তোমাতেই পূর্ণতা
পর্ব ৮: পুরোনো ছবির আড়ালে তুমি
লেখিকা: আরফা আইরিশা
সকাল ৮টা।
চৌধুরী বাড়ির ডাইনিং টেবিলে বসে আরিশা একমনে পরোটা খাচ্ছে। তার সামনে বসে আরহান ফোনে অফিসের মেইল দেখছে। অন্যদিকে নওরীন চৌধুরী চা খেতে খেতে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন।
আরিশা হঠাৎ মুখ তুলে বলল,
— ভাইয়া!
আরহান ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— কী?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— না।
— আরে! কথাটা তো শোনো!
— তোর প্রশ্নের উত্তর আগেই দিয়ে দিয়েছি।
আরিশা মুখ বাঁকাল।
— আচ্ছা, বলো তো, মেহের ভাবি কেমন আছেন?
আরহানের হাত থেমে গেল।
সে ধীরে ফোনটা নামিয়ে বোনের দিকে তাকাল।
— কাকে ভাবি বললি?
আরিশা নিরীহ মুখ করে বলল,
— মেহের ভাবি!
— আর একবার বললে তোর ফোন এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দেব।
আরিশা এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— মা, দেখেছ? নিজের হবু বউয়ের নাম শুনেই ভাইয়ার মুখ লাল হয়ে গেছে!
আরহান বিরক্ত হয়ে বলল,
— আরিশা!
— আচ্ছা, আচ্ছা! রাগ করো না। তবে একটা কথা বলি, ভাইয়া?
— কী?
— তুমি যদি মেহের আপুকে বিয়ে না করো, তাহলে আমি কিন্তু ওনাকে আমার ভাবি বানানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করব।
আরহান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কী ব্যবস্থা?
আরিশা মুচকি হেসে বলল,
— তোমার বিয়ের জন্য একটা সুন্দর বিজ্ঞাপন দেব। “চৌধুরী পরিবারের একমাত্র সুপুত্র, বয়স আটাশ, রাগী স্বভাবের, হাসতে ভুলে গেছেন। পাত্রী চাই!”
নওরীন হেসে ফেললেন।
আরহান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
— তোকে একদিন বাড়ি থেকে বের করে দেব।
আরিশা পেছন থেকে চিৎকার করে বলল,
— আগে বিয়ে করো, তারপর বউয়ের সঙ্গে মিলে আমাকে বের কোরো!
আরহান কোনো উত্তর দিল না।
তবে গাড়িতে ওঠার আগে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠেছিল।
মেহেরের কথা মনে পড়লেই কেন তার এমন হয়, সে নিজেও জানে না।
মেহেরের সকাল
রহমান বাড়িতে মেহের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছিল।
তার মা দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
— মেহের, আজ অফিসে যাবি?
— হ্যাঁ, মা। কেন?
— এমনিই। কাল রাতে তোর ঘরে আলো জ্বলছিল অনেকক্ষণ। ঘুমাসনি?
মেহের একটু থেমে বলল,
— কাজ ছিল।
মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— কাজ, নাকি কারও কথা ভাবছিলি?
মেহের চমকে উঠল।
— মা!
— কী হলো? নামটা বলিনি তো!
মেহের বালিশ তুলে মায়ের দিকে ছুড়ে মারল।
— যাও তো! তোমার সঙ্গে কথা বলব না।
মা হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কিন্তু মায়ের শেষ কথাটা মেহেরের মাথায় ঘুরতে থাকল।
সে সত্যিই কি আরহানকে নিয়ে ভাবছে?
লোকটা ভীষণ রাগী, সব সময় গম্ভীর, আর কথায় কথায় এমন ভাব করে যেন পৃথিবীর সব সমস্যা তার একার কাঁধে।
তবু লোকটা যখন তার দিকে তাকায়, তখন মেহেরের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে।
মেহের নিজের মাথায় আলতো চাপড় দিয়ে বলল,
— না, না! মেহের রহমান, এসব চলবে না। তুই অফিসে কাজ করতে যাবি, প্রেম করতে না!
তারপর ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু সে জানত না, আজকের দিনটা তার জীবনের অনেক পুরোনো দরজা খুলে দিতে চলেছে।
অফিসে অদ্ভুত ঘটনা
অফিসে পৌঁছেই মেহের দেখল, আরহান নিজের কেবিনে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে।
তার মুখ গম্ভীর।
মেহের দরজায় নক করল।
আরহান ফোন রেখে বলল,
— ভেতরে আসুন।
মেহের ঢুকে বলল,
— গুড মর্নিং, স্যার!
আরহান একবার তার দিকে তাকাল।
— আজ এত খুশি কেন?
মেহের অবাক হয়ে বলল,
— আমি কি প্রতিদিন কান্নাকাটি করে অফিসে আসি?
— আপনার কথাবার্তা শুনলে মাঝে মাঝে তাই মনে হয়।
— আর আপনার মুখ দেখলে মনে হয়, পৃথিবীর সব হাসি আপনার শত্রু!
আরহান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— আপনার কাজ শেষ হয়েছে?
— না।
— তাহলে কাজ করুন।
মেহের মুখ বাঁকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু দরজা বন্ধ হওয়ার পর আরহান হালকা হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেইল এল।
প্রেরকের নাম নেই।
মেইলের সঙ্গে একটি ছবি যুক্ত।
ছবিটা খুলতেই আরহানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
ছবিতে তার বাবা নওরীনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সামনে একটি ছোট্ট মেয়ে। মেয়েটির মুখের বেশির ভাগ অংশ ঝাপসা, কিন্তু তার গলায় থাকা ছোট্ট লকেটটা স্পষ্ট।
আরহান লকেটটা চিনতে পারল।
এমন একটা লকেট সে বহু বছর আগে আরেকটি ছবিতে দেখেছিল।
মেহেরের ছোটবেলার ছবিতে।
ছবির নিচে লেখা—
“তুমি কি এখনো জানতে চাও, মেহের রহমান তোমার জীবনে কেন ফিরে এসেছে?”
আরহানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে দ্রুত মেইলের উত্তর দিতে গেল।
কিন্তু তার আগেই আরেকটি বার্তা এল।
“আজ সন্ধ্যায় তোমার বাবার পুরোনো স্টাডির ঘরে যাও। আলমারির নিচের ড্রয়ারে এমন কিছু পাবে, যা তোমার সব প্রশ্নের উত্তর বদলে দেবে।”
আরহান চেয়ারে হেলান দিল।
মেহেরের সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক কী?
আর এত বছর পর সেই মেয়েটি তার জীবনে ফিরে এল কেন?
পুরোনো ডায়েরি
সন্ধ্যা ছয়টা।
বাড়ির সবাই যখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত, আরহান নিঃশব্দে তার বাবার পুরোনো স্টাডির ঘরে ঢুকল।
ঘরটা বহুদিন ব্যবহার করা হয়নি। চারদিকে ধুলোমাখা বই, পুরোনো ফাইল আর কাঠের আলমারি।
আরহান নিচের ড্রয়ারটা খুলল।
ভেতরে একটা বাদামি খাম।
খাম খুলতেই একটা পুরোনো ডায়েরি আর কয়েকটি ছবি বেরিয়ে এল।
প্রথম ছবিতে তার বাবা এক অচেনা নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। দ্বিতীয় ছবিতে সেই নারী কোলে একটি ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বসে আছেন।
আর তৃতীয় ছবিটা দেখে আরহানের হাত থেমে গেল।
ছবিতে ছোট্ট আরহান।
তার পাশে একটি ছোট্ট মেয়ে।
দুজনেই হাসছে। ছোট্ট মেয়েটির হাতে সেই একই লকেট।
ছবির পেছনে লেখা—
“আরহান ও মেহের—একসঙ্গে কাটানো শেষ বিকেল।”
আরহান ফিসফিস করে বলল,
— মেহের... তুমি কি সেই মেয়েটাই?
ঠিক তখন ডায়েরির ভেতর থেকে একটা চিঠি মেঝেতে পড়ে গেল।
চিঠিটা তার বাবার হাতের লেখা।
“যদি কখনো আরহান এই সত্যিটা জানতে পারে, তাহলে তাকে বলো—মেহেরকে ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা আমার ছিল না। কিছু মানুষকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল এমন এক সত্যের কারণে, যা প্রকাশ পেলে দুটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যেত।”
আরহান চিঠিটা শক্ত করে ধরে রইল।
কোন সত্য?
কেন তাকে মেহেরের কাছ থেকে আলাদা করা হয়েছিল?
আর এত বছর পর মেহের আবার তার জীবনে ফিরে এসেছে কেন?
ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ হলো।
আরহান দ্রুত চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন নওরীন চৌধুরী।
ছেলের হাতে পুরোনো ডায়েরি দেখে তাঁর মুখের রং বদলে গেল।
— আরহান! তুমি এখানে কী করছ?
আরহান মায়ের দিকে তাকাল।
— মা, মেহের কে?
নওরীন কোনো উত্তর দিলেন না।
আরহান এবার এক পা এগিয়ে এল।
— আমি জানতে চাই, ছোটবেলায় মেহেরের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক ছিল।
নওরীনের চোখে পানি জমে উঠল।
— এসব জানার দরকার নেই, বাবা।
— কেন? তোমরা সবাই কেন একই কথা বলো? কেন সবাই আমার কাছ থেকে সত্যিটা লুকিয়ে রাখছ?
নওরীন কাঁপা গলায় বললেন,
— কারণ সত্যিটা জানলে তুমি মেহেরকে আর আগের মতো দেখতে পারবে না।
আরহান স্তব্ধ হয়ে গেল।
— তার মানে তুমি সব জানো?
নওরীন চোখ বন্ধ করলেন।
— হ্যাঁ। আমি জানি।
— তাহলে আমাকে বলো!
নওরীন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— মেহেরের মা আর তোমার বাবা একে অপরকে চিনতেন। তাঁদের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক ছিল, যা আমরা কেউ কখনো প্রকাশ করতে চাইনি।
আরহানের ভ্রু কুঁচকে গেল।
— কী সম্পর্ক?
নওরীন উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর ফোন বেজে উঠল।
ফোনের পর্দায় অচেনা নম্বর।
তিনি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল—
— নওরীন, আর কত দিন সত্যিটা লুকিয়ে রাখবে?
নওরীনের হাত কেঁপে উঠল।
— তুমি আবার ফোন করেছ কেন?
— কারণ আরহান সব জানতে শুরু করেছে। এবার আর ওকে থামানো যাবে না।
নওরীন আতঙ্কিত চোখে আরহানের দিকে তাকালেন।
ওপাশের লোকটি আবার বলল,
— মনে রেখো, মেহেরের জীবনের সত্যিটা জানলে আরহান শুধু একজন মানুষকে হারাবে না। সে হারাবে নিজের পরিচয়কেও।
কল কেটে গেল।
আরহান মায়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বলল,
— কে ছিল?
নওরীন মাথা নাড়লেন।
— আমি বলতে পারব না।
আরহান এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— ঠিক আছে। তুমি না বললেও আমি সত্যিটা খুঁজে বের করব।
সে ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নওরীন ছেলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
— ঈশ্বর, এবার যেন কোনো অঘটন না ঘটে।
মেহেরের অজানা অতীত
রাত নয়টা।
মেহের নিজের ঘরে বসে পুরোনো একটা বাক্স খুলছিল।
বাক্সটা তার মা বহু বছর ধরে যত্ন করে রেখেছেন। আজ হঠাৎ মা বাক্সটা তার হাতে দিয়ে বলেছেন, সময় হয়েছে নিজের অতীত সম্পর্কে কিছু জানার।
বাক্সের ভেতরে পুরোনো ছবি, একটা ছোট্ট লকেট আর কয়েকটি চিঠি।
মেহের লকেটটা হাতে তুলে নিল।
তারপর একটা ছবির দিকে তাকাল।
ছবিতে ছোট্ট মেহেরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলে।
ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে মেহেরের বুক কেঁপে উঠল।
সে ছেলেটাকে চেনে।
অন্তত তার মনে হচ্ছে, চেনে।
ছবির পেছনে লেখা—
“যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়, মনে রেখো—তুমি আমাকে ভুলে গেলেও আমি তোমাকে ভুলব না।”
মেহেরের চোখে পানি জমে উঠল।
ঠিক তখন তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
প্রেরকের নাম—আরহান।
“কাল তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আমাদের অতীত সম্পর্কে।”
মেহেরের হাত কেঁপে উঠল।
সে কি সত্যিই সেই ছোট্ট ছেলেটি?
যার কথা সে এত বছর ধরে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে?
আর যদি আরহানই সেই ছেলে হয়, তাহলে তাদের আলাদা করে দিয়েছিল কে?
মেহের ছবিটা বুকের কাছে ধরে ফিসফিস করে বলল,
— তুমি কি সত্যিই সেই মানুষ, আরহান? নাকি তোমার সঙ্গে আমার জীবনের আরও ভয়ংকর কোনো সত্যি জড়িয়ে আছে?
ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।
মেহের দরজা খুলতেই তার মা ভেতরে এলেন।
মেয়ের হাতে ছবিটা দেখে তিনি থমকে গেলেন।
— এই ছবিটা তুই কোথায় পেলি?
মেহের অবাক হয়ে বলল,
— বাক্সের ভেতরে। মা, এই ছেলেটা কে?
মায়ের চোখে পানি চলে এল।
তিনি মেহেরের হাত ধরে ধীরে বললেন,
— এই ছেলেটা তোর জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যেটা তুই কল্পনাও করতে পারবি না।
মেহেরের বুক ধক করে উঠল।
— তাহলে বলো, মা! কে ও?
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— ও আর কেউ নয়... আরহান চৌধুরী।
মেহেরের হাত থেকে ছবিটা মেঝেতে পড়ে গেল।
তার শৈশবের স্মৃতি, আরহানের অদ্ভুত আচরণ, পরিবারের লুকানো রহস্য—সবকিছু যেন এক সুতোয় বাঁধা পড়তে শুরু করল।
কিন্তু ঠিক তখনই মেহেরের ফোনে আরেকটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।
“আরহানকে বিশ্বাস কোরো না। তোমাদের শৈশবের বিচ্ছেদের জন্য তার পরিবার দায়ী। আর যে সত্যিটা তোমরা খুঁজছ, সেটা জানলে তোমাদের ভালোবাসা ঘৃণায় বদলে যাবে।”
মেহের বার্তাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে চোখ তুলে ফিসফিস করে বলল,
— আরহান, তুমি কি সত্যিই আমার অতীতের অংশ... নাকি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য?
চলবে...!!