রোজার এক মাসের ধৈর্য নিয়ন্ত্রণ, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির পর, দরজা এসে কড়া নাড়লো পবিত্র ঈদুল ফিতর। এই দিনের ভোরটা অন্য সব ভোরের থেকে আলাদা। সূর্য ওঠার আগেই বাতাসে ভেসে থাকা এক স্বচ্ছ কমল পবিত্র ঘ্রাণ। যেন পুরো পৃথিবীটাই নব জন্ম হয়েছে। ফজরের আযানের পর ঘর -আঙ্গিনা ধীরে ধীরে আলোকিত হচ্ছে......
মানুষের মুখে থেকে বিশেষ এক প্রশান্তি।
রোজা সম্পূর্ণ করা তৃপ্তি। আর আল্লাহর কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতার আশা। এই দিনে মানুষের ঢাল নামে মসজিদের ঈদগার পথে। সবাই একই কাতারে দাঁড়ায়.... ধনী গরিবের পার্থক্য মুছে যায়। একটি ভাষা-একটি তাকবীর, একটি সিজদা-একটি কাতার...
ঈদের নামাজ শেষে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে বলে.....
☆"ঈদ মোবারক"☆
এই মুহূর্তটা উষ্ণতা ক্ষমার মিলন।
এটা ঈদের আসল সৌন্দর্য।
ঈদুল ফিতর শুধু আনন্দের দিন নয় এটা কৃতজ্ঞতা। ক্ষমার দিন। আর একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের হৃদয় খুলে দেওয়ার দিন। তেমনই একটা খুশির দিনে খান বাড়ির ছোট থেকে বড় সদস্যরা আনন্দে মেতে উঠেছে। আদিবা ঘুম থেকে উঠে দাদু ও পাপাদের হাত তুলে হাতের মেহেদি দেখাচ্ছে। ওর হাতের রং নাকি সবার থেকে বেশি হয়েছে। অনেক কয়েকবার মা-চাচিদের সাথে হাতের মেহেদির রং মিলিয়ে এসেছে। ওর কচি মেহেদি রাঙ্গা হাতে সবাই একটা করে চুমু দিয়েছে।
এখন সকাল সাতটা বাজে। আদিবা খুব তাড়াহুড়ো দেখাচ্ছে সে গোসল করে নতুন জামা পড়বে।
রাই কিচেনের ব্যস্ত। তাই মেয়েকে বলছে সবুর করতে একটু পরেই গোসল করে দিবে। কিন্তু আদিবা মানতে নারাজ। আপুদের আগেই নতুন জামা পড়তে চায়।
অবশেষে আদি ওকে নিয়ে গোসলে ঢুকলো।
সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা পড়ে আবির ও তানভীর সেই আগের মতে ই আদির জন্য ড্রয়িং রুমে অপেক্ষা করছে। এই ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই জুম্মার নামাজ যাওয়ার সময় আমিরত তানভীরকে অপেক্ষায় বসিয়ে রাখত। এই আদির কারণে ওরা দুই ভাই চাচা বাবার সাথে নামাজ পড়তে বের হতে পারতো না।
সব সময় লেট হয়ে যেত। এখন বড় হয়েও স্বভাবটা পাল্টায়নি। আজকেও আব্বু চাচ্চু ওদের রেখে চলে গেছে। তখনই আবিরের চোখ গেল সিঁড়ির দিকে সে ভেবেছে আদি নামছে। কিন্তু সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো কালো পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা পড়ে আহিয়ার নামছে। ফর্সা ছেলেটাকে কালো রং দিয়ে বেশ মানা য়। ছেলেটার স্বভাব চরিত্র তার মত হলেও দেখতে একদম মায়ের মতই হয়েছে।
আসসালামু আলাইকুম.... পাপা।
আহিয়ানের সালামে আবিরের ধ্যান ভাঙল।
ইতিমধ্যেই আহিয়ান পাপাকে জড়িয়ে কোলাকুলি করে ঈদ মোবারক জানালো। আবির ও ছেলের কপালে একটা চুমু দিয়ে দোয়া করে দিল। তারপর আহিয়ান গেল মামার কাছে। এত বছর পর বোন ভাগ্নে-ভাগ্নি সবাইকে নিয়ে একসাথে ঈদ করতে পেরে তানভীর ভীষণ আবেগ প্রফুল্ল। আহিয়ান কে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করল। তখনই মেয়েকে কোলে নিয়ে হাজির হলো আদি। ভাইদের সাথে ম্যাচিং করে সেও সাদা পাজামা পাঞ্জাবি যাবে পড়েছে। আদিবা নতুন জামা জুতা চশমা পরে সেজেগুজে ঘুরছে । পাপার কল থেকেই দুহাত বাড়িয়ে দিল আহিয়ানের দিকে।
আহিয়ান বোনকে কোলে নিয়ে গালে দুটো চুমু দিল।
আরেকটা চুমু দেওয়ার আগে আদিবা আহিয়ানের দুই ঠোঁট ওর হাত দিয়ে বন্ধ করে দিল।
তারপর মিষ্টি কন্ঠে বলল :আমার মেকআপ চলে যাবে বোঝো না.... সেজে এসেছি সবার থেকে সালামি নিতি মেকআপ উঠে গেলে কেউ সালামি দিবে....?
সবাই ওর কথা শুনে হাসি দিল। আগে আমাকে কল থেকে নামিয়ে। পকেট থেকে নতুন টাকার নোট হাতে ধরিয়ে দিল। ছোট মেয়েটা খুশি হয়ে সেই টাকাগুলো বড় বাবার কাছে রাখতে গেল। এদিকে আহিয়ান এগিয়ে গেল কিছু না এদিকে। সেখানে পর্যক্রমে বাড়ির সকল মহিলাদের পেয়ে গেল। সবাইকে সালাম করে ঈদ মোবারক জানালো।
অতঃপর সকলের সাথে বেরিয়ে গেল ঈদের নামাজ আদায় করতে। আহিয়া ফজরের নামাজ আদায় করে ঘুমিয়ে গেছিল। কাল সকালে ঘুম থেকে চাকরি দেরি হয়ে গেছে। মূলত আছে রিহানের ফোন পেয়ে জেগেছে।
ঝটপট ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে আসলো। কিন্তু দাদু পাপা ভাইয়া মামা কাউকে দেখতে পেল না। পুরো ড্রয়িং রুমে আদিবা সেজেগুজে পটের রানী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
হালিমা খান মালিয়া খান ও আকলিমা খান গেছে গোসলে। রান্নাঘর থেকে গরুর মাংসের সুন্দর ঘ্রাণ আসছে। আহিয়া পা টিপে টিপে গেল সেদিকে। দেখলো ওর মাম্মা মাংস রান্না করছে। অন্যদিকে মামনি পিঠা ভাসতেছে আর কাকিয়া অন্য কাজ করছে।
আহিয়া কিচেনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল: মাম্মা আমার খিদে পেয়েছে খুব নাস্তা দাও। মেঘ মাংশে লবণ দেখতে দেখতে বলল: গোসল করেছিস।
__না.. নাস্তা খেয়ে গোসল করব...
__ঈদের দিন গোসল না করে কিছু খেতে নেই...
__কিন্তু আমার খিদে পেয়েছে তো, আগে খেতে যাও.... পরে গোসল করি..
__আগে গোসল করে আয় তারপর ফিরে দিচ্ছি
৮১ বাকি অংশটুকু........
আহিয়া কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল: ঠিক আছে.. কিন্তুমি যে গরুর মাংস রান্না করেছো সেটা তে কি লবন হয়েছে.....?
__হুম হয়েছে আমি তো এইমাত্র খেয়ে দেখলাম...
__কিন্তু তরকারি দেখে তো মনে হচ্ছে লবণ হয়নি.
বন্যা ডুবন্ত তেল থেকে পিঠা উঠিয়ে রাখতে রাখতে বলল: তরকারি দেখে আবার লবণ বোঝা যায় নাকি।
জানতাম না তো...
আহিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে বলল: হ্যাঁ মামনি যায়..
বিশ্বাস না হলে আমাকে একটা বাটিতে মাংস তুলে দাও আমি খেয়ে দেখেছিলাম হয়েছে কিনা।
রাই হাতের কাজ রেখে আহিয়ার কান টেনে বলল: সরাসরি বলতে পারো না মাংস দিতে... সোজা কথাটা এভাবে বাকিয়ে বলার কি আছে..
আহিয়া মৃদু আর্তনাদ করে বলল:আআআ। কাকিয়া ব্যাথা পাছছি।
তারপর ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল: মামা প্লিজ বাঁচাও.....?
ওর অবস্থা দেখে সকলেই হাসে দিল। ইতিমধ্যে কিছু নেই আদিবা এসেছে। হাতে একটা চিপসের প্যাকেট নিয়ে আহিয়ার অবস্থা দেখে খিলখি দিয়ে হেসে উঠলো।
মেঘ একটা বাটিতে অনেকগুলো গরুর মাংস তুলে দিয়ে বলল: তাড়াতাড়ি খেয়ে গোসলে যা....
সবাই নামাজ থেকে আসার আগে যেন রেডি দেখতে পাই।
আহিয়া মাংসের বাটিটা হাতে নিয়ে মাম্মা আমার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল: থ্যাঙ্ক ইউ মাম্মা।
মেঘ হাসলো মেরে কান্ড দেখি।
আহিয়া আদিবাকে নিয়ে সোফায় পা তুলে বসল।
আদিবা বারবার বাটি থেকে নিজের হাতে মাংস ধরতে চাচ্ছে।কিন্তু জামার তরকারির দাগ লেগেছে আর ভয়ে আহিয়া খাইয়ে দিচ্ছে।
তখনই বন্যা কিচেন থেকে বলল: তৃধার কি খবর মহারানী কি এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি।
আহিয়া খেতে খেতে বলল: জানিনা মামনি উপর থেকে আসার সময় দেখলাম ওর দরকার বন্ধ...
মনে হয় ঘুমাচ্ছে।।
বন্যা আবারো বলল: তুই রুমে যাওয়ার সময় ওকে একটু ডেকে যাস...
__ঠিক আছে.
আহিয়া তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে গোসলে যা...
মাম্মার কথা শুনে আহিয়া বোরিং হয়ে ব্লেসিংকে হাত ধরে ছুটে গেল তৃতীয় তলার দিকে। তৃধার দরজা এখনো বন্ধ। আহিয়া নক করতে চাইলে কিন্তু হালকা ছোঁয়াতে দরজা খুলে গেল।
তৃধা এই তৃধা....
আহিয়া ডাকে তৃধা ঘুমঘুমু কন্ঠে বলল: ডেকো না তো আপু... আমার খুব ঘুম পাচ্ছে...
এমনিতেই কাল সারারাত ঘুমাই নি। কথাটা বলার সাথে সাথে কি মনে পড়ল কে জানে। মেয়েটা লাফিয়ে উঠে বসে। হন্য হয়ে কাউকে খুঁজছে। দেখলো সে এতক্ষণ কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমাচ্ছিল। তারপর কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল।
এদিকে ওর সব উল্টোপাল্টা কর্মকাণ্ড আহিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে।
আহিয়া চোখ ছোট ছোট করে বলল: কিরে কাকে খুঁজছিস.....? তোর সাথে কি আর অন্য কেউ থাকার কথা....? নাকি স্বপ্নে আমার ভাইকে জরিয়ে ধরে ঘুমাচ্ছিলি......?
তৃধা সঙ্গে সঙ্গে মাথা দুই পাশে দাঁড়িয়ে বলল: না আপু কাউকে খুজছি না....
তখনই আহিয়ার চোখ গেল তৃধার পায়ে।
মুহূর্তেই মেয়েটা উত্তেজিত কন্ঠে বলল: ওয়াও তৃধা...
পায়ে এত সুন্দর করে মেহেদী কে লাগিয়ে দিল তোকে।
আহিয়ার চিৎকারে তৃধা থতমত খেয়ে পায়ের দিকে তাকালো।এখন সে নিজেও হতবাক। তার যতদূর মনে পড়ছে রাতে সে পায়ে মেহেদি লাগায়নি। তাহলে কে এত সুন্দর করে মেহেদি লাগিয়ে আবার শুকনোর পর উঠিয়ে দিয়েছে। আহিয়ান ভাই....?
ভাবতে যেন তৃধার সব চিন্তাভাবনা গুলিয়ে যাচ্ছে।
আহিয়া এবার তৃধাকে চেপে ধরল জবাব দিতে।
আত্মবিশ্বাসের কণ্ঠে বলে উঠলো: সত্যি আপু আমি নিজেও জানিনা কে লাগিয়েছে।
আহিয়া কয়েক সেকেন্ড ভাবুক ভঙ্গিতে চুপচাপ করে থাকলো। রাতে ভাইয়া এসেছিল দেখা করতে। সত্যি করে বলবি।
তৃধা আমতা আমতা করে বলল: না মানে... হ্যাঁ..
আহিয়া এবার ফিক করে হেসে দিয়ে বলল: আমি প্রথমেই ভেবেছিলাম ভাইয়াকে দিয়েছি। কারণ ভাইয়েরা আমাকে হাত দুর্দান্ত ভালো।
তৃধা খানিকটা লজ্জা পেল মনে হয়।
আহিয়ার কাছ থেকে পালানোর জন্য ওয়াশরুমের দিকে যেতে চাইলে । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় খাট থেকে পা নামাতেই একটা ঝনঝন শব্দ করে উঠলো।
তৃধা শব্দের উৎস খুঁজতে উঠে দাঁড়ালো।
আহিয়া সেটা দেখে প্রশ্ন ছুরলো: এভাবে কি খুঁজছিস....?
তৃধা খোঁজাখুঁজির ভাব নিয়ে বলল: আপু ঘরে আরো কেউ আছে দেখনা কেমন নুপুরে ঝনঝন শব্দ হচ্ছে....
আহিয়া প্রথমে অবাক হলো তারপর হাসতে হাসতে বিছানায় এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। সেটা দেখে তৃধা নিজেও অবাক। আহিয়ার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল: সকাল সকাল পাগল হয়েছো নাকি। বাড়িতে এমন রোমিও জুলিয়েট থাকলে পাগল হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তৃধা এখনও কিছু বুঝতে পারিনি। অতঃপর আহিয়ার নজর বরাবর তাকালো নিজের পায়ের দিকে। দেখলে তার মেহেদি রাঙানো পায়ে সুন্দর রুপালি নুপুর। যা হাঁটা ছন্দে ছন্দ তাল তুলছে।।