আহিয়ান চুপচাপ বিছানার হেড বোর্ডে হানান দিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ ফোন স্ক্রল করার পর দেখল তৃধা এখনো গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে।
আহিয়ান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল :ঠান্ডার মধ্যে এমন মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছিস কেন ?
ঘুমাবি না....
মেয়েটা চোখ তুলে তাকালো। দেখলো আহিয়ান ভাই বিছানার এক কর্নারে বসে আছে। আর পুরো বিছানাটাই ফাঁকা। এবার গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসলো। তারপর কিছু একটা মনে হতে বিছানা থেকে নামতে চাইল।
আহিয়ান এবার বাহু টেনে ধরে জিজ্ঞাসা করলে: কি সমস্যা,,,,?আবার কোথায় যাচ্ছিস,,,,, ?
তৃধা ফ্লোর এর দিকে তাকিয়ে বলল আপনার রুমে যাচ্ছি....
__কেন.....?
__আমার রুমের মধ্যে তো একটাই কম্বল... এই শিতের মধ্যে আপনি কিভাবে ঘুমাবেন.....
আহিয়ান হাসলো তার বোকা বউয়ের কর্মকাণ্ড দেখি
তারপর তৃধার কম্বল পায়ের উপর দিয়ে বলল : একটাতেই দুজনের হয়ে যাবে...
তৃধার দৃষ্টি এলোমেল। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ভালোবাসার মানুষটির আবদার অন্যদিকে পরিবারিক টানাপোড়েন। বুকের হৃদ যন্ত্রটা অস্বাভাবিকভাবে লাফাচ্ছে। তৃধা আনমনে বলল :শুনুন....
আহিয়ান ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল: হুম...
__আমার না ভয় হচ্ছে খুব...
ছেলেটা এবার তৃধা থাকে টেনে নিজের কাছে আনলো।
তারপর এক বাহুতে জড়িয়ে মেয়েটাকে নিজের বুকের বা পাশে জড়িয়ে ধরলো। বিছানার হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে অনেকক্ষণ তৃধাকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকলো আহিয়ান। তার চোখ বন্ধ। বুকের ডিক ডিক শব্দ তৃধার কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে। মেয়েটা চুপচাপ চোখ বন্ধ করে তো শুনছে।
হঠাৎ আহিয়ান বলে উঠলো: তৃধা.....
তৃধা বুকে মুখ খোঁজেই জবাব দিল: হুম....
__যদি এখন কেউ আমাদের এভাবে দেখে নেয়....?
কথাট কর্নকোহরে পৌছানো মাত্রই তৃধা আরো শক্ত করে আহিয়ানের পেট জড়িয়ে ধরল।
আহিয়ান ওর চুলে দুটি চুমু দিয়ে বলল :ভয় পাচ্ছিস....?
__হুম....
__কেন.....?
__জানিনা.....
__সবার সামনে আমাকে স্বীকার করতে পারবি না....?
তৃধা কিছুক্ষণ স্বাস আটকে চুপ করে থাকলো। তারপর বলল: পারবো.... আপনি পারবেন না....?
আহিয়ান মৃদু হাসলো। তার ঠোঁটে মনে হয় এটা জয়ের হাসি।
তারপর জবাবে বলল: বউ তুই আমার... আমার অর্ধাঙ্গিনী... তুই ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ...নিজের সত্তাকে কি নিজে অস্বীকার করতে পারবো। তৃধা এবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। আহিয়ানের বুকে নিজের মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল বলল: তবুও আমার ভয় হয়...পরিবার কি মানবে আমাদের....?
আহিয়ান তৃধাকে আর একটু কাছে টেনে নিজের সাথে
মিশিয়ে নিল।
তারপর নিষ্প্রভ কন্ঠে বললো : যদি না মানে ছেড়ে যাবি আমায়....
তারপর পরিবারের কথা শুনে এহসানকে বিয়ে করবি।
তৃধা এ পর্যায়ে আহিয়ানের মুখ এক হাতে চেপে ধরল।
হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল: আর কখনো এই কথা মুখে আনবেন না....
আমার জীবনে আপনি আমার প্রথম পুরুষ আপনি আমার শেষ পুরুষ। জীবনে যত কঠিন সময় আসুক না কেন আমি কখনো আপনাকে ছেড়ে যাবো না।
আহিয়ান আবারও হাসলো। ওদের মতো ভালোবেসে বিয়ে করা আহিয়ানদের জয় বোদায় এতে। পরিবারের সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে ।তৃধারা আহিয়ানদের চায়।
ছোট জীবনে বড় কিছু পাওয়া বুঝি একেই বলে।
আহিয়ান নিজের খুশি টুকু সামনে কটাক্ষ করে বলল: কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগে সবাই জেনে গেলে তো আমার কাছে তো কিছুই পাবিনা।
তখন পরিবারের কথা মেনে নিতেই হবে। মানতে বাধ্য হবি। তৃধা আহিয়ানের টি-শার্টের বুকের কাছে চোখ মুছতে বলল: কিছু চেয়েছি কখনো? আমারে আপনার কাছে আপনাকে ছাড়া আর কিছু চাওয়ার নেই....
__কিন্তু আবেগ দিয়ে তোর দুনিয়া চলে না...
যেদিন সবাই জানতে পারবে সেদিন হয়তো তোকে ছাড়তে হবে নয়তো আমার স্থান হবে খান বাড়ির বাহিরে। তখন কি তুই বিলাসবহুল জীবন সেরে শূন্য হাতে মালিকের বেছে নিতে পারবি।
তৃধা এক সেকেন্ড সময় ব্যয় না করে বলল: পারবো...
আমার কাছে এই বিলাসবহুল জীবনের চেয়েও বেশি দামি হলেন আপনি।
তাছাড়া আপনি নিজেকে শূন্য কেন দাবি করছেন? আপনি ডাক্তারের পাশ করেছেন... এই বছর ইন্টারশীপ করার পর পুরোপুরি ডাক্তার হয়ে উঠবেন।
তখন আমরা যে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারব ইনশাল্লাহ কোন সমস্যা হবে না।
আপনি আমাকে যেভাবে রাখবেন যেখানে রাখবেন। আমি থাকতে রাজি।
শুধু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দুজনে একসাথে বাঁচতে চাই।
আহিয়ান ওর কপালে একটু গভীর চুমু দিয়ে বলল: তোর মত জীবন সঙ্গী পাওয়া আমার সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার... জীবনে যত ঝড় আসুক তোকে হারাতে দেবো না। বাবা ও মামাকে ঠিক বুঝে নিব।
তারপরও যদি তারা না বুঝে তোকে নিয়ে বাড়ি ছাড়বো। সেদিন তুমি কিন্তু ভাবনার সময় দিব না।
হতে পারে এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়তে হবে।
আমি আশা করব সকল প্রকার মানসিক প্রস্তুতি থাকবে তোর ভেতর।
তৃধা ফুপিয়ে কেঁদে বলল: আমার বাবাকে আমি রাজি করিয়ে নেব...
কিন্তু বড় বাবা মানবে কিনা জানিনা। আচ্ছা আমাদের সম্পর্কটা কি বড় পাপার মানতে সমস্যা হবে.....?
যেখানে উনি নিজেই কাজিন বিয়ে করেছেন।
আহিয়ান ফোস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল তোর ছোট মাথা এসব ঢুকবে না। তবুও তৃধা জোর করে বলল আহিয়ান কে বলার জন্য।
আহিয়ান আগের ন্যায় তৃধাকে বুকে জাপটে ধরে বলল: সমস্যা রক্তন নয় তৃধা। সমস্যা প্রতিশ্রুতির। যেটা পাপা ভাঙতে পারবে না। আর সেই প্রতিশ্রুতির ওজনে আমরা দুজন চাপা পড়ে আছি।
তৃধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল কি বুঝলো কে জানে । তৃধা আচমকা ওর বুকের কাছে টি শার্টটা খামচে ধরে বলল : শুনুন না....
__হুম.....
তৃধা আচমকা আবদারের স্বরে বলল : কোন কিছু না পাওয়ার চেয়ে পেয়ে হারানোর কষ্টটা অনেক বেশি। আমি আপনাকে হারাতে চাই না আমি চাই আমাদের মাঝে এমন কিছু থাকুক যাতে কেউ আমাদের আলাদা করতে না পারে। আমি এই সম্পূর্ণ আপনি টাকে আমার নিজের ভিতর বহন করতে চাই...... একটা বাচ্চা চাই দিবেন আমায়.....?
তৃধা লক্ষ্য করলো আহিয়ান এর হৃদপিণ্ড হঠাৎ করে অস্বাভাবিক পর্যায়ে বেড়েছে । তৃধা বুকে মাথা রেখেই সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে......
আহিয়ানের বুকে যেন বজ্রপাত হলো। এটা সত্যিই বাচ্চা চাইছে... সত্যি বাচ্চার কথা বলছে....
আহিয়ান আস্তে আস্তে ওর বুক থেকে তৃধার মাথাটা তুললো । দেখলো মেয়েটার চোখ দুটো লাল চোখের পাতাটা তার করে কাপছে ওই চোখে আছে ভয় --
আকুলতা--এমন আকলতা এমন ভয় যা আহিয়ান কে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে...
আহিয়ান নিচু গলায় বলল : তুই কি জানিস তুই কি বলছিস...?
তৃধা মাথা নাড়াল_"জানি".... খুব ভালো করেই জানি".. আপনি আমার..... আমি আপনার.... আমি আপনাকে পুরোপুরি চাই ..... যাতে আমাদের বিচ্ছেদের কথা কেউ মাথায়ও না আনে".....
আহিয়ান চোখ বন্ধ করে একটা নিশ্বাস নিল.... সে কি এতটাই ব্যর্থ"...?
আহিয়ানের চোখ যখন আবার তৃধার দিকে পড়ল তখন সে আবারও দেখতে পেল ভালোবাসাই নয় বরং অসহায়ত্ব ভয়...
আহিয়ান বলল : বাচ্চা মানে ভালোবাসার প্রমাণ নয়..... এটা একটা দায়িত্ব.... এটা একটা জীবন.... এটা একটা ভবিষ্যৎ.....
তৃধা এবার ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বলল : "জানি".... কিন্তু আমি যেকোনো মূল্যে আপনার সাথে সারা জীবন থাকতে চাই".....
তৃধার মুখের দিকে তাকিয়ে আহিয়ানের কন্ঠ এবং নরম হয়ে এলো বলল : তুই কি ভাবিস বাচ্চা থাকলে তারা আমাদের মেনে নেবে....? আমাদের পরিবার খুশি হবে...? না তৃধা,,,,,, তুই আরো কথা শুনবি,,,,,, অপমানিত হবি,,,,,,, পরিবারের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবি,,,,,,
তৃধা মাথা নাড়ালো_আমি এসব কিছুর ভয় পাই না..... আমি শুধু আপনাকে হারানোর ভয় পাই.....
আহিয়ান তৃধাকে নিজের কোলে বসিয়ে কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল : শোন তৃধা.... তুই আমার সবকিছু.... আমি তোর শরীর নিয়ে.... তোর জীবন নিয়ে... তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে... কখনোই খেলতে পারবো না।
__বাচ্চা হবে.....
__অবশ্যই হবে....
__কিন্তু লুকিয়ে নয়.....
__ভয়ের কারণে না....
__অপমানের মধ্যে না......
__ভালোবাসার দিনে.....
__ওটা হবে সেই দিনে যেই দিন আমি সবার সামনে তোকে বউ বলে ডাকতে পারবো....
__যেইদিন আপা মামা নিজের হাতে তোকে আমার হাতে তুলে দিবে.....
__সেদিন তোর পুরো অস্তিত্ব জুড়ে আমি থাকবো....
তৃধার চোখ বেয়ে টুপ টুপ পানি পড়ছে....
আহিয়ান সেই পানি বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মুছে দিয়ে আরো নরম গলায় বলল: তুই শুধু আমার পাশে থাক। আমি প্রমিস করছি.. তোর জন্য আমি লড়াই করব শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত....
তৃধা কথা কন্ঠে বলল_প্রমিস করুন আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আহিয়ান তৃধার হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গলা নামিয়ে বলল: যা কিছু হয়ে যাক-তুই হবি আমার শেষ ঠিকানা....
বাহিরে ঠান্ডা বাতাস জানালার কাঁচে ধাক্কা দিচ্ছে।
আর ভেতরে দুইটা হৃদস্পন্দন এক ছন্দ পাচ্ছে।
আহিয়ান হাত বাড়িয়ে রুমের লাইট অফ করে তৃধাকে
বুকে আগলে শুয়ে পড়ল। তৃধা বিড়াল ছানার মতো আহিয়ানের বুকে গুটিসুটি মেরে আছে। ছেলেটা একটা বড় নিশ্বাস নিল। তার এক জীবনের সকল টেনসনের স্বস্তি তো এই মেয়ের কাছে লুকিয়ে আছে।