সকল ভাবনাচিন্তার অবসান ঘটিয়ে। তৃধা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল আহিয়ান ভাইয়ের রুমের দিকে।
দরজায় মৃদু শব্দে নক করতেই । পুরুষালী কণ্ঠে ভেতর থেকে বেশি আসলো: coming....
তৃধা দরজা হালকা খুলে মাথা ঢুকালো। মূলত দেখা দরকার আহিয়ান ভাই কি করছে। তারপর ভিতরে যেতে হবে। তৃধা সামনে তাকাতেই দেখল আহিয়ানের মুখ গম্ভীর বিছানার হেডবোটে হেলান দিয়ে । চোখে চশমা দিয়ে ল্যাপটপ চালাচ্ছে। এই প্রথম আহিয়ান ভাইকে সাদা চশমা দেখতে পেয়ে। তৃধার বুক ধুক ধুক করছে। কালো শার্ট টাওজারও সাদা চশমা পড়ে লোকটাকে আজ অন্যরকম লাগছে।
আহিয়ান ভাই ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল: দরজা লক করে দিয়ে ভিতরে আয়। তৃধা খানিকটা অবাক হলো বোধ হয়। লোকটা না তাকিয়ে তার উপস্থিতি বুঝে গেছে ।সে দরজাটা লক করে নুপুর পায়ে রিমিঝিমি শব্দে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। আহিয়ান ভাই এখনও গম্ভীর মুখে কিবোর্ডে টাইপ করতে ব্যস্ত।
তৃধা খোলা চুল থেকে এক গোছা চুল আঙুলে প্যাঁচাতে পেচাতে বলল: শুনুন না....
আহিয়ান চোখ ল্যাপটপের স্কিনে রেখে বলল: হুম,,,
__আপনি কি কোন কারনে আমার উপর রাগ করে আছেন....?
আহিয়ান এবার চোখ ঘুরে তাকালো। দেখল মেরুন কালারের গাউনপরে একটা মিষ্টি পরী তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোটে তার ডার্ক মেরুন লিপস্টিক।
চোখে কাজল টানা কপালে সাদা পাথরের টিপ।
খোলা সুদের অপ্সরা দাড়িয়ে এই মুহূর্তে আহিয়ানের সামনে।
আহিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নজর ঘুরে নিল।
তারপর বলল: এখানে কি চাই....?
তৃধার এতক্ষণের উজ্জ্বল মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে উঠল। সে আহিয়ানের কথায় কিছু জবাব দিল না।
কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে রইল সামনে থাকা পাষান পুরুষটির দিকে। কয়েক মিনিট কেটে গেছে নিস্তব্ধ নীরবতায়। আহিয়ান তৃধা কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে মাথা তুলে তাকাল। দেখলে মেয়েটার কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
আহিয়ান এবার ল্যাপটপ রেখে তৃধা কাছে ডাকলো।
কিন্তু মেয়েটা এখনো অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। দুচোখ পানিতে টলটল করছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে চোখের পলক ফেলে এখুনি চোখ দিয়ে নোনা পানি গড়ে পড়বে।
আহিয়ান হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে কোলে বসানো।
তারপর আদুরী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল: কি হয়েছে..?
আমার কথায় কষ্ট পেয়েছো....?
আহিয়ান এর আদরের কথায়। তৃধা প্রশ্রয় পেয়ে মুহূর্তের গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে কেঁদে উঠলো। তৃধা আহিয়ান এর গলা জড়িয়ে ধরে বা হাতে চুড়িগুলো টুংটাং শব্দ করছে। আর সে এখনো ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে।
আহিয়ান হয়তো কিছুটা বোকা হয়ে গেছে। ও বুঝতেও পারেনি সামান্য কথা মেয়েটা এমন কেঁদে ভাসাবে।
অতঃপর নিজেকে স্থির করে তৃধা হওয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল: কি হয়েছে বউ.....?আমার কথা কি তুমি কষ্ট পেয়েছো.....? সত্যি আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম তার সাথে চিন্তিত.....!তাই এভাবে বলে ফেলেছি। আর কখনো এমন হবে না... প্লিজ এবার তাকাও আমার দিকে।
তৃধা এখনো আহিয়ানের গলার ভাজে মুখ ডুবে কান্নায় ব্যস্ত। সেটা দেখে ছেলেটা আবার বলল: সরি পরী.... সরি...বললাম তো তাও আমার দিকে।
আহিয়ান লক্ষ্য করল ঠান্ডা পরিবেশে মেয়েটা ঘেমে উঠছে। তাই সে মেয়েটার খোলা চুলগুলো এক হাতে গুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। তৃধা এখনো আগের মতো ওর গলায় জড়িয়ে ধরে কান্না করছে।
আহিয়ান কোনরকমে ব্লেড এর উপর থেকে ইয়ার ব্যন্ট নিয়ে। তৃধার চুল বেঁধে দিল। আর এসি অন করে দিল।
তারপর মেয়েটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেয়েটার কান্না এখন কিছুটা কমে এসেছে। অভিমানে চুপচাপ ওর মুখে মুখ লুকিয়ে আছে।
আহিয়ান বড় একটা নিশ্বাস নিল। মাঝে মাঝে এই মেয়েটাকে তার ম্যাচিউর মনে হয়। আবার মাঝে মাঝে একদম বাচ্চা। এই যে এখন অভিমান করে বাচ্চাদের মতো বুকে মুখ লুকিয়ে আছে। কিছুদিন আগেও তো বুকের ভেতর কষ্ট লুকিয়ে সকলের সামনে হেসে বেড়াতো।
তখন এই বাচ্চা আবেগি মনটাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল এই মেয়ে..?
আড়াই বছর অভিমান করে কথা না বলে আহিয়ান কে সে কি অসহায়নি যন্ত্রণাটা সে দিয়েছি। তখন একা একা কিভাবে নিজেকে সামলাতে..? এজন্যই বলেল...
মেয়েরা তার প্রিয় মানুষের কাছে যতটাই কমল। তার অনুপস্থিতিতে ঠিক ততটাই ভয়ঙ্কর।
আহিয়ান আবারও ডাকলো: বউ...?
__ওর বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে স্পষ্ট কণ্ঠে জবাব দিল: হুম ...
__কথা বলবা না আমার সাথে...?
__না....
আহিয়ান মৃদু হেসে আবার বলল: কি সুন্দর করে সেজে এসেছিলে... মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে পরী নেমে এসেছে.... কিন্তু এখন কান্নাকাটি করে চেহারা কে পেত্নীর মত বানিয়ে ফেলছে... কেন কান্না করছো....?
তৃধা এবার রেগে গিয়ে সোজা হয়ে বসে বলল: কাঁদলে আমায় পেত্নীর মত দেখায়...?
আহিয়ান অন্যদিকে তাকিয়ে ভাবলেহিন কন্ঠে বলল: একটু একটু....
তৃধা আহিয়ানের কোল থেকে নেমে যাওয়ার জন্য মুচরো মুচুরি করতে করতে বলল: ছারুন আমাকে.. আমি রুমে যাবো...
কিন্তু আহিয়ান ছাড়লো না। তৃধার কোমরে তার হাত আরো শক্ত হলো। মেয়েটা এখনো চেষ্টা করছে ছুটে যাওয়ার। আচমকা আহিয়ান ওর কানের লতিতে একটা কামড় দিয়ে। হাসিক কণ্ঠে বললো: একদম নড়বে না।
তোমাকে সব ভাবে ডার্ক চকলেট এর মত দেখায়।দেখলেই ইচ্ছে করে খেয়ে ফেলি।
আহিয়ানের লাগাম ছাড়া কোথায় তৃধা যেন গেল।
লাজুক লতার মত মাথাটা কি নেতিয়ে নিল। আহিয়ান চুপচাপ তাকিয়ে দেখলো তার লজ্জাবতীকে। থুতনি ধরে মুখটা উঁচু করতে মেয়েটা চোখ বন্ধ করে নিল।
আহিয়ানের চোখের দিকে এই মুহূর্তে তাকানো সাধ্য বোধহয় তার নেই।
আহিয়ান কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখল। কপালের টি, হালকা জোড়া ভুরু, বড় বড় আখির পল্লব, ঠোঁটের নিচে বাদামি তিল, হঠাৎ তার নজর আটকালো। মেরুন কালার লিপস্টিকে সাজানো তির তির করে কাঁপে ঠোঁট। আহিয়ান যেন কোন ঘরে আছে। নিশাক্ত তো দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আচমকায় তৃধার ডার্ক মেরুন ঠোঁটটা নিজের ঠোঁট দ্বারা আঁকড়ে ধরল।
তৃধা হয়তো ভাবতেও পারেনি। এমন সময় আহিয়েন এমন কিছু একটা করবে। তাই না চাইতেও একটু ছটফটি উঠলো। ছেলেটা কোমর চেপে ধরে ওকে আর একটু নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। দীর্ঘ ১০ মিনিট পর মেয়েটার কোমল ঠোঁট চোড়াই একটা কামড় দিয়ে ছেড়ে দিল। দুজনেই হাত আছে । হৃদপিন্ডের গতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। তৃধা নত মস্তিষ্কে ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। তৃধার ঠোঁটের চারপাশে লিপস্টিক চড়িয়ে আছে। সেটা দেখে আহিয়ান মুচকি হাসলো। মেয়েটার যেন মরি মরি অবস্থা। লাজুক মুখটাকে লুকাতে আহিয়ানের বুকটা আবার বেছে নিল।।
এই জান... বাড়িতে একটু ম্যানেজ করে বিকালে বের হও.. প্লিজ একটু দেখা করি...
মেহেদির আদরের আবদার জুই কিছুতেই ফেলাতে পারছে না। কিন্তু এক সপ্তাহ পর বিয়ে। এখন কিছুতেই বাড়ি থেকে বের হতে দিবে না। তাছাড়া বাড়ির লোক তো কেউ জানে না মেহেদী জুঁইয়ের পূর্ব পরিচিত।
এখন বাড়িতে কি বলে সামলাবে তুই নিজেও জানেনা।
তখনই দরজার কেউ নক করলো। ফোনটা বালিশের নিচে রেখে দরজা খুলল। দেখল ওর আম্মু জান্নাত দাঁড়িয়ে।
জান্নাত তুমি প্রবেশ করতে করতে বলল: বিকেলে নাকি বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাবি...?
জুই অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলবো: না মানে ..আম্মু
জুঁই এর পুরো কথা না শুনে জান্নাত বলল: রিহান ফোন দিয়েছিল..?
বলেছে সামনে বিয়ে তাই তোকে একা বের না হতে।
রেডি হয়ে থাকবি রিহান বিকালে এসে নিয়ে যাবে বন্ধুদের সাথে দেখা করাতে। এক সপ্তা বাকি। ছেলেপক্ষ কোনোভাবে জেনে গেলে এটা ভালোভাবে নেবে না। চুপচাপ মাথা নিচু করে সম্মতি জানাচ্ছিল। তোর মাথা দিয়ে যেন কিছুই ঢুকছে না। সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
আম্মু চলে যেতে দুই বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করল। দেখলো মেহেদী এখন অনলাইনে। সেটা ফোন না কেটে তাদের মা-মায়ের কথা শুনছিল।
জুই হ্যালো বলতে ফোনের ওপার থেকে মেহেদী বলল:
এখন কি বলবে দেখা করতে আসতে পারবো না....?
আপনি ভাইয়াকে এসব কেন বলেছেন....? ইস ভাইয়া কিনা কি জানি ভাবছে।
__সমন্দি আমার কিছুই ভাবছেনা.. ছোট বোনের জামাইকে একটু একটু সাহায্য করলে যাত যায় না।
ওর কথা শুনে তুই চুপ করে রইল কিছুই বলল না।
মেহেদী আবারো বলল: জান আজকে একটু সাজবে আমার জন্য...
জুঁই এবার একটু কপাল কুঁচকে বলল: আমাকে কি এভাবে সুন্দর লাগে না।
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে বলল: তোমাকে সব ভাবে সুন্দর লাগে জান। কিন্তু ঐদিন বাড়িতে একটু বেশি সুন্দর লাগছিল।
লাজুক তারপর ফোন রেখে দিতে চাইলো ।
মেহেদি তড়িঘড়ি করে বলল: এই দুই ফুল শোনো..
__কি....?
__সাথে তোমার বান্ধবীটাকেও নিয়ে এসো...
___কোন বান্ধবী....?
__তৃধার কথা বলছি....?
__জুই কপাল কুঁচকে বলল: কেন....?
মেহেদী এবার মৃদু হেসে বলল: এহসান তৃধা সাথে একটু একান্তই দেখা করতে চায়। জুঁই কিছু বুঝতে পারছে না তবুও সে পরিস্থিতির সামলানোর চেষ্টা করল।
জুঁই মেহেদী কে বলল: তৃধা ওর সিম নাম্বার চেঞ্জ করেছে ও নতুন সিমের নাম্বার আমার কাছে নেই..
তাই খবরটা ওকে জানাতে পারলাম না।
মেহেদী একটা হতাশা ভঙ্গি নিয়ে বলল: তাহলে আর কি করার, তুমি বিকেলে রেডি হয়ে থাকো রিহান ভাইয়া নিয়ে যাবে।
___আচ্ছা....