#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(১৯) প্রথমাংশ
আপনি যেভাবে বলেছেন আমি তো সেভাবেই করছি।"
নূরের কথায় তিনি ঝাঁঝালো স্বরে বললেন,
"ঠিক ভাবে করো।ময়লা যায়নি এখনো।"
নূর চুলে খোপা বেঁধে আবারও কাপড় ধুতে লাগলো। প্রায় দু ঘন্টা পর সে মুক্ত হলো এখান থেকে। সবগুলো শাড়ি বালতিতে ভরে নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে মেলে দেয়। বালতি বাথরুমে রেখে নূর চলে যেতে নিলে রাহেলা শাহ বলেন,
"এক কাপ চা নিয়ে এসো আমার জন্য। "
"আনছি। "
থ্রি-পিসের অর্ধেকটা অংশ ভিজে গিয়েছে নূরের। সে চুলায় পানি গরম করতে দিয়ে রুমে এসে দেখে আদ্রিয়ান সোফায় আধশোয়া অবস্থায় ঘুমাচ্ছে। নূর সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে আরেকটা থ্রি-পিস নিয়ে বাথরুমে যায় কাপড় বদলাতে। কাপড় বদলে মুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসতে গেলে দেখতে পায় আদ্রিয়ান সোজা হয়ে বসে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আদ্রিয়ানকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অসস্তি দেখা দিলো নূরের মাঝে। পরক্ষণে খেয়াল করতেই দেখে উড়না তো বিছানায় রেখে এসেছে। সবকিছু বুঝে উঠতে বেশ কিছুটা সময় লাগলো নূরের।তৎক্ষনাৎ দৌড়ে এসে উড়না টা নিজের শরীরে জড়িয়ে নেয়। সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে কবে যে চোখ লেগে এসেছিলো আদ্রিয়ানের সে বুঝতেই পারেনি৷ পানির শব্দ পেয়ে ঘুম ভাঙে তার। পিটপিট করে চোখ খুলতেই দেখতে পায় নূর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কিছু বুঝে উঠার আগেই নূরকে দৌড়ে বিছানার দিকে যেতে দেখে আদ্রিয়ান হতভম্ব হয়ে যায়।
"কি হয়েছে?এভাবে ছুটোছুটি করছো কেন?"
নূর আদ্রিয়ানের প্রশ্নে ভেবাচেকা খেয়ে বলে,
" আমি,,,,, আসলে,,,, "
আদ্রিয়ান সোফা থেকে উঠে নূরের সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,
"তুমি কি?"
"চা-চা করতে হবে। আম্মা চা খেয়ে চেয়েছেন।"
উক্ত কথা বলেই নূর তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যায়। নূর বেরিয়ে যেতেই আদ্রিয়ান ফোন বের করে রুশানকে কল দিয়ে বলে,
"শাহনাবের কি খবর?"
"আদ্রিয়ান ভাই খবর পেলাম, শাহনাব ভাইয়ের বাপ নাকি ছেলেকে বাইরের দেশে পাঠিয়ে দিবে।"
আদ্রিয়ান রুশানের কথায় হু হু করে হেসে বলে,
" এতো সহজে হার মেনে নিলো শাহনাব চৌধুরী। "
আদ্রিয়ান ফোন কেটে পাশে থাকা ঝুড়ি থেকে একটা আপেল নিয়ে তাতে কামড় বসালো।
--------------------------------------
"আপনি কেন বুঝতে পারছেন না বাবা, আদ্রিয়ান নূরকে বিয়ে করেছে একমাত্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। "
ইশতেহার চৌধুরী শাহনাবের কথায় বিরক্তিকর কন্ঠে বললেন,
" নূর এখন বিবাহিত । তাদের বিয়েটা যেভাবেই হোক না কেন নূর এখন আদ্রিয়ান শাহ'র কাগজে কলমে লিখিত স্ত্রী। "
শাহনাব তার পাসে থাকা ব্যাগ সজোরে ছুড়ে মারলো, দুহাতে মাথার চুল আঁকড়ে ধরে বললো,
" আমি মানি না এই বিয়ে। আদ্রিয়ান জোর করে আমার নূরকে কেড়ে নিয়েছে বাবা। তুমি কিছু করছো না কেন?"
ইশতেহার চৌধুরী গম্ভীর কন্ঠে শাহনাবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"সবকিছু ক্ষমতার জোরে পাওয়া যায় না শাহনাব। অনেককিছু ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিতে হয়।"
শাহনাব কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভাঙা স্বরে বলে উঠলো
" আমি দেশ ছেড়ে যেতে চাই না বাবা। প্লিজ আমাকে জোর করো না। "
" তোমাকে আজই দেশ ছাড়তে হবে আর এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত। তুমি চাও বা না চাও তোমাকে আমার আদেশ পালন করতে হবে।আমি এই নিয়ে আর কোন কথা বলতে চাই না।"
শাহনাব আশাহত দৃষ্টিতে তার মায়ের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন,
"এটাই ভালো হবে শাহনাব।তোমাকে চোখের সামনে এভাবে একটু একটু করে শেষ হতে দেখতে পারছি না।"
ইশতেহার চৌধুরী শাহনাবের হাতে পাসপোর্ট তুলে দিয়ে বললেন,
"আজ সন্ধ্যা ছয়টায় তোমার ফ্লাইট। আশা করি তোমার আর কোন আপত্তি নেই।"
শাহনাব অপারক হয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো। গোধুলি লগ্ন পার হয়ে গিয়েছে বহুক্ষণ আগেই।একটু পরেই চারদিক বেয়ে নেমে আসবে আবছায়া অন্ধকার। শাহনাব নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিলো। তার বাবার কথাও কোন অংশে মিথ্যে নয়। অতশত না ভেবে সে ব্যাগপত্র গুছিয়ে শামীমা চৌধুরীর ঘরে এলো।
নূর রাহেলা শাহ'কে চা দিয়ে এসে পড়তে বসেছে। কাল ও পরীক্ষা আছে। টানা সাতদিন পরীক্ষা চলবে তার।গতকাল তার বাকি যে সব বইখাতা ছিলো সেসব নিয়ে এসেছিলো আদ্রিয়ান। এই কয়দিনে পড়াশোনা থেকে ভীষণ পিছিয়ে গিয়েছে সে। আদ্রিয়ান ইলহামের সাথে ফোনে কথা বলচজে চাকরির বিষয়ে। চাকরিটা হয়ে গিয়েছে। নূর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো খাতায় লিখে রাখছিলো ঠিক তখনই বাইরে শোরগোলের শব্দ শুনতে পেয়ে সে কিছুটা অবাক হয়।আদ্রিয়ানের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় সেও বিচলিত এই নিয়ে।কি হয়েছে দেখার জন্য নিচে যেতেই দেখতে পায় গেইটের বাইরে থেকে আওয়াজ আসছে। বাইরে আসতেই নূর হতভম্ব হয়ে যায়।শাহনাব দারোয়ানের সাথে ঝগড়া করছে।নূরকে দেখতে পাওয়া মাত্রই শাহনাব তার কাছে ছুটে আসতে নিলে দারোয়ান তাকে থামিয়ে দেয়।এতে শাহনাব তাকে ধাক্কা মেরে নূরের কাছে ছুটে আসে। দারোয়ান তাকে আবারও আটকাতে গেলে পাশ থেকে আদ্রিয়ান ইশারায় তাকে চলে যেতে বলে।শাহনাবকে হঠাৎ এখানে দেখে নূর অবাক কন্ঠে বলে,
"আপনি এখানে কি করছেন শাহনাব ভাই?"
শাহনাব প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
"আমি চলে যাচ্ছি নূর।"
"কোথায় যাচ্ছেন?"
"এই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমাকে আর কেউ বিরক্ত করতে আসবে না প্রতিদিন। বিরক্ত করার মতো মানুষটা চলে যাচ্ছে সারাজীবনের জন্য। "
নূরের খারাপ লাগছে শাহনাবের জন্য। এই মানুষটা তাকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসেছে অথচ বিনিময়ে সে কি দিয়েছে? অবহেলা, বিচ্ছেদ।শাহনাব নূরকে চুপ করে থাকতে দেখে বললো,
" আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো নূর।যখন মনে হবে সবাই তোমার বিরুদ্ধে রয়েছে তখন একবার আমায় ডেকো, আমি সব পিছুটান ফেলে ছুটে আসবো তোমার কাছে। শুধু একটু খানি ঠাঁই দিও তোমার দ্বারে। "
আদ্রিয়ান হাতের মুঠো শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো। নূরকে বলা শাহনাবের কথাগুলো শুনে তার রাগ তরতর করে বেড়ে চলেছে। নূর শাহনাবের কথা শুনে ডুকরে কেঁদে উঠলো। শাহনাবের মতো একজন মানুষকে হারিয়েছে সে। আদ্রিয়ান নূরের সামনে এসে শাহনাবের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
"নূরকে তুই কখনো পাবি না।"
শাহনাব কিছু বলার আগেই আদ্রিয়ান নূরের হাত ধরে টেনে বাড়ির ভেতর নিয়ে যায়। এভাবে টেনে নিয়ে যাওয়ায় সে টাল সামলাতে না পেরে হোচট খেয়ে পড়ে। আদ্রিয়ান সেদিকে খেয়াল না করে নূরকে রাগান্বিত স্বরে বললো,
" শরীরে কি হাঁটার মতো শক্তিটুকুও নেই তোমার?"
আদ্রিয়ানের ধমকে নূর উঠে দাঁড়ালো।আদ্রিয়ান নিজের ঘরে যেতে যেতে বললো,
"রুমে এসো।"
#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(১৯) বর্ধিতাংশ
কপি করা নিষিদ্ধ।
" এই মেয়ের চরিত্রে সমস্যা আছে আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম।ছিহ! শেষ পর্যন্ত কিনা বাড়িতে পরপুরুষ ঢুকালো।"
রাহেলা শাহ নূরকে ধিক্কার জানিয়ে উক্ত কথাগুলো বললেন। নূর উপরে উঠার সময় রাহেলা শাহ'র কথা শুনে থমকে যায়৷ বাড়িয়ে দেওয়া পা সামনে না এগিয়ে আবারও পেছন ফিরে রাহেলা শাহ'র সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। রাহেলা শাহ নূরকে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করে,
"কি হলো এখানে এসেছো কেন?"
নূর রাহেলা শাহ'র প্রশ্নে কঠোর স্বরে উত্তর দিয়ে বলে,
"আম্মা আপনি খুব ভালো করেই জানেন এখানে আমার কোন দোষ নেই।বরং শাহনাব ভাই যে এখানে আসবে সেটাও আমি জানতাম না। তাহলে আপনি আমার চরিত্রে বিনা দোষে কেন দাগ লাগাতে চাইছেন?"
নূরের তীক্ষ্ণ যুক্তিতে রাহেলা শাহ কটমট করে তাকিয়ে বলে,
"একদম গলা উঁচু করে কথা বলতে আসবে না আমার সাথে। তুমি ভুলে যাচ্ছো তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলছো। "
" আমিও এখন এই পরিবারেরই অংশ আম্মা। আমি সব সহ্য করলেও আমার চরিত্রে যদি কেউ আঙ্গুল তুলে আমি সহ্য করবো না। "
" তোমার চরিত্র কেমন আমার জানা আছে,তোমাকে আর কষ্ট করে শিখিয়ে দিতে হবে না।"
নূরকে রুমে আসতে না দেখে আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে নিচে নেমে আসতেই দেখে রাহেলা শাহ ও নূর দুজনের মাঝে কথা কাটাকাটি হচ্ছে।আদ্রিয়ানকে নিচে নেমে আসতে দেখে রাহেলা শাহ তার সামনে এসে বলেন,
" দেখো আদ্রিয়ান। নূর আমার সাথে কেমন ব্যবহার করছে।"
আদ্রিয়ান নূরের দিকে তাকাতেই দেখে সে রাগে ফুসছে,তাই সে রাহেলা শাহ'র দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলো,
"কি হয়েছে মা?এতো চিৎকার চেঁচামেচি কিসের? একটু আগেও তো সব ঠিক ঠাক ছিলো "
"তোমার স্ত্রী আমার সাথে যা নয় তা ব্যবহার করছে। "
রাহেলা শাহ'র কথা শুনে আদ্রিয়ান নূরের কাছে এসে জিগ্যেস করে,
"মা এসব কি বলছে? কি হয়েছে খুলে বলো।"
আদ্রিয়ানের প্রশ্নের জবাবে নূর চিৎকার করে বললো,
" শাহনাব ভাই যে এখানে আসবে তা কি আমি জানতাম?আমি তো পুরোটা সময় রুমেই ছিলাম, আপনার সামনে তাহলে আপনার মা কেন আমার চরিত্রে দাগ লাগাতে চায়ছে? আমার চরিত্রে নাকি সমস্যা আছে। "
আদ্রিয়ান এই প্রথম নূরকে এভাবে রেগে কথা বলতে দেখলো। রাহেলা শাহ নূরকে আদ্রিয়ানের সাথে এভাবে কথা বলতে দেখে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
" দেখো আদ্রিয়ান, ওর কথা বলার ধরণ দেখো, যেন শরীরে তেজ এসেছে। "
নূর রাহেলা শাহ'র কাছে এসে রেগে বললো,
" আপনি আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলার পরেও কিভাবে আশা করেন যে আমি আপনার শুনে চুপ থাকবো।"
পরিস্থিতি বিগড়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আদ্রিয়ান নূরের হাত ধরে তাকে কিছুটা দূরে সরিয়ে বলে,
" তুমি রুমে যাও। আমি দেখছি।"
নূর আদ্রিয়ানের কথায় গজগজ করতে করতে বলে,
" আমার বেলায় যত মারধর, ধমক উপচে পড়ে আর এখন মুখে জবান নেই।"
নূর বিরবির করতে করতে উপরে উঠে যায়, রাহেলা শাহ আদ্রিয়ানের কাছে আসতেই সে কড়া গলায় বলে,
" মা আপনি নূরের চরিত্র নিয়ে কথা উঠালেন কেন?এখানে নূরের কোন দোষ ছিলো না। শাহনাব জোর করে এসেছিলো এখানে। আপনাকে আমি সকালেই বলে দিয়েছিলাম নূরের সাথে যেন আপনি কোনপ্রকার বাজে ব্যবহার না করেন। তাহলে কেন এসব করছেন?"
রাহেলা শাহ আদ্রিয়ানের কথা শুনে কন্ঠে ন্যাকা সুর ফুটিয়ে তোলে বললো,
"এই মেয়ে কেমন তুমি এখনো বুঝতে পারছো না আদ্রিয়ান। নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে তোমাকে।এই আমি বলে রাখলাম।"
"আদ্রিয়ান অন্য সবার মতো নয় যে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে। আপনি নিজের ঘরে যান।"
আদ্রিয়ানের কাছ থেকে কোনপ্রকার আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে তিনি নিজের ঘরে চলে যান।
আবছায়া অন্ধকার চারদিক শীতল হয়ে আছে।মিটিমিটি তারা জ্বলছে আকাশের পানে। জোনাকি পোকাদের ছিটেফোঁটা আলোয় বাহিরের পরিবেশ সৌন্দর্যে মেতে উঠেছে। ঘড়ির কাটার ঠকঠক শব্দ জোড়ালো হলো অন্ধকার ঘরে। সন্ধ্যা নেমে অন্ধকার হওয়া সত্ত্বেও বাতি জ্বালালো না আজ। আদ্রিয়ান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পায় ঘন অন্ধকারে ছেয়ে আছে পুরো ঘর। হাতড়ে ঘরের লাইট জ্বালাতেই দেখতে পায় নূর আধশোয়া অবস্থায় হেলান দিয়ে বসে আছে বিছানার এক কোণে। লাইটের আলো চোখে পড়তেই কুঁচকে আসে চোখে পাতা৷ আদ্রিয়ান একটা সিগারেট ধরিয়ে খাটে উঠে বসে।আদ্রিয়ানের অস্তিত্ব টের পাওয়া সত্ত্বেও সে চোখ খুলে তাকালো না। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসলো নূরের। জ্বরের তাড়নায় শরীর অসাড় হয়ে আসছে । তখন অতগুলো শাড়ি ধুয়ার কারণে জ্বর দেখা দিয়েছে। তবে কারো কাছে খুলে বললো না সে। সিগারেটের ধোঁয়া নাকে এসে ঠেকলো নূরের।সে বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,
" আপনার সিগারেটের ধোঁয়া এখানে আসছে।আমি শ্বাস নিতে পারছি না।"
আদ্রিয়ান ভাবলেশহীন ভাবে উত্তর দিলো,
"তোমার জন্য কি আমি সিগারেট খাবো না নাকি?"
" বেলকনিতে গিয়ে খান।"
"এটা আমার ঘর।আমার যেখানে ইচ্ছে আমি সেখানে বসে খাবো।"
নূর কথা বাড়ালো না আদ্রিয়ানের সাথে। এই মুহুর্তে কথা বলার মতো শক্তিটুকুও নেই তার। আবারও সিগারেটের ধোঁয়া নাকে এসে ঠেকলো তার, গন্ধ সইতে না পেরে নূর তার এক হাত দিয়ে নাক চেপে ধরলো। আদ্রিয়ান নূরের অবস্থা দেখে হাতে থাকা সিগারেট বেলকনিতে গিয়ে ফেলে দিলো। সিগারেট ফেলে আবারও বিছানায় এসে বসতেই দেখতে পায় নূর কাঁশছে,এক পর্যায়ে শরীর গুলিয়ে আসতেই হুট করে মুখ চেপে ধরে খাট থেকে নামতে যাবে সেই মুহুর্তেই আর আটকে রাখতে না পেরে গরগর করে বমি করে দেয়।আচমকা এসব হওয়ায় আদ্রিয়ান নিজেও ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। নূর একবার বমির দিকে তাকিয়ে আরেকবার আদ্রিয়ানের দিকে তাকায়।অত:পর করুণ কন্ঠে বললো,
"আসলে আমি বুঝতে পারিনি। আমি বাথরুমের দিকেই যাচ্ছিলাম কিন্তু তার আগেই...."
আবারও একই ভঙ্গিতে মুখ চেপে বাথরুমের দিকে দৌড়ে গেলো নূর।আদ্রিয়ান তারাতাড়ি করে নেমে নূরের কাছে আসতেই দেখতে পায় পুরো বাথরুম ভরিয়ে ফেলেছে। নূর দূর্বল শরীরে দাঁড়িয়ে আছে। বিন্দুমাত্র শক্তি নেই এসব পরিস্কার করার। হঠাৎ সবকিছু কালচে ঝাপসা হতে শুরু করে চোখের সামনে, আদ্রিয়ান দ্রুত নূরের এক হাত ধরে তাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নেয়।নূর এখন হাঁটতে পারবে না বুঝতে পেরে কোলে করে বিছানায় শুইয়ে দেয় তাকে।নূরের শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, আদ্রিয়ান ড্রয়ার থেকে থার্মোমিটার নিয়ে নূরের মুখে দেয়।
" এটা মুখে নিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকো।"
নূর চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আদ্রিয়ান নাক চেপে ধরে বিছানার পাশে তাকালো যেখানে নূর বমি করেছে। এখন এসব তাকেই পরিস্কার করতে হবে। রাহেলা শাহ'কে ডাকলে তিনি আসবেন বলে মনে হয় না আদ্রিয়ানের।আর কোন উপায় না পেয়ে বাথরুমে থাকা ছোট বালতিতে পানি ও ময়লা কাপড় নিয়ে ওই জায়গাটা পরিস্কার করতে যাওয়ার পর আদ্রিয়ান নিজেই বমি করে দিবে এমন একটা ভাব।
"কি দিনকাল পরলো আদ্রিয়ান শাহ।এখন বমিও পরিস্কার করতে হচ্ছে।"
আদ্রিয়ান বিরবির করে উঠে পরে। কি করবে বুঝতে না পেরে সে মাস্ক করে বমির জায়গাটা পরিস্কার করে তারপর বাথরুম পরিস্কার করে উদ্যত হয়। আদ্রিয়ানকে এভাবে বাথরুমে যেতে দেখে নূর বলে উঠে,
"আপনাকে এসব করতে হবে না, আমি পরিস্কার করে দিচ্ছি।"
মাত্র পরিস্কার করে এসেছে সে।এখন যদি আবার বমি করে দেয় এই ভয়ে আদ্রিয়ান জোর গলায় বললো,
"আমি করে দিচ্ছি।তুমি নিজের জায়গায় শুয়ে থাকো।"
আদ্রিয়ানের কথা শুনে নূর আর এগোলো না, আবারও শুয়ে পরলো বিছানায়।আদ্রিয়ান চোখ বন্ধ করে বাথরুম পরিস্কার করে এসেছে। জীবনে প্রথমবার এসব করার পর তার অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। শরীর গুলিয়ে উঠছে তার। পরনের শার্ট বদলে একটা গেঞ্জি পরে হাত মুখ ধুয়ে নূরের পাশে এসে বসে। থার্মোমিটার হাতে নিয়ে দেখতে পায় প্রায় একশত চার ডিগ্রি জ্বর। হঠাৎ এতো জ্বর কিভাবে আসলো বুঝতে পারছে না সে। আপাতত কিছু একটা না করলে অবস্থা বিগড়ে যেতে পারে। তাই সে দ্রুত ডাক্তারকে ফোন করলো। তাদের পারিবারিক ডাক্তার খন্দকার সাহেব মিনিট দশেকের মাঝেই উপস্থিত হলো। হঠাৎ ডাক্তার ডাকতে দেখে রাহেলা শাহ কিছুটা অবাক হোন, কারণ এই সময় তো বাড়িতে অসুস্থ কেউ নেই।তিনি আদ্রিয়ানের কাছে এসে জিগ্যেস করলেন,
"কি হয়েছে আদ্রিয়ান।ডাক্তার ডাকলে কেন?"
আদ্রিয়ান খন্দকার সাহেবকে উপরে নিয়ে যেতে যেতেই উত্তর দিলো,
" নূরের হঠাৎ জ্বর এসেছে।তাই ডাক্তার ডাকতে হয়েছে।"
নূরের কথা শুনে তিনি মুখ ভেঙচিয়ে বলেন,
"সামান্য জ্বর এসেছে দেখে ডাক্তার নিয়ে এসেছে। ওসব সামান্য জ্বরে কেউ মরে না।"
আদ্রিয়ান সে কথায় কান দিলো না।ডাক্তার নিয়ে চলে গেলো রুমে।ডাক্তার নূরকে চেক করতে করতে আদ্রিয়ানের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বললো,
" এই মেয়েটা কি তোমার স্ত্রী আদ্রিয়ান?"
আদ্রিয়ান উদিগ্ন চাহনি তাক করে বললো,
" হ্যাঁ আমার স্ত্রী। "
" সিরিয়াস কোন ব্যপার না। হঠাৎ করে বেশি পানি ঘেটেছে তো তাই জ্বর এসে গিয়েছে। ঠিকভাবে যত্ন নিলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।"
খন্দকার সাহেব ঔষধ লিখে চলে যান।আদ্রিয়ান দেখতে পায় ঔষধগুলো তার ঘরে আছে, তাই আর কিনে আনার প্রয়োজনবোধ করলো না। আদ্রিয়ান সোজা রান্নাঘরে গিয়ে দেখতে পায় দুপুরের খাবার ভাত মাছ ও ঢেরস ভাজি রাখা আছে। সেখান থেকে কিছুটা নূরের জন্য তুলে নিয়ে রুমে চলে যায়। নূরের শরীর কাঁপছে। মোটা কাথা শরীরে জড়িয়ে রাখা সত্ত্বেও ঠান্ডা লাগছে।আদ্রিয়ানকে রুমে আসতে দেখে সে দূর্বল কন্ঠে বললো,
" ফ্যান টা বন্ধ করে দিন।আমার ঠান্ডা লাগছে।"
আদ্রিয়ান গরমে ঘেমে একাকার অথচ এইদিকে নূর ঠান্ডায় কাঁপছে। বাধ্য হয়ে ফ্যান বন্ধ করে নূরের পাশে প্লেট রেখে বললো,
"খেয়ে নাও, এরপর ঔষধ খেতে হবে। "
"খিদে নেই আমার।"
আদ্রিয়ানের বিরক্ত লাগা কাজ করছে, সে ধমকের সুরে বললো,
"আমি এখানে তোমার নাটক দেখার জন্য বসে নেই।সেবা করছি মানে ভেবো না যে আমি তোমার এসবে সায় দেবো। নিজের লাভের জন্যই করছি এসব।চুপচাপ খেয়ে নাও।"
নূরের চোখে জল টলমল করছে, সে এক হাতে চোখের জল মুছে নিলো। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও খাওয়া শুরু করেছে।সবকিছু তিতা লাগতে শুরু করায় রুচি চলে গিয়েছে তার।দুই তিন নলার বেশি খেতে পারলো না।আদ্রিয়ান ও আর জোর না করে ঔষধ খাইয়ে দেয়। ঔষধ খাওয়ার পরপরই ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে সে। আদ্রিয়ান পাশে বসে ফোন টিপছে।কোনকিছুই ভালো লাগছে না। রাত খানিকটা গভীর হয়েছে। নিস্তব্ধ ঘরে নূর বিরবির করে কি যেন বলছে।আদ্রিয়ান এখনো ঘুমায়নি, নূরের গলার আওয়াজ পাওয়ায় তার ঠোঁটের কাছে কান নিয়ে শোনার চেষ্টা করছে নূর কি বলছে। নূরের আধো আধো শব্দে বলা কথা শুনে আদ্রিয়ান স্তব্ধ হয়ে যায়। নূর কাঁপা কাঁপা স্বরে বিরবির করে বলে,
" আমায় আর মারবেন না, আমি তো মাটির মানুষ শরীর ভীষণ ব্যথা লাগে,খুব কষ্ট হয়।আমার তো এখানে আগলে রাখার মতো কেউ নেই।"
চলবে,,,,,,,,
সকালেই দিতাম।কারেন্ট সকাল থেকে নেই। সন্ধ্যায় আসে কিনা সন্দেহ। আম্মুর হটস্পট দিয়ে পোস্ট করলাম।