ফন্ট সাইজ:
থিম:
মন প্রাঙ্গনের বৃষ্টি

পর্ব 37

লেখক: কংকা চৌধুরী

#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৩৬)

( অনুমতিবিহীন কপি করা সম্পুর্ণরুপে নিষিদ্ধ।)

"নূর আসেনি তোমার সাথে? "

পায়রার প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় আদ্রিয়ান। সে কি বলবে খুঁজে না পেয়ে ইলহামের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় ইলহাম আগ হতেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ইশারা করে আদ্রিয়ানকে না করলো কি বলতে।

" নূরকে আব্বা-আম্মার কাছে দিয়ে এসেছি গতকাল।"

এ কথা শুনে পায়রা কিছুটা সস্থি পেলো। সাড়ে পাঁচ মাসের উঁচু পেট নিয়ে চলাফেরা করতে খুব একটা সুবিধা হয় না তার। নূরের বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে পায়রা মলিন কন্ঠে বললো,

" আমিও যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমার চাচা আমাকে যেতে দিচ্ছে না। একবার যেতে দিলে কি এমন ক্ষতি হবে। "

ইলহাম পাউরুটির টুকরো ছিড়তে ছিড়তে বললো,

" ডাক্তার তোমাকে স্ট্রেস নিতে মানা করেছে, এমতাবস্থায় কোন ক্ষতি হয়ে গেলে তখন?"

" কিচ্ছু হবে না। আমি দিব্যি সুস্থ আছি।"

" একদম না। চুপচাপ খেয়ে নাও। "

পায়রা মুখ ফুলিয়ে বাকি খাবারটুকু শেষ করলো। সুরাইয়া শাহ তসবি হাতে নিয়ে পায়রার ঘরে গেলেন, দিনের বেশিরভাগ সময় পায়রার সাথেই কাটান তিনি। ইতিমধ্যে বেশ ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে। মাঝেমধ্যেই পা ফুলে যায় তার। সুরাইয়া শাহ গরল তেল মালিশ করে দিচ্ছেন পায়রাকে। পায়রা নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো,

" দেখেছেন আম্মা, উনি আমাকে কোথাও যেতে দেন না। "

" আমার ছেলে ভয় পায় এইটা তুমি বুঝো না বউ? প্রথমবার মা হইতাছো তার উপর দুইটা বাইচ্চা পেটের ভেতর। সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকা লাগে আমার ছেলের। "

"তাই বলে বন্দী করে রাখবে? সারাদিন বাড়ির ভেতর বসে থাকতে ভালো লাগে নাকি। "

" মা হতে গেলে একটু কষ্ট তো সহ্য করতে হবে। বাইচ্চা হওয়ার পর তুমি দিনরাইত ঘুইরো, তোমাকে কেউ মানা করবে না। "

পায়রা ঠোঁট ফুলিয়ে আরেকটু হেলান দিয়ে বসে। কিছুসময় পর পেটের ডান পাশে বাচ্চার লাথি অনুভব হওয়ায় সে সুরাইয়া শাহ'কে উদ্দেশ্য করে বলে,

" দেখেছেন আম্মা, আমি এখানে দুঃখ প্রকাশ করছি আর আমার ছেলে লাথি মারছে।"

সুরাইয়া শাহ পায়রার কথায় হাসতে লাগলেন। আদ্রিয়ান ও ইলহাম দুজনেই বেরিয়েছে। নূর ঘুম থেকে উঠেছে সেই কবে, ঘুমের ঔষধ খাওয়ার পরেও তার ঘুম খুব একটা হয়নি। জট পাকানো চুল খোপা করে সে জানালার ধারে বসলো। বাহিরের স্লান আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। সবকিছু কেমন যেন বিষন্ন লাগছে তার। হঠাৎ সে তার ডান হাত নিজের পেটের উপর নিতেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠলো, অত:পর সে তাচ্ছিল্য হেসে মিনমিন করে বললো ,

" গতকাল সকালেও এইখানটায় একটা প্রাণ ছিলো আর আজ সকালে তা নিস্তেজ। "

মোরশেদা বেগম তেলের বাটি নিয়ে নূরের ঘরে আসলেন। মেয়েটার ভাবলেশহীন রুপ দেখলে কষ্ট হয় তার। মোরশেদা বেগমকে তেলের বাটি নিয়ে বসতে দেখেও সে ফিরে তাকালো না।

" নূর এখানে এসে বস। চুলের কি অবস্থা করেছিস দেখেছিস একবারও? "

নূর কোন কথা না বলে নিঃশব্দে উঠে মোরশেদা বেগমের সামনে বসলো। মোরশেদা বেগম গরম তেল নূরের চুলে দিতে লাগলেন। চুল দেখে তার ভেতরটা হুহু করে উঠলো। নূরের ঘন কালো চুলের আজ এ কি অবস্থা।

"চুলে তেল দেস না কতদিন নূর? একসময় তোর চুলের সৌন্দর্য দেখে সবাই প্রশংসা করতো, আর আজ তার একভাগ ও নেই।"

নূর চুপ করে সবটা শুনছে। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তার। মোরশেদা বেগম তেল দেওয়ার পর বেণি পাকিয়ে দিলেন তার চুলে। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে মোরশেদা বেগম ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখতে পান আদ্রিয়ান ও ইলহাম এসেছে। মূলত রেজাউল খান তাদের আসতে বলেছেন। আদ্রিয়ান এদিক ওদিক উঁকি দিয়েও নূরকে দেখতে পেলো না। মোরশেদা বেগম চা বসিয়ে দিয়ে নূরের কাছে এসে বললেন,

" আদ্রিয়ান এসেছে। ওই ঘরে যা। "

নূর শুকনো মুখেই জবাব দিলো,

" আমি উনার সামনে যেতে চাই না। উনার চেহেরা দেখতেও বিবেকে বাঁধছে আমার।"

মেয়ের কথায় তিনি চুপ হয়ে গেলেন, আর কিছু বললেন না। আদ্রিয়ান ভেবেছে নূর হয়তো চলে যাওয়ার জন্য তাকে ডেকেছে। তবে বুকের ভেতর অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। মোরশেদা বেগম চা দিয়ে যেতেই রেজাউল খান আদ্রিয়ানকে জিগ্যেস করেন,

" তোমার আম্মার কি খবর? "

আদ্রিয়ান মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। গতকালকের পর সেই বাড়িতে আর যায়নি সে, কোন খবরা বরও নেয়নি।

" উনি ঠিক আছেন। "

" যেই কারণে তোমাদের আসতে বলেছি সেই বিষয়ে কথা বলি তাহলে? "

" হ্যাঁ বলুন। "

" নূর তালাকের কথা বলছিলো। এতে তোমার মতামত কি?"

আদ্রিয়ান কখনো ভাবেনি এখানে এসে সে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু শুনবে। বাকি চা টুকু সে আর খেতে পারলো না, চায়ের কাপ ঠাস করে নিচে পরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। আদ্রিয়ান বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে তার কথা শুনে। ইলহাম আদ্রিয়ানের বিষয়টা বুঝতে পেরে নিজেই বললো,

" এসব কি বলছেন আব্বা? "

রেজাউল খান চায়ের কাপ রেখে বিচলিত ভঙ্গিতে বললেন,

" নূর এই সম্পর্কে আর থাকতে চায় না, তাই তালাকের কথা বলছিলো। "

" আপনি নূরকে একবার ডাকুন আমি কথা বলছি ওর সাথে। "

ইলহামের কথা শুনে মোরশেদা বেগম নূরকে ডাকতে গেলে দেখতে পান নূর নিজেই এসেছে। আদ্রিয়ান নূরের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

" তুমি নাকি তালাক চাইছো?"

ইলহামের কথায় নূর নিঃশব্দে সায় জানালো, আদ্রিয়ান এক পলকে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

" এখন হয়তো তোমার মাথা ঠিক নেই তাই এসব বলছো।আমি তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি। তুমি মা, তোমার কষ্টটা বেশি। কিন্তু তুমি যেমন সন্তান হারিয়েছো, আদ্রিয়ান ও সেই সন্তানের বাবা। ওর ও তো কষ্ট হচ্ছে। দেখো, রাগের মাথায় একটা সম্পর্ক শেষ করে দেওয়া ঠিক না। "

" উনার জন্য আমি আমার সন্তান হারিয়েছি, নাহয় আমার সন্তান বেঁচে থাকতো। গতকাল সকালেও যে আমার অস্তিত্বের সাথে জুড়ে ছিলো আজ সে নেই। পলকের মাঝে আজ আমি সন্তানহারা এক মা। উনাকে আমি কখনো ক্ষমা করবো না, কেয়ামতের দিনও আমি আমার সন্তানের দাবি ছাড়বো না। "

এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে থামলো নূর, অত:পর আবারও বললো,

" এই মাসের মধ্যেই আমি তালাই চাই। আমি আর এই নামহীন সম্পর্কে থাকতে চাই না। "

আদ্রিয়ান নিঃশব্দে উঠে নূরের দিকে এগিয়ে গেলো, উপস্থিত সকলের দৃষ্টি তার দিকে সীমাবদ্ধ। আদ্রিয়ান নূরের সামনে দাঁড়িয়ে তার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,

" আমি জানি আমি ক্ষমার যোগ্য নই, আমি যা করেছি তাতে ক্ষমা আশা করা বোকামি কিন্তু মায়ের কর্মকান্ডের সাথে আমি মোটেও জড়িত ছিলাম না। "

নূর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো, আদ্রিয়ান এবার সকলের সামনে নূরের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে ভাঙা গলায় বললো,

" আমায় আরেকটা সুযোগ দাও নূর। কথা দিচ্ছি তুমি যেভাবে চাইবে সেভাবেই হবে। আরেকবার সুযোগ দাও।"

আদ্রিয়ান আর কিছু বলতে পারলো না, চোখ জলছে তার।নূর শক্ত গলায় বললো,

" আপনার এসব নাটক বন্ধ করে চলে যান। আমি আর এসব সহ্য করতে পারছি না। এবার মুক্তি দিন আমায়।"

নূরের মুখ থেকে এসব শোনার পরেও আদ্রিয়ান ঠাঁই বসে রইলো তার সামনে, আকুতি মিনতি করে বললো,

" আমায় ছেড়ে যেও না নূর। আমার তো দোষ ছিলো না। আম্মার কুফুরির প্রভাবে আমি ... "

" আদ্রিয়ান কথা শেষ করতে পারলো না তার আগেই নূর বলে উঠলো,

" বিয়ের পর দিনের পর দিন যে অত্যাচার করেছেন সেসব ও কি কুফুরির ফল?জোর করে বিয়ে, দিনরাত অত্যাচার। এসব কি ছিলো? বিয়ের প্রথম রাতে আমায় অন্ধকার বেলকনিতে ঠান্ডা মেঝেতে শুতে দিয়েছেন। আপনার আম্মা ভাতের মাড় ফেলতে পারিনি বলে আমার হাত পুড়িয়ে দিয়েছিলো সেসব কি?"

নূরের কথায় আদ্রিয়ান চুপ করে রইলো। প্রতিশোধের তাড়নায় সে দিনরাত অত্যাচার করেছে নূরের উপর। সেসব কিছুই মিথ্যে নয়।

নূর কাঁদতে কাঁদতে বললো,

" পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্সি নিয়ে ভারী কাজ করেছি, গোয়াল ঘর পরিস্কার করেছি প্রতিটা দিন। এমন একটা দিন নেই আপনার আম্মা আমাকে শান্তিতে দুবেলা দুমুঠো খেতে দিয়েছেন। প্রেগন্যান্ট অবস্থায় কিছু খেতে পারতাম না, গব্ধ লাগতো সবকিছুতে। ওই সময় ও ম'রে ম'রে গোয়াল ঘর পরিস্কার করেছি আমি। এঁটো, বাসি ভাত খেয়ে ছিলাম। আপনার মায়ের মন গলেনি কখনো। আপনার মায়ের এতো এতো কাপড় ধুয়েছি যেখানে এই সময় অন্যান্য নারীরা কিনা বিশ্রাম করে, আয়েশ করে দিন কাটায়। কখনো খেতে পেয়েছি কখনো পাইনি। শেষ কবে ভালো করে ভাত খেয়েছি বলতে পারবো না আমি। এই সময় পুষ্টির দরকার হয় অথচ আমি এক টুকরো ফল খেতে পারিনি, আমার কি ভাগ্য। যেখানে অন্যান্য নারীরা এক মুঠো খেলে আরেক মুঠো খাবার ছাড়খার করে সেখানে আমি এক বেলা খাওয়ার জন্য পুরোদিন পরিশ্রম করেছি।পা ফুলে ব্যথায় টনটন করতো কিন্তু তবুও সারা বাড়ি মুছেছি আমি। শুধুমাত্র আমার ভেতরে থাকা প্রাণটিকে বাঁচানোর জন্য, অথচ পারলাম না আমি তাকে বাঁচাতে। "

কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গিয়েছে তার। নূর চোখের জল মুছে বললো,

"আপনার মা'কে আমি বলেছিলাম আমি এখানে চলে আসবো কিন্তু আপনার মা আমার সন্তানকে অবৈধ প্রতিবাদ দিবে বলে ব্লেকমেইল করেছিলো। এতোকিছু সহ্য করেছি যার জন্য , দিনশেষে তাকেই হারিয়ে ফেলেছি আমি। "

আদ্রিয়ান নূরের কথায় অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার অবর্তমানে কতকিছু সহ্য করতে হয়েছে নূরকে।

" আমায় এবার শান্তি দিন একটু, মুক্তি দিন। মুক্তি চাই আমি। "

শেষোক্ত কথাটি বলে নূর চলে গেলো সেই ঘর থেকে। রেজাউল খান ও মেয়ের কথা শুনে বাকরুদ্ধ। আদ্রিয়ানের জন্য তার মনে যতটুকু সম্মান বেঁচে ছিলো তার একভাগ ও নেই।

" নূর নিজের শেষ কথা বলে দিয়েছে। আশা করি তুমি সবটা বুঝতে পেরেছো। এখন তুমি আসতে পারো।"

চলে যাওয়ার কথাটা যে আদ্রিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলেছে তা সে বুঝতে পেরেছে। আদ্রিয়ান মাথা নিচু করে সায় জানিয়ে বেরিয়ে যায়। আদ্রিয়ানের সাথে সাথে ইলহাম ও বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। আজ চাকরিতেও যাওয়া হয়নি, সব এলোমেলো লাগছে তার। আদ্রিয়ানের চোখ জলছে, লালচে বর্ণ ধারণ করেছে আবারও। নূরের কথাগুলো বুকে গেথে গিয়েছে তার। ইলহাম তার পাশাপাশি হাঁটছে। আদ্রিয়ান এক পর্যায়ে বলে উঠে,

" আম্মা নূরের উপর এতো অত্যাচার করবে জানলে আমি কখনোই নূরকে এখানে রেখে যেতাম না। আমার বউটা পাঁচমাসের প্রেগ্ন্যাসি নিয়ে এতো কষ্ট সহ্য করেছে! "

" ভাবি লোভে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো। ভালো খারাপ বুঝতে পারেনি। "

আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইলহামের সাথে তার বাড়ি যায়। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই সুরাইয়া শাহ'র কান্নার আওয়াজ শুনে দুজনেই দ্রুত ভেতরে যায়। সুরাইয়া শাহ ফোন হাতে নিয়ে কাঁদছেন। আদ্রিয়ান তার কাছে এসে জিগ্যেস করলো,
" কি হয়েছে দাদীজান, আপনি কাঁদছেন কেন? "

" তোমার মা ফোন ধরছে না। সেই সকাল থেকে ফোন করে যাচ্ছি।"

" হয়তো ব্যস্ত আছে তাই ফোন ধরছে না। এতে কাঁদার কি আছে।"

সুরাইয়া শাহ চলে গেলে পায়রা একা হয়ে যাবে পুরো বাড়িতে তাই তিনি বের হতে পারেননি। পোয়াতি মহিলা আবার যদি কোন বিপদ আপদ হয়? তিনি বুড়ো মানুষ, এতোটা পথ কি একা যেতে পারবেন।আদ্রিয়ানের কথায় তিনি তিনি বললেন,

" সকালে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে তুই যেন রাহেলাকে ক্ষমা করে দিস। এরপর ফোন ধরছে না আর।"

আদ্রিয়ান সুরাইয়া শাহ'র কাছ থেকে উঠে একটা চেয়ার টেনে বসলো তাতে। আদ্রিয়ানের কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ না দেখে সুরাইয়া শাহ ইলহামকে বললেন,

" তোমার ভাবিকে একবার দেখে এসো। না জানি কোন বিপদ হলো কিনা। "

ইলহাম সুরাইয়া শাহ'র কথা শুনে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

" আদ্রিয়ান চল তো দেখে আসি।"

আদ্রিয়ান গ্লাসে পানি ঢেলে ভাবলেশহীন ভাবে বললো,

" আমি যাবো না। তুমি গিয়ে দেখে এসো। "

আদ্রিয়ানের কথায় সুরাইয়া শাহ আদ্রিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

" এভাবে রাগ করে থেকো না বাপ। একবার হলেও দেখে এসো। তোমার মায়ের আবার কিছু হলো না তো। "

সুরাইয়া শাহ'র পীড়াপীড়িতে আর না পারতে আদ্রিয়ান উঠে বেরিয়ে গেলো, তার সাথে ইলহাম ও বেরিয়ে যায়। আদ্রিয়ান হাঁটতে হাঁটতে ইলহামকে বললো,

" আমি ভেতরে ঢুকবো না। তুমি গিয়ে কথা বলে এসো। "

ইলহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগিয়ে যেতেই দেখলো বাড়ির সামনে অনেক মানুষ ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে। এসব দেখে আদ্রিয়ান ও ইলহাম দুজনেই একে অপরের দিকে তাকায়। তারা আরেকটু সামনে গিয়ে পাশের বাড়ির সুলায়মান কাকাকে জিগ্যেস করতেই তিনি আদ্রিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,

" তোমার আম্মা গলায় ফাঁস দিয়েছে আদ্রিয়ান। "

উক্ত কথাটি শুনে আদ্রিয়ান বাকরুদ্ধ। সে হতদন্ত হয়ে দৌড়ে ভেতরে যায়। রাহেলা শাহ'র ঘরে সামনে সবাই দাঁড়িয়ে আছে, আদ্রিয়ান ভীড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে রাহেলা শাহ ফাঁসি দিয়েছেন। আদ্রিয়ানের মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করলো। আশেপাশের কিছুই তার কানে আসছে না। সামনের এই দৃশ্য সে সহ্য করতে পারলো না। তবে কি সে এতিম হয়ে গেলো? আদ্রিয়ান অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার মায়ের ঝুলন্ত লা'শের দিকে। দুদিনের ভেতর সে তার পুরো পরিবারকে হারিয়ে ফেললো নিমেষেই। আদ্রিয়ান ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো সামনে। ইলহাম রাহেলা শাহ'র লা'শ নামিয়ে বিছানায় রাখতেই আদ্রিয়ান তার শরীরে হালকা টোকা দিয়ে বলে,

" মা!"

তার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। সে আবারও মিনমিন করে ডাকলো,

" মা উঠুন। আপনার সাথে আমার বোঝাপড়া শেষ হয়নি এখনো। মা!"

উঠলেন না তিনি। আদ্রিয়ানের ডাক অগ্রাহ্য করে তিনি নিস্তেজ হয়ে শুয়ে রইলেন। পাশ থেকে একজন মহিলা বলে উঠলেন,

" আদ্রিয়ানের আম্মা তো জানাজা পাইবো না। আহা! শেষ বয়সে আইসা কিনা গলায় ফাঁস দিলো। এহন তো লা'শ ফালাইয়া দিতে হইব। "

আদ্রিয়ান চোখ বন্ধ করে নিলো তার কথা শুনে। আশেপাশের মানুষ সবাই কানাঘুঁষা করছে এসব নিয়ে।ইলহাম সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলায় সকলে বেরিয়ে গেলো। আশ্চর্য ব্যপার হলো আদ্রিয়ানের চোখ থেকে এক ফোটা জল ও গড়ালো না, সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। রাহেলা শাহ'র বালিশের পাশে একটা চিঠি দেখতে পেলো আদ্রিয়ান। সে কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করলো,

" আদ্রিয়ান,

এখন হয়তো আমি নেই। আমি জানি আমার উপর খুব রাগ তোমার। আমি সম্পত্তির লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক ভুল বিচার করার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। দিনশেষে হয়ে উঠলাম নির্বোধ। আমার র'ক্ত! আমার নাতিকে শেষ করে দিলাম আমি। তোমার ভালো চাইতে গিয়ে আমি তোমার সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছি। পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও। মা হওয়ার যোগ্যতা নেই আমার। যে অধিকারটুকু ছিলো, তাও হারিয়ে ফেলেছি আমি। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম সবাইকে ছেড়ে চলে যাওয়ার। আ'ত্মহ'ত্যা মহাপাপ কিন্তু দুনিয়াতে বেঁচে থেকে সন্তানের দৃষ্টিতে ঘৃণিত হওয়ার মতো যন্ত্রণা হয়তো জাহান্নামে নেই। পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও আদ্রিয়ান বাবা আমার। শেষবারের মতো আমার একটা আবদার রাখবে বাবা? আমার কবরে এক মুঠো মাটি দিও। তোমার হাতের মাটি পাওয়ার বড্ড ইচ্ছে আমার।

ইতি
তোমার ঘৃণিত মা "

চিঠিটা পড়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো সে। চোখ তুলে তাকালো রাহেলা শাহ'র নিস্তেজ হয়ে থাকা মুখের দিকে। চোখ দুটো হয়তো আর খুলবে না।

চলবে,,,,,,,,

( সবাই ১.৫কে করে দিন জলদি। কেমন হয়েছে দুলাইন মন্তব্য করবেন প্লিজ।গঠনমূলক মন্তব্য চাই কিন্তু। বেশি বেশি রেসপন্স করবেন। )

গল্প নিয়ে প্রশ্ন কিংবা গল্পের সকল আপডেট জানতে জইন হোন আমার গ্রুপে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 37 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন