখনো ডিনার করিস নি....?
তৃধা মুখ ভোঁতা করে বলল: না... ভেবেছি আপনি আসলে খাব...!
আহিয়ান এবার উঠে বসলো। তারপর একটু কঠোর কন্ঠে বলল: তুই আমার জন্য এত রাত পর্যন্ত না খেয়ে কেন বসে আছিস....? তুই জানতি না আমি ফকির বাড়ি থেকে খেয়ে আসবো....?
তৃধা আমতা আমতা করে বলল: না মানে জানতাম...
কিন্তু টেনসনে টেনশনে খেতে ইচ্ছে করেনি।
আহিয়ান সহ যোগ ছোট করে তাকিয়ে বলল: তোর কিসের টেনশন....?আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি অন্য কারো সাথে....?
তৃধা আর কিছু বলতে পেল না। চুপচাপ খানিকটা অভিমানী দৃষ্টিতে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। আহিয়ান ওকে জোর করে নিজের দিকে ফিরালো।
তারপর আদুরে কণ্ঠে বলবো: কি হয়েছে আমার পিচ্চি বউয়ের....?
তৃধা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল: শুনুন... আপনি আর পরিপাটি হয়ে বাইরে যাবেন না... সবসময় অগোছালো হয়ে বাইরে যাবেন.....
আহিয়ান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল: কেন.....?
তৃধা নিচের দিকে তাকিয়ে হাতের তালুতে নখ ঘুরাতে ঘুরাতে বলল: আশেপাশে ভূত-পেত্নীর অভাব নেই।
তাদের নজরে লাগবে।
আহিয়ান মৃদু হাসলো তবু ওর হাসির ঝংকার নিস্তব্ধ রুমের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আহিয়ান হাসতে হাসতে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।
তারপর বলল: আমি খেয়ে এসেছি, তুই যা খেয়ে নে..
কথাটা বোধহয় তৃধার পছন্দ হলো না তাই চুপচাপ অন্যদিকে ফিরে শুয়ে পড়লো। বলল: আমার খিদে নেই।।
আহিয়ান বুঝলো তার পাগলিটার অভিমান । তবুও কিছু না বলে দরজার দিকে গেল। ওর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে তৃধার রাগ যেন আরো মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
পিছনে ফিরে দেখতে চাইলো আহিয়ান ভাই চলে গেছে কিনা। তখনই নিজেকে শুনে অনুভব করলো।
ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলো সে আহিয়ান ভাইয়ের কোলে। লোকটা ওকে পাজা কোলে তুলে খোলা দরজা দিয়ে ড্রয়িং রুমে যাওয়া শুরু করেছে।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তৃধা ছটফটিয়ে হাত পা নাড়িয়ে বলছে :আমাকে নামিয়ে দিন কেউ দেখে ফেলবে...
আহিয়ান সামনের দিকে দেখে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল: দেখলে দেখুক আমি কি কাউকে ভয় পাই নাকি...? আমার বউ আমি কোলে তুলেছি তাতে কার কি....?
তৃধা বারবার এক কথাই বলছে...
__প্লিজ আমাকে নামিয়ে দিন আমি নিজে গিয়ে খেয়ে নিচ্ছি...
কিন্তু আহিয়ান শুনলো না ওকে সোফায় বসে দিয়ে বলল: তুই এখানে চুপচাপ বসে থাক আমি এক্ষুনি আসছি।
তৃধা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো.. আহিয়ান ভাই কিচেনের দিকে যাচ্ছে...
মিনিট কয়েক পর লোকটা ফিরে এলো। হাতে খাবারের প্লেট। কোন কথা না বলে চুপচাপ ওর পাশে বসলো।
অতঃপর ভাত মাখিয়ে ধরল মেয়েটার সামনে।
পুরোটা সময় তৃধা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল আহিয়ানের দিকে।
__হা কর....
আহিয়ানের কথায় মেয়েটার ঘোর কাটলো।
আহিয়ান আবারও বলল: তাড়াতাড়ি খেয়ে নে অনেক রাত হয়েছে । কিছুক্ষণ পর আবার সেহরির জন্য উঠতে হবে।
তৃধা খানিক টা খাবার খেয়ে বলল: আপনি খাবেন না...?
আহিরান তৃধার মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল: না আমি খেয়ে এসেছি...
তৃধা আর একটু খেয়ে বলল: আমি আর খাব না পেট ভরে গেছে...
আহিয়ান এবার খাড়িত কঠিন স্বরে বলল: তুই এত শুকনা কেন....? মনে হয় ফু দিলেই উড়ে যাবি...
আমার এত চিকন বউ পছন্দ না...
তৃধা মুখে খাবার নিয়ে অস্পষ্ট সরি বলল: আপনার কেমন বউ পছন্দ.....?
আহিয়ান সরাসরি বলল: একটু গুলুমুলু বউ পছন্দ.. যাতে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে ভালো লাগে। তৃধা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইল। সেটা দেখে আহিয়ান ওর মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল: তোর হাতে এখনো অনেক সময় আছে। পার্মানেন্টলি আমার সাথে থাকার আগে ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করে একটু মোটা হ।
তৃধা একটু অভিমানী কন্ঠে বলল: তারমানে এখন আমাকে ভালো লাগেনা...?
আহিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল: হায়রে মহিলা জাতি.. আমি বলতে চাই কি আর উনি বোঝে কি...
তৃধা খানিকটা রেগে গেছে বুঝতে পেরে। আহিয়ান ওকে আরো জালাতে থাকল।এক সময় খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দুজনেই উপরে গেল নিজেদের রুমের দিকে।
তৃধা নিজের রুমের দরজা লক করবে তার আগেই আহিয়ান দরজা ধাক্কা দিয়ে রুমের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে বলল: সেহেরির টাইম হতে আর মাত্র ২ ঘন্টা আছে তোর রুমে থাকি। তৃধা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আহিয়ান কে সরিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। তৃধা কে জ্বালাতে পেরে আহিয়ান এবার হাসতে হাসতে নিজের রুমের দিকে গেল।