#মন_প্রাঙ্গনের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৫১) এর বর্ধিতাংশ
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি কোন লাইন ও কপি করা যাবে না।)
" কি করছেন? "
নূরের প্রশ্নে আদ্রিয়ান ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো। এক মুহুর্তের জন্য যেনো সে হারিয়ে গিয়েছিলো অন্য এক ভাবনায়। হঠাৎ করেই অপ্রস্তুত হয়ে গেল সে।নূর বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকাতেই আদ্রিয়ান দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা বেলকনির দিকে চলে গেল সে। নূর আদ্রিয়ানের হাবভাব বুঝতে পারলো না সে। হঠাৎ ফোন বেজে উঠতেই নূর ফোন হাতে নিয়ে দেখলো তার মায়ের নম্বর থেকে ফোন এসেছে। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইশিতা বলে উঠলো,
" আপু আমাকে নিতে আসবে না? "
ইশিতার কথা মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গিয়েছিলো। ব্যস্ত থাকায় ফোন ও করতে পারেনি। না জানি কি ভাবছে মেয়েটা। নূর আমতাআমতা করে বললো,
" ইশ! আমি একদম ভুলেই গিয়েছিলাম। রাগ করেছো ইশু?"
" মোটেই না। বরঞ্চ আরও বেশি রাগ করেছি।"
" তা কি করলে ইশু পাখির রাগ ভাঙবে শুনি?"
" ভাইয়াকে বলো আমাকে এক্ষুণি নিতে আসতে। আমি আর এই বাড়িতে থাকবো না। ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি।"
নূর স্মিত হাসলো তার কথায়। এই মেয়ে ভীষণ চটপটে, মায়ের সাথে একটু কথা কাটাকাটি হলেই ব্যাগপত্র গুছিয়ে চলে আসত তাদের বাড়িতে। আজও হয়তো এমন কিছু করেছে । নূর ঠোঁট টিপে হেসে বললো,
" খালামণির সাথে ঝগড়া হয়েছে? "
নূরের বলা দেরি কিন্তু ইশিতার ক্রন্দনরত শব্দ বের হতে দেরি নেই। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো,
" সাইমা আপু আম্মুর কাছে বিচার দিয়েছে তোমার সাথে কথা বলায়। তাই আম্মু আমাকে ঝাটা দিয়ে মেরেছে। আমি আর এই বাড়িতে থাকবো না। আমাকে এক্ষুনি নিতে আসতে বলো আদ্রিয়ান ভাইয়াকে। "
" ঠিক আছে, আর কাঁদতে হবে না। আমি এক্ষুণি তোমার ভাইয়াকে বলছি যেন তোমাকে নিয়ে আসে। "
ইশিতা হেঁচকি তুলতে তুলতে ফোন কেটে দিলো। নূর ফোন রেখে হেসে উঠতেই আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে। কার সাথে কথা বলে হাসছে নূর, বুঝে উঠতে পারলো না। সে বেলকনি থেকে নূরের সামনে এসে দাঁড়াতেই নূর বলে উঠলো,
" যান মশাই তৈরি হয়ে নিন। ইশিতা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। "
ইশিতার কথা শুনে আদ্রিয়ান খানিকটা অবাক হলো কারণ ইশিতার তো কিছুদিন আগে আসার কথা ছিলো কিন্তু যেহেতু আসেনি তাই সে ভেবেছিলো হয়তো কাল আকিকার সময় আসবে।
" এখন নিয়ে আসতে যাবো? "
" হ্যাঁ। খালামণির সাথে ঝগড়া করে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়েছে। তারাতাড়ি যান নাহয় চোখের পানিতে বাড়িঘর ভাসিয়ে দিবে।"
নূরের কথায় আদ্রিয়ান উচ্চস্বরে হেসে ফেলে। আকাশি রঙের একটা শার্ট পরে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পরে সে। জানলার পাশে বসে আছে সাইমা। হঠাৎ আলো দেখে বাইরে তাকাতেই দেখতে পায় আদ্রিয়ানকে। এই সময় হঠাৎ আদ্রিয়ানকে দেখে সে প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে বসে। সে ভেবেছে আদ্রিয়ান হয়তো তার জন্য এসেছে তাই সুন্দর করে উড়না দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টিকলো না। বাইরে এসে দেখে ইশিতা ব্যাগ নিয়ে বের হচ্ছে। আদ্রিয়ানকে দেখে ইশিতা ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে পরে কিন্তু বাইক দেখে ঢোক গিলে সে। বাইকে উঠতে ভয় পায়, মনে হয় যেনো এক্ষুণি পড়ে যাবে। কিন্তু আদ্রিয়ানকে এই ব্যপার টা কিভাবে বলবে। জ্বীন নিয়ে মজা করায় আদ্রিয়ান যদি তার উপর প্রতিশোধ নেয় তখন। আদ্রিয়ান ইশিতার দিকে তাকিয়ে অধরে হাসি ফুটিয়ে বললো,
" ব্যাগটা দাও ইশিতা। উঠে বসো। "
ইশিতা দোয়া পড়তে পড়তে বাইকে উঠে বসে
আজই বোধহয় তার শেষ দিন। সে মিনমিন করে বললো,
" আল্লাহ এবারের মতো বাঁচিয়ে দাও, পরের বার থেকে আর আকাম কুকাম করবো না। "
ইশিতা বাইকে উঠে বসতেই সাইমার হতবাক হয়ে যায়। আদ্রিয়ান ইশিতাকে নিতে এসেছে তার জন্য আসেনি। সে চোয়াল শক্ত করে ইশিতার উদ্দেশ্যে বললো,
" এই তুই এই সময় কোথায় যাচ্ছিস? আজকাল বেশি উঠছিস তাই না? আম্মাকে বলে তোর ডানা ছাটাই করব আমি। "
ইশিতা সাইমাকে মুখ ভেঙিয়ে বললো,
" আম্মুকে বলে এসেছি। এখন তুমি শান্তিতে থাকো ডাইনি আপা।"
সাইমা তেড়ে আসবে তার আগেই আদ্রিয়ান বাইক চালিয়ে চলে যায়। ইশিতার কথা শুনে পেট ফেটে হাসি আসছে তার। অপরদিকে ইশিতার অবস্থা নাজেহাল। এখনি বুঝে পড়ে যাবে সে। বাইকে আজই প্রথমবার উঠা তার। পাশে ট্রাক চলতে দেখে সে এবার ভয়ে ভয়ে বলে উঠলো,
" আল্লাহ আর কোনদিন আকাম করবো না এইবার শুধু বাঁচিয়ে দাও। এখনো তো বিয়ে করা বাকি আমার। "
হঠাৎ জোরে জোরে সূরা পড়া শুরু করলো সে
আদ্রিয়ান তাকে সূরা পড়তে দেখে নিজেও থতমত খেয়ে বসলো। সে বাইক চালানো অবস্থায় বলে উঠলো,
" তুমি কি জ্বীন দেখে সূরা পড়ছো ইশিতা?"
" এখনো দেখিনি কিন্তু সামনে দেখতে পাবো। "
আদ্রিয়ান ইশিতার কথায় হা করে পেছন ফিরে তাকায় ইশিতার দিকে, তাতেই ইশিতা চিৎকার করে উঠলো। আদ্রিয়ান ভেবেছে জ্বীন হয়তো দেখতে পেয়ে গিয়েছে কিন্তু তার কিছু বলার আগেই ইশিতা বলে উঠলো,
" সামনে তাকান ভাইয়া! মরে যাবো তো। আমার এখনো নাতি নাতনীকে গল্প শুনানো বাকি!"
আদ্রিয়ান বাইক থামিয়ে ইশিতার দিকে তাকিয়ে বললো,
" আরেকটু হলেই তো পটল তুলতে যেতাম দুজনেই। এতো জোরে চেঁচানোর কি আছে।"
" আপনার তো তাও বিয়ে হয়ে গিয়েছে আমার তো তাও হয়নি। আমি আগে মরে গেলে কত দুঃখটাই না থাকতো।"
আদ্রিয়ান অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এইটুকু মেয়ের কি চিন্তাভাবনা। এখনো স্কুল শেষ হয়নি অথচ বিয়ের কথা চিন্তা করছে।
সাইমা ফোসফোস করতে করতে তার মায়ের ঘরে গেলো। তার মা ধনেপাতা বেছে বেছে রাখছেন। সে তার মায়ের সামনে এসে বললো,
" আম্মা তোমার মেয়ের কিন্তু সাহস খুব বেড়েছে। ইশিতা আদ্রিয়ান ভাইয়ার সাথে বেরিয়ে গিয়েছে অথচ তুমি এখানে ধনেপাতা নিয়ে বসে আছো।"
" আদ্রিয়ান কে?"
" নূরের স্বামী। দেখেছো তোমাকে না বলেই বেরিয়ে গিয়েছে।"
" তুই ওসব নিয়ে ভাবিস না। নূর ফোন করে আমায় বলেছে। "
" তার মানে তুমি জানতে?"
" হ্যাঁ। কাল তো আমাদের ও দাওয়াত দিয়েছে আকিকাতে। "
সাইমা বাকরুদ্ধ উনার কথায়। কি বলবে জবাব খুঁজে পেলো না। বাইক থেকে নামতেই যেন দেহে প্রাণ ফিরে এলো। নূর তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলো বসার ঘরে। নূরকে দেখতে পেয়ে ইশিতা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো। অত:পর আদ্রিয়ানের নামে বিচার দিতে দিতে বললো,
" তোমার বর এমন ভাবে বাইক চালিয়েছে আরেকটু হলেই আজরাইল চলে আসতো। জান হাতে নিয়ে এসেছি আপু, তুমি এর বিচার করো। জ্বীনের ঘটনার প্রতিশোধ নিচ্ছিলো উনি আমি জানি।"
আদ্রিয়ান তার কথা শুনে তেড়ে এসে বললো,
" মোটেও না। উল্টো এই মেয়ের জন্য আমি আরেকটু হলেই টপকে যেতাম। কি জোরে চিৎকার টাই না দিলো। "
" আপনি পেছনে তাকাচ্ছিলেন তাই ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে ফেলেছি। "
" তুমি সূরা পড়া শুরু করলে দেখেই তো তাকিয়েছি। "
আসতে না আসতেই লেগে গিয়েছে আগুন দুজনের মাঝে। নূর ইশিতার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে বললো,
" দুজনেই থামো। যাও ফ্রেশ হয়ে এসো আমি নাস্তা দিচ্ছি। আদ্রিয়ান আপনিও ভেতরে যান, আরহাম কাঁদছে, ওকে একটু কোলে নিন। "
নূর ইশিতাকে নিয়ে তার জন্য রাখা ঘরে গেলো। আদ্রিয়ান পায়রার ঘরে যেতেই দেখতে পেলো পায়রা দুজনকে রেখে ওয়াশরুমে গিয়েছে। যদিও আয়ান খেলছে কিন্তু আরহাম কাঁদছে। আদ্রিয়ানকে দেখতেই আয়ান টিপটিপ করে তাকালো তার দিকে। চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোলে উঠতে চাইছে সে। কিন্তু আয়ানকে কোলে না নিয়ে আরহামকে কোলে নিলো সে। অত:পর আয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
" আজকে ভাইয়ার পালা। ভাইয়া উঠুক পরে তোমাকে নিবো কেমন? রাগ করে না। "
আরহামকে কোলে নিয়ে হাঁটছে আদ্রিয়ান অথচ আয়ান ঘুরে ফিরে তার দিকে তাকাচ্ছে। ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলবে এমন একটা ভাব। আদ্রিয়ান তা দেখে বললো,
" মাত্র এই কয়দিনেই এতো কোল পাগল হয়ে গিয়েছো? কাঁদে না, তুমি না গুড বয়। ভাইয়া ঘুমাক তারপর তোমাকে নিবো।"
আরহামের কান্না থামছে না, ছেলেটা মা পাগল অবশ্য। কোথা থেকে যেন ইশিতা এসে ধপ করে বসলো বিছানায়। আয়ানকে দেখেই কোলে নিয়ে টপাটপ কয়েকটা চুমু দিয়ে দিলো গাল ভরে। অত:পর বুকে জড়িয়ে ধরে বললো,
" এতো সুন্দর হয়েছে পায়রা আপুর ছেলে! "
ইশিতার কথায় নূর পেছন থেকে বলে উঠলো,
" এভাবে বলতে হয় না। বলো " মাশাল্লাহ "
নূরের কথায় ইশিতা সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পেরে কপালে আলতো চাপড় দিয়ে বললো,
"আরে হ্যাঁ! মুখ ফসকে বের হয়ে গেছে। মাশাল্লাহ"
নূর বিছানায় এসে বসলো। ইশিতা আবারও আয়ানের কপালে আলতো করে চুমু খেল। আয়ান ও চুপটি করে শুয়ে খালামণির কান্ডকারখানা দেখছে। ঠিক তখনই আরহামের কান্না আরও জোরে বেড়ে গেল। ছোট্ট মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে, দু'হাত ছুঁড়ে ছুঁড়ে কাঁদছে সে। আদ্রিয়ান তাকে বুকে আগলে দোলাতে লাগল।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে পায়রা বেরিয়ে এলো।আরহামের কান্নার আওয়াজ শুনে আদ্রিয়ানের কাছ থেকে তাকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে বললো,
" এই তো আব্বু। চলে এসেছি তো আম্মু। খিদে পেয়েছে আমার আব্বার?"
পায়রার কথা কানে যেতেই আরহামের কান্না এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ভিজে চোখ দুটো নিয়ে তাকিয়ে রইলো মায়ের পানে। ছেলেটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না থামিয়ে বুকের সঙ্গে মুখ গুঁজে রইল। অপরদিকে আয়ানকে কোলে নিয়ে খেলছে ইশিতা। ফর্সা আদুরে গাল দুটোতে কতবার চুমু খেয়েছে হিসেব নেই তার। আরহামকে পায়রার কোলে দিতেই আদ্রিয়ান আয়ানকে নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায়। কিন্তু ইশিতা আয়ানকে ছাড়তে রাজি নয়। আজ তো আয়ানকে সে কোল ছাড়া কিছুতেই করবে না। নূর রান্নাঘরে এসেছে রাতের খাবার তৈরি করতে। যদিও ফারজানা সব তৈরি করে গিয়েছে। গরুর মাংস ভুনা, আলু ভর্তা আর ডাল। আজ বেশিকিছু করেনি। ডান আর ভর্তা ফারজানা বানিয়ে দিয়েছিলো শুধু গরুর মাংস টা নূর রান্না করেছে ইশিতা আসবে শুনে। টেবিলে খাবার বেড়ে সুরাইয়া শাহ'র জন্য আলাদা করে দিয়ে এসেছে। অসুস্থ থাকায় তেমন একটা চলাফেরার সাহস পায় না। আদ্রিয়ানের ক্ষত ও সেরে গিয়েছে শুধুমাত্র মুখের দাগ ছাড়া। যদিও তার কিছু যায় আসে না এই দাগ নিয়ে। কিন্তু আদ্রিয়ান মাঝে মাঝে এই ব্যপার নিয়ে মন খারাপ করে। ভাবনার মাঝেই আদ্রিয়ান ও ইশিতা চলে এলো খাবার টেবিলে। ইলহাম এখনো ফিরেনি। পায়রা বাচ্চা দুটোকে ঘুম পাড়িয়ে খেতে আসলো টেবিলে। ইদানীং ইলহাম খুব একটা সময় দেয় না তাকে। বাহির থেকে ফিরে যতক্ষণ থাকে বাচ্চাদের নিয়েই সময় কেটে যায় ইলহামের। পায়রাও অতো অধিকার খাটায় না তার উপর। খাওয়া শেষে নূর সব এক এক করে গুছিয়ে রাখছে স্র ইশিতা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে গল্প করছে তার সাথে। প্রতিদিনের মতোই নূরকে সাহায্য করতে এসেছিলো আদ্রিয়ান কিন্তু ইশিতাকে দেখে আর সামনে এগিয়ে এলো না। রুমে চলে গেলো তৎক্ষনাৎ। দুইদিন পর নূরের জন্মদিন। বিবাহবার্ষিকীতেও কিছু দিতে পারেনি সে নূরকে। এতোসব ঝামেলার মাঝে হয়ে উঠেনি। রাত দুটো বাজে, কিন্তু নূরের এখনো ঘরে ফেরার নাম নেই। রান্নাঘরের সমস্ত কাজ সেরে সে ইশিতার ঘরে গল্প করছে তার সাথে। এইদিকে আদ্রিয়ান ও ঘুমায়নি এখনো। নূরের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তার ধৈর্য শেষ হয়ে আসছে। এক বার গিয়ে দেখে আসতে ইচ্ছে করছে কিন্তু পরে কিছু একটা ভেবে আর গেলো না।
রজনীর কালো আবরণ অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। পূর্বাকাশে অরুণোদয়ের রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্য ধীরে ধীরে নিজের দীপ্তি মেলে ধরেছে। স্নিগ্ধ সকালের কোমল আলোয় জেগে উঠেছে নিদ্রামগ্ন ধরিত্রী। বিছানার উপর উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে আদ্রিয়ান । অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে খবর নেই তার। এলার্মের তীক্ষ্ণ শব্দ কানে আসতেই ঘুম ভেঙে গেল তার । বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকে বিছানার পাশ থেকে ফোনটা হাতে তুলে এলার্ম বন্ধ করলো সে। আধখোলা চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলো সকাল আটটা বাজে। এতোক্ষণে হুশ এসেছে তার, আজ আয়ান আর আরহামের আকিকা। পাশ ফিরে নূরকে দেখতে না পেয়ে ভাবলো হয়তো রাতে আর এই ঘরে আসেনি। কিন্তু নূরের ফোন পাশে দেখেই নিশ্চিত হলো যে রাতে এখানেই ঘুমিয়েছিলো। হয়তো দেরি করে এসেছিলো । তাই সকাল থেকেই বাড়িতে শুরু হবে ব্যস্ততার হিড়িক। আদ্রিয়ান তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। চুলে একবার হাত চালিয়ে ঘরের চারপাশে চোখ বুলালো সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো সে। সাদা পাঞ্জাবিটা গায়ে চাপিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতঘড়িটা পরে নিল। অত:পর সিড়ি বেয়ে নিয়ে নামতেই নিচতলা থেকে ভেসে এলো মানুষের কথাবার্তা ও টুংটাং আওয়াজ। হয়তো বাবুর্চি ও কাজের লোকেরা এসে পড়েছে
সকাল থেকেই আকিকার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ইলহাম। উঠোনে কয়েকজন কর্মচারী প্যান্ডেলের শেষ কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। উঠোনের ডান পাশে বড় বড় ডেগে রান্না চলছে পুরোদমে। চৌধুরী পরিবারের সবাই চলে এসেছে ইতিমধ্যে। বাড়ির কাজের সুবিধার্থে দুজন মহিলাকে আলাদাভাবে রাখা হয়েছে। নূর এক এক করে তাদের দেখিয়ে দিচ্ছে কি কি করা লাগবে। ইশতেহার চৌধুরী ও শামীমা চৌধুরীকে দেখে নূর তাদের সালাম করে ভেতরে বসতে বললো। শাহনাব ও ইরাও প্রবেশ করলো কিছুক্ষণ পর। আদ্রিয়ানকে নামতে দেখে ইলহাম তড়িঘড়ি করে তার কাছে এসে বললো,
" উঠেছিস তুই। বাবুর্চি ও কসাইরা চলে এসেছে। তুই বাইরে গিয়ে দেখে আয় সব ঠিকঠাক আছে কিনা। "
" হ্যাঁ চাচ্চু যাচ্ছি।"
নূর সবাইকে শরবত ও সেমাই এনে দিলো। আদ্রিয়ান না খেয়ে বের হওয়ায় তার জন্য আলাদা করে রেখে দিয়েছে। আজ যেহেতু শুক্রবার, সবাই জুমার নামাজের পরেই আসবে। আর বেশি দেরি নেই মেহমান আসার। ইশিতা হালকা সোনালী রঙের একটি থ্রি-পিস পড়েছে। শ্যামলা গড়নে মানিয়েছে তাকে। ইরা আরহামকে তার কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে আদর করে চুমু খেলো তার গোলগাল গালে। আয়ান শাহনাবের কোলে শুয়ে আছে। তাকে হাসতে না দেখে শাহনাব ফিসফিস করে বললো,
" আদ্রিয়ানের বেলায় তো ঠিকই খিলখিল করে হাসো। এখন হাসছো না কেন? শুনো একদম ওই বজ্জাতটার মতো হবে না। আমার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে ওই বজ্জাত। আগ থেকে সাবধান করে দিচ্ছি। ছোট ভাই হিসেবে দায়িত্ব আছে না।"
আয়ানের হাত পা নড়ে উঠতেই শাহনাব তার গাল টিপে বললো,
" এই তো বুঝে গিয়েছো দেখছি। একদম দূরে দূরে থাকবে ওই বজ্জাতের থেকে। "
"ওকে কি বদবুদ্ধি দিচ্ছিলি তুই? "
আদ্রিয়ানের কন্ঠস্বর কানে আসা মাত্রই আয়ান নড়ে চড়ে উঠলো। সে দরজায় হেলায় দিয়ে দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল। শাহনাব আদ্রিয়ানের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
" তাতে তোর কি? তোর একার ভাই নাকি? "
" অবশ্যই আমার একার। তুই কোন ক্ষেতের মূলা আবার। "
নূর নাশতা নিয়ে আসতেই দেখতে পায় দুজনেই একসাথে হতেই যুদ্ধ বাজানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়েছে। আদ্রিয়ান শাহনাবের কাছ থেকে আয়ানকে কোলে নিয়ে বললো,
" শোন টমেটো, এই লাফাঙ্গার একটা কথাও শুনবি না। শালা এক নাম্বারের বজ্জাত। "
" তুই কোন পীর বাবা যে আমাকে বজ্জাত বলছিস। "
" হপ! আমি ভালোই। "
নূর তাদের ঝগড়া শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো। শাহনাবের দিকে মিষ্টি এগিয়ে দিয়ে বললো,
" শাহনাব ভাই মিষ্টি খান।"
শাহনাবকে মিষ্টি দেওয়ায় আদ্রিয়ানের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। সে আড়চোখে তাকিয়ে আয়ানকে দোলাচ্ছে। নূর একটা মিষ্টি প্লেট থেকে তুলে আদ্রিয়ানের মুখে পুরে দিয়ে বললো,
" সেমাই রাখা আছে, খেয়ে নিবেন। "
এতোক্ষণে অধরে হাসি ফুটে উঠলো তার। নূর শাহনাবের সামনে তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেওয়ায় সে শাহনাবের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে আয়ানের নাকে নাক ছুঁইয়ে বলে উঠলো,
" দেখেছিস টমেটো, তোর ভাবী আমাকে কত ভালোবাসে। কিছু মানুষের কপালে তো বউয়ের ভালোবাসাও জুটে না। "
আদ্রিয়ান কথায় ব্যপক রেগে গেলো শাহনাব। সে রাগে ফুসতে ফুসতে চলে গেলো। ইরা আরহামকে নিয়ে তার সামনে আসতেই মনে মনে বলে উঠলো,
" এই ডাইনির জন্য আজ আমার এই অবস্থা। সেদিন যদি এই মেয়ে না আসতো তাহলে আজ সে শান্তিতে থাকতে পারতো। "
মনে মনে নিজেকে বেশ কয়েকবার গালি দিয়ে কপাল চাপড়ালো সে। পায়রা আয়ান ও আরহামকে তৈরি করার জন্য আলমারি থেকে দুই সেট কাপড় বের করলো। আরহামকে ইরার কোন থেকে নিয়ে কাপড় পড়াতে পড়াতে আদ্রিয়ানের দিকে আরেক সেট কাপড় এগিয়ে দিয়ে বললো,
" ওকে পড়িয়ে দাও। আর হ্যাঁ ডায়েপার রাখা আছে ঝুড়িতে। "
আদ্রিয়ান যেই না আয়ানকে বিছানায় শুইয়ে তার প্যান্ট খুললো ডায়েপার পড়ানোর জন্য। অমনি সে হিসু করে দিলো আদ্রিয়ানের কোলে। আদ্রিয়ান ছিটকে সরে গেলো তার কাছ থেকে। পড়িয়ে রাখা প্যান্টে একটু হিসু করেনি, যেই না আদ্রিয়ান প্যান্ট খুললো তখনি করে দিলো। আদ্রিয়ান সকালেই গোসল করে নিয়েছিলো। এখন যদি কোলেই করে দিতো তাহলে আবার গোসল করা লাগতো। সে আয়ানের দিকে তাকিয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,
" মুতু করার জন্য আমার কোল'ই পাস তুই? তোর চালাকি আমি বুঝি না? এটা কি পানির কল নাকি যখন তখন ছেড়ে দিবি। আরেকটু হলেই তো কেল্লা ফতে হয়ে যেতো।"
আয়ান আদ্রিয়ানের কথায় উন্মুক্ত মাড়ি দেখিয়ে হেসে উঠতেই আদ্রিয়ান ও হেসে উঠলো। অত:পর তাকে বেশ যত্ন নিয়ে তৈরি করিয়ে দিলো।
চলবে,,,,,,,,,,
( সবাই ১.৫কে করে দিন জলদি।রেসপন্স করুন)
গল্প নিয়ে প্রশ্ন কিংবা গল্পের সকল আপডেট জানতে জইন হোন আমার গ্রুপে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/