#মন_প্রাঙ্গনের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৪৪)
( অনুমতিবিহীন কপি করা নিষিদ্ধ।)
ইলহাম বাইরে দাঁড়িয়ে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ছে। আদ্রিয়ানের সামনে যাওয়ার সাহস নেই তার। ছেলেটার এইটুকু কষ্ট ও সহ্য করতে পারে না ইলহাম। আদ্রিয়ানের মেরুদণ্ড, ঘাড়, পেটের বাম পাশ ও হাঁটুর দিকটায় ওয়াশ করে নতুন করে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে । আপাতত সে বেড এ শুয়ে আছে আর নূর বাইরে ইলহামের সাথে কথা বলছে। যেসব জায়গায় ব্যান্ডেজ করেছে সেখানে ব্যথায় টনটন করছে। আদ্রিয়ান কপালে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
" এই জীবন রাখার জন্য এতো কষ্ট করে ওয়াশ করালাম জান হাতে নিয়ে! এর চেয়ে নিজের গাড়ির নিচে চাপা পড়ে যেতাম। "
অত:পর আবারও কিছু একটা মনে করে বললো,
" আবার একসময় করোনার টিকাও নিয়েছিলাম এই কচুময় জীবন রাখার জন্য। "
নূর প্লেটে খাবার বেড়ে আদ্রিয়ানের কাছে নিয়ে আসতেই দেখতে পায় তার করুন অবস্থা।
" আপনার খাবার। "
আদ্রিয়ান কপালের উপর থেকে হাত সরিয়ে নূরের দিকে তাকালো। নূর খাবারের প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
" খেয়ে নিন।"
" চাচ্চু কোথায়?"
" উনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। "
আদ্রিয়ানের সামনে আসলে ইলহামের কষ্ট হবে দেখে সে তার সামনে যায়নি একবারের জন্যেও। আদ্রিয়ান কিছু সময় নূরকে পর্যবেক্ষণ করে অত:পর বলে উঠলো,
" আমার কিছু বলার ছিলো।"
নূর হাতের কাজ রেখে আদ্রিয়ানের পাশে বসলো। সে কিছুসময় চুপ থেকে অত:পর বললো,
" ডিভোর্স চাইছিলে না। পেপার নিয়ে এসো আজই দিয়ে দিবো।"
" আপনি আগে সুস্থ হোন তারপর নাহয় এই ব্যপারে কথা বলবো।"
" আমি ঠিক আছি৷ তুমি পেপারস নিয়ে চলে যাও।"
" আপনি বারবার চলে যাওয়ার কথা বলছেন কেন? আমি থাকলে আপনার কি এমন ক্ষতি হচ্ছে?"
আদ্রিয়ান ডান পাশে ফিরে বললো,
" তুমি চলে যাও নূর। আমি তোমার উপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। এতোদিন ডিভোর্স চেয়ে এসেছিলে, আজ দিয়ে দেবো। মুক্তি দিয়ে দেবো তোমায়। এই বিকৃত চেহেরা আর দেখতে হবে না।"
" আপনাকে কে বলেছে আপনার চেহারা বিকৃত? "
" আমি কোন ছোট বাচ্চা নই। আমার চেহারায় এতো বড়ো দাগ থাকা সত্ত্বেও তুমি আমায় বলছো কেন বলেছে আমার চেহারা বিকৃত? শাহনাব হতে শুরু করে সকলেই জানে আমার চেহারা কতটা কুৎসিত। "
শাহনাবের নাম শুনে নূর সবটা বুঝতে পারলো৷ অত:পর সে ধীর কন্ঠে বললো,
" সকলে বলতে কি শুধু শাহনাব?"
" আমায় একা থাকতে দাও। বাড়ি চলে যাও তুমি, আমি আর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।"
" আমি কি একবার ও বলেছি আপনি আমার উপর বোঝা হয়ে আছেন।"
" সব কথা মুখে বলতে হয় না নূর। তুমি আমার উপর দয়া করছো আমার এই অবস্থা দেখে। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আমার সাথে থাকতে হবে না তোমার। আমি তোমার কাছে অনুরোধ করছি তুমি চলে যাও। "
" আমি চলে গেলেই আপনি ভালো থাকবেন? সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে? "
আদ্রিয়ান চুপ করে রইলো তার কথায়। হাত মুঠো পাকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। নূর আর কিছু বললো না, তার সামনে খাবারের প্লেট রাখতেই দেখলো টেবিলে পানি নেই। পানির বোতল নেওয়ার জন্য বাইরে যেতেই দেখতে পেলো রেজাউল খান গম্ভীর চাহনি তাক করে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। নূর আঁতকে উঠলো তাকে দেখে। তার মানে তিনি সব শুনে ফেলেছেন হয়তো। নূর আমতাআমতা করে বললো,
" আব্বা আপনি হঠাৎ... "
" তুমি এক্ষুনি বাড়ি যাবে আমার সাথে। "
নূর কিছু বলার সুযোগ পেলো না তার আগেই রেজাউল খান উল্টো পথে চলা শুরু করলেন। নূর ও তার পেছন পেছন চলতে শুরু করলো। রেজাউল খান আদ্রিয়ানের জন্য ফলমূল নিয়ে এসেছিলেন তাকে দেখতে কিন্তু আদ্রিয়ানের কথা শুনে তিনি মুহুর্তের মাঝেই জমে গেলেন। ইলহাম রেজাউল খানকে চলে যেতে দেখে এগিয়ে আসলেও তিনি থামলেন না। কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে চলে গেলেন। মোরশেদা বেগম কাপড় ধোয়ার জন্য কলপাড়ে যেতেই দেখতে পেলেন নূর ও রেজাউল খান দুজনেই একসাথে বাড়ি ফিরছে। তিনি ভেবেছিলেন নূর হয়তো আরও কিছুদিন থাকবে কিন্তু হঠাৎ চলে আসতে দেখে তিনি কিছুটা অবাক হলেন। রেজাউল খান রাগান্বিত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসলেন, অত:পর মোরশেদা বেগমকে বললেন,
" ব্যাগপত্র গোছাও বেগম। আমরা আজই ময়মনসিংহ রওনা দিবো।"
ময়মনসিংহ যাওয়ার কথা শুনে তিনি ভরকে গিয়ে জিগ্যেস করলেন,
" হঠাৎ ওখানে কেন?"
" ভাইজানের ছেলে ইকবালের সাথে বিয়ে হবে নূরের। আমি ভাইজানের সাথে কথা বলেছি।"
নূর এক মুহুর্তের জন্য থমকে যায় তার বাবার কথা শুনে। হঠাৎ এত বড় সিদ্ধান্তের জন্য সে প্রস্তুত ছিলো না। সে তার বাবার সামনে এসে বললো,
" এসব কি বলছেন আব্বা? আমি এখন আর এসব নিয়ে ভাবতে চাই না। "
" আগে যা হওয়ার হয়েছে। আমরাও নিরুপায় ছিলাম। কিন্তু এবার আল্লাহ তোমাকে আরো একবার সুযোগ দিয়েছে এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না আমরা। ইকবাল খুবই ভালো ছেলে , তোমাকে সুখে রাখবে সে। "
" কিন্তু আব্বা... "
" আর কোন কিন্তু নয়। এই বিয়েতে রাজি না হলে তুমি আমার মরা মুখ দেখবে। জীবন তোমাকে আরও একবার সুযোগ দিয়েছে যখন কাজে লাগাও। আদ্রিয়ান নিজেই রাজি হয়ে গিয়েছে তালাকের জন্য। "
নূরের মুখ দিয়ে আর কোন শব্দ বের হলো না। ঠিক ই তো, আদ্রিয়ান তো বলেছে তালাকের কথা। হয়তো আজকের ভেতর তালাক দিয়েও দিবে। এর আগে অনেক ভুল করেছে সে এইবার নাহয় মা-বাবার কথা মতোই কিছু একটা করুক। মোরশেদা বেগম ও স্বামীর মুখের উপর কিছু বলতে পারলেন না। ব্যাগপত্র গোছাতে শুরু করলেন তিনি।
_____________
" ছেলেরা হলো বাটপার, শূন্য পকেটে প্রেম করবে একজনের সাথে আর যখন পকেট ভরা থাকবে তখন বিয়ে করতে যাবে অন্য একজনকে।"
" তুমি আমাকে ভুল বুঝছো প্রিয়া। আমি তো বলিনি আমি বিয়ে করবো, বাবাই তো জোর করে ঠিক করেছে এই বিয়ে।"
ইকবালের কথায় প্রিয়া তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
" শোন ইকবালের বাচ্চা, আমাকে ধোঁকা দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবি তুই তা তো হবে না। তুই টাকলা হয়ে যাবি, তুই কানা হয়ে যাবি আমার অভিশাপে। ছয় বছর আমার সাথে প্রেম করে এখন বাপ মায়ের দোহায় দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবি তুই।"
"আমাকে কি পাগলে পেয়েছে যে ডিভোর্সী এক বাচ্চার মাকে বিয়ে করবো। বিশ্বাস করো প্রিয়া আমার বউ হবে শুধুমাত্র তুমি। "
" এই কথাটা নিজের বাপকে গিয়ে বলতে পারনি কেন তুমি? শোন তুমি কি ভেবেছো আমি বেটার অপশন পাবো না? হালবাত পাবো।"
" এসব বলে না প্রিয়া। আমি শুধু তোমাকেই বিয়ে করবো। "
প্রিয়া রেগে চলে যেতেই ইকবাল ও রেগে তার ঘরে চলে গেলো। ছয় বছরের সম্পর্ক ইকবাল ও প্রিয়ার। একসাথেই পড়াশোনা করেছে তারা। ইকবালের বিপদের সময় আর কেউ থাক না থাক প্রিয়া কখনো তার সাথ ছাড়েনি কিন্তু কয়েকমাস আগে ইকবালের চাকরি হওয়ার সুবাদে তার বাবা তার বিয়ে ঠিক করে চাচাতো বোন নূরের সাথে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার প্রতিবেশি প্রিয়া তা জেনে যায়। ইকবাল ঘরে ঢুকতেই দেখতে পায় তার বাবা খাচ্ছে। সে তার বাবার সামনে এসে বললো,
" বাবা আমি নূরকে বিয়ে করতে চাই না। সারা জীবন যাকে বোনের চোখে দেখে এসেছি তাকে এখন বউয়ের চোখে কিভাবে দেখব আমি? তার উপর নূর ডিভোর্সী। "
" মানুষের জীবনে অনেক ধরনের ঝড় ঝাপটা লেগেই থাকে। মেয়েটার প্রথম ঘরের স্বামী ঠিক ছিলো না এতে ওর দোষটা কই বাবা। "
" আমি কি সাহায্যের ভান্ডার খুলে বসেছি এখানে? আমাকেই কেন বিয়ে করতে হবে? "
" আমি বলেছি তাই। নূরকে আমি আমার মেয়ে হিসেবেই রাখতে চাই এই ঘরে। "
" তাহলে দত্তক নিয়ে এসো। আমার ঘাড়ে কেন চাপিয়ে দিচ্ছো?"
" চুপ!! বেয়াদব। "
ইকবাল রেগে তার ঘরে চলে গেলো, যাওয়ার সময় চিৎকার করে বলতে শুরু করলো,
" এখন থেকে যার'ই ডিভোর্স হবে তাকেই বলবো যেন আমায় বিয়ে করে নেয় কারণ আমি তো সাহায্যের ভান্ডার খুলে বসেছি। "
তার বাবা অবশ্য এসবে কান দিলেন না। কাল বিয়ে, সাদামাটা বিয়ে বিধায় কাজি এনে বিয়ে সম্পন্ন করবেন বলে ঠিক করেছেন।
রাতের ট্রেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রেজাউল খান। যেহেতু মাধবপুর স্টেশন অনেকটা দূরে তাই রাত আটটায় রওনা দিয়েছে তারা। তারা চলে যেতেই ইশিতা সাইমার ফোন থেকে আদ্রিয়ানকে ফোন করে। সাইমার নাম্বার ব্লক করে রাখায় ফোন ঢুকছে না। ইশিতা কি করবে ভেবে না পেয়ে তার মায়ের কাছে এসে বললো,
" আম্মু তোমার ফোনটা একটু দাও। আমার বান্ধবীকে ফোন করব।"
ইশিতার মা ফোন দিতেই সে আদ্রিয়ানের নাম্বারে কল করলো। আদ্রিয়ান শুয়ে আছে নিজের মতো। ইলহাম তার পাশেই বসে আছে। নূরের চলে যাওয়ার খবর শুনে সে কিছুটা মন খারাপ করলেও কিছু বলেনি। হঠাৎ অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসাতে সে খানিকটা অবাক হলো। ফোন কানের সামনে নিতেই ইশিতা বলে উঠলো,
" আদ্রিয়ান ভাইয়া, নূর আপুর কাল বিয়ে। "
ইশিতার কথা শুনে আদ্রিয়ান বাকরুদ্ধ। সে কি বলবে ভাষা খুঁজে পেলো না।
" কি বলছো এসব তুমি?"
" হ্যাঁ, ময়মনসিংহ ফুলবাড়িয়ায় যাচ্ছে খালামণিরা। আপুকে বিয়ে দিয়ে দিবে বলেছে। "
এইটুকু বলেই ফোন কেটে দিলো ইশিতা নয়তো কেউ সন্দেহ করবে আবার। এখনো তো ডিভোর্স পেপারে সই করেনি সে তাহলে। অত:পর কিছু একটা ভেবে চুপ করে রইলো। ইলহাম তার অবস্থা দেখে জিগ্যেস করলো,
" কে ফোন করেছে?"
" ইশিতা ফোন করেছিলো। নূরকে ময়মনসিংহ নিয়ে যাচ্ছে বিয়ে দিতে। "
ইলহাম আদ্রিয়ানের শান্ত ভাবভঙ্গিমা দেখে অবাক হলো। আগের আদ্রিয়ান হলে হয়তো এখন সব ছিন্নভিন্ন করে ফেলতো কিন্তু এই আদ্রিয়ান বড্ড অচেনা। ইলহাম বিরক্তিকর কণ্ঠে বললো,
" তোর বউয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আর তুই চুপ করে বসে আছিস? তুই কিছু করবি না? "
" কি করবো চাচ্চু? এই বিকৃত চেহারা নিয়ে ওকে ফিরিয়ে আনতে যাবো? নূর সুখে থাকুক তার নতুন স্বামী সংসার নিয়ে।"
" পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই? এসব কি উল্টোপাল্টা কথা বলছিস? "
" আমি চাই না নূর আমার উপর দয়া করুক। আমি বোঝা হতে চাই না ওর উপর?"
"নূর কি একবার ও বলেছে তোর চেহারা বিকৃত? সে কি একবার ও বলেছে তুই তার উপর বোঝা?"
" এসব না বললেও আমি বুঝি চাচ্চু। নূর আমাকে ঘৃণা করে। "
" নূর যদি তোকে ঘৃণাই করত তাহলে তোর এত সেবা যত্ন করত না। তোর এ''''ক্সিডেন্ট হওয়াতে সে রাত জেগে কান্নাকাটি করত না। দিনের পর দিন না খেয়ে তোর পাশে তোর জন্য নামাজ পড়ত না। এতসবের পরও বলছিস তুই ওর উপর বোঝা ও তোর উপর দয়া করছে! "
আদ্রিয়ান চুপ করে সব শুনছে। ইলহাম বিরক্ত হয়ে বলল,
" এখনো সময় আছে হাল ছেড়ে দিসনা। তুই গিয়ে আটকা ওকে। তুই যদি একবার বলিস নূরকে ফিরে আসতে নূর ফিরে আসবে। "
আদ্রিয়ান চুপ করে রইলো হঠাৎ কি মনে করে সে লাফ দিয়ে উঠে পড়লো। অসুস্থ শরীর নিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু সে হাতের ক্যানেলা খুলে বেরিয়ে গেলো। রুশান তার বাইক নিয়ে আসা যাওয়া করায় বাইকটা হাসপাতালর সামনেই আছে। আর কিছু না ভেবে বাইক চালিয়ে বেরিয়ে গেলো। আদ্রিয়ান বেরিয়ে যেতেই ইলহাম ও বেরিয়ে গেলো। রুশানকে বললো যেন সে পায়রার খেয়াল রাখে। আদ্রিয়ান স্টেশনে পৌঁছাতেই দেখতে পেলো ট্রেন ছাড়ার আর কিছু সময় বাকি মাত্র। সে এদিক ওদিক খুঁজতেই দেখতে পেলো নূর ট্রেনের জানলার পাশে বসেছে। ট্রেন ও মাত্র চলা শুরু করেছে। আদ্রিয়ানকে এই অবস্থায় এখানে দেখে নূর হতভম্ব। আদ্রিয়ান জানলায় হাত বাড়িয়ে ট্রেনের সাথে দৌড়াতে দৌড়াতে নূরের উদ্দেশ্যে বললো,
" নূর তুমি যেও না। তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো না। "
রেজাউল খান তাকে দেখে বিরক্তিকর কন্ঠে বললেন,
" এই ছেলে থামো। এখন এ'''ক্সিডেন্ট করে বসবে এভাবে দৌড়ালে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হওনি তুমি। "
আদ্রিয়ান তার কথায় পাত্তা দিলো না, ট্রেনের গতি বাড়তে শুরু করেছে। হাঁটুতে ক্ষত থাকা সত্ত্বেও সে হার মানলো না দৌড়াতে লাগল একই গতিতে। নূর কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলছে। আদ্রিয়ান তার হাত এগিয়ে দিয়ে বললো,
" আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো নূর। নাহয় আমি ম""রেও শান্তি পাবো না। স্বামীর অধিকার যেন আমি ছাড়া অন্য কারো না হয়৷ কথা দাও আমায়।"
নূর হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরলো। আর টাল সামলাতে পারলো না, উলটে পড়লো আদ্রিয়ান। নূর আঁতকে উঠলো এই অবস্থা দেখে। হাঁটু থেকে র'''ক্ত পড়ছে। আদ্রিয়ান সেসবে তোয়াক্কা করলো না কিন্তু ট্রেন দ্রুত গতিতে চলে গেলো। সে কি করবে বুঝতে পারলো না, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইলহাম ফোন করলো তাকে। ইলহামের ফোন ধরতেই সে বলে উঠলো,
" গাড়িতে উঠ। আমরাও ময়মনসিংহ রওনা দিবো। "
ইলহাম গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে। আদ্রিয়ান দেরি না করে স্টেশন থেকে বেরিয়ে মেইন রাস্তায় গিয়ে দেখে ইলহাম গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে। গাড়িতে উঠতেই তারাও রওনা দেয়।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গোধূলির বিপরীত প্রহর, স্নিগ্ধ প্রভাত ফুটে উঠেছে। ভোরে পৌঁছেছে নূর ও তার পরিবার। আরেকটু পরেই শুরু হবে কোলাহল। সারারাত দু চোখের পাতা এক করেনি নূর। ব্যাগপত্র নিয়ে কাঙ্খিত স্থানে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগেনি তাদের। মনিরুল ইসলাম তাদের স্বাগত জানায় তাদের। বিয়ের কাপড় আগ থেকেই নিয়ে রেখেছেন তিনি। নতুন পরিবেশ দেখে নূরের কিছুটা অসস্থি হচ্ছে। আদ্রিয়ানের জন্য চিন্তাও হচ্ছে তার। প্রেম টিকবে কিনা সেই চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি ইকবাল। কাল থেকে ব্লকলিস্টে রেখে প্রিয়া তাকে। নিজের ঘর থেকে বের হতেই নূর ও তার পরিবারকে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় ইকবালের। সে রেজাউল খান ও মোরশেদা বেগমকে সালাম করে আবারও উপরে চলে যায়। মনিরুল ইসলাম নূরের হাতে বিয়ের লেহেঙ্গা দিয়ে বললেন,
" তোমার বাবা বলেছিল শাড়ি কিনতে কিন্তু আমার ইচ্ছে ছিল লেহেঙ্গা কেনার। যাও মা পরে এসো। "
নূর তার মায়ের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি চোখ নামিয়ে ফেলেন কারণ তার হাতে করার মতো কিছুই নেই। নূর দেখিয়ে দেওয়া ঘরে চলে যায় কাপড় বদলাতে। আদ্রিয়ানের কথা মনে পড়ছে তার৷ কি করবে বুঝতে পারছে না। আদ্রিয়ান ও ইলহাম মাত্র ময়মনসিংহ পৌঁছেছে , ঠিক সেই সময় গাড়ির টায়ার পাঞ্চার হয়ে যায়। আদ্রিয়ানের মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরঘুর করছে , সকালে নূরের বিয়ে। এই শহর সম্পুর্ণ অচেনা। সে তবুও এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলো গাড়ি পাওয়া যাবে কিনা। একটা ছেলেকে বাইক চালিয়ে আসতে দেখে আদ্রিয়ান ইলহামের কাছ থেকে চার হাজার টাকা দিয়ে কয়েক ঘন্টার জন্য ভাড়া নেয় সেই গাড়ি। ক্ষতস্থান ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ডাক্তার তাকে বিশ্রাম নিতে বলেছিলো কিন্তু সে এতোদূর জার্নি করে আবার বাইক চালানোর কারণে শরীর দূর্বল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সে চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করে ।
ইকবাল বারবার ফোন করেই যাচ্ছে প্রিয়াকে কিন্তু কোন হুশ নেই প্রিয়ার । সে ফোন তুলছে না। মনিরুল ইসলাম ইকবালকে নিয়ে সোফায় বসাতেই নূরকে নিয়ে নেমে আসলেন মোরশেদা বেগম। নূরের শরীর কাঁপছে রীতিমতো। কাজী ও এসে বসে আছেন, শুধুমাত্র সই করাটাই বাকি। নূরকে সই করতে বলাতে সে এক পলকে তাকিয়ে রইলো তার বাবার দিকে। তিনি ইশারায় নূরকে বললেন সই করতে । নূর সই করতে নিয়েও পারলো না চুপ করে বসে রইলো ঠিক সেই সময় ইলহাম বাড়ির ভেতর ঢুকে চিৎকার করে বললো,
" নিমোক হারাম! আমার আদ্রিয়ান ওখানে নিজের শেষ নিঃশ্বাস নিতে চলেছে।"
টুপ করে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো নূরের চোখ থেকে। বাকিরা সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ইলহামের দিকে। রেজাউল খান রাগান্বিত স্বরে ইলহামকে বললেন,
" আমার মেয়েটাকে শান্তি দিবে না তোমরা? নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে সে। "
" আমার ভাতিজা মৃ'''ত্যুর মুখে আর আপনি বলছেন আপনার মেয়ের নতুন জীবনের কথা!"
নূর কাঁপা কাঁপা শরীর দাঁড়িয়ে যায়। এক পলকে তাকিয়ে থাকে তার বাবার দিকে। নূরের চোখের ভাষা বুঝতে পেরে তিনি চুপ করে রইলেন। অত:পর নূর ইলহামের কাছে দৌড়ে এসে বলল,
" আমাকে উনার কাছে নিয়ে চলুন। আর দেরি করবেন না চলুন।"
ইলহাম নূরকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই রেজাউল খান ধপ করে বসে পড়লেন সোফায়। কাজী অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন,
" আজ কি বিয়ে হবে না? "
ইকবাল দ্রুত বললো,
" হবে। বিয়ে আজকেই হবে।"
রেজাউল খান ভেবেছেন ইকবাল নূরের কথা বলছে তাই তিনি হাত জোর করে বললেন,
" আমায় ক্ষমা করে দাও ইকবাল। আমার মেয়ে এমন কিছু করবে আমি আশা করি নি।এমনটা হওয়ার কথা ছিলো না। "
" ভালোই করেছে। আমি আগেই বলেছিলাম আমি এই বিয়েতে রাজি না, এখন আমার পথ খালি। আমি যাচ্ছি আমার প্রিয়াকে নিয়ে আসতে।"
ইকবাল দ্রুত এগিয়ে গেলো প্রিয়ার ঘরের সামনে। প্রিয়া দরজা খুলে ইকবালকে বর বেশে দেখে বললো,
" বিয়ে করে মিষ্টি দিতে এসেছিস হারামজাদা। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!"
" আরেহ তোমাকে বিয়ে করতে এসেছি। চলো কাজী অপেক্ষা করছে। "
হাসপাতালে যেতেই নূর যখন নার্সকে জিগ্যেস করলো আদ্রিয়ানের কোন কক্ষে, তখন তিনি নূরকে ৪০১ নাম্বার কক্ষে নিয়ে যান।সেখানে যেতেই নূর দেখতে পায় সাদা কাপড়ে আবৃত সেই লা''শকে। নার্স এসে বললেন,
" এই কক্ষের পেশেন্ট মা''রা গিয়েছেন কিছুক্ষণ আগেই।"
নূর কাঁপা কাঁপা হাতে লা''শের মুখ থেকে সাদা কাপড় সরাতেই দেখতে পেলো,
চলবে,,,,,,,,
( আজকে থেকে রেগুলার পাবে আগের মতো। অসুস্থ থাকায় কিছুদিন মিস গিয়েছে। বড়ো পর্ব দিয়েছি কিন্তু।সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করবেন ।)