ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে(সিজন-৩)

100

লেখক: ফারজানা মনি

দেখতে দেখতে আজকে বুধবার। জুই এর বাড়িতে সকলে প্রচুর ব্যস্ত। বাড়ির প্রতিটা লোকের দম ফালানোর মত অবস্থাতে নেই। একমাত্র মেয়ের বিয়েতে আসিফ ও জান্নাত কোন ক্রটি রাখতে চাই না। তাই সকল কিছু নিখুত ভাবে করার চেষ্টা করছে। জুই ষ জান্নাত মিম বিয়ের শপিং এর দায়িত্ব নিয়েছে। রিহান কে নিয়ে এরা তিনজন সকলে শপিং কমপ্লিট করে ফেলেছে। মাহমুদা খানের বাড়ি মরিচ জাতীয় বিভিন্ন বাহারি রংয়ের বাতিতে সাজানো হয়েছে ডেকোরেশনের লোক ছাদে তৈরি করেছে চোখ বাঁধানো স্টেজ। উষা পুরো বাড়িতে দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত। আজকে বিকেলে আইরিন ও চলে এসেছে। রাকিব মাঝে মধ্যে এসে বোন ও দুলাভাইকে নানা রকম হেল্প করছে। ৎফুপির অনবরত ফোন করার কারণে রিহানের আসা যাও এই বাড়িতে লেগেই আছে। কিন্তু এই বাড়ির কেউ জানে না রিহান রাগ করে বাড়ির বাইরে আছে। গতকালকে রিহান বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখল ওর আম্মু বসে আছে। সকালের সামনে রিহান আব্বুকে সালাম দিয়ে ফুপি রুমের দিকে চলে গেল। কিন্তু পরবর্তীতে রাকিব অবশ্যই বলেছিল তোমার আম্মু বাড়ি যেতে বলেছে।

তোমার চিন্তা সে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। তাই ইচ্ছে হলে বাড়ি যেতে পারো। আব্বুর ঘোরানো প্যাচানো কথা রিহান কিছুই বলেনি।

রিহান ভালো করে জানে এই মানুষটার ভিতরে দগ্ধ হলে উপরে তা প্রকাশ করে না। নিজে সরাসরি বলছে না বাড়ি যেতে। কিন্তু আম্মুর নাম দিয়ে ঠিকই বলছে বাড়ি যেতে। এক মুহূর্তে আব্বুর উপর থেকে সকল অভিমান উঠে গেল। তবুও সেটা প্রকাশ করল না। আহিয়া কি নিজের করে পেতে হলে এতোটুকু তাকে করতেই হবে।

তাছাড়া আহিয়ান এর কাছ থেকে সকল আপডেট পেয়েছে। তাই আহিয়ান এর পুরো মিশন কমপ্লিট না হওয়া পর্যন্ত রিহান বাড়ি যেতে পারবে না। মাহমুদা খান ও তার হাজবেন্ড কোন কাজ করতে না পারলেও বিয়ের নিতি নীতি সম্পর্কে ছেলেমেয়েদের সতর্ক অবলম্বন করতে বলছে । বাড়ির একমাত্র মুরুব্বীহিসেবে বৌমাদের সকল কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার তার দায়িত্বের মধ্যেই পরে। মাহমুদাখান সকাল সকাল কল দিয়েছিলেন খান বাড়িতে। সেখানে তার বড় ভাইজান কে বলেছেন: আহিয়া তৃধা ও আহিয়ান কে আজকেই পাঠিয়ে দিতে।

তিনি জানিয়েছেন বাড়ির ছোট সদস্যদের বলেছে আজকে যেতে। কিন্তু আহিয়ান জানিয়েছে। মা চাচী বোনদের নিয়ে বৃহস্পতিবারই যাবে।

তাই উনি আর কিছু বলেননি।

তৃধা পুরো একমাস পর আজকে বই খুলে বসেছে... কিন্তু তার মন বইয়ের পাতায় নেই...

সে কলম দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবছে।

যেহেতু মেহেদী ভাইয়ের সাথে জুইয়ের বিয়ে। সেতু মিশকা ও এহসান অবশ্যই আসবে। সেদিন তো কৌশলে দুজনকে বোকা বানিয়েছিল। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানের মাঝে একসাথে দুজনকে কিভাবে সামলাবে। এহসানকে নিজের থেকে দূরে রাখতে না পারলে আহিয়ান ভাই রেগে যাবেন। আর মিশকাকে আহিয়ানের থেকে দূরে রাখতে না পারলে নিজের মেজাজ হট হয়ে যাবে।

উফ সবদিকে যন্ত্রণা বিয়ে কইরাও শান্তি নেই।

ভাবনার মাঝে কেউ রুমে প্রবেশ করল। তৃধা পিছনে ফিরে দেখল আহিয়া এসেছে। আহিয়া কে দেখে এসে পড়ার টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু আহিয়া ওর সাথে কোন কথা বলোনা। বিষন্ন মুখ নিয়ে বিছানার এক কোণে বসে চুপচাপ রইলো। তৃধা এসে বোনের মলিন মুখ দেখে জিজ্ঞাসা করল: কি হয়েছে আপু...? কি নিয়ে এত টেনশন করছো...?

আহিয়া এবার বোনকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলো। তৃধা ওকে বারবার শান্ত হতে বলল.. কিন্তু মেয়েটা থাম সেই না......

হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে।তৃধা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বোনকে কাঁদতে দিল। কান্নার দাপট কিছুটা কমে আসতে আহিয়া কি বিছানায় বসে এক গ্লাস পানি খেতে দিল। আহিয়া কোন কথা না বলে ঢক ঢক করে পুরো ক্লাসের পানি শেষ করল। অতঃপর চুপ করে নত মস্তিষ্কে বসে রইল।

তৃধা এবার শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল: কি হয়েছে আপু,,,,,? রিহান ভাইয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে.,,,..?

আহিয়া দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল : না তাদের ঝগড়া হয়নি।

তৃধা আবারো বলল: তাহলে ফুপি কোন কারনে বকেছে...?

আহিয়া এবার মুখ ফুটে বলল: না বকেনি...

___তাহলে কি হয়েছে আপু...? তুমি এমন করে কান্না করছো কেন...?

___তৃধা.....

___হুম... আপু বল কি হয়েছে...?

___তৃধা... রাকিন আঙ্কেল আমাদের সম্পর্কটা মানেনি।

তাই রিহান রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।

___তুমি এগুলো কোথা থেকে শুনলে আপু....?

আহিয়া চুপ করে রইলো। আহিয়ার থেকে কোন উত্তর না পেয়ে তৃধা আবার বলল: তোমাকে এসব রেহান ভাইয়া বলেছে....? আহিয়া হেঁচকি তুলে

কাঁদতে কাঁদতে বলল: আমিতো রেহানের সাথে কথাই বলবো না... সে আমাকে কিছুই জানায়নি। সব সমস্যা কয়েকদিন থেকে সে একাই ফেস করে যাচ্ছে।

___তাহলে তুমি কি করে জানলে আপু...?

___আমি ভাইয়ের রুমে কফি দিতে গিয়েছিলাম... সেখানে গিয়ে দেখি ভাইয়া কারো সাথে এসব নিয়ে কথা বলছেন। আমি ১০০% সিওর ওটা রেহানে ছিল।

গত কয়েকদিন থেকে রেহানের কথা আমার কেন জানি সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। যখনই ভিডিও কল দিয়ে অফিসের রেস্টরুমেই পাই। তারমানে রিহান ঈদের পর থেকে সেখানেই থাকছে।তৃধা... আমার জন্য রিহান এত কিছু করছে আর আমি কিছুই করতে পারছি না। আমার কিছু ভালো লাগছে না।

আহিয়া পুরো কথা শেষ করতেই তৃধা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল: কে বলেছে তুমি কিছু করোনি। এইতো সেদিন সাহসের সাথে আমার পাপার কাছে সবকিছু স্বীকার করলে। আর রাকিব আঙ্কেলের তোমাকে পুত্রবধূ হিসেবে ভীষণ পছন্দ।

কিন্তু উনি বড় বাবার কথা ভেবে এগোতে পারছেন না।

তাই রিহান ভাই ওনাকে রাজি করাতে অল্প সময়ের জন্য বাড়ি ছেড়েছে। কখনো কখনো সুখের জন্য ক্ষণস্থায়ী কষ্ট বরণ করে নিতে হয়। রিহান ভাইয়া সেটাই করেছে। আর দেখো এতদিনে আমার পাপাকে দেখে এসব নিয়ে আলোচনা করেছে। তাইতো পাপা সেদিন এত কিছু জিজ্ঞাসা করল।

আহিয়া আবার চোখের পানি মুছে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল: তুই এত কিছু কিভাবে জানলি...?

তৃধা মৃদু হেসে বলল : আমাকে সবকিছু তোমার ভাই বলেছে। আর উনি বলেছেন তোমাকে সব কিছু বলে টেনশন না দিতে। কারণ তোমার ভাইয়া তোমাকে ভালই চেনে। সে জানে সবকিছু তুমি শুনলে কান্নাকাটি করে অস্থির হয়ে পড়বে। কিন্তু সত্যি বেশিদিন লুকানো যায় না। সেইতো তুমি জেনেই গেলে। আহিয়া কিছু বিষাদ এবং কিছু অস্থিরতা নিয়ে বনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর আবারো ফুপিয়ে কেদে উঠে বলল: নিজের আরাম~আয়েশে জীবন রেখে রিহান এভাবে রেস্ট হাউস তে থাকছে। আমি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।

___আপু তুমি প্লিজ কষ্ট পেয়ো না... সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে.,,,. তুমি এরকম করবে জেনে নিন ভাইয়া তোমাকে কোন কিছু জানাতে নিষেধ করেছে....

___তৃধা...

___জি আপু....

ভাইয়াকে বলে রিহানের সাথে একটু দেখা করার ব্যবস্থা করে দিবি প্লিজ। আমি ওর কাছে যেতে চাই।

তৃধা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল: এই মুহূর্তে তোমার একটা ভুল অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে যেতে পারে আপু..... তাই নিজের মনকে শান্ত কর। ভাইয়ের সাথে আজকে লুকিয়ে দেখা করার প্রয়োজন নেই।

আগামীকাল তো আমরা সবাই ফুফুদের বাড়িতে যাচ্ছি। সেখানে রিহান ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে যাবে।

তখন না হয় মন খুলে কথা বলে নিও। আমি তোমাকে সকল রকম সাহায্য করব। আহিয়া কতক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তৃধার কথাগুলো যুক্তিক।কিন্তু মস্তিষ্ক মারলেও মন মানছে না। মন যেন অস্থির হয়ে আছে রিহানকে একমাত্র সামনাসামনি দেখার আশায়।

যদিও তাদের ভিডিও কলে কথা হয়। কিন্তু ভিডিও কলে আহিয়া ততটুকুই দেখে যতটুকু রিহান দেখায়।

রিহান সকল কষ্ট সকল যন্ত্রণার লুকিয়ে রেখে ভিডিও কলে হাসিমুখ নিয়ে হাজির হয় সর্বদা। তাই আহিয়া ওকে সামনাসামনি দেখতে চায়। কিন্তু কিছুই করার নাই। আপাতত মনের সকল অস্থিরতা দমন করতে হবে। তাই চোখের পানি মুছে চুপচাপ হেঁটে চলে গেল নিজের রুমে। তৃধা ওকে আটকালো না। নিজের মনকে শান্ত রাখার জন্য মাঝেমধ্যে একাকিত্বের ভীষণ প্রয়োজন ।

সকলের অফিস ঈদের ছুটি থাকায় খান বাড়িতে ঈদের আমেজ এখনো বহমান । সামনের সপ্তাহ থেকে আবারও সকলে পারি জমবে নিত্য দিনের ব্যস্ততায়।

আহিয়ান দেশে ফেরার পথ থেকে বাড়িতে থাকলেও ঈদের পর থেকেও কারো ব্যস্ততা দিন শুরু হবে।

হসপিটালে ডিউটি এবং ভার্সিটির ক্লাসসহ সে ভীষণ ব্যস্ততার পড়ে যাবে মেঘছেলে মেয়ে যত্নে কখনো অবহেলা করে না। আহিয়ান ও ওর পাপা পছন্দের খাবার অধিকাংশ একই। তাই মেঘ সর্বদা চেষ্টা করে সেগুলো তৈরি করার। সব সময়ের মতো আজকেও মেয়ের ঘরের বিছানা ঠিক করতে করতে ভাবছিল বাপ ছেলের পছন্দের কিছু খাবার রান্না করবে। আহিয়ার আব্বু, ও তানভীর ভাইয়া সকাল সকাল কোথায় যেন গিয়েছিল। দুপুরে ফিরে একসাথে লাঞ্চ করবেন।

তার আগেই রান্না গুলো করা জরুরী। ভেবেই মেঘ হাতের কাজ ঝটপট করার চেষ্টা করল। তখন ঐ দরজায় কেউ টোকা দিল। মেঘ পিছনে তাকিয়ে দেখলো আহিয়া দাঁড়িয়ে আছে। মেয়ের মুখে বিষন্নতার ছাপ। দেখে মেঘ এগিয়ে গেল। কিন্তু মেঘ কিছু বলার আগেই আহিয়া ওকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিল।

মেঘ উথালা কন্ঠে বলল: কি হয়েছে মা এভাবে কান্না কেন করছিস....?

আহিয়া ভাঙ্গা কন্ঠে বলল: আমার কিছু ভালো লাগছেনা মাম্মা তোমার কাছে থাকি...?

মেয়েরা মন অবুঝ আবেদন শুনে মেঘ হাতের কাজ সব রেখে মেয়ে কে নিয়ে বিছানায় বসলো। সেখানেই বসতে আহিয়া মায়ের কোলে মাথা রেখে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো।

মেঘ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দিতে দিতে বলল: কি হয়েছে না বললে বুঝবো কি করে...? বল কি হয়েছে..?

আহিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল: জানিনা মাম্মা আমার কিছু ভালো লাগছে না।

মেগার মেঘ আর ঘাটলো না। মেয়ে এখন বড় হয়েছে অনেক কিছুর বাবা-মার সাথে শেয়ার করতে পারে না বা করতে চায় না।

তাই চুপচাপ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে চোখ বন্ধ করা অবস্থায় বলল: মাম্মা।

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে বলল: কিছু বলবি...?

___না মানে মামা তো সবকিছু জেনে গেছে.. মামাকে বাবাকে রাজি করাতে পারবে...

মেঘ মুচকি হেসে বলল :পারবে ইনশাল্লাহ তাছাড়া ভাইয়ার আমি তো আছি...

আমার একমাত্র রাজকন্যা সব দুঃখ কষ্ট এক নিমিষে ভ্যারিস করে দেব।

মায়ের মুখে এমন কথা শুনে আহিয়া খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। অতঃপর মায়ের কোলে মাথা রেখে চুপটি করে রইল।আর মেঘ শান্তভাবে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 100 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন