আবির কিছু প্রয়োজনীয় কাজে অফিস বন্ধ থাকার সত্ত্বেও সকাল সকাল অফিসে এসেছে। ওর সাথে তানভীরও এসেছে। বাড়িতে বসে থেকে বোরিং হচ্ছিল তাই ভাইয়ার সাথে চলে এসেছি। তানভীর বসে বসে অনেকক্ষণ ফোন স্কল করলো।এতক্ষণে আবির প্রয়োজনীয় সকল কাজ করে ফেলেছে।
এক কাপ কফি তানভীরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল:. নে কফি খা...তারপর বেরিয়ে যাব।
তানভীর ফোন থেকে মুখ সরিয়ে সামনে দেখল। দেখলো আবির ভাই কফির কাপ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তানভীর আশ্চর্য হয়ে বলল: তুমি কফি বানিয়েছো...?
___তা নয়তো কে বানাবে....? অফিসে তো আর কেউ নেই....?
তানভীর মুচকি হেসে কফির কাপটা হাতে নিল। তারপর কিছু একটা ভেবে বলল: ভাইয়া তোমার সাথে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা ছিল। এই কথা শুনে আবির তানভীরের মুখোমুখি নিজের চেয়ারে বসলো।
তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল: কি ইম্পোর্টেন্ট কথা ..?
তানভীর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে গলা খাঁকারি কারী দিয়ে বলল: সৈকতের সাথে সামনের মাসের তাসফিয়ার বিয়েটা না দিলে হয় না।
আবির কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল: সৈকত দেশে ফিরবে বিয়ে করার জন্যই...তাই সেই সময় ওদের বিয়ে দিতে হবে। নয়তো ছেলেটার আবার যাওয়ার সময় হয়ে যাবে।
___না মানে ভাইয়া... তুমি যেটা বুঝেছ আমি সেটা বলতে চাইনি...
___তাহলে...?
তানভীর আমতা আমতা করে বলল: আসলে....,.., কয়েকদিন পরেও নয়,...,...আমি বলতে চাইছি সৈকতের সাথে বিয়ে না দিলে হয় না।
___কেন...? সৈকতের ভেতর কি সমস্যা...?
___কোন সমস্যা নেই ভাইয়া.. কিন্তু...
___কিন্তু কি...?
___আমার ভাগ্নির জন্য আমার অন্য কাউকে পছন্দ হয়... আশা করি তোমাদের ও পছন্দ হবে।
আবিরের কপালে ভাঁজ পরলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল তানভীরের কথাবার্তার ধরন।
তারপর বর্ণিত না করে সরাসরি বলল: ছেলেকে...?
___যাকে আমার মেয়ের পছন্দ....
আবিরের এই এককথায় তানভীর থতমতো খেয়ে গেল। আবির ভাই বুদ্ধিমান মানুষ। তাছাড়া একজন সফল ব্যবসায়ী। তাকে পুরো কথা খুলে বলতে হয় না। বইয়ের উপরের মোড়ক দেখেই ভেতরের পুরো গল্প বলে দিতে পারে।
তাই তানভীর ঘুরিয়ে-পেছে না বলে এবার সরাসরি বলল: না মানে ভাইয়া। তাসফিয়া ও ছেলেটা দুজন দুজনকে ভীষণ পছন্দ করে। তাছাড়া ছেলে ভালো। আমাদের চেনা জানা। হাতের সামনে বড় হওয়া ছেলে। তুমি যদি একবার ভেবে দেখতে।
___তানভীর আমি জিজ্ঞাসা করেছি ছেলেটাকে...?
তানভীর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল: আমি রাকিবের ছেলে রিহানের কথা বলছি।...
ওরা দুজন দুজনকে পছন্দ করে। তাছাড়া রাকিব ভাইয়ের ফ্যামিলি সম্পর্কে তোমাকে নতুন করে বলার কিছু নেই। আমাদের তাসফিয়া ভালো থাকবে।
আমি চুপচাপ শুনলো। আবিরকে কিছু বলতে না দেখে তানভীর এবার নিজেও চুপ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর আবির কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল: ছেলের বাপ কে..? তুই নাকি রাকিব...?
তানভীর আমতা আমতা করে বলল :রাকিব ভাইয়া...
___তাহলে বিয়ের প্রস্তাব তুই কেন দিচ্ছিস... রাকিব কই..?
তানভীর আবির ভাইয়ের কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছে না। ওর মুখটা পূর্বের মতোই স্বাভাবিক। আবির ভাইকে রিহানকে মেনে নেবে নাকি এত বছরের বন্ধুত্বের ফাটল ধরবে...?
এই ভয়ংকর কথাটা ভাবতেই তানভীরে সারা শরীরে কাটা দিয়ে উঠলো। সে সামনে তাকিয়ে দেখলো আবির ভাইয়ের মুখটা এখনো শান্ত।
তানভীর এবার ঢোক গিলে বলল: আসলে ভাইয়া তাসফিয়ার বিয়ে অন্য জায়গায় ঠিক সেটা তো আর রাকিব ভাইয়ের অজানা নয়।তাছাড়া ছেলে মেয়ের বিয়ে সম্পর্কে সকল অনুভূতি তোমার বন্ধুর জানা।।
তাই সে তোমাকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।
অন্যদিকে কিছুতেই ছেলে কেও মানাতে পারছে না।
অবশেষে ছেলের সাথে রাগারাগি করে ছেলের গায়ে হাত তুলেছে।। অল্প বয়সের ছেলে তাই বিষয়টা মেনে নিতে পারেনি। ফলস্রুতিতে রিহান চারদিন হলো বাড়ি ছেড়েছে। রাগ করে বাড়িতে ফেরেনা। ছেলের চিন্তায় চিন্তায় রিয়া ভাবিও খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।
আবির সবকিছু শুনতে শুনতে হাতের কফি টা শেষ করল অতঃপর দাঁড়িয়ে বলল: রাকিব কে বিয়ের প্রোপজল নিয়ে বিকেলে বাড়িতে আসতে।
তারপর বাকিটা দেখছি।
তানভীর খুশিতে ঠোঁট প্রসারিত করে বলল: থ্যাংক ইউ ভাইয়া...
___আর হ্যাঁ ওর ছেলেকেও সাথে নিয়ে আসবি...
___আচ্ছা ভাইয়া...
___দুপুর হয়ে এল চল বাড়িতে যাই...
___হুম.....
____________________________
___ভেতরে আসবো...?
তৃধার কণ্ঠস্বর শুনে আহিয়ান চোখ তুলে সামনে তাকালো। তারপর মৃদু কন্ঠে বলল: আমার রুমে আসার জন্য আপনার পারমিশন এর প্রয়োজন নেই মিসেস..
তৃধা মুচকি হাসে ভিতরে এসে বলল: ডেকেছেন কেন..?
আহিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটলো কাভার্ড দিকে।
তারপর সেখান থেকে একটা প্যাকেট বের করে এগিয়ে আসলো তৃধার দিকে।
তৃধা কাভার্ডের দিকে এক নজরে চেয়ে থেকে বলল: আচ্ছা শুনুন... সেদিন যে বেনারসি টা আনলেন সেটা কার জন্য...?
আহিয়ান মুচকি হেসে বলল :আমার বউয়ের জন্য...
তৃধা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ভাবল। যদিও আহিয়ান ভাইয়ের বউ সে নিজে। কিন্তু শাড়িটা এ পর্যন্ত আহিয়ান ভাই ওকে দেয়নি। তাহলে কি অন্য কেউ আছে...
বোকা মেয়েটা মন খারাপ করে বলল: আপনার কোন বউয়ের জন্য...?
আহিয়ান আবারও হাসলো। অতঃপর তার বোকা রানী কে রাগানোর জন্য বলল: আমার দ্বিতীয় বউয়ের জন্য।
তৃধা রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়ে বলল: তাহলে আমাকে ডাকছেন কেন তাকে ডাকুন...আমাকে আপনার রুমে কেন ডেখেছেন...?
এবার আহিয়ান তৃধাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল: আমার বোকারানী.. এত বোকা কেন তুই..?
তৃধা এখনো গাল ফুলিয়ে আহিয়ানের বাহু থেকে নিজেকে সরাতে চাচ্ছে। আহিয়ান এক হাতে শক্ত করে ওকে চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তৃধার পিঠ আহিয়ান এর বুকে লেপটে আছে। আহিয়ান অন্য হাতে ঘাড়ের চুল গুলো সরিয়ে। ঠোট বুলানো ওর মসৃণ কাঁধে। অতঃপর ডান কাঁদে থতলি রেখে। পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তে যেন তৃধার শরীর কেঁপে উঠল। আহিয়ান ভাইয়ের হঠাৎ করে ছোঁয়া দেওয়া মেয়েটার সামলাতে পারছে না। কেমন জানি নিজেকে বেসামাল লাগছে। বক্ষপিঞ্জরে ঝড় তৈরি করে। হৃদয়ের কম্পন ওঠে মুহূর্তেই।
তৃধা কাঁপা কন্ঠে বলল: ছাড়ুন আমার...
____যদি না ছারি......?
____কেউ চলে আসবে......
____আসুক..... আমার বউ আমি আদর করছি...... কে কি ভাবল... আমার তাতে মাথাব্যথা নেই......
____ইস ঢং..... দ্বিতীয় বৌয়ের জন্য শাড়ি এনে আমাকে আদর করতে এসেছে....
আহিয়ান এবার সশব্দে হেসে দিল। তারপর তৃধাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নাকে নাক ঘষিয়ে দিয়ে বলল: তোরা মেয়েরা এত হিংসা রাখিস কোথায় বলতো... এখনো দ্বিতীয় বিয়ে করলামই না তাতেই আমার ওই বউকে নিয়ে হিংসা করছিস। তৃধা আহিয়ারের মুখে দ্বিতীয় কারো নাম শুনে মন খারাপ করে নিচের দিকে তাকালো। আহিয়ান বুঝলো একটু বেশি হয়ে গেছে। তাই একহাতে ওর থুতনি ধরে মুখ উঁচু করে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্য করলাম মেয়ে কান্না করছে।
আহিয়ান এবার তৃধার মুখটা দুহাতে আজলায় নিয়ে বলল: এই পরি..... কি হয়েছে তোর.....? আমি তো দুষ্টুমি করেছি পাগলি। আমার আগে ও পরে তুই ছাড়া আর কোন পিছুটান নেই বিশ্বাস কর। আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তুই থেকে যাবি। আমি কখনো কাউকে আসার সুযোগ দিব না।
তৃধা এবার হেসকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল: তাহলে আপনি কার জন্য দুইটা লাল শাড়ি কিনেছেন..?
আহিয়ান বউটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল: আজকের ডিনারের পর আমার রুমে আসবি তখন বলব...
তৃধা বায়না ধরে বলল: না এখনি বলুন...
তখনই ওরা শুনতে পেল ড্রয়িং রুমে শোরগোলের শব্দ।
তাই দুজনে বেরিয়ে গেল সেদিকে।
তারা তৃতীয় তলার করিডোর থেকে নিচে তাকিয়ে দেখলো আহিয়াকে পাপা কি যেন জিজ্ঞাসা করছে।
আর সেটা নিয়ে পুরো বাড়িতে আতঙ্কক। পাপার পাশে সকলের দাঁড়িয়ে আছে তানভীর মামা। তার আর বুঝতে দেরি হলো না নিচে কি ঘটেছে। তাই দুরন্ত পায়ে চলে গেল নিচের দিকে।
___আহিয়া আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছি speak up..
পাপার ধমক দিয়ে বলা কথা আহিয়া কেঁপে উঠল। পুরো বাড়ির সবাই আতঙ্কের চোখে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে। পাপার ধমকে আহিয়ে কেঁদে ফেলেছে। মেঘ এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে নিয়ে বলল: আপনি মেয়েটাকে এমন ধমকাচ্ছেন কেন..?
আবির রাগী চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল : তোমার মেয়ে কোন কথার জবাব দিচ্ছে না কেন আহিয়ার আম্মু...?ওকে জিজ্ঞাসা করো... ও যেহেতু রাকিবের ছেলেকে পছন্দ করে সে আগে আমাদেরকে জানায়নি কেন...?
সে যদি আগে জানাতো তাহলে আমি সৈকতের সাথে বিয়ে নিয়ে আগাতাম না। ও তখন চুপ কেন ছিল...? ওর নীরবতাকে আমি সম্মতি লক্ষণ হিসেবে ধরেছিলাম...আবির এবার মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল: ভালো তোমাদের কথাই মেনে নিলাম। অন্তত এতোটুকু তো বলতে পারতো ওর সৈকত কে পছন্দ না। আমি কি মেয়েকে কোন সময় কোন কিছু নিয়ে জোর করেছি। ওর একটু নীরবতার কারণে আজকে সৈকতের আব্বুর কাছে আমার মাথা নত হয়ে যাবে। সেটুকু তোমার মেয়ে বুঝলো না কেন...?
তানভীর এগিয়ে এসে ভাইকে শান্ত করার জন্য বলল: প্লিজ ভাইয়া শান্ত হও... বাচ্চা মেয়ে বুঝতে পারিনি ভেবেছিল আমরা শুনলে ওকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিব। তাই ভয়ে বলেনি।