#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৩৫)
(কপি করা সম্পুর্ণরুপে নিষিদ্ধ।)
" উনি আমার সন্তানকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে আব্বু। উনার জন্য আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি।"
রেজাউল খান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
" অনেকসময় সবকিছু আমাদের হাতে থাকে না। জন্ম মৃত্যু সবকিছুর মালিক আল্লাহ তায়ালা। হয়তো তোমার সন্তানের হায়াত এইটুকু সময় পর্যন্ত ছিলো। তোমার সন্তান নির্দোষ ছিলো, সে কোনো শাস্তি পায়নি বরং হয়তো আল্লাহ তাকে পৃথিবীর কষ্ট থেকে দূরে নিজের কাছে আগলে রেখেছেন।"
বাবার কথা শুনে নূর ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠে বলে,
" আমি ওর লা'শটাও দেখতে পারলাম না আব্বু! আমার ছেলের চেহেরা টুকুও দেখার সৌভাগ্য হলো না আমার। "
শেষ কথাটা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে নূর। বুকফাটা আর্তনাদে যেন রেজাউল খানের বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে । রেজাউল খান নিজেকে সামলাতে পারলেন না।নিজের চোখও ভিজে উঠেছে ততক্ষণে, তবুও মেয়ের সামনে ভেঙে পড়লেন না তিনি। মেয়ের চোখের জল মুছে বললেন,
" নিজেকে সামলাও মা। এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। তোমার সন্তানকে তুমি পৃথিবীতে না পেলেও জান্নাতে ঠিকই পাবে। "
" আমার সবকিছু এলোমেলো লাগছে আব্বু। সবকিছু শূন্য শূন্য লাগছে আমার। "
" অনেক রাত হয়েছে ঘুমাতে যাও। বিশ্রাম দরকার তোমার।"
মোরশেদা বেগম নূরকে নিয়ে তার ঘরে যান। নূর পরনের কাপড় বদলে একটা থ্রি-পিস পরে নেয়। এতো বড়ো একটা অপারেশন সাথে পেটের মধ্যে হওয়া চিনচিন ব্যথা এখনো বিদ্যমান। নূর চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করলেও ঘুমাতে পারছে না, বারবার মনে হচ্ছে কোন ছোট বাচ্চা হয়তো কাঁদছে। নূর স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সেই শব্দ। নূর আগ্রহ বশত উঠে বসে, এর মাঝেই মোরশেদা বেগম নূরের ঘরে আসেন তার সাথে ঘুমানোর জন্য। সদ্য সন্তান হারানোয় নূরকে একা রাখতে চাইছেন না তিনি।
" আম্মু তুমি এখানে?"
" আজ এখানটায় ঘুমাবো আমি।"
মোরশেদা বেগম পাশে শোয়া সত্ত্বেও নূরের অস্থিরতা কমছে না, ছটফট করছে সে। অবশেষে না পেরে ঘুমের ঔষধ খেয়ে নেয় সে। আদ্রিয়ান নিজের সব ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়েছে। রাহেলা শাহ আদ্রিয়ানকে ব্যাগ গুছাতে দেখে জিগ্যেস করলেন,
" আদ্রিয়ান কোথায় যাচ্ছো এতো রাতে?"
আদ্রিয়ান শান্ত স্বরে উত্তর দিলো,
" চলে যাচ্ছি।"
আদ্রিয়ানকে একে একে তার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে দেখে রাহেলা শাহ কিছুটা বিচলিত হোন। আদ্রিয়ান নূরের ব্যবহৃত কাপড় ও গুছিয়ে নেয়। সব গুছানো শেষ হলে বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে চারিপাশ ভালো করে দেখে নেয় আরও একবার।রাহেলা শাহ'র অবস্থা করুন।এলোমেলো শাড়ি, উষ্কখুষ্ক চুল। সব মিলিয়ে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছেন তিনি৷ আদ্রিয়ানকে চলে যেতে দেখে তিনি তার কাছে এসে বললেন,
" কোথায় যাচ্ছো আদ্রিয়ান? ফিরবে কবে? "
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার জবাবে বললো,
" আর ফিরবো না। ভুলে যান শাহ বাড়িতে আদ্রিয়ান নামক কোন অস্তিত্ব ছিলো। "
রাহেলা শাহ'র মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরে। এসব কি বলছে আদ্রিয়ান। তিনি আদ্রিয়ানের দুহাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাতে কপাল ঠেকিয়ে ক্রন্দনরত স্বরে বললেন,
" এমন করে বলো না আদ্রিয়ান। তুমি ছাড়া আমার আমার আর কেউ নেই। মা'কে এভাবে পর করে দিও না। "
আদ্রিয়ান তার হাত সরিয়ে নিলো রাহেলা শাহ'র হাতের বাধন থেকে। অত:পর মৃদু হেসে বললো,
" কে বলেছে আপনার কেউ নেই? এই যে সম্পত্তি রয়েছে। সম্পত্তির জন্য এতোকিছু করলেন অথচ এখন বলছেন আপনার কেউ নেই! "
আদ্রিয়ান যে তাকে ব্যঙ্গ করে কথাটা বলেছে তিনি তা বুঝতে পেরেছেন। আদ্রিয়ান আবারও বলে উঠলো,
" আজ থেকে আপনার সাথে আমি বরাবরের মতো সব সম্পর্ক ছিন্ন করছি। আমি তো আগেই এতিম ছিলাম অত:পর আপনি আমায় নতুন জীবন দিয়েছিলেন, নতুন পরিবার দিয়েছিলেন। আজ আপনি নিজেই সেই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করলেন।আপনার সকল সহায় সম্পত্তি নিয়ে আপনি আয়েস করুন, আমি চলে যাচ্ছি।"
আদ্রিয়ান বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রাহেলা শাহ চিৎকার করে বলেন,
" যেও না আদ্রিয়ান! তুমি তোমার মা'কে ফেলে চলে যেতে পারো না!"
আদ্রিয়ান পিছন ফিরে তাকালো রাহেলা শাহ'র দিকে। কিছু সময় তাকিয়ে থেকে অত:পর বললো,
" কেমন মা? যে কিনা সম্পত্তির লোভে নিজের ছেলেকে কালোজাদু করতে পারে! যে কিনা নিজের নাতিকে হ'ত্যা করতে দুবার ভাবে না সেই মা? আমার মা মা'রা গেছে। আমার কোন মা নেই। "
রাহেলা শাহ ধপ করে বসে আদ্রিয়ানের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন,
" আমি সম্পত্তির লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম নূরের চেয়েও ভালো ঘরের আনতে। আমি বুঝতে পারিনি এর পরিণাম এতো ভয়াবহ হবে। "
"আপনার লালসা'র জন্য আজ আমার সন্তান পরপারে। আমি বাবা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হয়েছি আপনার জন্য। আপনাকে আমি কখনো করব না। আপনাকে ক্ষমা করলে আমার সন্তানকে কি জবাব দিবো আমি ?"
রাহেলা শাহ আর কিছু বলতে পারলেন না। নির্বাক হয়ে বসে রইলেন মেঝেতে। আদ্রিয়ান তার পা ছাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো।তিনি এক দৃষ্টিতে আদ্রিয়ানের চলে যাওয়ার পথে চেয়ে রইলেন।মুহূর্তের মাঝেই বিশাল বাড়িটা প্রাণহীন হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো তার। কাঁপা কাঁপা হাতে সামনে থাকা টেবিলটা আঁকড়ে ধরে দাঁড়ালেন তিনি। জীবনে প্রথমবার নিজের করা পাপগুলো স্পষ্টভাবে চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার। ভাইয়ের কথায় সেদিন যদি কালোজাদু করতে রাজি না হতো তবে আজ ছেলেকে হারাতেন না তিনি। আদ্রিয়ান আর ফিরবে না ভেবেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি।
লোহার বড়ো গেইট পেরিয়ে বেরিয়ে আসতেই আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চোখ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে তার। চারিপাশ থেকে শূন্যতা গ্রাস করেছে তাকে। পেছন ফিরে আরও একবার বাড়ির দিকে তাকিয়ে সে হাঁটতে শুরু করলো কিছুদূর যেতেই দেখলো ইলহাম দাঁড়িয়ে আছে সামনে। আদ্রিয়ানকে দেখে সে আদ্রিয়ানের হাত থেকে ব্যাগ নিজের হাতে নিয়ে বললো,
" বাড়ি চল। "
আদ্রিয়ান ইলহামের দিকে তাকালো না, নিচে তাকিয়ে বললো,
" আমার কোন বাড়ি নেই। ও বাড়ি একেবারে ছেড়ে চলে এসেছি।"
" তোর বাড়ি নেই মানে? যতদিন ইলহাম বেঁচে আছে ততদিন তোর কোনকিছুর প্রতি অভাব আসতে দিবে না। আমার বাড়ি কি তোর বাড়ি নয়? "
আদ্রিয়ান চুপ করে রইলো ইলহামের কথায়, চোখ জ্বলছে তার। ছোট থেকেই একমাত্র ভরসা বলতে ইলহামকেই বুঝেছে সে। যে-কোনো ঝড় ঝাপটা আসার আগেই নিজেই মোকাবিলা করেছে সবকিছুর। কখনো আদ্রিয়ানকে বুঝতে দেয়নি কোন কিছুর অভাব। আদ্রিয়ানের আঁখিদ্বয় ছলছল করে উঠলো। ইলহাম'ই একমাত্র ব্যক্তি যার কাছ থেকে কোনকিছু লুকাতে পারে না সে। ইলহাম আদ্রিয়ানকে নিয়ে তার বাড়িতে এলো। পায়রার জ্বর এসেছে প্রায় একশত তিন ডিগ্রি। পায়রাকে এখনো কোনকিছু জানানো হয়নি। তার শরীরের কন্ডিশন ভালো না হওয়ায় ইলহাম মানা করেছে। পায়রা খেয়ে-দেয়ে ঘুমাচ্ছে। ইলহাম আদ্রিয়ানকে চেয়ারে বসিয়ে একটা প্লেটে ভাত বেড়ে নিয়ে আসে।
" খাবো না চাচ্চু। খিদে নেই।"
" খেয়ে নে, সারাদিন কিচ্ছু খাস নি।"
ইলহাম জোর করায় আদ্রিয়ান ভাতের প্রথম দলা মুখে দিতেই চোখের কোটর ভরে গেলো জলে। ভাতের দলা গিলতেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা একসাথে গলায় আটকে গেলো তার। খুব কষ্টে ভাতের দলাটা গিলে নিলো সে। ভাতের প্লেটে হাত নাড়াচাড়া করতে দেখে ইলহাম বললো,
" খাচ্ছিস না কেন?"
আদ্রিয়ান ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে বলে উঠলো,
" আমি তো ট্রেনিং শেষে নূরকে নিজের মনের কথা বলবো ঠিক করেছিলাম তাহলে কেন আজ.... "
উক্ত কথা শেষ করতে পারলো না তার আগেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে। ইলহাম আদ্রিয়ানকে কি বলে সান্ত্বনা দিবে খুঁজে পেলো না। আদ্রিয়ান ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললো,
" নূরের কাছে কোন মুখে যাবো আমি? ছেলেটাকে পর্যন্ত রক্ষা করতে পারলাম না। অন্ধকার কবরে শুয়ে আছে আমার ছেলে। "
" সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি নূরকে বুঝাবো। "
" নূরের অধিকার আছে ঘৃণা করার। বিয়ের পর থেকে কখনো সুখ নামক আশা দেখতে পায়নি সে। অপমান, অবহেলা ছাড়া কিচ্ছু দিতে পারিনি আমি তাকে। "
" সব ঠিক হয়ে যাবে তুই চিন্তা করিস না। কাল আমরা নূরের বাড়ি গিয়ে নূরকে বোঝাবো। "
আদ্রিয়ান বাকি খাবারটুকু শেষ করতে পারলো না। উঠে চলে গেলো তার জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে।ঘরের বাতি নিভিয়ে শরীর এলিয়ে দিলো বিছানায়। জানালার ফাঁক গলে আসা ম্লান চাঁদের আলোয় আধো অন্ধকার হয়ে আছে চারিপাশ। আদ্রিয়ান নিঃশব্দে শুয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ বন্ধ করলেই বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তোয়ালে মোড়ানো ভ্রুণটির অবস্থান। ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে রাত্রির দ্বি-প্রহর ছুঁয়েছে। অথচ তার চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। প্রতিটা মুহূর্তে অপরাধবোধ তাকে ঘিরে ধরছে।
ভোরের আলো ফুটতেই গ্রীষ্মের সকালের স্নিগ্ধ বাতাস জানালার ফাঁক গলে পর্দা দুলিয়ে দিচ্ছে মৃদুভাবে।সারারাত নির্ঘুম কাটানোয় ক্লান্ত ছাপ স্পষ্ট আদ্রিয়ানের চোখেমুখে। লালচে চোখদুটো নিয়ে সে নিঃশব্দে বসে রইলো। মাথা ব্যথা করছে তার। ফ্রেশ হয়ে বের হতেই সুরাইয়া শাহ জড়িয়ে ধরলেন নাতিকে। দীর্ঘ পাঁচমাস পর দেখেছে তার প্রানপ্রিয় নাতিকে। আদ্রিয়ানকে এই বাড়িতে দেখে কিছুটা অবাক হয় পায়রা। সে ভেবেছে হয়তো নূর ও এসেছে। আগের চেয়ে স্বাস্থ্য বেড়েছে তার। টুইন বেবির জন্য পেট স্বাভাবিক এর চেয়ে একটু বেশিই বড়ো লাগে তার। পায়রা কোমরে হাত দিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। শুধুমাত্র আদ্রিয়ানকে টেবিলে বসতে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
চলবে,,,,,,,,
(সবাই ১.৩কে করে দিন প্লিজ। বেশি বেশি রেসপন্স করবেন। রাতে হয়তো আরেকটা পর্ব আসবে।)
গল্প নিয়ে প্রশ্ন কিংবা গল্পের সকল আপডেট জানতে জইন হোন আমার গ্রুপে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/