ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে(সিজন-৩)

90

লেখক: ফারজানা মনি

তৃধা আআআআআ বলে চিৎকার দিল। ওর চিৎকারে মুহূর্তে যেন হাসিমুখী পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠলো।

এক মুহূর্তের জন্য সবাই থমকে গেছে। রান্নাঘরের নারীরা কিছু বোঝার আগেই তানভীর ও আবি র ছুটে এসেছে। ইতিমধ্যেই তৃধা পায়ে হাত দিয়ে বসে পড়েছে।

তানভীর ছুটে এসে মেয়ের পায়ের যন্ত্রণা কমানোর জন্য অনবরত ফু দিতে লাগলো। আবির ফ্রিজ থেকে বরফ নামিয়ে আনবো। বন্যা যেন এখনো নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের তৃধার চারিপাশে ছোটখাটো একটা ভিড় তৈরি হলো। পুরো বাড়ির সবাই ওর আশেপাশে জমে আছে। আচমকা কি ঘটেছে বুঝে ওঠার সাথে সাথেই বন্যা মেয়ের কাছে বসে হু হু করে কেঁদে উঠলো। তৃধার পায়ে সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় ফোসকা পড়েছে। সেটা দেখে বন্যার কান্না আরো যেন বাড়ছে। তানভীর এক নজর তাকালো সেদিকে। ইচ্ছে করছে বড় একটা ধমক দিয়ে ওর কান্না বন্ধ করে দিই। মেয়ের চেয়ে বেশি মেয়ের মা কান্না করছে। এমনিতেই তো সারাদিন মেয়েকে কত বকতে থাকে। তবে তানভীর কিছুই বলল না। মেঘ বন্যাকে সরিয়ে আবিরের হাত থেকে বরফ নিয়ে আস্তে আস্তে ওর পায়ে ঘষে দিল। তৃধা এখনো কান্না করছে অনেক।

নিচে এত শোরগোল শুনি আহিয়ান তৃতীয় তলার করিডর থেকে নিচে তাকালো। দেখলে ড্রয়িং রুমে সবাই একত্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মামনি ও তৃধা কান্না করছে। আহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো। আহিয়াকে সরিয়ে আহিয়ান সামনে গেল। দেখলে তৃধার পা অনেকটা পুড়ে গেছে। ছেলেটা কিছুই বুঝতে পারছে না। তাই সকলের মুখের দিকে এক নজর তাকালো।

তখনই আহিয়া কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে বলল: ভাইয়া তৃধার পায়ের দু কাপ গরম কফি পড়েছে।

আবির ভিড় থেকে সরে গিয়ে ডক্টরকে কল দিলে।

আহিয়ান তানভীর এর উদ্দেশ্যে বলল: মামা ওকে রুমে নিয়ে যাই.. পাপা ডক্টর কে কল দিয়েছি। হয়তো উনি এখনই চলে আসবেন।

তানভীর মাথা নেড়ে সম্মতি দিতে। আহিয়ান ওকে পাঁচকোলা করে তুলে হাটা দিল তৃতীয় তলার দিকে।

ওর পিছু পিছু মোটামুটি বাড়ির সকলেই গেল।।

আহিয়ান সিড়ি বেয়ে উটতে উটতে তৃধাকে বুকের সাথে চেপে ধরল। তৃধা এতক্ষণ কান্না বন্ধ করে লক্ষ্য করল আহিয়ান ভাইয়ের হার্ট অনেক দ্রুত বিট করেছে। এবার তৃধা নিজেও আহিয়ানের বুকে লেপটে চোখ বন্ধ করে রইল। কিন্তু শান্তিতে স্থির হলো না। কয়েক মিনিট পরে ওকে বিছানায় শুয়ে দেওয়া হলো। মনে না চাওয়া সত্ত্বেও এতক্ষণ ধরে কলাট খামচি ধরা হাতটা আলতো করে আহিয়ান ভাইকে ছেড়ে দিল। আহিয়ান তৃধাকে ছুঁয়ে দিয়ে পিঠা সোজা হয়ে দাঁড়াতে মিনিটখানেক পর সকলেই এসে হাজির হলো।

বন্যা মেয়েকে উতলা কন্ঠে জিজ্ঞেস করল: অনেক জ্বালা করছে মা তোর...? ডক্টর চলে আসবে এক্ষুনি। ওষুধ লাগলেই জ্বালাপোড়া কমে যাবে।

আহিয়ান পাপার থেকে ডক্টর এর ফোন নাম্বার নিয়ে আবারো কল দিল ।তার মিনিট পাঁচেকের মাথায় ডক্টর খান বাড়িতে চলে আসলো। তৃধার পা ড্রেসিং করে মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে গেল।

প্রেসক্রিপশন হাতে আহিয়ান এক মুহূর্ত দেরি করেনি।

বাইকের চাবি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে মেডিসিন আনতে

তৃধা একবার ঘড়ির দিকে তাকালে। বেলা অনেক হয়ে গেছে। তাই সকলের উদ্দেশ্যে বলবে যার যার কাজে যেতে সে এখন ভালো আছে। শুধু আহিয়া থাকলেও ওর কাছে আর সবাই একা একা চলে গেলে ড্রয়িং রুমের দিকে। বাড়ির বউরা আবারও কাজে হাত লাগালো।

আলী আহমেদ খান চিন্তিত সরি বলল: এহসানের বাড়ি থেকে আজকেই লোক আসবে আর আজকেই মেয়েটার এমন হতে হল। ওনার কথার পরিপ্রেক্ষিতে আবির বলল: দুর্ঘটনার কি কোন সময় আছে আব্বু...? দুর্ঘটনা যে কোন সময় ঘটতে পারে.. যেহেতু অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেছে সেহেতু আজকে তুই থাকিস আর নিচে নামার দরকার নেই। এহসানের ফুপি না হয় উপরে গিয়ে দিকে আসবেন।

তানভীর সম্মতি জানিয়ে বলল: ঠিক আছে ভাইয়া.. আমার মেয়েকে আর কষ্ট করে নিচে নামার প্রয়োজন নেই......যার ইচ্ছে উপরে গিয়ে দেখা করে আসবো।

রাকিব ও রিহান মুখোমুখি সোফায়ই বসে আছে। আর একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে রিয়া। সকলের মুখ থমথমে তুমি হয়ে আছে। রিয়া একবার স্বামির দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার ছেলের দিকে। ওর এই সময় কাকে সাপোর্ট করা উচিত নিজেই জানে না। ছেলে বলছে খান বাড়ির মেয়ে আহিয়াকে বিয়ে করতে চায়।

আর ছেলের আব্বু বলছে এটা সম্ভব নয় যদি অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করতে চাও সেটা বল। কিন্তু রিহান সেটা মানতে নারাজ... ওআহিয়াকে বিয়ে করবে...

রাকিব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার বলল : তুই কি আমার কথা বুঝতে পারছিস না রিহান...?

আরো এক বছর আগে আহিয়ার বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক হয়ে আছে।

___ আব্বু তুমি বোধহয় আমার কথা বুঝতে পারছ না... আমি আহিয়াকে আরো তিন বছর আগ থেকেই পছন্দ করি.....এই যে আমাকে এত সাকসেস দেখছো সবই ওর জন্য। যাতে তোমার বন্ধু বলতে না পারে তার মেয়েকে বিয়ে করার যোগ্যতা আমার নেই।

___কিন্তু রিহান তুই অনেক দেরি করে ফেলেছিস.. এই বিষয়টা আমাকে আরো অনেক আগেই জানানো প্রয়োজন ছিল..... আবির সৈকত আহিয়ার বিয়েটা নিয়ে অনেক এগিয়েছে...আমার জানামতে সামনের মাসে সৈকত দেশে আসবে। তখনই ওদের বিয়ের আয়োজন শুরু হবে। তুই ওকে ভুলে যা... আবিরের কাছে তোর জন্য আহিয়াকে আমি কিছুতেই চাইতে পারবো না...

রিহান সেন্টার টেবিল এর উপর থাকা ফুলদানিটা জোরে টেবিলে বাড়ি মেরে বারিমেরে উঠে দাঁড়ালো।

মুহূর্তে ঝমঝম শব্দের কাচের টেবিলটা ভেঙ্গে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। ওর এমন কর্মকান্ডের রিয়া কেঁপে উঠেছে। রিহানের দাদা দাদির নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে ন। কিন্তু রাকিব এখনো স্থির দৃষ্টিতে ছেলেকে দেখছেন।

রিহান আব্বুর দিকে তাকিয়ে কাঁপা কন্ঠে বলল : অসম্ভব....

ওর বিয়ে হলে আমার সাথেই হবে। প্রয়োজন হলে খান বাড়ি থেকে তুলে এনে বিয়ে করব। তাও আমার ওকেই লাগবে।

....................ঠাসসস......................

শব্দে পুরো ড্রয়িং রুম স্তব্ধ হলো। আব্বুর হাতের শক্ত চরে রিহান গালে হাত দিল। উপস্থিত সকলেই নির্বাক। সঙ্গে সঙ্গে রাকিব ছেলেকে আর একটা চড় মারলো।

তারপর কঠোর কন্ঠে বলল: তুই আমার ছেলে ভাবতেই লজ্জা হচ্ছে। আমি ছোটবেলা থেকে তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি। বাপের সামনে গুন্ডাগিরি দেখাস। অন্য বাড়ির মেয়েকে তুলে আনবি তাই না। কোথায় তুলে আনবি....? আজকের পর থেকে তোর এই বাড়িতে কোন জায়গা নেই। তবে মনের ভেতর এই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে যদি আবিরের সাথে আমার বন্ধুত্ব নষ্ট হয়। তাহলে আমি তোকে ত্যাজ্য করব। রিয়া স্বামীর সমন থেকে ছেলেকে সরাতে চাইল। কিন্তু রিহান এখনো চুপচাপ তাকিয়ে আছে আব্বুর দিকে। মিনিট কায়েক স্থির থাকার পর রিহান হনহন করে চলে গেল নিজের রুমের দিকে। রাকিব সোফায় বসে দুহাতে মুখ দেখে ঘনঘন শ্বাস ফেলছে। রিহানের দাদি এগিয়ে এসে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু তার আগে রাকিব সকলের উদ্দেশ্যে কর্কট বলল: এই ব্যাপারে আমি আর কোন কথা বলতে চাই না সবাই সবার রুমে যাও।

রিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছে। ছেলে যে একটা মেয়েকে পাগলের মতো ভালোবাসে সেটা তার অজানা নয়। তবে মেয়েটা যে আহিয়া সেটা রিয়া জানতো না। রিহানের আব্বুর মুখ থেকে সে অনেকবার শুনেছে আহিয়ার বিয়ে নিয়ে কথা। আবির ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন মেয়ের বিয়ে নিয়ে। সেটাও রিয়া জানে। মাঝেমধ্যে রিহানের আব্বুর মুখ থেকে এসব গল্প শোনা হয়। সেদিক দিয়ে ভাবতে গেলেই। হঠাৎ কিভাবে বলবে রিহানের আব্বু কিভাবে বা বলবে আবির তোর মেয়ের বিয়ে টা ভেঙ্গে দে। আমার ছেলের সাথে বিয়ে দে।

তবে আহিয়াকে তার অনেক ভালো লাগে। মেয়েটা অনেক শান্তশিষ্ট। যদি অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক না হতো তাহলে তারা এক মুহূর্ত ভাবতো না। লক্ষী মেয়েটাকে নিজের ছেলের বউ করে ঘরে নিয়ে আসতে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন এমন যে ছেলে বা ছেলের আব্বু কাউকে সে কিছু বলতে পারছে না।

,,,,,, দাদুভাই কই যাও,,,,,

রিহানের দাদি আর্তনাতে তে সকলে সিড়ির দিকে তাকালো। দেখল লাগেজ যাতে ছেলেটা বেরিয়ে যাচ্ছে।

রিয়া ছুটে গেল ছেলের দিকে।

___কই যাস আব্বা তুই...? যাস না বাবা... আমারে রাইখা যাস না। আমি তোর আব্বুকে বোঝাবো। আবির ভাইয়ের কাছে তার নিচে চেয়ে আনব। তুই আমাদের রেখে যাস না। রিহান চুপচাপ মায়ের কথা শুনল কিছু বলল না।

কিন্তু রাকিব থমথমে কণ্ঠে বললো: ওকে যেতে দাও রিহানের আম্মু। বাইরে বের হয়ে দেখুক দুনিয়ার কতটা কঠিন। কয়েক পয়সা জমাতে জানে বলে কি একা থাকতে পারবে...?বাবা মায়ের আশ্রয় ছিল বলে বড় বড় কথা বলছে...ওর যেদিকে ইচ্ছা যাক তুমি ওকে যেতে দাও।

রিয়ার কান্না শব্দ ইতিমধ্যে বেড়ে গেছে..

ছেলেকে জাপটে ধরে বলল : যাস না বাবা... সব ঠিক হয়ে যাবে...

মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি মুছে বলল: ভালো থাকো আম্মু.... নিজের এবং ওনার যত্ন নিও।

আমি আসছি...বলে রিহন হনহন করে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

রিয়া অনেক চেষ্টা করে ছেলেকে আটকাতে না পেরে সদর দরজার সামনে ফ্লোরে বসে পড়ল। রিহানের দাদি অনবরত ছেলেকে গালমন্দ করছে রিহানকে চড় মারার জন্য। এদিকে বয়স্ক মা ধমকাচ্ছে অন্যদিকে বউ ছেলের জন্য কাঁদছে। রাকিব কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ নিজের রুমের দিকে চলে গেল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 90 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন