অবশেষে তুমি
পর্ব ৬: ভালোবাসা নাকি ভুল বোঝাবুঝি?
লেখিকা: আরফা আইরিশা
সকালে আহমেদ পরিবারের বাড়িতে বেশ আনন্দের পরিবেশ। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও ইনায়ার মনটা খারাপ। গতকাল ইহানের সঙ্গে কথা বলার পর থেকে সে অপেক্ষা করছে, কখন ইহান তার জন্য কাচ্চি নিয়ে আসবে।
অন্যদিকে সামির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে।
আয়রা পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, — কী ব্যাপার? আজ এত সাজগোজ কেন?
সামির চুলে হাত বুলিয়ে বলল, — নিজের সৌন্দর্যের যত্ন নেওয়া অপরাধ নাকি?
আয়রা হেসে বলল, — না, তবে তোর সৌন্দর্য দেখে আয়না ভেঙে গেলে দায়িত্ব কিন্তু তোর!
সামির বালিশ তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল।
— আপু, তুমি আমার সৌন্দর্য সহ্য করতে পারো না!
আয়রা বালিশটা ধরে বলল, — তোর সৌন্দর্য সহ্য করার জন্য আলাদা সাহস লাগে। নুহা বেচারি কীভাবে সহ্য করবে, সেটাই চিন্তা করছি!
নুহার নাম শুনতেই সামিরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— আচ্ছা, নুহা কি আজ তোমার সঙ্গে দেখা করবে?
আয়রা ভ্রু তুলে বলল, — ওহ! তাহলে আসল ব্যাপারটা এখানে!
সামির লজ্জা লুকিয়ে বলল, — না মানে, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
— হ্যাঁ, বুঝেছি। তুই এমনিই চুল ঠিক করিস, এমনিই পারফিউম লাগাস, আর এমনিই নুহার কথা জিজ্ঞেস করিস!
সামির আর কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আয়রা পেছন থেকে বলে উঠল, — প্রেমে পড়লে মানুষ যে এত বোকা হয়, তোকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না!
ইনায়ার অপেক্ষা
সকাল সাড়ে দশটা।
ইনায়া বারান্দায় বসে ফোন দেখছিল। বারবার ইহানের মেসেজ চেক করছে, কিন্তু কোনো খবর নেই।
সে বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করল, — মানুষটা নিজেই বলল কাচ্চি আনবে, এখন ফোনও ধরছে না!
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
ইহানের নাম দেখে ইনায়া দ্রুত কল ধরল।
— কোথায় আপনি?
ওপাশ থেকে ইহান হেসে বলল, — সুপ্রভাত বলার আগেই জেরা শুরু?
ইনায়া মুখ ভার করে বলল, — আপনার সুপ্রভাত আপনার কাছে রাখুন। আমার কাচ্চি কোথায়?
— বাহ! আমি মানুষটা কেমন আছি, সেটা জানারও দরকার নেই?
— আপনি ভালো থাকুন, অসুস্থ থাকুন, আমার কী! কাচ্চি আনবেন বলেছিলেন, সেটাই জানতে চেয়েছি।
ইহান হেসে বলল, — ঠিক আছে, ম্যাডাম। আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাব।
— কাচ্চি যেন ঠান্ডা না হয়!
— জি, ম্যাডাম।
কল কেটে ইনায়া নিজেই হেসে ফেলল।
কিন্তু সে জানত না, ইহান শুধু কাচ্চি নিয়ে আসছে না। তার জন্য ছোট্ট একটা উপহারও কিনেছে।
আয়ানের অপ্রত্যাশিত দেখা
অফিসে যাওয়ার পথে আয়ান একটি ক্যাফের সামনে গাড়ি থামাল। তার একজন ব্যবসায়িক সহযোগীর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল।
গাড়ি থেকে নামতেই সে দেখল, ফুটপাতের পাশে আয়রা দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।
আয়ান অবাক হয়ে এগিয়ে গেল।
— আয়রা? তুমি এখানে?
আয়রা ফোন রেখে বলল, — একটা বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। তুমি?
— অফিসের মিটিং আছে।
আয়রা মাথা নাড়ল।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর আয়ান বলল, — অনেক দিন পর দেখা হলো। কেমন আছ?
— ভালো।
আয়ান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। একসময় আয়রাকে সে পছন্দ করত। কিন্তু সেই অনুভূতি কখনো প্রকাশ করেনি। এখন আয়রার চোখে অন্য একজনের জন্য অনুভূতি দেখতে পায়—ইহানের জন্য।
আয়রা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, — তুমি কি কিছু বলতে চাও?
আয়ান মৃদু হেসে বলল, — না। শুধু ভালো থেকো।
কথাটা বলে সে ক্যাফের ভেতরে চলে গেল।
আয়রা কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। আয়ান যে একসময় তাকে পছন্দ করত, সেটা সে জানত না। আর আয়ানও চায়নি, পুরোনো অনুভূতি নতুন কোনো জটিলতা তৈরি করুক।
কাচ্চি, উপহার আর একটুখানি অভিমান
দুপুরের দিকে ইহান বাড়িতে পৌঁছাল। হাতে খাবারের প্যাকেট আর ছোট্ট একটি উপহারের বাক্স।
ইনায়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, — এত দেরি হলো কেন?
ইহান ঘড়ি দেখে বলল, — পাঁচ মিনিট দেরি হয়েছে।
— আমার কাছে পঞ্চাশ মিনিট মনে হয়েছে!
ইহান হাসল।
— আচ্ছা, আপনার অপেক্ষার কষ্টের জন্য ক্ষতিপূরণ আছে।
সে খাবারের প্যাকেটটা ইনায়ার হাতে দিয়ে উপহারের বাক্সটা বাড়িয়ে দিল।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল, — এটা কী?
— খুলে দেখুন।
বাক্স খুলে ইনায়া দেখল, ভেতরে একটা সুন্দর কলম। তার পছন্দের রঙের।
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — এটা আমার জন্য?
— না, পাশের বাসার বিড়ালের জন্য। আপনার হাতে দিলাম ভুল করে।
ইনায়া হেসে ফেলল।
— আপনি একদম অসহ্য!
ইহান মৃদু হেসে বলল, — জানি। কিন্তু আপনার জন্য পছন্দ করে কিনেছি।
কথাটা শুনে ইনায়ার হাসি থেমে গেল। সে কলমটা হাতে নিয়ে নিচু গলায় বলল,
— ধন্যবাদ।
ইহান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছু অনুভূতি আছে, যা মুখে বলা যায় না। কিন্তু ছোট ছোট যত্নের মধ্যে সেগুলো ঠিকই প্রকাশ পেয়ে যায়।
সামিরের পরিকল্পনা
বিকেলে সামির আয়রাকে ফোন করল।
— আপু, নুহার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা হয়েছে?
আয়রা হেসে বলল, — হয়েছে। বিকেল পাঁচটায় ক্যাফেতে আসবে।
সামির উত্তেজিত হয়ে বলল, — সত্যি? আমি কী পরব?
— যা ইচ্ছা পর। তবে মুখটা একটু কম বোকা বোকা রাখিস।
— আপু, তুমি আমার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দিচ্ছ!
— তোর আত্মবিশ্বাসের কিছু হয়নি। শুধু বাস্তবতা মনে করিয়ে দিলাম।
সামির ফোন রেখে আলমারি খুলল। একটার পর একটা জামা বের করে বিছানায় ফেলতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর তার মা ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে বললেন, — এই ঘরে ঝড় হয়েছে নাকি?
সামির দ্রুত বলল, — না মা, আমি শুধু একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।
— কী সিদ্ধান্ত?
— কোন জামা পরলে মানুষ আমাকে দেখে মুগ্ধ হবে।
তার মা হেসে বললেন, — আগে ঘরটা গুছিয়ে নে। তারপর মানুষ মুগ্ধ করার চেষ্টা করিস।
সন্ধ্যার সেই মুহূর্ত
সন্ধ্যায় ইহান অফিসের একটি কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। গাড়ি চালাতে চালাতে তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“আপনার পরিবারের কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ।”
ইহান মেসেজটা পড়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
সে উত্তর দিল, “আপনি কে?”
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি মেসেজ এল—
“সব সত্যি জানার আগে কাউকে বিশ্বাস করবেন না।”
ইহানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
গত কয়েক দিন ধরে পরিবারের মধ্যে অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটছে। আয়ানও বেশ চিন্তিত। এখন আবার এই মেসেজ!
বাড়িতে পৌঁছে সে দেখল, আয়ান বসার ঘরে বসে ফোনে কথা বলছে।
ইহান কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, — ভাইয়া, কী হয়েছে? তোমাকে কয়েক দিন ধরে চিন্তিত লাগছে।
আয়ান ফোন রেখে বলল, — কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে আমি সামলে নেব।
— আমাকে বলতে পারো।
আয়ান ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, — সময় হলে সব বলব।
ইহান আর জোর করল না। কিন্তু নিজের ফোনের মেসেজটার কথা সে আয়ানকে জানাল না।
কারণ তার মনে প্রশ্ন জেগেছে—অচেনা মানুষটা কি সত্যিই তাদের পরিবারের কোনো গোপন কথা জানে?
শেষ দৃশ্য
রাতের খাবারের পর ইনায়া নিজের ঘরে বসে নতুন কলম দিয়ে ডায়েরিতে কিছু লিখছিল।
“কিছু মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে ঝগড়া করতে ভালো লাগে। আবার তাদের একটু যত্ন পেলেই মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু সেই মানুষটাকে নিজের মনের কথা বলব কীভাবে?”
লেখা শেষ করে সে ডায়েরি বন্ধ করল।
অন্যদিকে ইহান নিজের ঘরে বসে ইনায়ার হাসির কথা ভাবছিল।
হঠাৎ তার ফোনে আবার মেসেজ এল।
“আপনি যাকে ভালোবাসেন, তার কাছেও একটা সত্যি লুকানো আছে।”
ইহানের হাত থেমে গেল।
সে দ্রুত লিখল, “কী সত্যি?”
উত্তর এল—
“সময় হলে নিজেই জানতে পারবেন।”
ইহান ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তার মনে প্রথমবারের মতো একটা ভয় জন্ম নিল। ইনায়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক কি কোনো অজানা সত্যির কারণে বদলে যাবে?
আর সেই সত্যি কি তাদের ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
চলবে...!!