#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৩৭) এর প্রথমাংশ
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)
দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রখর তাপ ও কাঠফাটা রুদ্দুরের
উষ্ণতা ঘিরে ধরেছে চারদিকে। জানালার ফাঁক গলে আসা রোদের সরু রেখা এসে পরেছে ঘরের ভেতর। সিলিং ফ্যানটা ধীর গতিতে ঘুরে চলেছে কিন্তু তাতেও গুমোট ভাব কাটছে না। আদ্রিয়ান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে মানুষের চাপা গুঞ্জন বাড়ছে ক্রমশ। আদ্রিয়ানের কানে তাদের কথা আসছে কিন্তু সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। ইলহাম ইমাম সাহেবকে ফোন করার কিছু সময়ের মাঝেই তিনি উপস্থিত হলেন শাহ বাড়িতে। ইলহাম আদ্রিয়ানকে চিঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তার কাছে এসে চিঠিটা নিয়ে নিলো তার কাছ থেকে। চিঠিটা পড়ে সে এক পলক তাকালো আদ্রিয়ানের দিকে। তার কোন ভাবভঙ্গিমা না দেখে ইলহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইমামের কাছে এসে দাঁড়ালো। ইমাম সাহেবের মুখভঙ্গিমা দেখেই মনে হচ্ছে তিনি বিরক্ত।
" ইমাম সাহেব আমার ভাবীর জানাজা পড়তে হবে। "
ইলহামের কথা শুনে গুঞ্জন বেড়ে গেলো। আশেপাশের মানুষ নানান কথা বলছেন। এক পর্যায়ে একজন মহিলা বললেন,
" আ'ত্মহ'ত্যা করা মানুষের আবার জানাজ হয় নাকি। চেয়ারম্যান সাহেব এসব কি বলছে ইমাম সাহেবকে।"
" নাউজুবিল্লাহ!! আ'ত্মহ'ত্যা যে করেছে তার জানাজা আমি পড়াতে পারবো না। চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে আপনি এই নিয়ে আর কোন কথা বলবেন না।"
তার কথায় ইলহাম রুষ্ট হলো। ইমাম সাহেব রাজি হলেন না রাহেলা শাহ'র জানাজা পড়াতে। ইলহাম ধমকি ধামকি দেওয়ার পরেও তিনি নিজের কথায় অনড়। রাহেলা শাহ'র লা'শ গ্রামের অন্যান্য মহিলারা গোসল করিয়ে দেওয়ার পর কাফনের কাপড় পড়িয়ে দেয়। রাহেলা শাহ'কে 'শাহ' বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে আসা হয়েছে। আদ্রিয়ান ইলহামের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। ইলহাম একাই সব তদারকি করছে। সে আরিয়ানের পাশের কবর রাহেলা শাহ'র জন্য খুড়তে গেলে আদ্রিয়ান বলে উঠে,
" উনাকে আমার সন্তানের পাশে কবর দিও না চাচ্চু। আমি চাই না আমার সন্তানের কবর তার খু'নির পাশে হোক।"
আদ্রিয়ানের কথায় ইলহাম বাকরূদ্ধ। আশেপাশে থাকা লোকেরাও চুপ করে দেখছে আদ্রিয়ানকে। সে হাতের কোদাল ফেলে আদ্রিয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,
" এই সময় এসব কি বলছিস? তোর মাথা ঠিক আছে? "
আদ্রিয়ান শান্ত ভঙিতে রাহেলা শাহ'র লা'শের দিকে তাকিয়ে বললো,
" আমি একদম ঠিক আছি চাচ্চু। আমি চাই না আমার সন্তানের কবর তার খু'নির পাশে হোক।"
অগত্যা ইলহাম অন্যপাশে কবর খুড়তে লাগলো। আদ্রিয়ানের চোখ থেকে এক ফোটা জল ও গড়ালো না। সে
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। কবরস্থানের একপাশে থাকা আমগাছের পাতাগুলো নিস্তেজ হয়ে ঝুলে পড়েছে। সেই গাছের ডালে বসে থাকা একটি কাক ডাকছে একটানা। ইলহাম ধীরে ধীরে কবর খুঁড়ে চলেছে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে তার, চোখ দুটো লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। এই হাতে কখনো রাহেলা শাহ'র কবর খুড়তে হবে ভাবেনি সে। মাটির খুড়ার মাঝে আড়চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকাচ্ছে সে। আদ্রিয়ান পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে। আদ্রিয়ানের ভাবলেশহীন ভঙিমা দেখে ইলহাম অবাক হলো না। দু দিনের মাঝে পুরো পরিবার হারালো ছেলেটা, তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা নেই ইলহামের। কবর খোঁড়া শেষ হতেই কয়েকজন লোক মিলে রাহেলা শাহ'র দেহটা নামানোর প্রস্তুতি নিতে লাগলো। মাটি দেওয়ার শেষ পর্যায়ে ইলহাম আদ্রিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
" আদ্রিয়ান তোর আম্মাকে মাটি দে। মৃ'ত্যুর আগে ভাবির শেষ ইচ্ছে ছিলো তুই যেন ভাবির কবরে মাটি দেস। তারাতাড়ি আয়।"
ইলহামের কথায় টনক নড়লো আদ্রিয়ানের। সে ইলহামের দিকে তাকিয়ে বললো,
" তোমরা দাও। আমি দিবো না।"
চারপাশের লোকজন একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো আদ্রিয়ানের কথায়। কথাটা শুনে কারও মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হলো না , শুধুমাত্র গুমোট নীরবতা নেমে এলো চারদিকে।
ইলহাম আদ্রিয়ানের কথার জবাব নিচু স্বরে বললো,
" আদ্রিয়ান, এখন এসব কথা না বলাই ভালো। তারাতাড়ি আয়।"
আদ্রিয়ান এক পা ও নড়লো না। ইলহাম তার কর্মকান্ডে বেজায় রেগে গেলো। সে রাগান্বিত স্বরে বললো,
" আমার কথা কানে যাচ্ছে না তোর?"
অত:পর শান্ত কন্ঠে বললো,
" তোর হাতের মাটি ছাড়া ভাবির আত্মা শান্তি পাবে না। মৃ'ত মানুষের শেষ ইচ্ছেটা হলেও পূরণ কর।"
আদ্রিয়ান তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
" আমার সবকিছু ধ্বংস করে এখন কি সহজেই এই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে শুয়ে রয়েছে দেখো চাচ্চু।কত সহজেই মুক্তি পেয়ে গেলো সবকিছু থেকে। "
ইলহাম এক মুঠো মাটি নিয়ে আদ্রিয়ানের হাতের মুঠোয় দিয়ে বললো,
" এই দুনিয়া থেকে মুক্তি পেলেও পরপার থেকে মুক্তি পাননি ভাবি। দেখ পাপের পরিমাণ এতোই বেশি ছিলো যে মৃ'ত্যু'র পর জানাজাটুকুও পাননি তিনি। এই পাপের ফল ভোগ করতে হবে আখিরাতে। "
আশেপাশের লোকেরা'ও অনুনয় করে বলতে লাগলো আদ্রিয়ানকে,
" মাটি দিয়ে দাও আদ্রিয়ান বাবা। "
তাদের কথায় হাতের মাটি টুকু রাহেলা শাহ'র কবরে দিলো আদ্রিয়ান। ইলহাম নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার কবরের দিকে। রাহেলা শাহ যতই খারাপ হোক না কেন তবে ইলহামকে মায়ের মতো ভালোবেসেছে। বয়সের তফাৎ টা বেশি হওয়ায় আদ্রিয়ানের মতো ইলহাম ও ছিলো রাহেলা শাহ'র চোখের মণি। শেষ বয়সে এসে তিনি এমন কিছু করবেন তা ইলহাম বুঝতে পারেনি। রাহেলা শাহ'কে মায়ের সম্মান দিয়ে এসেছে সারাজীবন, অথচ আজ সেই মানুষটা সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে।
নিজের ঘরে বসে ছিলো নূর। সকালে আদ্রিয়ান ও ইলহামের সাথে কথা বলার পর আর দরজা খোলেনি। মোরশেদা বেগম ও রেজাউল খান অনেক করে ডেকেছে তাকে, তবুও সে দরজা খুলেনি। সকাল থেকে পেটে একটা দানাও পরেনি, এই যে দরজা বন্ধ করেছে আর খোলেনি।হঠাৎ ইশিতা এসে দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে বলে উঠলো,
" নূর আপু, তোমার শ্বাশুড়ি আম্মা আজ সকালে আ'ত্মহ'ত্যা করেছে.!"
চলবে,,,,,,,,,,,,,
(ঈদ কেমন কাটলো আপনাদের? ঈদের আমেজ এখনো যায়নি। সবাই ১.৩কে করে দিন জলদি।কালকে দুপুরে গল্প দিয়ে দিবো। আজ দেরি হয়ে গেলো তাই অল্প দিয়েছি।কারেন্ট ও ছিলো না।)
গল্প নিয়ে প্রশ্ন কিংবা গল্পের সকল আপডেট জানতে জইন হোন আমার গ্রুপে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/