#মন_প্রাঙ্গনের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৫২)
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পুর্ণরুপে নিষিদ্ধ।)
পায়রা আত্মীয় স্বজন সকলের সাথে কথা বলছে তাদের নাস্তাপানি এগিয়ে দিচ্ছে। সুরাইয়া শাহ আরহামকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। বংশের প্রথম সন্তান হওয়ায় সকলের আদর ভালোবাসা পাচ্ছে আয়ান ও আরহাম। আয়ানকে আদ্রিয়ান কোল ছাড়া করছে না কিছুতেই। অন্যদিনের তুলনায় আর দুজনেই বেশ শান্ত। শাহনাব ও ইরা একপাশে বসে আছে, আদ্রিয়ানের ফুপি শাহিলা তালুকদার ও এসেছেন আজ। আদ্রিয়ানের প্রতি তার আর আগের মতো ক্ষোভ নেই। আদ্রিয়ানের ভেবেছিলো উনি হয়তো আগের মতোই তাকে উপেক্ষা করে চলে যাবেন। কিন্তু এবার আদ্রিয়ানকে হতবাক করে দিয়ে তিনি তাকে জড়িয়ে ধরলেন। আজ প্রথমবার তার ফুপি তার সাথে কথা বলেছে। বিষয়টা যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। আদ্রিয়ান তো সৌজন্যের খাতিরে উনাকে সালাম করতে গিয়েছিলো কিন্তু তিনি যে তাকে বুকে আগলে নিবেন তা সে ভাবেনি। শাহিলা তালুকদার আদ্রিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
" কিছু খেয়েছিস নাকি সকাল থেকে কাজ'ই করে যাচ্ছিস?"
আদ্রিয়ানের বিষ্ময় যেন কাটছেই না। সে আমতাআমতা করে বললো,
" খেয়েছি ফুপি। আপনি ভেতরের রুমে গিয়ে বসুন। "
শাহিলা তালুকদার স্মিত হেসে চলে গেলেন। মূলত তার ক্ষোভ ছিলো রাহেলা শাহ'র প্রতি। তার খুব অহংকার ছিলো আদ্রিয়ানকে নিয়ে। আদ্রিয়ান আসার পর থেকেই তার ছেলেকে অবহেলা করা শুরু হয়। তাই সেই ক্ষোভেই এতোদিন আদ্রিয়ানের প্রতি খারাপ আচরণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু আজ যেহেতু রাহেলা শাহ নেই তাহলে আর কেন সেই পুরোনো রাগ পুষে রাখবেন তিনি। অবশ্য ইলহাম ও অনেক করে বুঝিয়েছে তাকে। নূরের মা বাবাও চলে এসেছেন ইতিমধ্যে। তার খালা ও সাইমাও এসেছে। সাইমাকে দেখে নূর কিছু বললো না। সাইমার দুচোখ তখন থেকে আদ্রিয়ানকে খুঁজে চলেছে। প্রভাতের কোমলতা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে দিনের মধ্যভাগের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, রৌদ্রের তাপ ছড়িয়ে পড়ছে শাহ বাড়ির বিস্তীর্ণ উঠোনজুড়ে। ইমাম সাহেব পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করলেন। আদ্রিয়ান ও ইলহামের কোলে দুই নবজাতক। তিলাওয়াত শেষে তিনি দুই শিশুর সুস্থতা, দীর্ঘায়ু, ঈমানদার জীবন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে হৃদয়স্পর্শী দোয়া করলেন। উপস্থিত সবাই দু'হাত তুলে সেই দোয়ায় শামিল হলো। "আমিন" ধ্বনি উচ্চারণ হতেই মুখর হয়ে উঠল পুরো আঙিনা। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই শিশুর নাম ঘোষণা করার পালা। ইলহাম তার দুই ছেলের নাম উচ্চারণ করলো "আয়ান " ও "আরহাম"। নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে চারদিক করতালিতে ভরে উঠল। আত্মীয়-স্বজন একে একে এগিয়ে এসে আয়ান ও আরহামের কপালে আলতো করে চুমু এঁকে উপহার দিতে শুরু করলেন। নূরের মা স্বর্ণের চেইন উপহার দিলেন দুই নাতিকে। শাহিলা তালুকদার আংটি গড়িয়ে এনেছেন। সবার দেওয়া শেষ হলে তবেই আদ্রিয়ান নূরকে ইশারা করলো কিছু একটা নিয়ে আসতে। নূর দ্রুত সিড়ি বেয়ে তাদের ঘর থেকে আলমারিতে রাখা শপিং ব্যাগ নিয়ে আসে। আদ্রিয়ান সেখান থেকে দুই জোড়া কাপড় ও দুটো আংটি বের করে পায়রার সামনে দিলো। শাহনাবের পরিবার ও আয়ান ও আরহামের জন্য আংটি গড়িয়েছে। বেশিরভাগই টাকা দিয়েছে। পায়রা কখনো ভাবেনি তার সন্তান এতোটা ভালোবাসা পাবে সকলের কাছ থেকে। এর মাঝেই বাহির থেকে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ শোনা গেলো। অনুষ্ঠানের সময় আবার কিসের ঝামেলা হলো। আদ্রিয়ান বাহিরে ছুটে গিয়ে দেখলো দারোয়ানের সাথে একজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির তুমুল ঝগড়া চলছে। পেছবে থাকা বাকিরাও চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেছে। আদ্রিয়ান আয়ানকে পায়রার কোলে দিয়ে, সামনে এসে দারোয়ান চাচাকে জিগ্যেস করতেই তৃতীয় লিঙ্গের সেই ব্যক্তি চিৎকার করে বলে উঠলেন,
" আমরা এসেছি দোয়া দিতে, আমাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে কেন? আমরা হিজরা বলে কি মানুষ নই?"
" আপনারা শান্ত হোন। চাচা হয়তো বুঝতে পারেনি। আপনারা ভেতরে আসুন।"
তারা রীতিমতো ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ির ভেতর ঢুকলেন। তারা যেতেই আদ্রিয়ান দারোয়ান চাচাকে জিগ্যেস করলো,
" আপনি উনাদের বের করে দিচ্ছিলেন কেন? "
" তোমরা কেউ তো বলোনি তাদের কথা। তাই ভেবেছি ভেতরে ঢুকতে দিলে হয়তো রাগ করবে। "
" বুঝতে পেরেছি চাচা। জোহরের নামাজের পর এসে সকলের সাথে খেয়ে নিবেন। আলাদা করে যেন বলতে না হয়। "
দারোয়ান বেশ ইস্ততবোধ করলেন তার কথায়। অনেক আত্মীয়স্বজন বসবে সেখানে উনাকে খেতে বসতে বলায় একটু অবাক'ই হলেন বটে। তিনি আমতাআমতা করে বললেন,
" কত মানুষ বসবে সেখানে আমার মতো দারোয়ান বসলে কি বিষয়টা ভালো দেখাবে আদ্রিয়ান বাবা? আমি বরং সবার শেষে খাবো। "
" মানুষ তো কি হয়েছে। অতশত বুঝি না, সবাই বসার সাথে সাথে আপনিও খেতে বসে যাবেন। "
দারোয়ান চাচা বেশ খুশি হলো তার কথায়। কিন্তু সে খেলে কি হবে, তার স্ত্রী সন্তান তো বাড়িতে না খেয়ে থাকবে। সে একা কি করে খাবে এভাবে? কিন্তু আদ্রিয়ানের মুখের উপর কিছু বলার সাহস পেলো না। পায়রা হঠাৎ তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের আসতে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। সে মনে করেছে তারা যেতেতু বাহিরে ঝামেলা করেছে এখন হয়তো এখানেও করবে। কিন্তু ইলহাম বেশ শান্ত ভঙ্গিতে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের সর্দারের হাতে আরহামকে তুলে দিলেন। আরহামের হাত পা নড়ে উঠতেই সেই ব্যক্তি তাকে আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আয়ানকে পায়রার কোল থেকে নিয়ে বাকি হিজরাদের কোলে দিলেন। এরা ইলহামের চেনা পরিচিত। এদের মন খুব ভালো, প্রায় সময়ই তারা এতিম খানায় এটা ওইটা নিয়ে আসতো বাচ্চাদের জন্য। সর্দার ব্যক্তি আদ্রিয়ান আসতেই তার দিকে তাকিয়ে বললো,
" বিশ হাজার টাকা ছাড়া ছাড়ছি না কিন্তু। "
আদ্রিয়ান পকেট থেকে টাকা বের করে বাচ্চাদের নজর কাটিয়ে সর্দার ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়। বাকি হিসাবের সাথে হিজরাদের দেওয়ার জন্যেও আলাদা করে টাকা রেখে দেওয়া হয়েছিলো। সেই হিজরা গুণে দেখেন বিশ হাজারের পরিবর্তে পঁচিশ হাজার দেওয়া হয়েছে। তা দেখে তিনি বললেন,
" তুমি বাচ্চার কি হও? "
" চাচাতো ভাই। "
" বিয়ে হয়েছে?"
আদ্রিয়ান নূরের হাত ধরে পেছন থেকে সামনে এনে বললো,
" হ্যাঁ। আমার স্ত্রী মিসেস শাহ । "
" তোমাদের কোল আলো করে ফুটফুটে একটা সন্তান আসুক। দোয়া করে দিলাম। "
নূর বেশ লজ্জ্বা পেলো উনার কথায়। নবজাতকদের দোয়া করে তারা চলে যেতে নিলে আদ্রিয়ান তাদের খেয়ে যেতে বলে। খুবই কমই মানুষ তাদের খাওয়ার কথা বলেছে। আদ্রিয়ানের কথায় তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে বললেন,
" মানুষ আমাদের পাপ মনে করে। আমাদের দেখলে নাক সিটকায়। এতো বছরের জীবনযাপনে খুব কমই মানুষ দেখেছি তোমার মতো। নিসন্দেহে তোমার স্ত্রী সন্তান খুবই ভাগ্যবতী। "
আদ্রিয়ান তাদের কথায় তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
" তাদের জীবনে আমি কোন অভিশাপের চেয়ে কম ছিলাম না। কোন এক সময় দেখা হলে সময় নিয়ে বলবো। আপাতত খেতে বসুন।"
আদ্রিয়ান তার দলের ছেলেদের বললো যে খাবার পরিবেশন করে। অবশ্য এই কাজটা তারা নিজ থেকেই নিয়েছে। আদ্রিয়ান চেয়েছিল বাহির থেকে মানুষ ঠিক করতে কিন্তু তারা এতে নাকোচ করলো। তারা থাকতে বাহির থেকে মানুষ ঠিক করার। খাবারের আয়োজনে অনেক কিছুই করা হয়েছে। রুশানকে দেওয়া হয়েছে শসা ও গাজর কাটার দায়িত্ব। সে মিনমিন করে আশরাফুলকে ঝাড়ছে আর বলছে,
" নিজে টেবিল গোছানোর দায়িত্ব নিয়ে আমাকে কাটার দায়িত্ব দিয়েছে। তখন থেকে কেটেই যাচ্ছি প্রতিবার ভিক্টিম শুধু আমিই।"
পাশ থেকে আশরাফুল বলে উঠলো,
" প্যানপ্যান না করে হাত চালা জলদি। "
সূর্য মধ্যাকাশে আপন তেজের পূর্ণতায় দীপ্তিমান ।বসার ঘরে সোফায় বাকিদের সাথে বসে আছে সাইমা। আদ্রিয়ান জোহরের নামাজ পড়তে যাবে বলে নিজের ঘরে যাচ্ছিলো পাঞ্জাবি পড়তে। আদ্রিয়ানকে দেখে সাইমা তড়িঘড়ি করে তার কাছে এসে বললো,
" আদ্রিয়ান ভাইয়া, রুমে যাচ্ছিলেন বুঝি?"
আদ্রিয়ান বেশ বিরক্ত হলো তার কথায়। কিন্তু আজকের মতো শুভ দিনে সে কোনপ্রকার সিনক্রিয়েট করতে চাইছে না। তাই সে উপরে উঠতে উঠতেই বললো,
" না, উঠোনে যাচ্ছি।"
" কিন্তু উঠোন তো নিচে, আপনি তো উপরে যাচ্ছেন।"
" যখন দেখতেই পাচ্ছো তাহলে আবার জিগ্যেস করছো কেন?"
আদ্রিয়ানের মুখ থেকে এসব শুনে সাইমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। এই লোকের যতই কাছে আসার চেষ্টা করুক না কেন সে। সবসময় দূরে ঠেলে দিবে। অপমান করবে, কিন্তু সেও হাল ছাড়ার মতো পাত্রী নয়। আদ্রিয়ানের ঘরে তার বিছানায় বসেছে সাইমা। আদ্রিয়ান কিছু বলতেও পারছে না সহ্যও করতে পারছে না। নূর আবার তাকে ভুল না বুঝে ফেলে। ঠিক সেই মুহুর্তে নূর ভেতরে এসে ঢুকলো। সাইমাকে এই ঘরে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছে তার। এই মেয়ে তার ঘরে কি করছে। কিন্তু সে সাইমাকে কিছু না বলে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
" নামাজের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন।"
আদ্রিয়ান ভেবেছিলো হয়তো কিছু বলবে কিন্তু নূরকে চুপ করে থাকতে দেখে মনে হলো, এ যেন ঝড় হওয়ার পূর্ব মুহুর্ত। বেশিক্ষণ থাকলে হয়তো তার উপরেই ঝড় বইবে তাই সে দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে পাঞ্জাবি পরে চলে গেলো। ইলহাম নিচেই অপেক্ষা করছে তার জন্য। আদ্রিয়ান চলে যেতেই নূর বিছানা গুছানো শুরু করে। সাইমা বুঝতে পেরেছে সে বসার কারণেই বূর পরিস্কার করছে। তাই সে ঠেস মেরে বললো,
" হিংসে হচ্ছে তোর?"
" কাকে নিয়ে? "
" আমাকে নিয়ে। যদি তোর বর আমায় পছন্দ করে ফেলে? পুরুষ মানুষ হচ্ছে মাছির মতো। যেখানে সেখানে মুখ দেওয়ার অভ্যাস।"
" তোর মাঝে হিংসা করার মতো কিছু আছে? আমি তো দেখতে পারছি না।"
নূর যে তাকে রীতিমতো হেউ করে কথা বলেছে তা সে বুঝতে পেরেছে। সে নূরের দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললো,
" তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস।"
" অন্যের স্বামীর উপর ঢলে পড়া খুব সওয়াবের কাজ বুঝি? "
" আদ্রিয়ান ভাইয়া ঠিক'ই আমাকে পছন্দ করে। তাকে নিজের করা আহামরি কিছু না।"
" তো কর। কিসের অপেক্ষা করছিস?"
" অবশ্য তোর স্বামী তো তোকে ভালোবাসে না তাই তোর কিছু যায় আসে না। "
নূর স্মিত হেসে তার পায়ের নুপুর দেখিয়ে বললো,
" প্রথম মাসের বেতন দিয়ে বানিয়ে দিয়েছে। আর তোর মতো মেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকলেও আদ্রিয়ান কখনো তাকাবে না। তাকানোর হলে যখন রাত বিরাতে মেসেজ দিতিস তখনই তাকাতো। তাই এখন অযথা এসব বলে লাভ নেই।"
নূরের শান্ত ভাবভঙ্গিমা মোটেও ভালো লাগছে না সাইমার। সে রেগে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। নূর ওসবে পাত্তা দিলো না অত। কি দরকার বাইরের মানুষের জন্য অশান্তি ডেকে আনার। সময় কিভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে বলা মুশকিল। এতো কাজের মাঝে হিসেব মিলানো কষ্ট। পায়রাকে কিছু ফল কেটে দেওয়া হলো খাওয়ার জন্য। সেও তেমন কিছু খেতে পারেনি। এতো আত্মীয় স্বজনের মাঝে কিভাবেই বা খাবে। দুই মেয়েকে ভালো থাকতে দেখে মোরশেদা বেগম খুব খুশি। এটাই তো চেয়েছিলেন তিনি। শাহনাব ইলহাম ও আদ্রিয়ানের সাথে নামাজ পড়তে গিয়েছে। যাওয়ার সময় ও দুজনের মাঝে বেশ কথা কাটাকাটি হয়। নূর আর অবাক হয় না এসব দেখে। দুজিন একসাথে হলেই শুধু হয় সাপে নেউলের মতো। আরহাম ভীড় সহ্য করতে পারছে না, গরমে কান্না করছে বেচারা। ইরা তাকে কোলে নিয়ে এদিক ওদিক হাঁটছে। আয়ান অবশ্য এতো ভীড়ের মাঝেও দিব্যি ঘুমোচ্ছে। তার ঘুম দেখে পায়রা মিনমিন করে বললো,
" একদম বাপের মতো হয়েছে। এতো আওয়াজের মাঝেও কিভাবে ঘুমাচ্ছে দেখো। বাপের ফটোকপি একদম, ঘুমালে হুঁশ থাকে না। "
মধ্যাহ্ন ধীরে ধীরে পশ্চিমাকাশের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। দিবাকরের প্রখর তেজ এখনও ম্লান হয়নি; রৌদ্রের দহন ছড়িয়ে আছে ধরণীর বুকে। পুরুষদের নামাজ পড়ে ফিরতে দেরি হবে তাই মহিলাদের আগে খেতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইরাকে বলেছিলো বসে যেতে কিন্তু ইরার সেই এক কথা সে নূরের সাথে খাবে। নূর ও এতোক্ষণ যাবত কিছুই খায়নি কারণ এতো কাজের মাঝে সময় হয়ে উঠেনি। পায়রার খাবার ঘরেই দিয়ে গিয়েছে। শামীমা চৌধুরী বেশ তৃপ্তি পেয়েছেন খেয়ে। আয়ান ও আরহাম নিজের নাতি না হওয়া সত্ত্বেও তাদের বেশ আদর যত্ন করেছেন তিনি। সকলের খাওয়া শেষে আস্তে আস্তে পুরুষরা নামাজ শেষ করে আসতে শুরু করেছে। আরিয়ানের কবর জিয়ারত করেই এসেছে সবাই। যেহেতু মসজিদ থেকে কবর খুব বেশি দূর নয়। মুরব্বিদের কাছ থেকে শুনেছে চল্লিশদিন না হওয়া পর্যন্ত ঘর থেকে যেন বের না করা হয় নবজাতকদের। কিন্তু ইলহাম তাতে কর্ণপাত করেনি। সে চায় আরিয়ানের কবরে যেন আয়ান ও আরহামকে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও সুরাইয়া শাহ এতে বেশ মনক্ষুন্ন হন কিন্তু ইলহামের তাতে কিছু যায় আসে না। তার এক কথা,আল্লাহ তার সন্তানদের ঠিকই ভালো রাখবে। আয়ানকে নিয়ে আদ্রিয়ান নিজের সন্তানের কবরে আসতেই সে হাত পা নেড়ে তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে। আদ্রিয়ান নিচু হয়ে বসে ছেলের কবরে চুমু খেয়ে বলে উঠলো,
"আয়ানকে কোলে নিয়েছি বলে রাগ করেছে আমার বাবাটা? আজ তো ওর আকিকা তাই তোমাকে দেখাতে নিয়ে এলাম। তোমার বাবা তোমায় ভালোবাসে সোনা।"
কবরে পুতে রাখা ফুলগাছগুলো বড়ো হয়েছে বেশ। গুল ধরেছে তাতে। ইলহাম মলিন দৃষ্টিতে তাকায় কবরের দিকে। দুই বাচ্চা কোলে অথচ এক বাচ্চা কবরে। নিজের হাতেই তোয়ালেতে মোড়ানো ভ্রুণটি তোলে নিয়েছিলো সে। বাবা না হয়েও উপলব্ধি করেছিলো এই বহন কত ভারী। যখন নার্স এমনি কাপড়ে করে ভ্রুণটি তোলে দিয়েছিলো তার হাতে তখন সে কি ধমকটাই না দিলো। ছোট্ট নিষ্পাপ ফুলটাকে কি একটা তোয়ালে দিলে খুব পাপ হয়ে যাবে? সেই তোয়ালের দাম দিয়েছিলো দশ হাজার। এসব আদ্রিয়ানকে জানায়নি সে। কিছু কিছু কথা গোপন করে রাখলেই সুন্দর। এতো শক্ত মন হওয়া সত্ত্বেও বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে আরিয়ানের জন্য। আজ এই দুই বাচ্চার সাথে তো ওই বাচ্চাটাও থাকতে পারতো। কি এমন ভুল করেছিলো এই নিষ্পাপ শিশুটা? আল্লাহ'র বান্দা আল্লাহ নিয়ে গিয়েছেন তবে এই মায়া কিভাবে কাটবে? সে তো বাবা নয় তবুও এতো কষ্ট হচ্ছে তাহলে আদ্রিয়ানের মনে কি পরিমাণ ঝড় চলছে? আদ্রিয়ানের সাথে বয়সের পার্থক্য খুব একটা না থাকা সত্ত্বেও তাকে সবসময় নিজের সন্তানের মতো করে দেখেছে ইলহাম। এই হাতে কত মানুষ মে''রেছে সে। অথচ সেদিন নিজের রক্তের ভার বইতে পারেনি। কি হতো যদি বাচ্চাটা বেঁচে যেতো? আদ্রিয়ান নিজের ভেতরে থাকা সব কথা ইলহামকে বললেও, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা বলেনি কখনো। চোখ বেয়ে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো আরহামের ছোট্ট দেহখানার উপর। ছেলেটা বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। ইলহাম তার কপালে আদরের স্পর্শ দিয়ে বললো,
" বাবা তোমাকে ভালোবাসি। "
কিছুসময় পর তারা দুজনেই বাড়ি ফিরে এলো। শাহনাব অবশ্য তাদের সাথে যায়নি। আরিয়ানের কবর দেখার সাধ্য তার নেই। যতই শত্রুতা থাকুক আদ্রিয়ানের সাথে, কিন্তু তার সন্তানের প্রতি অগাধ মায়া, ভালোবাসা জন্মেছে শাহনাবের। ওই ছোট দেহের কবর দেখার সাধ্য নেই তার। ভাবতেই অস্থির হয়ে উঠছে সে। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কি খুব কষ্টকর?
চলবে,,,,,,,,,
( সবাই রেসপন্স করবেন। ১.৫কে করে দিন জলদি। আপনারা তারাতাড়ি রেসপন্স করলে আমিও নতুন পর্ব দিবো। আপনারা কি আদ্রিয়ান ও নূরের সংসার জীবন চান? আপনাদের জন্য সারপ্রাইজ আছে আজকে।)
গল্প নিয়ে প্রশ্ন কিংবা গল্পের সকল আপডেট জানতে জইন হোন আমার গ্রুপে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/