ওদের গাড়িটা ঢাকা-মাওয়া রোডে এগোচ্ছে। রাস্তার দুই পাশে লাইটের ঝাপটা। দূর আকাশ জুড়ে গোলাপি ও নীল আলোছায়া মিশে থাকা বিকেল।
কিন্তু গাড়িটার ভেতরের পরিবেশ খুব জমজমাট উত্তেজনা ময়।
তৃধা এখনো গাল ফুলিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে।
পিছনের সিটে বসে আহিয়া আর চোখে মাঝে মাঝে দেখছে। তার হাত দুটো কাঁপছে। প্রতিবারই ফোনটা তুলে আঙ্গুলের ফাস দিয়ে দেখছে। কোন নোটিফিকেশন নেই। রিহানের নাম্বার এখনো বন্ধ।
আহিয়ান স্টিয়ারিং ধরে রেখেই লক্ষ্য করছে সকল ভাবভঙ্গি।
অতঃপর আহিয়ার উদ্দেশ্যে বলল: কি নিয়ে এত ভাবছিস.....?
___তেমন কিছু না ভাইয়া.....
___রিহানের সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছে.. ও আসছে.....
কথাটা শোনা মাত্রই আহিয়া বড় একটা শ্বাস ফেললো।
তারপর ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল: ভাইয়া তুমি তো সবটাই শুনলে সৈকত সামনের মাসে দেশে আসছে...
___তো...?
___না মানে আমার খুব ভয় হচ্ছে পরিবারের সবাই রেহানকে মানবে তো...?
___সংসার কি তুই করবি নাকি তোর পরিবার করবে..?
আহিয়া একটা আতাম আমতা করে বলল: না মানে
আহিয়ান স্টিয়ারিং সামনের দিকে ঘুরিয়ে বলল: মানে কি.....?
___আমি যেটা বলছি সেটার উত্তর দে...
তৃধা হলো ভাই বোনের মাঝে নির্বাক দর্শক। আদিবা গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আহিয়া এবার তৃধার দিকে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল: আমি সংসার করবো...
___আহিয়ান এবার সরাসরি কণ্ঠে বললো: তাহলে তুই মানলেই হয়েছে...
কিন্তু ভাইয়া আমি তো পরিবারের অনুমতি ব্যতীত রিহানের সাথে সংসার শুরু করতে চাই না...
আহিয়ান ওটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল: সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না..... বাকিটা রিহানকে ভাবতে দে।
মাওয়াঘাট পৌঁছতে পৌঁছাতে চারিদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। পদ্মের ধারে পৌঁছাতেই বাতাস যেন এক ধাক্কা সকলের সকল টেনশন দূর করে দিল।নদীর জলে সন্ধ্যার নরম কমলা রঙের ছায়া পড়েছে। দূরে পদ্মা সেতুর বিশাল লাইনটা আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছে।
আহিয়া আদিবাকে ঘুম থেকে জাগালো। কাঁচা ঘুম ভাঙতেই মেয়েটা মুখটা প্রথমে কাদক আদক করলো তারপর গাড়ি থেকেই নামতেই একটা চিৎকার দিল।।
—দেখো ভাইয়া নদী... এত বড় নদী.....! আহিয়ান আদিবার হাতটা ধরে আহিয়া ও তৃধাকে নিয়ে নিরাপদে এগিয়ে গেল সামনে। পদ্মর সামনে নানা রকম খাবার স্টল বসেছে। সব থেকে বেশি চোখে পড়ছে ভাপা পিঠা। ইলিশ ভাজা। চটপটি ফুচকা ও বিভিন্ন ধরনের গ্রিলের দোকান।
পদ্মের বাতাসে ভেসে আসা ধোঁয়া গন্ধ যেন মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়। তৃধা পদ্মর ধরে হাত মেলে চোখ বন্ধ করে জল নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
আহিয়া কে বলল: এত সুন্দর মনে হয় কতদিন পরে শ্বাস নিলাম। আহিয়া এখনো ফুরফুরে হতে পারছি না।
তার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।
আহিয়ান আদিবাসী ছোট্ট হাতটা মুঠোবন্দি করে ধরে তাকিয়ে আছে তৃধা র দিকে। কালো ড্রেসে মেয়েটাকে দুর্দান্ত সুন্দর লাগছে। আজ হিজাব বাদেনী খোলা চুলগুলো নদীর বাতাসে অবাধ্যর নাই উড়ছে।
এখন কি আহিয়ারের উচিত না মেয়েটাকে ঠাটিয়ে একটা চড় মারা। ওকে এত সুন্দর হতে কে বলেছে।
তৃধা চট করে বলল: আহিয়া আপু ইচ্ছে হচ্ছে সারা জীবন এখানেই থেকে যাই...
আহিয়া এতক্ষণের মন খারাপ দূরে সরিয়ে তৃধার উদ্দেশ্যে বলল: হুম... তুই এখানে থেকে যা আর আমার ভাই তোর সাথে সন্ন্যাসী হয়ে যাক.....
কথাটা শোনা মাত্রই তৃধা পিছনে ঘুরে এক নজর আহিয়ানের দিকে তাকালো । আহিয়ান ভাই এদিকেই তাকিয়ে আছে। উনি আজকে কালো শার্ট পড়েছেন।
শুধু আজকে বললেই ভুল হবে লোকটা সব সময় কালো কালার পরে। দুজনে ড্রেস মেশিন হওয়ায় তৃধা মুচকি হাসলো।
তখনই আদিবা দৌড়ে এসে হেঁচকি উঠালো।
ওই দেখো নদীর উপরে আলো জ্বলছে.. ভাইয়া আমরা ঐদিকে যাব....!
পদ্মা সেতুর লাইট গুলো তখন জ্বলছে আকাশের বুকে তারার মালার মত। চারজন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শুধু ওই দৃশ্যই দেখল। বাতাসে হালকা ঠান্ডা ও নদীর শব্দ-সব মিলিয়ে অন্যরকম একটা শান্তি...
ঠিক তখনই আহিয়ান তৃধার হাতটা ধরে বলল : চল আমরা ওই দিক থেকে ঘুরে আসি। আহিয়ানের এক হাতে আদিবা অন্য হাতে তৃধা। আহিয়া এখনো আনমনে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নদীর টলটলে পানি দিকে।
তৃধা আহিয়ানের কথা বলার চেষ্টা করল... তখনই আহিয়ান বলল চোখ মুখ দিয়ে আরেকটা কথা বের করবি না...
আহিয়া আনমুনে বেশ কিছুক্ষণ ধরে কিছু একটা ভাব ছিল। তখনই পেলো খুব কাছে কিস কেউ একজন এসে ঘেসে দাঁড়িয়েছে। আহিয়া এক পলক ঘুরে দেখল। ভাইয়া ত্রিধা আদিবা কেউ আশেপাশে কোথাও নেই।
তারপর অন্য পাশে তাকিয়ে দেখল রিহান চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েআছে। চোখে মুখে হালকা ক্লান্তি-কিন্তু সেই পরিচিত গভীর তাকানো যেটা দেখলে আহিয়ার হৃদপিণ্ড যেন থেমে যায় মুহূর্তে। আহিয়া নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তটা যেন সময় থামিয়ে দিয়েছে। রিহান এখনো কিছু বলছে না ।
কিন্তু আহিয়া নিজেকে স্থির রাখতে পারল না।
দীর্ঘ দুশ্চিন্তা অস্থিরতা সব একসাথে ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়ল চোখে মুখে। সে রিহানের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো তারপর কাঁপা কন্ঠে বলল:
___কোথায় ছিলেন আপনি....? ফোনটা বন্ধ ছিল কেন....?
___আমার মত একজন ফোন বন্ধ থাকলেই বা কি....?
___রিহান আপনি এভাবে বলছেন কেন..?
___হ্যাঁ ভুল বলেছি....
__আমার কিন্তু মনে হয় না আমি কারো জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কেউ...?
আহিয়া অসহায় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর আচমকা রিহানকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। তারপর ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলল: I am sorry রিহান। Sorry for everything...
আমি আপনাকে মানসিকভাবে কোন প্রেসার দিতে চাইনি। বিশ্বাস করুণ আপনি তখন বিজনেস নিয়ে ভীষণ টেনশনে ছিলেন ।তাই আর আমি টেনশন বাড়াতে চাইনি। কিন্তু আহিয়ার দীর্ঘ কথা শুনে ও রিহন এখনো চুপচাপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ধরেনি পর্যন্ত। সেটা দেখে আহিয়া সোজা হয়ে দাঁড়ানো। দুহাতে রিহানের গাল আকড়ে ধরে বলল: এই রিহান এই সরি বলছি তো। রিহান এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না.. শান্ত দৃষ্টিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে...
আহিয়া আবারো বলবো: আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না তো... আপনি এমন করলে কিন্তু আমি ফ্যামিলির কথা সত্যি সত্যি সৈকতকে বিয়ে করে ফেলব। রিহানের মেজাজ এবার প্রচন্ড গরম হলো।
আচমকা শক্ত হাতে আহিয়ার গাল দুটো চেপে ধরল।
তারপর রাগান্বিত কন্ঠে বলল : তোকে কি আমি বেশি ভালোবেসে ফেলেছি আহিয়া....তোর প্রতি আমি বেশি অন্ধ হয়ে গেছিলাম মনে হয়। তাইতো আমার থেকে কথা লুকোতে শিখেছিস। আর আমি বুঝতেই পারেনি।
আমি বুঝতেই পারিনি তুই আমাকে ফেলে অন্য কাউকে বিয়ে করার পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলি। আমাকে ধোঁকা দেওয়ার পরিকল্পনা করিস না। আমি তোকে সত্যিই মেরে দিব।
রিহানের শক্ত হাতে থাকায় আহিয়া চোখমুখ দিয়ে যেন রক্ত উঠে এসেছে। রিহান মেয়েটার গাল ছেড়ে দিয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে ঢেকে বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করছে। এদিকে আহিয়া অনবরত কেসেই যাচ্ছে। চোখ দিয়ে অঝরে ধারায় পানি পড়ছে।
সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তার সামনে থাক দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি সেই শান্তসৃষ্ট রিহান।
রিহানকে এত রাগে আহিয়া কখনো দেখেনি। কমবেশি যতবার ওদের মধ্যে রাগারাগি হয় কথা কাটাকাটি হয়। রেহানেই সবসময় সরি বলেছে। তাছাড়া আহিয়া কষ্ট পাবে এমন কোন কিছুই রেহান করেনি।
কিন্তু আজকে রিহানের রাগান্বিত রূপটা দেখে মেয়েটা রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছে। রিহান এতক্ষন কি করেছে হুঁশ ফিরে পেতে। তাহিয়া কে জড়িয়ে ধরে চোখে মুখে অনবরত চুমু দিতে লাগলো।
তারপর ভেজা কন্ঠে বলল: সরি আহিয়া পাখি তোমার মুখে অন্য ছেলের নাম শুনে নিজেকে শান্ত রাখতে পারিনি... তুমি শুধু আমার। আমার মানেই আমার।
আহিয়া আরো কয়েকটা কাশি দিয়ে। রিহানের বুকে মুখ গুচে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। রিহান চারপাশে এক নজর। দূর দূরান্তের বহু লোক দাঁড়িয়ে পদ্মার হাওয়া উপভোগ করছে। এর মাঝে কেউ কেউ এদিকেও তাকাচ্ছে। কিন্তু হালকা আলো আঁধারে ওদেরকে কারো নজরে পড়ছে কিনা তা জানা নেই। এই পাখি... কান্না থামাও প্লিজ... আমি ভুল করেছি তো নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারেনি। বিশ্বাস কর রাগ কন্ট্রোল করতে পারব না বলেই ফোন বন্ধ করে রেখেছিলাম।
কিন্তু তোমার ভাই আমাকে জোর করে এখানে আনিয়েছে। কান্নার দাপট কিছুটা কমে আসতে আহিয়া রিয়ান কে ছেড়ে নদীর দিকে তাকিয়ে দাড়ালো।
শরীর এখনো মৃদু মৃদু কাঁপছে। রিহান নিজের চুল নিজেই খামচে ধরলো। আহিয়া কে আঘাত করার মত কোন ইচ্ছেই তার ছিল না। কিন্তু মেয়েটা কেন বলল সৈকত কে সে বিয়ে করে নেবে। তার এত বছরের ভালবাসার কি কোন মূল্য নেই.....?
এই মেয়েটা তো তার জীবন। ওকে ছাড়া কিসে বাসতে পারবে। তখনই নিজের ভিতর থেকে উত্তর এলো না কখনোই না। আহিয়াকে ছাড়া রিহান বাচবে না। প্রয়োজনে ওই মেয়েকে মেরে। সে নিজেও মরবে। তবু অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারবে না। সহ্য করা কখনো সম্ভব না।