#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(১৬)
" অমানুষের সাথে বিয়ে হয়েছে যখন, অমানুষের সাথেই থাকতে হবে। "
আদ্রিয়ানের উপস্থিতি টের পেয়ে নূর ভয়ে আরও জোরে কাঁদতে থাকে পায়রার হাত শক্ত করে ধরে,তখনের মারের ভয় ঢুকে গিয়েছে নূরের মাঝে। পায়রা নূরের হাত ধরে তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে,
" তোর আপু আছে তোর সাথে,কেউ তোকে কিচ্ছু করতে পারবে না।"
আদ্রিয়ান পায়রার কথায় পাত্তা না দিয়ে সিগারেটে টান দেয়।পায়রা আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
" আমার ঘরে আয় তুই, আর তোকে এই ঘরে থাকতে হবে না। "
নূর পায়রার কথা শুনে উঠতে গেলে আদ্রিয়ান পায়রার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,
"একদম বাড়াবাড়ি করবে না, আমার সংসারে নাক না গলিয়ে নিজের সংসারে মন দাও।"
নূর আদ্রিয়ানের কথা শুনে উঠার সাহস পেলো না,পায়রা আদ্রয়ানের কাছে এসে তার দিকে আঙ্গুল তাক করে বললো,
"আমি নূরকে তোমার সাথে কিছুতেই থাকতে দেবো না আদ্রিয়ান। তোমার মতো পশুর সাথে থাকলে নূর কখনো ভালো থাকতে পারবে না।"
"আমার স্ত্রীর ভালো খারাপ নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, নেহাত তুমি আমার চাচাজানের বিবাহিত স্ত্রী তাই সম্মান দিচ্ছি নাহয় আদ্রিয়ান ও কোন অংশে কম নয়।"
আদ্রিয়ানের কথা শুনে পায়রা রেগে যায়, কিন্তু কিছু বলার আগেই ইলহামের কন্ঠস্বর তার কানে আসে,
"পায়রা কোথায় তুমি?"
"আসছি!"
পায়রা এক পলক নূরের দিকে তাকিয়ে নিচে চলে যায়,অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে যেতে হয়।পায়রা যেতেই নূর হাঁটুতে মুখ গুজে বসে থাকে। আদ্রিয়ান পরণের শার্ট খুলে একটা গেঞ্জি পরে নেয়,বাহিরে প্রচন্ড রোদে ঘেমে একাকার সে। নূরকে এভাবে বসে থাকতে দেখেও সে কিছু বললো না। নূরের সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে, পেটে ক্ষুধাও লেগেছে ভীষণ। দুপুরের দিকে দুটো চিপস খেয়েছিলো, এরপর আর এক ফোটা পানিও পেটে পরেনি, উঠে যে রান্নাঘরে যাবে সেই শক্তিটুকুও নেই তার।
ইলহাম হাতের ঘড়ি খুলে দেখে পায়রা ভেতরে ঢুকছে,ইলহাম পায়রার কাছে এসে তার কপালে হাত দিয়ে পরখ করে দেখে জ্বর আগের মতো নেই।স্বাভাবিক তাপমাত্রা।
"এখনও কি দূর্বল লাগছে?"
পায়রা ইলহামের কথার উত্তর না দিয়ে বললো,
"আপনি কিছু একটা ব্যবস্থা করুন আদ্রিয়ানের, আদ্রিয়ান নূরকে..... "
ইলহাম পায়রার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে আরাম করে বসলো বিছানায়,পায়রা বেশ রাগান্বিত স্বরে বললো,
" আপনি আমার কথা শুনছেন? "
"হ্যাঁ শুনছি।"
ইলহামের ভাবলেশহীন উত্তরে পায়রা যেন আশাহত হলো, সে ইলহামের পাশে বসে, ইলহামের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
"আপনি কিছু একটা ব্যবস্থা করুন, এভাবে চলতে থাকলে আদ্রিয়ান নূরকে মে'রে ফেলবে। আজ দুপুরে খুব জঘন্যভাবে মেরেছে নূরকে। আমি নিজের চোখে দেখেছি।"
"এটা তাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যপার। হয়তো নূর এমন কিছু করেছে যেটায় আদ্রিয়ানকে বাধ্য হয়েছে নূরের শরীরে হাত তুলতে।"
ইলহামের কথা শুনে পায়রা ইলহামের হাত ছেড়ে দিলো, অত:পর রেগে বললো,
" এখানে নূরের কোন ভুল ছিলো না।আদ্রিয়ান ইচ্ছে করেই এসব করছে। "
ইলহাম পায়রার কথা শুনে স্মিত হেসে তার দিকে তাকিয়ে বললো,
"কোন স্বামী চাইবে না তার স্ত্রী পরপুরুষের কাছে যাক কিংবা তার সাথে কথা বলুক। আদ্রিয়ান নিষেধ করা সত্ত্বেও নূর শাহনাবের সাথে কথা বলতে রাজি হয়েছে, এমনকি নূরের হাত ও ধরেছে শাহনাব। এখানেও আদ্রিয়ানের রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। "
" কিন্তু নূর ইচ্ছে করে এসব করেনি,শাহনাব জোর করে নূরের হাত ধরেছিলো। "
"নূর যদি শাহনাবের সাথে কথা বলতে রাজি না হতো তাহলে শাহনাব নূরের হাত ধরার সাহস কখনো পেতো না। "
ইলহামের কথায় পায়রা চুপ হয়ে যায় কারণ ইলহামের প্রতিটি কথাই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু বোনের এই অবস্থা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, পায়রা পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইলো ফ্লোরের দিকে, অত:পর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো,
"নূরকে ভীষণ বাজে ভাবে মেরেছে আদ্রিয়ান। আমি সহ্য করতে পারছি না নূরের এই অবস্থা। মেয়েটা কেমন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আছে।"
ইলহাম পায়রার চোখের জল মুছে তাকে জড়িয়ে ধরলো নিজের বুকে,
"সব ঠিক হয়ে যাবে। আদ্রিয়ানকে আমি চিনি, একটু পরেই দেখবে যত্ন নিচ্ছে। "
পায়রা ইলহামের কাছ থেকে সরে বললো,
"আপনি বসুন আমি খাবার নিয়ে আসছি।"
ইলহাম সায় জানাতেই পায়রা চলে যায় রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে, ইলহামের জন্য ভাত বাড়তে।ঠিক সেই সময় রান্নাঘরে কারো উপস্থিতি টের পেতেই সে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে আদ্রিয়ান একটা প্লেটে ভাত ও তরকারি নিচ্ছে, হঠাৎ পেছনে পায়রাকে দেখতে পেয়ে সে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়। পায়রাও কিছুটা অবাক হয় আদ্রিয়ানকে রান্নাঘরে দেখতে পেয়ে৷ আদ্রিয়ান প্লেট হাতে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই পায়রাও ইলহামের জন্য খাবার নিয়ে বেরিয়ে যায়। নূরের পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে কিন্তু তাও সে চুপচাপ বসে রইলো। আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ আগেই রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, নূর ভেবেছে আদ্রিয়ান হয়তো বাহিরে বের হয়েছে কিন্তু তার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে আদ্রিয়ান দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। আদ্রিয়ানকে দেখে নূর শরীরে ভালোভাবে উড়না জড়িয়ে নিলো।আদ্রিয়ানের হাতে খাবারের প্লেট দেখেই তার পেট চু চু করছে কিন্তু সে কিছু বললো না,অপলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো খাবারের দিকে।আদ্রিয়ান নূরের কাছে এসে পাশে থাকা টেবিলের উপর খাবারের প্লেট রেখে আমতাআমতা করে বললো,
"কারো ক্ষুধা লাগলে সে খেয়ে নিতে পারে।"
আদ্রিয়ান যে তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে তা সে ভালোই বুঝতে পারছে, কিন্তু তবুও সে নিজের জায়গা থেকে নড়লো না।আদ্রিয়ান নূরকে উক্ত কথাটি বলে বেলকনিতে চলে যায় তবে নূর তার আনা খাবার ছুঁয়ে দেখেনি।প্রায় বেশ কিছু সময় পর আদ্রিয়ান বেলকনি থেকে এসে দেখলো সে যেভাবে খাবার রেখে গিয়েছিলো সেভাবেই আছে। আদ্রিয়ান রাগান্বিত দৃষ্টিতে নূরের দিকে তাকালে সে মাথা নিচু করে নেয়,আদ্রিয়ান গম্ভীর কন্ঠে বললো,
"এখনো খাও নি কেন?"
নূর আদ্রিয়ানের দিকে তাকালো না,মাথা নিচু করেই উত্তর দিলো,
" আমাকে খেতে বলেননি তাই খাই নি।"
আদ্রিয়ান নূরের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকায়,কিছু সময় পর বুঝতে পারে নূরের কথার মানে।আদ্রয়ান গলা পরিস্কার করে নূরের দিকে প্লেট এগিয়ে দিয়ে বললো,
"তারাতাড়ি খাওয়া শেষ করো।"
নূর এক পলক আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে তার হাত থেকে প্লেট নিয়ে খেতে শুরু করলো।
সূর্যের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে বিলীন হতে লাগলো, চারদিকে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে,জোনাকি পোকারা উঁকি দিচ্ছে এদিক সেদিক।রাহেলা শাহ সবেমাত্র ফিরেছেন সুরাইয়া শাহকে নিয়ে। সুরাইয়া শাহ'র হাটুর ব্যথাটা বেড়েছে তাই তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন রাহেলা শাহ। বাড়িতে এসে কাউকে দেখতে না পেয়ে তিনি কিছুটা অবাক হোন, সুরাইয়া শাহ'কে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে তিনি আদ্রিয়ানের ঘরে এসে দেখেন নূর এই সময় ভাত খাচ্ছে, নূরকে এই সময় খেতে দেখে তিনি কপাল কুঁচকে বললেন,
"এটা খাওয়ার সময় হলো?"
হঠাৎ রাহেলা শাহ'কে দেখে নূরের হাত থেমে গেলো, মাত্র মুখে দিতে নিয়েছিলো সে। আদ্রিয়ান রাহেলা শাহ'কে দেখে বললো,
"মা, কোথায় গিয়েছিলে দাদীজানকে নিয়ে?"
"তোমার দাদীজানের হাঁটুর ব্যথা বেড়েছে তাই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম।"
নূরকে বসে থাকতে দেখে আদ্রিয়ান গম্ভীর কন্ঠে বললো,
"কি হলো খাচ্ছো না কেন?"
"এইতো খাচ্ছি।"
রাহেলা শাহ তাকিয়ে থাকায় নূর কিছুই ইস্ততবোধ করলো, তবে আদ্রিয়ানের কথায় সে আবারও খাওয়া আরম্ভ করতেই রাহেলা শাহ বলে উঠেন,
"খাওয়া শেষ হলে রান্নাঘরে গিয়ে রান্না বসিয়ে আমায় উদ্ধার করো।"
রাহেলা শাহ চলে যেতেই নূর তারাতাড়ি খাওয়া শেষ করে রান্নাঘরে চলে যায়। রাহেলা শাহ ফ্রিজ থেকে কিছু সবজি ও মুরগী বের করে কাটার জন্য, ফারজানা আজ আসেনি, তার বাবা অসুস্থ থাকায় ছুটি নিয়েছে আজ৷ নূর লাউ ও কাকরোল দেখে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়,পুরো শরীর এখনো ব্যথায় টনটন করছে।নূর দেখলো তার পায়েও মারের দাগ পরেছে। ফর্সা চামড়ায় মারের দাগ স্পষ্ট।পায়ের উপরিভাগের দাগটা ভীষণ জ্বলজ্বল করছে। নূরের বসতে খুব কষ্ট হচ্ছে, বসে তরকারি কাটা এখন তার জন্য বেশ কষ্টকর লাগছে।উড়না একপাশে রেখে সে টমেটো কাটতে নিলে ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে, বসে কাজ করা সম্ভব না আপাতত তার পক্ষে। এই মুহুর্তে রাহেলা শাহ এসে যদি দেখেন এখনো কাটা হয়নি তাহলে হয়তো আজ তার কপালে ভীষণ দুঃখ রয়েছে। নূর হাজার চেষ্টা করেও একটা টমেটো কাটতে পারলো না,বসতে গেলেই পায়ে ব্যথা করছে,উপায় না পেয়ে সে এদিক ওদিক তাকিয়ে পায়রার ঘরের দিকে এগিয়ে যায়,পায়রা ধুয়ে রাখা কাপড় তার বেলকনিতে শুকোতে দিচ্ছিলো কিন্তু হঠাৎ নূরকে তার ঘরে আসতে দেখে কিছুটা অবাক হয়।এই সময় তো নূরের বিশ্রাম করার কথা।পায়রা নূরের কাছে যেতেই নূর পায়রাকে মলিন কন্ঠে বলে,
"আপু আমার একটা সাহায্যের প্রয়োজন ছিলো।"
"কি লাগবে বল? ব্যথা করছে এখনো? "
"আমাকে একটু সবজিগুলো কেটে দাও, আমি বসে কাটতে পারছি না, শরীরে প্রচন্ড ব্যথা।"
পায়রা নূরের কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়,এই সময় তো নূরের বিশ্রাম করার কথা তা না করে কাজ করছে তাও এই দূর্বল শরীর নিয়ে। পায়রা নূরের দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললো,
"তোকে কাজ করতে কে বলেছে?ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিস না অথচ কাজ করতে চলে এলি?"
" আম্মা বলে গেলো সবজিগুলো কেটে রাখতে তাই..... "
পায়রা নূরের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলো, নূর পায়রার পিছু পিছু এসে দাঁড়ালো রান্নাঘরে, পায়রা সবগুলো সবজি কেটে মুরগী কাটার প্রস্তুতি নিতে লাগলো। রাহেলা শাহ রান্নাঘরে এসে নূরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো,
"কি হলো তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন?আর পায়রা তোমাকে এসব করতে কে বলেছে?"
পায়রা রাহেলা শাহ'র দিকে তাকালো না, সে নিজের কাজ করতে করতেই উত্তর দিলো,
"আমার বোনের খেয়াল তো আমাকেই রাখতে হবে, তাই নিজ থেকেই করছি।"
"কি বলতে চাইছো?আমরা নূরের খেয়াল রাখি না?"
পায়রা নিজের হাতের কাজ রেখে রাহেলা শাহ'র দিকে তাকিয়ে বললো,
"খেয়াল রাখলে এই ব্যথাযুক্ত শরীর নিয়ে কাজ করতে বলতেন না আপা।"
চলবে,,,,,,,,
কালকে সকালে বোনাসপর্ব দিবো গ্রুপে। সবাই জইন হয়ে নিন
https://facebook.com/groups/4214405902220456/