ফন্ট সাইজ:
থিম:
মন প্রাঙ্গনের বৃষ্টি

পর্ব 39

লেখক: কংকা চৌধুরী

#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৩৭) এর বর্ধিতাংশ

(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)

ইশিতার কথা শুনে নূর বাকরুদ্ধ। এ কি বলছে সে। দ্রুত দরজা খুলতেই দেখে মেয়েটা হাপাচ্ছে। নূর তাকে দেখে জিগ্যেস করলো,

" তুমি কিভাবে জানলে ইশু?"

" টিউশন পড়ে ফেরার সময় দেখলাম গ্রামের মহিলারা বলাবলি করছে, চেয়ারম্যান সাহেবের ভাবি আ'ত্মহ'ত্যা করেছে। এতোক্ষণে বোধহয় লা'শ নিয়েও গিয়েছে। তুমি দেখতে যাবে না নূর আপু? "

ইশিতার কথায় নূর কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ হয়ে যায়। অত:পর খাটের ওপর বসে বললো,

" তুমি যাও এখান থেকে। আমার মাথা ব্যথা করছে। "

ইশিতা আর কোন কথা না বলে মোরশেদা বেগমের কাছে গেলো। তিনিও খবর পেয়েছেন তবে মেয়েটাকে একা ঘরে রেখে যেতে সাহস হলো না তার। নূর ফ্যানের দিকে দৃষ্টি তাক করে শুয়ে আছে। পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছে তার সংসার জীবনের কথা। আর আট দশটা সংসারের মতো তাদের সংসার হলে কি ক্ষতি ছিলো। বিধাতা তার কপালে সুখ রাখলো না। দিনশেষে স্বামীহারা,সন্তানহারা হলো সে। এসব ভাবতে ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো নূর।

গোধূলির স্লান আলো ফুরিয়ে অন্ধকার নেমে এলো চারদিকে। বর্ষাকালের আগমন শুরু হবে সামনে। দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি কানে আসতেই পাখিরা ডানা ঝাপটে নিজ নীড়ে ফিরে যেতে লাগলো। ইলহাম শরীর থেকে মাটি ঝেড়ে বাড়ি ফিরে এলেও আদ্রিয়ান এলো না। ইলহাম তাকে বেশ কয়েকবার বাড়ি ফেরার কথা বললেও আদ্রিয়ান ফেরেনি। জরুরি একটা কাজ পরে গিয়েছে বলে সে বেরিয়ে যায়। রেললাইনের উপর বসে আছে আদ্রিয়ান। এই সময় খুব একটা মানুষ থাকে না এখানে। বাজারের ভেতর দিয়ে চিপা গলি সরু গলি পেরিয়ে বেশ খানিকটা পথ হাঁটার পর এই রেলস্টেশন। চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। দূরের দোকানগুলোর ভেতরে থাকা বাতির আলো ক্ষীণ হয়ে এসে পড়ছে রেললাইনের লোহার পাতের ওপর। বাতাসে ভেসে আসছে স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ।দুই হাতের আঙুল জড়িয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে আদ্রিয়ান। বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতার ভার যেন ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো মন মানসিকতা নেই বললেই চলে। কিছুটা দূরে একদল ছেলে সিগারেট ফুঁকছে।

নূরের সামনে বসে আছে তার বাবা রেজাউল খান। তাকে খুব বিচলিত দেখাচ্ছে, তিনি নূরের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন,

" তালাক নিয়ে তুমি নিশ্চিত? "

নূর শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,

" শতভাগ। "

" তবে কালকেই ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিবো। তোমার কি মতামত? "

" আপনার যা ভালো লাগে তাই করুন।আমি মুক্তি চাই এই সম্পর্ক থেকে। "

তাদের কথোপকথন শুনে মোরশেদা বেগম পাশ থেকে বলে
উঠলেন,

" আদ্রিয়ানের মা মা'রা গিয়েছে আজ। এই অবস্থায় এইসব কি ঠিক হবে? "

মোরশেদা বেগমের কথায় ঘরের ভেতর থমথমে একটা পরিবেশ সৃষ্টি হলো। রেজাউল খান গম্ভীর ভাব বজায় রেখে বললেন,

" আমার মেয়েকে যে পরিমাণ অত্যাচার করেছে ওই পরিবার, তাতে আমি আর একদিনের জন্যেও আমাকে মেয়েকে ওই কাপুরুষের সংসার করতে দিবো না। আর তোমার কাছ থেকে এই বিষয়ে আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না।"

রেজাউল খানের কথায় দমে গেলেন মোরশেদা বেগম। নূরের দিকে তাকাতেই নূর ও চোখ ফিরিয়ে নেয়। রেজাউল খান গম্ভীর চাহনি তাক করে বেরিয়ে যায় সেই ঘর থেকে। তিনি বের হয়ে যেতেই মোরশেদা বেগম নূরের পাশে বসে বললেন,

" দেখ মা!ছেলেটা সবেমাত্র মা হারিয়েছে, সন্তান হারিয়েছে। এর মধ্যে তুই ও যদি.. "

মোরশেদা বেগমকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সে বলে উঠলো,

" আমিও তো আমার ছেলেকে হারিয়েছি। পাঁচ মাস গর্ভধারণ করে আমি আমার নিষ্পাপ ছেলেটাকে হারিয়ে ফেলেছি। একদিন আগেও যার অস্তিত্ব আমার মাঝে ছিলো আজ সে নেই। পলকেই হারিয়ে ফেলেছি। "

" বাচ্চাটা তো তোর একার না। আদ্রিয়ানের ও সন্তান। "

" বাহ! পাঁচ মাস আমি পেটে রাখলাম,কষ্ট করলাম । আর আজ উনার সন্তান হয়ে গেলো! "

" ঠান্ডা মাথায় ভাব নূর। রাগের মাথায় নেওয়া কোন সিদ্ধান্তই ঠিক হয় না। ইলহাম আমাকে সবটা খুলে বলেছে। আদ্রিয়ান তো জানতো না তুই সন্তানসম্ভাবা। "

" বিয়ের দিন থেকে যে আমার উপর প্রতিনিয়ত অত্যাচার করে গিয়েছে তার কি হবে? তার সংসারে আমি এক বিন্দু পরিমাণ সুখ অনুভব করতে পারিনি। তুমি জানো আম্মু! বিয়ের পরেরদিন রাতে নষ্ট গন্ধ ছড়ানো ভাত খেয়েছি আমি খিদের তাড়নায়। খিদের যন্ত্রণা কি সেটা আমি বুঝেছি ওই বাড়িতে যাওয়ার পর। আমি কখন মাংস দিয়ে দু-মুঠো ভাত খেয়েছি আমার মনে নেই। আদ্রিয়ান চলে যাওয়ার পর আমাকে দেওয়া হতো এঁটো ভাত। গর্ভবস্থায় আমি প্রতিটা ভাতের দানা খেয়েছি চোখের পানি নিয়ে। "

মোরশেদা বেগম চুপ করে রইলেন মেয়ের কথা শুনে। নূর কিছুক্ষণ থেমে আবারও বললো,

" আমি এসব কি করে ভুলবো আম্মু? আদ্রিয়ান আমার পাশে থাকলে হয়তো এসব কিছুই সহ্য করতে হতো না। কিন্তু যার স্বামী তার উপর বিয়ের পরিদিন থেকে অত্যাচার করে সেখানে অন্যরা কেন করবে না? মাইগ্রেনের ব্যথার জন্য উনার পকেট থেকে টাকা নিয়ে ঔষধ কিনতে যাওয়ায় আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো। এইসব কিছু ভুলে যাবো? "

নূরের হেঁচকি উঠে গিয়েছে কাঁদতে কাঁদতে। মোরশেদা বেগম নূরকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, মেয়েকে বলার মতো ভাষা নেই তার।

-------------

ঠাস করে এক চড় পড়লো আদ্রিয়ানের গালে। চড়ের শব্দে আশেপাশে থাকা মানুষজন এক নজরে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ইলহাম পরপর আরও দুটো চড় বসিয়ে দিলো আদ্রিয়ানের গালে। সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো ইলহামের সামনে। ঘড়ির কাটা রাত নয়টা পেরোতেই ইলহাম বেরিয়ে পরলো আদ্রিয়ানকে খুঁজতে। সে নিজেও বাড়ি যায়নি, বাড়ি গেলেই হয়তো সুরাইয়া শাহ কান্না দেখতে হবে। তাই সে পা বাড়ায় নি বাড়ির রাস্তায়। গলির মোড়ে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলো, আদ্রিয়ান ফিরলে একসাথে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু হাতঘড়ির কাটা সাড়ে নয়টায় পৌঁছাতেই সে আর স্থির থাকতে পারলো না। মনের মাঝে খারাপ চিন্তাভাবনা উঁকি দিচ্ছে বারংবার। আদ্রিয়ান সচরাচর যে জায়গাগুলো তে যায় সেই জায়গাগুলোতে খুঁজেও পেলো না তাকে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হচ্ছে তার। অত:পর লোকেশন ট্র্যাক করে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছে যায়। ট্রেন আসার শব্দেও আদ্রিয়ান নড়লো না রেললাইন থেকে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ থাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতেই সে মেঝেতে লুটিয়ে পরে। পেছন ফিরে দেখতে পায়, যে ছেলেগুলো সিগারেট ফুঁকছিলো তাদের মধ্য থেকে একজন আদ্রিয়ানকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসেছিলো। কিছুসময় পর ঠাস করে চড় পড়লো তার গালে। সামনে তাকিয়ে ইলহামকে দেখতে পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় আদ্রিয়ান। পরপর চড় খাওয়ার পরেও সে একটা টু শব্দ ও করলো না। ইলহাম রাগান্বিত স্বরে দাঁত কিড়মিড় করে বললো,

" ম'রার শখ হয়েছে না তোর। আয় আমি মে'রে দিচ্ছি তোকে। ম'রার জন্মের শখ মিটিয়ে দিচ্ছি জানোয়ার। "

আদ্রিয়ান পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অন্যমনস্ক হয়ে রেললাইনে বসে থাকায় ট্রেন আসছে খেয়াল করেনি। ইলহাম আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কিছু আছে কিনা। কিন্তু ছোট ছোট পাথর ছাড়া কিছুই দেখতে পেলো না।

" বাড়ি চল তুই। আজ তোকে ফ্যানের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে সাধ মেটাচ্ছি তোর।"

ইলহামের কথায় আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,

" আগে ভালো ব্রান্ডের ফ্যান কিনো তারপর আমাকে ঝুলাতে এসো।"

এইসময়ে এসেও আদ্রিয়ানের কাছ থেকে পাত্তা না পেয়ে ইলহামের বিরক্তি বেড়ে গেলো। সে আদ্রিয়ানের মাথায় চাপড় মেরে বললো,

" সকাল থেকে কিছু খাসনি বাড়ি চল। কাল আমরা নূরের বাড়ি যাবো।"

" নূর আর ফিরবে না চাচ্চু। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ আর পেছন ফিরে তাকায় না। "

এসব নিয়ে পরেও কথা বলা যাবে। বাড়ি চল।

ইলহাম আদ্রিয়ানকে নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখতে পায়, বাড়ির পরিবেশ একদম শান্ত। সুরাইয়া শাহ ও পায়রার কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ইলহাম ভয়ে ভয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে দেখে সুরাইয়া শাহ ঘুমাচ্ছে। পায়রা এক কোণে হেলান দিয়ে বসে আছে। রাহেলা শাহ'র মৃ'ত্যুর কথা শুনে দুজনেই বেশ অবাক হয়েছে। স্বামী মা'রা যাওয়ার পরেও শাহ বাড়ি ছেড়ে যাননি তিনি। সুরাইয়া শাহ অনেক করে বলেছিলেন যেন দ্বিতীয় বিয়ে করে নেয়,কিন্তু তিনি রাজি হননি।সবসময় খেয়াল রেখেছেন সুরাইয়া শাহ'র। আজ তার অকাল মৃ'ত্যুতে সুরাইয়া শাহ শোকাহত। তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না রাহেলা আর নেই৷ পায়রাকে ডাক্তার দুশ্চিন্তা করতে মানা করেছে, কিন্তু রাহেলা শাহ'র কথা শুনে সে আর ঠিক থাকতে পারলো না। মাথা ঘুরছে তার। শরীর খারাপ করছে সেই বিকেল থেকে। ইলহামকে দেখতে পেয়ে সে ধীরপায়ে কোমড়ে হাত দিয়ে এগিয়ে আসলো তার সামনে।

" হঠাৎ করে এসব কি হয়ে গেলো! আমি তো কখনো কল্পনাও করতে পারিনি, উনার মতো একজন মানুষ কিনা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। "

" তুমি এসব নিয়ে ভেবো না। বিশ্রাম নাও। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।"

আদ্রিয়ান নিজের ঘরে এসে পকেটে থাকা চিঠিটা বের করে জ্বালিয়ে দিলো। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। মুহুর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেলো সেই চিঠি।

----------

এইসব কিছু একজন বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছে। আদ্রিয়ান ও নূরের বিচ্ছেদ হয়ে শুনে সে ক্রুর হাসলো। অত:পর ফোন হাতে নিয়ে পরিচিত একটা নাম্বারে ফোন দিলো। দীর্ঘ এগারো মাস পর আজ ফোন করছে এই নাম্বারে। রিং বাজার কিছু সময়ের মাঝেই ফোন রিসিভ করলো সেই ব্যক্তি।

" বাবা, আমি কাল দেশে আসছি। "

" কি বলছো শাহনাব! ফ্লাইট কখন?"

" সকালের ফ্লাইটে দেশে আসছি আমি।"

উক্ত কথাটি বলেই ফোন রেখে দিলো সে। যেন এই দিনটিরই অপেক্ষা করছিলো এতোদিন। ডিভানে শরীর এলিয়ে দিয়ে সে টিভিতে গান ছেড়ে চোখ বুজে রইলো। টিভিতে গান বাজছে,

"আতর গোলাপ সোয়া চন্দন

মারো বন্দের গায়ে

আতর গোলাপ সোয়া চন্দন

মারো বন্দের গায়ে

ছিটাইয়া দাও সোয়া চন্দন

ছিটাইয়া দাও সোয়া চন্দন

ঐ রাঙ্গা চরণে"

গানের তালে তালে সেও গাইছে গান। অত:পর বিরবির করে বলে উঠলো,

" আদ্রিয়ান! আসছি আমি!"

চলবে,,,,,,,,,,

(সবাই ১.৩কে করে দিন প্লিজ। বেশি বেশি রেসপন্স করবেন। কারেন্ট নিয়ে অনেকের প্রবলেম। গ্রামে থাকি কিনা বলেও মন্তব্য করেছেন। এখন থেকে প্রবলেম হলে জানাবো না, অন্যান্য লেখিকাদের ফলো করবো, তারা কতদিন পর পর দেয় সেটা খেয়াল রেখে তারপর দিবো।সাতদিন পর চার হাজার শব্দের গল্প দিবো, প্রতিদিন না দিয়ে। আপনারা খুশি নিশ্চয়ই? )

গল্প নিয়ে প্রশ্ন কিংবা গল্পের সকল আপডেট জানতে জইন হোন আমার গ্রুপে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 39 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন