#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(১৭) প্রথমাংশ
অন্ধকার ঘরের এক কোনায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে শাহনাব, অন্ধকার ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ঘরের বেশিরভাগ জিনিসপ, ভাঙা পারফিউমের বোতল থেকে কড়া গন্ধ বের হচ্ছে,শামীমা চৌধুরী তখন থেকে দরজা ধাক্কিয়ে চলেছেন কিন্তু শাহনাবের কোন সাড়াশব্দ নেই,সে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে আগের মতো। ইশতেহার চৌধুরী তার ঘরে ব্যস্ত পায়ে পাইচারি করছে।শামীমা চৌধুরী ক্রন্দনরত স্বরে বললেন,
"শাহনাব দরজা খুলো। এ কেমন ছেলেমানুষী করছো তুমি।" এইবারও কোন সাড়াশব্দ এলো না আগের বারের মতো। শাহনাব দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। আকাশে জ্বলজ্বল করা চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভারী নিঃশ্বাস ফেললো শাহনাব।দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ জোড়ালো হতেই সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো দরজার সামনে।দরজা খুলতেই শামীমা চৌধুরী তড়িঘড়ি করে তার রুমে প্রবেশ করলো,চারদিকে অন্ধকার দেখতে পেয়ে তিনি আলো জ্বালিয়ে দিলেন, তবে রুমের অবস্থা দেখে তার চোখ কপালে।এ কি অবস্থা করেছে ঘরের। শামীমা চৌধুরী মেঝেতে পরে থাকা কাঁচের টুকরো দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে যান।ব্যস্ত ভঙ্গিতে শাহনাবের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় ছেলের মলিন চেহারা। ক্লান্ত চোখ দুটো কেমন লাল হয়ে আছে। দুপুরে বাড়ি ফেরার পর কিচ্ছু মুখে তুলেনি সে, শামীমা চৌধুরী জোর করেও কিছু খাওয়াতে পারেননি তাকে। শাহনাবের বা হাতের দিকে তাকিয়ে দেখেন র'ক্ত শুকিয়ে লেগে রয়েছে। তৎক্ষনাৎ ছেলের হাত নিজের হাতের মুঠোয় এনে ভালোভাবে পরখ করে বললেন,
" কি অবস্থা করেছো নিজের শাহনাব? নূরের চেয়েও ভালো মেয়ের সাথে বিয়ে দেবো আমি তোমার।"
শাহনাবের মাঝে কোন ভাবান্তর দেখা গেলো না। সে একরোখা উত্তরে বললো,
"আমার নূরকে চাই মা।"
"নূরকে ভুলে যাও শাহনাব। আর কতদিন এভাবে নিজেকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে চলবে? "
"আমার নূরকে চাই মা, আপনি আমার ভালোবাসাকে আমার কাছে এনে দিন মা। আমি আমার সমস্ত সুখের বিনিময়ে হলেও নূরকে চাই।"
শামীমা চৌধুরী আশাহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন শাহনাবের দিকে, ছেলের সুখে থাকার আসল পথ্যকে চিনি চাইলে আনতে পারবেন না। শাহনাব মায়ের কোলে মাথা রেখে বললো,
"জানেন মা, আজ আমি নূরের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম আদ্রিয়ানের সত্যিটা বলতে অথচ নূর আমার সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি মা।আগের নূর আর এখনের নূরের মাঝে অনেক পার্থক্য। "
"নূর এখন আর আগের নূর নেই, এখন সে কারো বাড়ির বউ।"
শামীমা চৌধুরীর কথা শুনে শাহনাব চুপ করে রইলো অত:পর ধীর কন্ঠে বললো,
"আমি কি খুব খারাপ মা? তাহলে নূর আমার হলো না কেন?"
★
আদ্রিয়ান ও রুশান দুজনেই ক্লাবে এসেছে।রুশান আদ্রিয়ানকে ওয়াইনের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে নিজেও চুমুক দিলো,অত:পর আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
" শুনেছি আজ ভাবীর উপর খুব রাগ ঝেড়েছো আদ্রিয়ান ভাই।"
আদ্রিয়ান সবেমাত্র চুমুক বসিয়েছে গ্লাসে,রুশানের কথা শুনে আবারও কলেজের ঘটনা মনে পরে যাওয়ায় মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। এক নিঃশ্বাসে পুরো গ্লাস শেষ করে ফেলে, রুশান আদ্রিয়ানের জেলাসি বুঝতে পেরে বললো,
"আদ্রিয়ান ভাই তোমার কি হিংসে হচ্ছিলো শাহনাব ভাবীর হাত ধরায়?"
আদ্রিয়ান অন্য দিকে তাকিয়ে আমতাআমতা করে বললো,
"হিংসা হবে কেন? আমার জিনিসে কারো নজর ও সহ্য হয় না আমার।"
" তাহলে মেনেই নিয়েছো ভাবী তোমার।"
আদ্রিয়ান যেন নিজের কথায় নিজেই ফেঁসে গিয়েছে, সে রুশানকে এক প্রকার ধমক দিয়ে বললো,
"তোকে কে বললো এতো মাথা ঘামাতে? কাজের চেয়ে মুখ বেশি চলে।"
রুশান আদ্রিয়ানের ধমক খেয়ে বিরবির করে বললো,
"সত্যি বললে সকলেরই গায়ে লাগে।"
আদ্রিয়ান রুশানের কথা শুনে তার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে,
" কি বলছিস বিরবির করে?"
"না ভাই, কিছু বলিনি।"
রুশান এক প্রকার দৌড়ে বেরিয়ে গেলো, আদ্রিয়ান রুশানের যাওয়ার পথে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে নিজেও বেরিয়ে গেলো ক্লাব থেকে। রাতের বেশিরভাগ সময় তার ক্লাবেই কেটে যায়। তবে আজ একটু তারাতাড়িই বাড়ি ফিরেছে সে। সবেমাত্র রাত নয়টা বাজে। নূর জানলার পাশে বসে রাতের আকাশে তারা গুনছে, পাশে অবহেলিত ভাবে পরে আছে তার ভাঙা ফোন। একটু আগেই পায়রা ঔষধ খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে। ফোনটাও নেই, তখন আছড়ে ভেঙে ফেলেছিলো আদ্রিয়ান। টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিলো মুহুর্তেই। রুমের দরজা খুলে কেউ প্রবেশ করতে নূর উড়না ঠিক করে জড়োসড়ো হয়ে বসলো, আদ্রিয়ান নূরের দিকে এক পলক তাকিয়ে বেলকনিতে গিয়ে বসে, ঠান্ডা মৃদু হাওয়ায় আজ পরিবেশ বেশ শান্ত। আদ্রিয়ান আড়চোখে নূরকে দেখছে। জানলা দিয়ে ঠিক করে বাতাস আসছে না, বাহিরের মনোরম পরিবেশ নূরকে মুগ্ধ করছে। নূর বেলকনিতে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে। আদ্রিয়ান তা লক্ষ্য করেও চুপ করে রইলো, তখন ব্যথা না থাকলেও এখন কিছুটা বেড়েছে। হুট করে এক দমকা হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিলো নূরের খোপা বাঁধা চুল। মুহুর্তেই কারেন্ট চলে গেলো, চারদিক নিস্তব্ধ৷ আদ্রিয়ান এক মনে তাকিয়ে আছে খোলা আকাশের পানে, নূর বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে বাহিরের দিকে।এখান থেকে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। আদ্রিয়ান নূরের দিকে তাকিয়ে গলা পরিস্কার করে বললো,
" বেলকনিতে আসতে চাও?"
নূর মুহুর্তেই আদ্রিয়ানের কথায় মাথা নেড়ে সায় জানায়।আদ্রিয়ান চেয়ার থেকে উঠে নূরের কাছে এসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই নূর সাদরে গ্রহণ করলো সেই প্রস্তাব। তবে এক পা বাড়াতেই চোখ খিঁচে দাঁড়িয়ে পরে। আদ্রিয়ান তা বুঝতে পেরে নূরকে মুহুর্তেই কোলে উঠিয়ে নেয়। আচমকা কোলে নেওয়ায় নূর অবাক চোখে তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে।অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, আদ্রিয়ান নূরকে নিয়ে বেলকনির চেয়ারে বসলো। আদ্রিয়ানের পাশের চেয়ারে বসে আছে নূর। বাহিরের মনোরম দৃশ্য দেখে নূরের বেশ ভালো লাগছে, মৃদু হাওয়া ও মাঝে মাঝে দমকা খাওয়ায় পরিবেশটা দারুণ লাগছে। চাঁদের আলোয় নূরকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, আদ্রিয়ান না চাইতেও বারবার আড়চোখে নূরকে দেখছে। ক্লান্ত থাকায় আজ নূরের চোখের ঘুমেরা বেশ জলদি বাসা বেঁধেছে।বারবার ঝিমাচ্ছে সে, আদ্রিয়ান বুঝতে পেরে নূরকে নিজের সাথে আগলে ধরলো। উষ্ণতা পেয়ে আদ্রিয়ানের বুকে মাথা রেখে কবে ঘুমিয়ে গিয়েছে খেয়াল নেই তার। সময় পেরিয়ে গিয়েছে নিজের মতো , রাত বাজে একটা। আদ্রিয়ান এখনো নূরকে নিয়ে বসে আছে বেলকনিতে। কিছু একটা মাথায় আসতেই সে নূরের পাশ ছেড়ে উঠে গেলো অত:পর মলম হাতে এগিয়ে গেলো নূরের কাছে।
#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(১৭) বর্ধিতাংশ
ভোরের আলো ফুটেছে সবেমাত্র, সূর্য উঠবে কিছুক্ষণ পর। ঘুম ভাঙতেই নূর পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো এখনো তারা বেলকনিতেই আছে। মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে নূরের৷ নূর আদ্রিয়ানের দিকে তাকাতেই দেখে সে গভীর ঘুমে মগ্ন। গতকাল রাতে তারাতাড়ি ঘুমিয়ে পরায় খাওয়ার সুযোগ হয়নি তাই সকাল হতেই পেটে ইঁদুর দৌড়ানো শুরু করেছে। আদ্রিয়ানকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দেখে নূর আর তাকে জাগালো না। আস্তে করে উঠে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। হাটতে গিয়ে লক্ষ্য করলো এখন আর গতকালের মতো ব্যথা নেই। ফ্রেশ হয়ে এসেই সে নিচে চলে গেলো রান্নাঘরে,খিদে পেয়েছে ভীষণ। এখনো কেউ ঘুম থেকে উঠে নি।নূর এক কাপ চা ও দুটো পাউরুটি নিয়ে খেয়ে নিলো। আজ কলেজে পরীক্ষা আছে, নূর তারাতাড়ি করে আলু পরোটা ও চা বসিয়ে দিলো। সকাল নয়টা থেকে পরীক্ষা তাই আগে আগে বেরোতে হবে। রাহেলা শাহ রান্নাঘরে এসে দেখলে নূর চা বসিয়েছে তাই আর কিছু না বলে দপুরে রান্নার জন্য সবজি নিয়ে নিলেন। আজকাল সুরাইয়া শাহ'র শরীর ভালো যাচ্ছে না তাই ডাক্তার তাকে কিছুদিন রেস্ট নিতে বলেছেন।নূর দুটো পরোটা ও চা নিয়ে সুরাইয়া শাহ'র ঘরে গেলো, সুরাইয়া শাহ টিভিতে খবর শুনছিলেন।নূর তাকে নাশতা এগিয়ে দিতেই তিনি বললেন,
"দেখি এখানে বসো। "
সুরাইয়া শাহ'র কথা শুনে নূর তার সামনে এসে বসলো, তিনি নূরের জামার হাত উপরে উঠিয়ে মারের দাগ দেখে বললেন,
" কেন কথা শুনো না বলতো ছেলেটার? কেমন করে মারলো। "
নূর সুরাইয়া শাহ'র কথা শুনে মলিন হেসে বললো,
" এখানে আমার দোষ ছিলো না দাদীজান।আমি......"
নূরের কথা শেষ হওয়ার আগেই সুরাইয়া শাহ নীরের মাথায় হাত রেখে বলেন,
" মা রে, পৃথিবীর কোন স্বামীই চাইবে না তার স্ত্রীকে কোন পরপুরুষ স্পর্শ করুক। আমি সবটা শুনেছি আদ্রিয়ানের কাছ থেকে।কাল রাতে যখন তুমি ঘুমাচ্ছিলে তখন আদ্রিয়ান আমার কাছে এসেছিলো তোমার জন্য ব্যথা মালিশের তেল নিতে। তখনই সবটা খুলে বলেছিলো আমাকে।"
নূর সুরাইয়া শাহ'র কথা শুনে অবাক হয়,আদ্রিয়ান তার জন্য উনার কাছে এসেছিলো?সুরাইয়া শাহ নূরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"আদ্রিয়ান তোমাকে আগেও নিষেধ করেছিলো শাহনাবের সাথে কথা না বলতে। গতকাল যদি তুমি শাহনাবের সাথে কথা বলতে রাজি না হতে তাহলে শাহনাব কখনো তোমায় স্পর্শ করার সুযোগ পেতো না। পুরুষ মানুষ সব সহ্য করতে পারলেও নিজের স্ত্রীকে অন্য কারো সাথে কখনো সহ্য করবে না। "
নূর সুরাইয়া শাহ'র কথা শুনে মাথা নিচু করে মনে মনে বলে,
"সত্যিই তো, কাল যদি আমি শাহনাব ভাইয়ের কথা শুনতে রাজি না হতাম তাহলে তো এতোকিছু হতো না।"
নূরকে চুপ করে থাকতে দেখে সুরাইয়া শাহ নূরের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে,
" বাপছাড়া বড়ো হয়েছে তো তাই একটু ছন্নছাড়া স্বভাবের। চোখের সামনের বাবার মৃ'ত্যু দেখার পর কথা বলা ভুলে গিয়েছিলো একদম। কত ডাক্তার দেখিয়েছি এই ছেলের জন্য। প্রায় এক বছর পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে আদ্রিয়ান। এরপর থেকে একপ্রকার খাপছাড়া হয়ে গিয়েছে ছেলেটা, নিজের মনমর্জির উপর চলে। "
আদ্রিয়ানের বাবা মারা গিয়েছে জানার পর নূর কিছুটা অবাক হয় কারণ এই বাড়ির কেউই এতোদিন তাকে এই কথাটা জানায়নি। কথা বলতে বলতে কখন সময় হয়ে গিয়েছে টেরই পায়নি নূর। সুরাইয়া শাহ'র ঘর থেকে বেরোতেই দেখে ইলহাম ও পায়রা সুরাইয়া শাহ'র ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এতো সকালে তারা দুইজন এখানেই বা কি করছে? নিচে নামতেই দেখে ইলহাম ও পায়রা দুজনেরই কিছু জিনিসপত্র রাখা আছে, তবে কি আজই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে তারা?পায়রা চলে যাবে ভাবতেই বূকে মোচড় দিয়ে উঠে নূরের। ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে চললো সুরাইয়া শাহ'র ঘরের দিকে ভেতরে গিয়েই দেখতে পায় ইলহাম ও পায়রা সুরাইয়া শাহ'কে সালাম করছে। ইলহাম মলিন কন্ঠে বললো,
"আমরা চলে যাচ্ছি আম্মা। এখন আর আমার স্ত্রীকে নিয়ে এই বাড়িতে কোন ঝামেলা হবে না। "
এক ছেলেকে হারানোর পর আরেক ছেলেও চলে যাচ্ছে তাকে ছেড়ে। আলাদা ঘর, আলাদা সংসার গড়ে তুলেছে। সুরাইয়া শাহ ইলহামকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
"আমার কথায় রাগ করে চলে যাচ্ছো আব্বা?আম্মার বয়স হয়েছে।কখন কি বলি তার ঠিক নেই মতোমরা চলে গেলে আমার সংসার একা হয়ে যাবে। "
"দূরে কোথাও যাচ্ছি না আম্মা।কিছুদূর পরেই আমাদের নতুন বাড়ি। আপনার যখন ইচ্ছে হয় চলে আসবেন আম্মা। আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার সাধ্যি কোথায় আমার,বলুন।"
ইলহামের কথায় তিনি শান্ত হলেন না, বরঞ্চ কান্নার গতি বাড়িয়ে বললেন,
"শেষ বয়সে এসে আমায় একা করে যাবে ইলহাম? আমি কখন ম'রে যাই ঠিক নেই৷ "
"এসব কি বলছেন আম্মা? আপনার কিচ্ছু হবে না। একটা ফোন করলেই আমি চলে আসবো। "
পায়রা সুরাইয়া শাহ'র কাছে এসে বললো,
"আমায় ক্ষমা করবেন আম্মা, আমার কথা কষ্ট পেলে ক্ষমা করে দিবেন। "
"তোমার কোন দোষ নেই পায়রা। আমার ছেলেটাকে বুঝাও তুমি। শেষ বয়সে এসে আমি এভাবে তোমাদের ছাড়া কিভাবে থাকবো।"
পায়রা সুরাইয়া শাহ'র হাত ধরে বললো,
"আমার বোনটাকে দেখে রাখবেন আম্মা। আমার খুব আদরের বোন নূর।"
নূর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো পায়রার কথায়,নূরকে দেখতে পেয়ে পায়রা তার কাছে এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।
"আপু তুমি চলে যেও না। "
" আমার কিছু করার নেই নূর। উনি চায় না আমরা এখানে থাকি। "
পায়রার কথা শুনে নূর ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলে। অপরদিকে সবেমাত্র আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠেছে আদ্রিয়ান। বসে ঘুমানোয় ঘাড়ে ব্যথা করছে। পাশ ফিরে নূরকে দেখতে না পেয়ে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল সাড়ে সাতটা বাজে। নিচ থেকে শোরগোলের আওয়াজ পেয়ে সে কিছুটা বিচলিত হয়,সাত সকালে কারাই বা চিৎকার চেঁচামেচি করছে। কি হিয়েছে দেখার জন্য নিচে নামতেই দেখে ইলহাম ও পায়রা দাঁড়িয়ে আছে তাদের ব্যাগপত্র নিয়ে। আদ্রিয়ানের দু চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে নূরকে। এই সময় নূর কোথায় গেলো? কিছু সময় পর দেখতে পেলো নূর পায়রার হাতে একটা ব্যাগ দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আদ্রিয়ানকে দেখে ইলহাম তার কাছে এসে বললো,
"নিজের খেয়াল রাখবি। "
ইলহামের কথায় আদ্রিয়ান কিছুটা অবাক হয়।সকাল থেকেই একটার পর ধাক্কা খেয়ে আসছে সে। আদ্রিয়ানকে অবাক করে দিয়ে ইলহাম বললো,
"চলে যাচ্ছি এই বাড়ি ছেড়ে। আমার সংসার আমি আমার নতুন ঘরে গড়ে তুলবো। "
ইলহামের কাছ থেকে আদ্রিয়ান বোধহয় এটা আশা করেনি। ইলহাম চলে যাচ্ছে তাকে ছেড়ে। আদ্রিয়ান অবাক কন্ঠে শুধালো,
"চলে যাচ্ছো মানে?"
ইলহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
"আর ফিরবো না এই বাড়িতে। সারাজীবনের জন্য নতুন বাড়িতে পদার্পণ করছি।"
আদ্রিয়ানের মুখ থেকে আর একটা শব্দ ও বেরোলো না। ছোট থেকে যার সাথে সবসময় মেতে থাকতো আজ সে চলে যাবে। ইলহাম ও পায়রা দুজনেই বেরিয়ে পরে। আদ্রিয়ান নিজের ঘরে চলে এলো, আজ ইন্টারভিউ আছে একটা কোম্পানিতে। অবশ্য ইলহামই ঠিক করে দিয়েছে চাকরিটা। আদ্রিয়ান নিজের কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে নিতে দেখলো নূর হেঁচকি দিতে দিতে ঘরে ঢুকছে। নূরকে কাঁদতে দেখে আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করে,
"কি হলো কাঁদছো কেন?"
নূর কোন উত্তর দিলো না, আদ্রিয়ান ও বিষয়টা আর ঘাটলো না। নূর তার বোরকা হাতে নিয়ে তৈরি হতে লাগলো,ব্যাগে সবকিছু গুছিয়ে নিতে গিয়ে খেয়াল করলো কলম শেষ হয়ে গিয়েছে, আর কলম অবশিষ্ট নেই। আদ্রিয়ানের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় সে আকাশী রঙের একটা শার্ট পরে তৈরি হচ্ছে।নূর ধীর পায়ে আদ্রিয়ানের সামনে এগিয়ে যায়। তবে কিছু বলার সাহস পায় না। হঠাৎ চোখের সামনে নূরকে এভাবে ঘুরাঘুরি করতে দেখে জিগ্যেস করলো,
"কি হয়েছে? কিছু বলবে?"
নূর আমতাআমতা করে বলে,
"আজ পরীক্ষা কিন্তু আমার কলম শেষ হয়ে গিয়েছে। "
আদ্রিয়ান শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলে,
" আমি যাওয়ার সময় কিনে দিবো।"
প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গিয়েছে। নূর বেশ তাড়াহুড়ো করেই বেরিয়েছে, দেরি হয়ে গেলে তারই ক্ষতি। আদ্রিয়ান তাকে নিয়ে পাশের একটা দোকানে এসেছে,সেখান থেকে প্রয়োজনীয় কলম, স্কেল ও পেন্সিল সবই কিনে দিলো। যদিও নূর শুধুমাত্র কলমের কথা বলেছিলো তবে আদ্রিয়ান তাকে সবকিছুই আবার নতুন করে কিনে দিয়েছে।নিত্যদিনের মতো আজকেও শাহনাব দাঁড়িয়ে আছে কলেজ প্রাঙ্গনের সামনে। নূর তাকে দেখতে পেয়ে শুকনো ঢোক গিললো, কলেজে ঢোকার সময় সবসময়ের মতো আজও আদ্রিয়ান নূরের হিজাব ঠিক করতে করতে বললো,
" কালকের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। "
নূর শাহনাবের দিকে তাকিয়ে বলে,
"আচ্ছা।"
নূর চলে যেতেই শাহনাব ক্ষিপ্র গতিতে আদ্রিয়ানের শার্টের কলার ধরে বললো,
"কি করেছিস তুই নূরকে?"
চলবে,,,,,,,