এহসান তৃধার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে কয়েকবার মৃদু কন্ঠে ডাকলো :কিউটি গার্ল.....
কিন্তু বিছানার ঘুমন্ত পরীটার থেকে কোন সাড়াশব্দ এলো না। তখনই পেছন থেকে ভেসে আসলো ভরাট পুরুষালী কণ্ঠস্বর.....
ঘুমন্ত মেয়েটাকে কেন ডাকছেন?
খেয়ে পেছনে তাকালো। দেখল দরজার সামনে আহিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল : আসিয়ান আপনি.....?
___আমার বাড়িতে আমি থাকবো এটা কি অস্বাভাবিক মিস্টার এহসান নেওয়াজ....?
___না আমি তেমন কিছু বলতে চাইনি...
___তাহলে....?
___আসার পর থেকে আপনাকে দেখিনি তো তাই বললাম। আহিয়ান ভেতরে প্রবেশ করে বলল : একটু ব্যস্ত ছিলাম তাই নিচে যাই নি। লাঞ্চ করেছেন..?
___না...
___আম্মু ফোন দিয়ে বলল আপনাকে নিয়ে লাঞ্চ করতে নিচে যেতে...
___আন্টি ফোন দিয়ে নিচে যেতে বলেছে..?
___না বললে আমি জানলাম কি করে আপনি এই রুম...?
এহসান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল : কিন্তু আমি তো তৃধার সাথে দেখা করতে এসেছিলাম।
আহিয়ান এক নজর কম্বল মুরিদ নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকা তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল : ওতো ঘুমাচ্ছে.... তাছাড়া আপনি নিশ্চয়ই জানেন ও অসুস্থ... ওকে ডাকাটা ঠিক হবে না....
___ও কি খাবেনা.....?
___ঘুম থেকে উঠলে মামুনি রুমে খাইয়ে দিয়ে যাবে... আপনি ওর চিন্তা না করে নিচে খেতে যান...
ঈশান কেমন জানি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে আইনের দিকে তাকাল একটা ভেবে নিজে নিজে বিড়বিড় করে বলল : এহসান সিআইডি তে কাজ করিস বলে যাকে তাকে সন্দেহ করিস না,,,,
এদিকে তৃধা রানী এই ভরদুপুর বেলা নাকে মুখে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে সারা শরীর ভিজে উঠেছে। কিন্তু এহসান নেওয়াযের রুম থেকে বের হওয়ার নামই নেই।
এসআর নেওয়া জোয়ান ভাই একজন আরেকজনের কথার পাল্টাপাল্টি উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে ত্রিধার অবস্থা নাজেহাল মাঝে মাঝে বাহুতে একটু চুলকাচ্ছে। কিন্তু চুলকাতেও পারছে না। লড়তে দেখলেই তো এহসান আবার ডাকবে।
তখনই ওদের কথায় তৃধা আবারো মনোযোগ দিল। তখনই এহসান আহিয়ান কে বলল : ওর ফোন নাম্বারটা কি একটু দেয়া যাবে...?
আহিয়ান ভুজুগুল কুঁচকে বলল : সরি মিস্টার...? একটা মেয়ের অনুমতি ছাড়া আমি আপনাকে তার ফোন নাম্বার দিতে পারছি না...?
___কিন্তু আমি তোর ফিওন্সে...?
আহিয়ানের কপালে ভাজ পরলো জিজ্ঞেস করল: জেগে থাকি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ও আপনাকে বিয়ে করবে বা এই বাড়ির কেউ ...?
এহসান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল : সরাসরি প্রতিশ্রুতি না দিলেও ঠিক ঐরকমই...
__আবির আংকেল বলেছে ওর পড়ালেখা শেষ হলে আমাদের বিয়ে নিয়ে ভাববে...
আসিয়ান বাঁকা এসে বলল : ভাববে বলেছে সরাসরি তো আর বলেনি বিয়ে দিবে আর আপনি যদি ওর ফিএন্সে হয়েই থাকেন তাহলে আপনার কাছে ওর ফোন নাম্বার নেই কেন?
এহসান কোনা চোখে এক দৃষ্টিতে বিছানায় শুয়ে থাকা তৃধার দিকে তাকিয়ে বলল: ছিল, কিন্তু ও নাম্বার পরিবর্তন করেছে।
আহিয়ান এবার তাচ্ছিল্য করে হাসলো,,
মিস্টার এহসান নেওয়াজ আপনি বড় বড় আসামিদের মনের কথা নিমিষেই বুঝে ফেলেন বা বের করেন।
আর একটা মেয়ের কথা মনের কথা বুঝতে পারছেন না।
তৃধা নিশ্চয়ই আপনাকে চায় না। তাইতো নতুন নম্বর নেওয়ার পরেও আপনার সাথে যোগাযোগ করেনি।
তবুও আপনি ওর পিছনে পড়ে আছেন কেন..?
এহসান এবার খানিতে রেগে গেল। দাঁতের দাঁত চেপে বলল:তৃধা আমাকে চায় কিনা সেটা আমি ওর সাথে বুঝে নেব। এ বিষয়ে অন্য কারো সাথে আলোচনা করতে আমি ইন্টারেস্ট না।
বলেই এহসান নেওয়াজ শোরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
এহসান বেরিয়ে যেতেই আহিয়ান এগিয়ে এসে মেয়েটার মুখ থেকে কম্বলটা তুলে দিল।
দেখল মেয়েটা ঘেমে ঝপঝপে হয়েছে।
তৃধা উঠে হাফ ছেড়ে বলল: উফ গরমে সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম।
বলে এসি অন করে দিল।
—গোসল করেছিস...?
আহিয়ান এর প্রশ্নের মেয়েটা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে: না সম্মতি জানালো...
—গোসল করে নেই... এহসান আজকের এদিকে আসবে না।
—একা একা কি করে করব আমার বাড়িতো ব্যান্ডেজ করা...
—ঠিক আছে আমি আহিয়া কে পাঠিয়ে দিচ্ছি...
_এই না না আপনি একদম নিচে যাবেন না...
আহিয়ান শান্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল: আমি নিচে যাচ্ছি না। আহিয়া কে কল দিয়ে আসতে বলছি।
তৃধা হাফ ছেড়ে বলল: শুনুন...
—হুম....
—এহসান যদি আজকেই সকল কথা সবাইকে বলে দেয়।
আহিয়ার আরেকটু এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বললো: ও কাউকে কিছু বলবে না... তবে আজকের পর থেকে আমার বিষয়ে সকল খোঁজ খবর রাখবে...
হতে পারে আমার উপর নজরদারি করবে...
তৃধা মুখ কাচুমুচি করে বলল: আমার কেন জানি ভয় লাগছে..
আহিয়ান ত্রিধার চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দিতে দিতে বলল: কিছু হবে না.. আমি আছি তো সব সময় তোর হাতটা ধরে রাখবো। তৃধা মিষ্টি করে হাসলো।
তখনই দরজায় নক করলো কেউ। ওরা দুজন তাকিয়ে দেখলো আহিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
আহিয়া ওখানে দাঁড়িয়েই বলল: ভাইয়া তোমাকে মাম্মা নিচে খেতে ডাকছে...
আহিয়া বোনের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল: বল আমি এখন খাব না।
আর শোন...
—বল ভাইয়া...
—তুই খেয়েছিস...?
— হ্যাঁ...
—ঠিক আছে, তৃধা গোসল করতে হেল্প কর। গোসল শেষ হলে ওর জন্য খাবার নিয়ে আসবি।
—কিন্তু ভাইয়া তুমি খাবে না...?
—আমি এখন নিচে যেতে পারবো না...
—আমি খাবার রুমে দিয়ে আসবো...?
—ঠিক আছে দিয়ে যাস...
বলে আহিয়ান রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
এদিকে সোফার কোণে বসে তানভীর মিটিমিটি হাসছে।
যদিও মন্ত্রীর মেয়ে তেমন কিছু বলছে না।
তবুও যতটুকু কথা বলছে আবির ভাইয়ের সাথে বলছে।
আবির ভাইয়ের শুধু হ্যাঁ হু বলে মাথা নারছে।
একটু আগে ডাইনিং টেবিলে যখন সবাই একসাথে লাঞ্চ করছিল।
তখন মেঘ সবাইকে খাবার পরিবেশন করতে করতে আবির ভাইয়ের দিকে তপ্ত নজরে তাকিয়েছে কয়েকবার।
আবির ভাই এসব বুঝেও কিছু বুঝতে পারছিনা।
বাড়িতে অতিথি এসেছে। তাদের আপ্যায়ন ও তাদের সঙ্গ দেওয়া সব বাড়ির লোকদের দায়িত্বে পরে।
যেহেতু এহসনের আব্বু আম্মু ফুপি ফুফা সবাই মধ্যবয়স্ক লোক। তাই বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা উনাদের কাছে তেমন আসছে না। তারা তানভীর ও আদীর শ্বশুর বাড়ির লোকজনদের সাথে গল্প করছে।
এবং এহসান এর ফ্যামিলিকে সময় দিচ্ছে। তানভীর আরিফ , আদি ও আবির।
কিন্তু সবার মধ্যে মন্ত্রীর মেয়ের আবীর ভাইকে নিয়ে একটু বেশি আগ্রহী।
বেলা চারটা নাগাদ ওনারা বাড়ির সকলের কাছ থেকে বিদায় নিবেল। এহসানের ফুফি ত্রিদার সাথে আর একবার দেখা করতে চাইলে এহসানের আম্মু বলল: এহসান বলেছি মেয়েটা নাকি ঘুমাচ্ছে। যেহেতু অসুস্থ তাই এখন আর ওকে ডাকার কোন প্রয়োজন নেই।
এহসান যাওয়ার আগে কয়েকবার তৃষ্ণার্ত চোখে তাকালো তৃতীয় তলার দিকে।
কিন্তু কোথাও মেয়েটা নেই।
মিসকা হাঁসফাঁস করছে এক নজর তার ক্রাশ কে দেখার জন্য।
কিন্তু সেও আজকে আর দেখা পেল না। ইলমা মিশকার অবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসছে।
এদিকে মেহেদী বারবার আর চোখে তাকাচ্ছে জুইয়েল দিকে।
জুই খানিকটা মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাড়িতে আসার পর সকলের অগোচরে মেহেদী বেশিরভাগ সময় তার সাথে কাটিয়েছে।
এখন মেহেদী চলে গেছে হয়তো বিয়ের আগে আর দেখা হবে না।
মন্ত্রীর বাড়ির সকলকে বিদায় দেওয়ার শেষে বন্যা ও রায় এসে বসল নিজের বাবা-মাদের কাছে।
রিংকি, আদির পাশে বসে আদরের কণ্ঠে বললো: ভাইয়া আপুকে নিয়ে কবে যাবে আমাদের বাসায়...?
আদি মুচকি হেসে বলল: খুব শীঘ্রই যাব..
—এখন তো ঈদের ছুটি চলছে এর ফাঁকে আপুকে নিয়ে কিছুদিনের জন্য আমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারেন....?
—যাওয়ার চেষ্টা করব.... তুমি বোনের সাথে কিছুদিন এ বাড়িতে থেকে যেও...
—না ভাইয়া আজকে না... আরেকদিন থেকে যাব..
আহিয়া ত্রিধাকে গিয়ে এহসান চলে যাওয়ার খবর দিতে। তৃধা বায়না ধরেছে নিচে আসবে..
অতঃপর তৃধা জড়াজড়িতে আহিয়া ওকে ধরে নিচে নিয়ে আসলো।
তৃধাকে এখন খানিকটা পরিপাটি দেখাচ্ছে।
গোসল সেরে নতুন জামা পরে নিচে এসেছে।
তানভীর মেয়ে কে লক্ষ্য করে এগিয়ে এনে শোভাতে বসালো।
তৃধা অনেকক্ষণ নিজের নানুকে বায়না করল আজকে থেকে যাওয়ার জন্য।
কিন্তু তারা কেউ থাকলো না। অবশেষে সন্ধ্যার আগে আগে তানভীর আদির শ্বশুর বাড়ির লোকেরা রওনা দিলে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
এসব নিয়ে অবশ্য বন্যা ও রাইর প্রচুর মন খারাপ।
তবুও রান্নাঘরের সকল কাজ সবাই হাতে হাতে করে আজকে তাড়াতাড়ি যে যার রুমে চলে গেছে।
সারাদিন এমনিতেই অনেক খাটু নি গেছে।
মেঘ নিজের রুমে গিয়ে গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়েছে।
তার দশ মিনিট পর আবির ঘরে ঢুকলো। দেখল মেঘ ঘুমিয়েছে।
তাই আবিরের কথা বাড়ালো না। চুপচাপ ল্যাপটপ নিয়ে বিছানার হেডবোটে হেলান দিয়ে বসে কাজে মনোযোগ দিল।
মেঘকে জাগালে সারাদিনের মান অভিমানের খাতা নিয়ে বসতে হবে।