ফন্ট সাইজ:
থিম:
মন প্রাঙ্গনের বৃষ্টি

পর্ব 59

লেখক: কংকা চৌধুরী

#মন_প্রাঙ্গনের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৫৩)

( অনুমতি বিহীন কপি করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।)

কিছুসময় পর আদ্রিয়ান ও ইলহাম ফিরে এলো শাহ বাড়িতে। আদ্রিয়ানের মলিন চেহারা দেখে শাহনাব বুঝতে পারছে সব। যতই শত্রু হোক কিন্তু সে আদ্রিয়ানের খারাপ কখনো চায়নি। চাইলে সে অনেক কিছুই করতে পারতো কিন্তু করেনি, শত্রু হলেও তাদের মাঝে ওইরকম সম্পর্ক ছিলো না। আদ্রিয়ান আয়ানকে নিয়ে সোফায় বসতেই শাহনাব ও তার পাশে এসে বসলো। সে আদ্রিয়ানের মলিন চেহারা দেখে বললো,

" ছেলের জন্য মন খারাপ? "

" হ্যাঁ, আমার ছেলে বেঁচে থাকলে তার আকিকাও অনেক সুন্দর করে করতাম। কিন্তু... "

" তোর ছেলে যেখানে আছে ভালো আছে। মন খারাপ করিস না। "

আদ্রিয়ান স্মিত হাসলো তার কথায়। পুরুষদের বসে যেতে বলেছে টেবিলে। রুশান সহ বাকিরা খাবার বেড়ে দিচ্ছে। নূর খায়নি শুনে আদ্রিয়ান তার জন্য এক প্লেট বিরিয়ানি নিয়ে তাদের ঘরে চলে আসে। আত্মীয় স্বজন ও বাড়িতে মানুষ বেশি হওয়ায় শাহনাব, ইরা, নূর সবাই আদ্রিয়ানের ঘরে এসে বসেছে। আদ্রিয়ান নূরের জন্য খাবারের প্লেট এনে বললো ,

" শুনলাম তুমি এখনো খাওনি,তাই খাবার নিয়ে এসেছি। খেয়ে নাও। "

শাহনাব ও ইরার সামনে নূর খানিকটা লজ্জ্বা পেলো, সে আমতাআমতা করে বললো,

" আমি পরে খেয়ে নিতাম। আপনি কষ্ট করে এখানে নিয়ে আসতে গেলেন কেন? "

" কখন খেতে আমার জানা আছে। দ্রুত খেয়ে নাও। "

" আপনি খেয়েছেন? "

" না, সকলের খাওয়া শেষ হলে চাচ্চু সহ একসাথে বসে খাবো। "

আদ্রিয়ান নাছোরবান্দা সে কথা নূর জানে, তাই আর কিছু না বলে সে খেতে শুরু করলো। প্রথম লোকমা মুখে দিতেই তার মনে পড়ে যায় ইরাও খায়নি তার সাথে একসাথে খাবে বলে।

" ইরাও খায়নি আমার সাথে খাবে বলে। ওর জন্যেও এনে দিন না।"

আদ্রিয়ান যেই না বিছানা থেকে উঠতে যাবে ঠিক তখনই শাহনাব তাকে থামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। আদ্রিয়ান জানে শাহনাব ও ইরার মাঝে সম্পর্ক কেমন। একটা ভুলের জন্য তাদের জীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। কিছু সময় পরেই শাহনাব ইরার জন্য এক প্লেট বিরিয়ানি নিয়ে আসতেই ইরা তা সাদরে গ্রহণ করে। স্ত্রী না মানলেও অন্তত তার দায়িত্ব তো পালন করছে। এর চেয়ে বেশি আর কি চায় সে? হঠাৎ ফোন বেজে ওঠায় আদ্রিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে গেইটের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে ফাইল হাতে নিয়ে। আদ্রিয়ানের হাতে তুলে দিতেই সে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ঘরে চলে আসে। নূর এসবে খুব একটা পাত্তা দিলো না। দিবাভাগের দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে বিকেল নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় সময়ের সীমানায়। সূর্য তখন আর মধ্যগগনের উদ্ধত অধিপতি নয়; পশ্চিম আকাশের দিকে ধীরে ধীরে হেলে পড়ে সে নিজের দীপ্তিকে কোমল সোনালি আভায় রূপান্তরিত করে। সেই আলো ধরণীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছে। মেঘেরা তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে আপনমনে। ইতিমধ্যে সবাই খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পরেছে। ইশিতাও চলে গিয়েছে তার মায়ের সাথে। বাচ্চা দুটো দিব্যি আরামে ঘুমোচ্ছে। এতো শোরগোলের মধ্যে ঘুমাতে পারেনি ঠিক করে। ইলহাম ও বেশ ক্লান্ত, সে বিছানায় পরা মাত্রই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। পায়রা আপনমনে ফোন টিপছে নিজের মতো। আদ্রিয়ান তার হাতে থাকা পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছে এক নজরে। কাল সকালেই এই দেশ ছেড়ে চলে যাবে, তার সন্তানকে কি আর দেখতে পাবে সে? হয়তো বা না। আজ পুরোরাত নিজের সন্তানকে সময় দিবে সে। হলদে রঙের থ্রি-পিস পরেছে, সকাল থেকে কাজ করায় বেশ লাগছিলো তাই সব কাজ শেষ হতেই ঝটপট গোসল সেরে নিলো। শাহনাব ও ইরা শামীমা চৌধুরীর সামনে বসে আছে। ইশতেহার চৌধুরী জরুরি একটা কাজে বাহিরে গিয়েছেন। কিছুক্ষণ পরেই ফিরবেন। শাহনাব ও ইরার বিয়ে কিভাবে হয়েছে তাদের জানানো হয়নি। ইরা নিজেই বলেছিলো প্রেম করে বিয়ে করেছে তারা। আজ আকিকাতে উপস্থিত থাকা কিছু মহিলা শামীমা চৌধুরীকে সেদিনের পুরো ঘটনা বলে দেয়। এসব শুনে যেন পায়ের তলার মাটি সরে যায় উনার। তার আড়ালে এতো কিছু হয়ে গেলো অথচ উনি টেরই পেলেন না। এইজন্যই কি তার ছেলে সবসময় এতো মনমরা হয়ে থাকেন। হঠাৎ ঠাস করে শব্দ হওয়ায় আঁতকে উঠে শাহনাব। ইরাকে চড় মেরেছে শামীমা চৌধুরী। রাগে রীতিমতো ফুসছেন তিনি। শাহনাব তার মা কে ধরে সোফায় বসিয়ে বলে উঠলো,

" পাগল হয়ে গেছো আম্মা? ওর গায়ে হাত তুললে কি করে? "

দমে যাওয়ার মতো ব্যক্তি নন তিনি। ইরার দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলেন,

" নির্লজ্জ মেয়ে! মেয়ের মতো ভালোবেসেছি। আদরযত্ন করেছি অথচ এতো বড়ো কথা লুকালে আমার কাছ থেকে? "

" আম্মা, ইরার কোন দোষ নেই। আমরা দুজনেই পরিস্থিতির শিকার ছিলাম।"

" তালাক বলেও কিছু একটা ছিলো। কি দরকার ছিলো নিজের জীবন নষ্ট করার? ওর মাঝে তো অনুসূচনাই নেই। মেঘ না চাইতেই জল পেয়েছে, এতোমাস ধরে আমার কাছে লুকিয়েছে ব্যপার টা। আমাদের সবার সাথে বেঈমানী করেছে। "

ইরা নিঃশব্দে কেঁদেই চলেছে। অত:পর শাহনাব তার মায়ের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠলো,

" এখানে ইরার কোন দোষ নেই। আমার ভুলের কারণেই এসব হয়েছে। ইরাকে যদি আর একটাও বাজে কথা বলো কিংবা অপমান করো তাহলে কিন্তু আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না। "

শাহনাব ইরাকে নিয়ে নিজেদের ঘরে চলে যায়। তার মায়ের মাথা ঠিক নেই, কখন আবার মেয়েটাকে কি না কি বলে বসে। ইরার চোখ দুটো ফুলে গিয়েছে কাঁদতে কাঁদতে। সে কি জানতো নাকি এতো কিছু হবে। শাহনাব ইরাকে অভয় দিয়ে বললো,

" কেঁদো না। একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আম্মার মাথা এখন গরম তাই এমন করছেন। উনার হয়ে আমি সরি বলছি।"

ইরা হেঁচকি তুলতে তুলতে বললো,

" আমি তো জানতাম না বিয়ে হয়ে যাবে, জানলে কখনো আসতাম না ওইদিন রাতে। আপনাকে আর আমায় সহ্য করতে হবে না। তালাক দিয়ে দিন। ছোট থেকে হারানোর অভ্যাস আছে আমার। আম্মাও আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলো। আমি ভয়ে কিচ্ছু বলি নি আপনার আম্মাকে, আসলে মায়ের ভালোবাসা পাচ্ছিলাম তো তাই লোভ সামলাতে পারিনি। আমার মা কখনো আমায় ভালোবাসেনি, আগলে রাখেনি। আপনার মায়ের মতো মা পেয়ে লোভ সামলাতে পারিনি। কিন্তু এখন যেহেতু সব জেনেই গিয়েছে, আমি আর এই দহন নিয়ে থাকতে পারবো না। আমাকে আমার বাড়িতে দিয়ে আসুন।"

" কোথাও যাবে না তুমি। বিয়েটা যেভাবেই হোক আমি তোমার স্বামী। আমি তোমাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দ্বারে ছেড়ে দিয়ে আসতে পারি না। তুমি আমার দায়িত্ব। এখানে বসো, কিছু সময় পর সব ঠিক হয়ে যাবে। "

ইরার কান্না থামছেই না। শাহনাব আগ বাড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতেই সে গলা ছেড়ে বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠলো,

" আম্মা আমাকে ঘৃণা করেন তাই না? আমার ভুল কি খুব বেশি? বলুন না শাহনাব। "

" কাঁদছো কেন ইরা। সব ঠিক হয়ে যাবে। আম্মা একটু অবুঝ। পরে দেখবে আবার তোমাকে আগলে নিবে। "

শামীমা চৌধুরী এদিক দিয়েই আসছিলেন, কিন্তু শাহনাব ও ইরার কথাবার্তা শুনে তার কষ্ট হচ্ছে ইরার জন্য। মেয়েটাকে কখনো ছেলের বউয়ের চোখে দেখেনি, মেয়ের মতো করে ভালোবেসেছিলো। আইসক্রিম পছন্দ বলে ইশতেহার চৌধুরীকে বলে সবসময় ফ্রিজে আইসক্রিম আনিয়ে রাখতেন যেন ইরা খেতে পারে। তখন রাগ হলেও এখন মেয়েটার জন্য খারাপ লাগছে তার। শত হোক মায়ের মন তো। চেয়েছিলেন তাদের ঘরে ঢুকতে কিন্তু পরে কিছু একটা ভেবে নিচে চলে আসে। রান্নাঘরে গিয়ে মাংস বসায় রান্না করতে। সন্ধ্যার নাস্তায়, রুটি আর ঝোল করবে। রান্না প্রায় হয়ে এসেছে। মাগরিবের আজান ও দিয়ে দিয়েছে। দিবসের দীপ্ত অধ্যায় নিঃশেষিত হলে সন্ধ্যা নীরব পায়ে ধরণীর বুকে অবতরণ করে। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের অন্তিম রক্তিম আভা ধীরে ধীরে গলিত অগ্নির মতো মিলিয়ে যায়। দিনের উজ্জ্বলতা তখন ক্রমে মলিন হয়ে আসছে। আকাশের বিস্তীর্ণ নীলিমা একে একে রক্তিম, কেশর, বেগুনি ও ধূসর রঙের স্তরে স্তরে নিজেকে ঢেকে ফেলেছে। মেঘেরা বিদায়বেলার আলো গায়ে মেখে ভেসে বেড়াচ্ছে। ইরাকে অনেক করে ডাকার পরেও সে নিচে নামেনি খাওয়ার জন্য। শাহনাব আড়চোখে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে যেই না এক টুকরো রুটি মুখে পুরবে ঠিক তখনি শামীমা চৌধুরী ইশারায় বলেন ইরাকে নিয়ে আসতে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইরাকে ডেকে নিয়ে আসে। ফর্সা নাক টুকটুকে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। ইরা ইতস্তবোধ করে এক টুকরো রুটি ছিড়ে ঠিকই কিন্তু মুখে দেয় না। অত:পর শামীমা চৌধুরী নিজেই বসা থেকে উঠে তার মুখে রুটি নিজের হাতে তুলে দেয়। ইরা ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে নিবে ঠিক তখনি তিনি বলে উঠেন,

" খাওয়ার সময় কান্নাকাটি আমার মোটেও পছন্দ নয়। সবগুলো শেষ করে উঠবে। "

কিন্তু ইরা শুনলো না। সে শামীমা চৌধুরীর কোমরে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠে বললো,

" আমার মা কখনো আমার সাথে ভালো করে কথা বলেনি, মেয়ে হয়েছি বলে তার নিকট আমি অভিশাপস্বরুপ। কখনো এভাবে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়নি, জানো আম্মা। আমি শাহনাবকে পছন্দ করতাম কিন্তু হুট করেই বিয়ে হয়ে যায়। আমি টাকার জন্য এখানে পড়ে থাকিনি, মায়ের ভালোবাসা পাইনি তো। মায়ের ভালোবাসা কেমন হয় জানতাম না। শুধুমাত্র ভালোবাসার লোভে এখানে পড়ে থাকতাম। ছোট থেকে শুনে এসেছি আমি নাকি অপয়া। কিন্তু তোমার কাছে এসে আমি বুঝলাম আমার মূল্যায়ন কতটুকু। আমি জানি শাহনাব আমাকে ভালোবাসেন না, অনেকবার চেয়েছিলাম চলে যেতে কিন্তু তোমার আঁচলের লোভ ছাড়তে পারিনি। আমায় ক্ষমা করে দিও আম্মা, আমি চলে যাবো এখান থেকে ।"

শামীমা চৌধুরীর দুচোখ ভরে উঠলো, এতো ভালোবাসা আদর কিছুই বৃথা যায়নি। মেয়েটাকে মারার পর নিজেই কষ্ট পেয়েছিলেন খুব। ইরাকে শান্ত করে তিনি বললেন,

" মা নাহয় রাগ করে দুটো কথা শুনিয়েছি, মেরেছি তাই বলে এতো অভিমান? "

" অভিমান তো করিনি। কিন্তু আমার আসল গন্তব্য তো এখানে নয়। "

" তোমার স্বামীই তোমার আসল গন্তব্য। মেয়েদের জীবনে একমাত্র ঢাল তার স্বামী। শাহনাব মুখে যতই বলুক সে তোমাকে ভালোবাসে না, কিন্তু সবসময় সে তোমার ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। আর কান্না না করে খেয়ে নাও।"

শাহনাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাদের দেখছে। একটু আগেই এতো কান্ড ঘটিয়ে এখন দুজনেই মিলে গিয়েছে মাঝে সে খারাপ হয়ে গেলো।

আদ্রিয়ানকে হঠাৎ করে কাপড় গোছাতে দেখে নূর জিগ্যেস করলো,

" কোথাও যাচ্ছেন? "

" ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও। কাল সকালে আমাদের ফ্লাইট। "

আদ্রিয়ানের কথা শুনে নূর কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না এসব কি বলছে। হঠাৎ করে কোথায় যাচ্ছে তারা। সে ভ্রু কুঁচকে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

" কোথায় যাচ্ছি আমরা? কতদিনের জন্য যাচ্ছি?"

" সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছি। যেখানে আমাদের একটা সংসার হবে যেমনটা তুমি চেয়েছিলে। যেখানে তোমাকে কারো জবাবদিহিতা করতে হবে না। "

নূর অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আদ্রিয়ান মূলত তিন মাস আগ থেকেই সব আস্তে আস্তে করা শুরু করেছিলো। নূরকে সব গোছাতে বলে সে পায়রা ও ইলহামের ঘরে আসে, নূর ও তার পেছন পেছন চলে এসেছে। পায়রা আরহামের কাপড় বদলে দিচ্ছিলো, আদ্রিয়ান আয়ানকে কোলে নিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো,

" আমরা কাল লন্ডন চলে যাবো। "

পায়রা হতবাক হয়ে গেলো আদ্রিয়ানের কথায়। সে আড়চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করলো,

" সেখানে কেন?"

" আমি নতুন বিজনেস শুরু করেছি, তাই নূরকে নিয়ে সেখানে সেটেল হয়ে যাবো। কাল সকালে আমাদের ফ্লাইট। "

" তোমার চাচা জানে?"

" হ্যাঁ, চাচ্চুই তো সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। "

" তোমরা যা ভালো বুঝো তাই করো। "

নূর পাশ থেকে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছে। পায়রার কথায় কেন যেন মনে হচ্ছে সে খুশি নয়। আদ্রিয়ান অবশ্য তেমন কিছু বললো না। আয়ানের কপালে চুমু খেয়ে সে চলে গেলো বাইরে। নূর পায়রার পাশে এসে বসতেই পায়রা বলে উঠলো,

" হঠাৎ দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলি কেন? "

নূর আয়ানকে কোলে নিয়ে তাকে দুলাতে দুলাতে বললো,

" আমি তো এখনি জানলাম সব। উনি আগ থেকেই সবকিছু ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। "

পায়রা আর কিছু বললো না । রাতের আধাঁরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না তেমন। রজনীর অষ্টম প্রহরে ধরিত্রী যেন নিস্তব্ধতার গাঢ় চাদরে আবৃত। নীলিমা আকাশে চন্দ্রের স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে প্রকৃতিকে করে তুলেছে অপার্থিব। আদ্রিয়ান ছেলের কবরের সামনে ফুলের তোড়া নিয়ে বসেছে। আজকের পর আর দেখা হবে না তার কলিজাকে। বড্ড স্নেহ নিয়ে চুমু খেলো ছেলের কবরে, অত:পর বলে উঠলো,

" তোমার বাবা খুব খারাপ সোনা। কিন্তু তার বুকে তুমি আজীবন চিরস্থায়ী থাকবে। কাল থেকে বাবা আর আসবো না, রাগ করো না বাবার উপর। বাবা নিজের ভুল শুধরে নিতে সব ছেড়ে চলে যাচ্ছি অচেনা দেশে। তোমার জায়গা কখনো কেউ নিতে পারবে না আমার আব্বাজান। তুমি সবসময় বাবার কলিজা থেকে যাবে। বাবা ফিরবো কোন এক সময়, অভিমান করে থেকো না কলিজা। আজকের রাত তোমার আর বাবার। আজ তোমার বাবা তোমাকে ঢের সময় দিবে।"

নূর সারারাত অপেক্ষা করেছে আদ্রিয়ানের জন্য, কিন্তু তার কোন হদিস নেই। রাত দুটো পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলো কিন্তু এরপর আর থাকতে না পেরে কল দিয়েছিলো, আদ্রিয়ান জানায় সকালে ফিরবে। আদ্রিয়ান যাওয়ার কিছু সময়ের মাঝেই আয়ান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। আদ্রিয়ানকে দেখতে না পেয়েই কাঁদছিলো সে, কিন্তু হঠাৎ পায়রা তার নরম তুলতুলে গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিতেই সে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে। নূর এতো জোরে কান্নার শব্দ শুনে দৌড়ে ঘরে এসে দেখে আয়ান কাঁদছে আর পায়রা তাকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে। নূর চেয়েছিলো কোলে নিতে কিন্তু পায়রা দেয়নি। নূরের ও রাগ উঠে গিয়েছিলো এভাবে ছোট একটা বাচ্চাকে মারায়। কিন্তু পায়রাকে শত জোর করা সত্ত্বেও সে আয়ানকে দেয়নি, বাধ্য হয়ে নূর নিজের ঘরে চলে আসে।

রজনীর আবরণ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে শুরু করেছে। আঁধারের গাঢ় চাদর সরিয়ে পূর্ব দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে নবপ্রভাতের লাজুক আভা। নিশিথের নিস্তব্ধতা ভেঙে একে একে জেগে উঠছে ধরণী।আকাশজুড়ে ভেসে বেড়ানো তুলোর মতো মেঘগুলো সোনালি রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে।নূর তার ও আদ্রিয়ানের সকল জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলো। চার'ঘন্টা পরেই তাদের ফ্লাইট। গতকাল রাতেই জানতে পারলো তারা দেশ ছাড়ছে। হঠাৎ করে সবকিছু হয়ে যাওয়ায় নূর তেমন কিছু জিগ্যেস করার ও সুযোগ পায়নি। আদ্রিয়ান আগেই তাদের পাসপোর্ট বানাতে দিয়েছিলো। সে লন্ডনে নিজের নতুন ব্যাবসা শুরু করেছে, এতোদিন সব কার্যক্রম ঠিকঠাক ভাবে চলার জন্যই সকলের কাছ থেকে লুকিয়েছিলো। অবশ্য ইলহাম'ই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। হঠাৎ করেই সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে মন খারাপ লাগছে নূরের। এই বাড়িতে অনেককিছু হারিয়েছে আদ্রিয়ান, তাই তার নতুন করে গড়ে তোলা সংসার আর এখানে স্থায়ী করতে চাচ্ছে না। আদ্রিয়ানের কোলে থাকা আয়ান ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে। হয়তো সেও বুঝতে পেরেছে তাকে আগলে রাখা বড়ো ভাই আর তার কাছে থাকবে না। তার সাথে খেলবে না। তাকে বুকের উপর রেখে ঘুম পাড়াবে না। আদ্রিয়ান আয়ানকে উপরের দিকে ছুড়ে আবার আঁকড়ে ধরে বললো,

" কাঁদে না টমেটো। ভাইয়া দূর থেকেও তোমায় ভালোবাসবো। আমার কলিজা। কান্না করে না সোনা। তুমি কাঁদলে তো ভাইয়ার যেতে মন চাইবে না? সারাক্ষণ তোমায় আগলে ধরে রাখতে মন চাইবে। "

কান্না যেন থামছেই না। নূর ট্রলি ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে আসতেই আদ্রিয়ান আয়ানের সারা মুখমণ্ডল জুড়ে চুম্বন করে, তাতে থেমে যায় আয়ান। আয়ানকে পায়রার কোলে দিয়ে আদ্রিয়ান ও নূর সবাইকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে পরে। সুরাইয়া শাহ বেশ খুশি হলেন তাদের কথা শুনে, মন ভরে দোয়া করলেন। আদ্রিয়ান অবশ্য ফোন করে বলে দিয়েছে সবাইকে। গাড়িতে উঠার পরপরই সে রুশানকে ফোন দেয়,মিনিট দুয়েকের মাঝেই ফোন রিসিভ হতেই আদ্রিয়ান বলে উঠে,

" আমি চলে যাচ্ছি। যাওয়ার আগে তোকে দুটো দায়িত্ব দিয়ে গেলাম।"

রুশান ওপাশ থেকে বলে উঠে,

" কিসের দায়িত্ব আদ্রিয়ান ভাই?"

" প্রতিদিন আমার ছেলের কবর পরিস্কার করতে ভুলবি না। আর হ্যাঁ আজ থেকে বাইকটা তোর। "

" একদম চিন্তা করো না ভাই। আরিয়ান বাবার কবর পরিস্কারের দায়িত্ব আমার। "

মাধবপুর থেকে তারা ঢাকা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্য রওনা দেয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাতে তাদের সময় লাগে চার ঘন্টা। সকাল সকাল বেরিয়ে পরায় খুব একটা দেরি হয়নি তাদের। নূর এই প্রথমবার প্লেনে চড়বে তাই ভয়টাও বেশি। নীল রঙের একটা থ্রি-পিস পরেছে সে, দেখতেও বেশ সুন্দর লাগছে। আদ্রিয়ান সব ঠিকঠাক করতেই দুজনেই প্লেনে নিজেদের সিটে বসে পড়ে। সবাইকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হচ্ছে নূরের। বিশেষ করে সন্তানের সব স্মৃতি ছেড়ে চলে আসতে। জানলার পাশে সিট পরেছে নূরের। সে ভয়ে কাঁপছে রীতিমতো। আদ্রিয়ান তার হাত নিজের হাতের মুঠোয় বন্দী করে অভয় দিয়ে বললো,

" ভয়ের কিছু নেই। আমি আছি তো। ভয় পেয়ো না। "

যদিও নূরের ভয় কাটলো না, সে শক্ত করে ধরে রইলো আদ্রিয়ানকে। দীর্ঘ এগারো ঘন্টার জার্নি করার পর অবশেষে তাদের বিমান লন্ডনের মাটিতে অবতরণ করল। বিমান থেকে নেমে ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দুজন যখন বিমানবন্দরের বাইরে এলো। আদ্রিয়ানের বন্ধু সৌরভ তাদের নিতে এসেছে। এতো সময় ধরে জার্নি করায় নূরের মাথা ধরে গিয়েছে। ঘন্টাখানিকের মাঝেই তারা পৌঁছে গেলো একটি আলিশান বাড়ির সামনে। যদিও লন্ডনের সময় বাংলাদেশের তুলনায় পাঁচ ঘন্টা পিছিয়ে। এখনো সবে সন্ধ্যা এখানে। আরেকটু পরেই অন্ধকার নেমে আসবে। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই নূর অবাক হয়ে যায়। এতো সুন্দর বাড়ি, সবকিছু কত সুন্দর গোছানো।

" স্বাগতম মিসেস, এই হলো তোমার সংসার। একান্তই তোমার।"

নূরের চোখে অশ্রুরা ভীড় জমিয়েছে। কিন্তু এই দহন দুঃখের নয় সুখের। আদ্রিয়ান নূরকে তাদের নতুন ঘর দখিয়ে বলে উঠলো,

" ডানপাশে ওয়াশরুম আছে, ফ্রেশ হয়ে এসো।"

নূর বেবি পিংক কালারের একটি শাড়ি পরেছে। আদ্রিয়ানের পরনে সাদা শার্ট। বরাবরের মতোই নূরকে দেখতে সুন্দর লাগছে। আগের তুলনায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য ও বেড়েছে কিছুটা। সে নূরের দিকে তাকিয়ে বললো,

" চলো তোমাকে এই শহরটা ঘুরিয়ে দেখাই। "

" এই সময়? রাত হয়ে এসেছে তো।"

" কিছু হবে না চলো। "

নূর এগিয়ে আসতেই আদ্রিয়ান তাকে নিয়ে বের হয়। আশেপাশে তেমন মানুষ নেই, পাশেই একটা পার্ক আছে। আদ্রিয়ান হুট করে নূরকে কোলে তুলে নিতেই আদ্রিয়ানের কাঁধ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বললো,

" কি করছেন, যদি কেউ দেখে ফেলে?"

" তাতে কি? "

" নামান আমাকে। "

আদ্রিয়ান নামালো না। সে নূরকে পার্কে নিয়ে একটা দোলনায় বসিয়ে নিজে পাশের দোলনায় বসে পড়লো।

চলবে,,,,,,,,,,

(সবাই রেসপন্স করুন। ১.৫কে করে দিন জলদি।)

গল্প নিয়ে প্রশ্ন কিংবা গল্পের সকল আপডেট জানতে জইন হোন আমার গ্রুপে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 59 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন