#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(২৩)
কপি করা নিষিদ্ধ
পায়রার অভিমানি কথায় ইলহাম স্মিত হেসে বললো,
" তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো পূর্ণতা।"
পায়রার দুচোখ বেয়ে গড়গড় করে জল গড়িয়ে পড়ছে। ইলহামের মুখ থেকে শোনা কঠোর বাক্য এখনো তার কানে বাজছে।
রাত গড়িয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।সূর্যের আবির্ভাব ঘটেছে মূহুর্তের মাঝেই। ঘরের এক কোণায় হাটুগেড়ে বসে আছে নূর।ওদিকে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে আদ্রিয়ান।সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি নূর, সারা শরীরে টনটন ব্যথা। এক রাতের মাঝেই চোখের নিচে কালচে দাগ পরে গিয়েছে। নূরের দৃষ্টি আদ্রিয়ানের মাঝেই সীমাবদ্ধ, কালরাতে তার অন্য এক সত্তাকে দেখেছে নূর। এক দিনের জন্যেও স্ত্রী নামক স্বীকৃতি দেওয়া সত্ত্বেও স্বামীর হক আদায় করে নিয়েছে। নূর তাচ্ছিল্য হেসে উঠে দাঁড়ালো, একটু পরেই আজান দিবে। আদ্রিয়ান পিটপিট করে চোখে মেলে তাকালো, মাথাটা কেমন ভার ভার লাগছে। চেহারার মাঝে বিরক্তিকর একটা ভাব ফুটে উঠেছে তার। সবেমাত্র আজান দিয়েছে, অসময়ে ঘুম ভাঙায় বিরক্ত কিছুটা। ভালো করে তাকাতেই দেখতে পায় শুভ্রা রঙা একটা শাড়ি পরে নূর দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।আয়নায় তাকিয়ে চুলে চিরুনি চালাচ্ছে।নূরের দিকে তাকাতেই মাথায় চাপ দিয়ে বসলো তার। আদ্রিয়ানকে উঠে বসতে দেখে নূর তাকে উপেক্ষা করে নিচে চলে গেলো রান্নাঘরে। রাহেলা শাহ সোফায় বসে তসবি গুনছেন, তার পাশেই বসে আছেন সুরাইয়া শাহ। আজ রাহেলা শাহ নূরের দিকে একবার ফিরেও তাকালেন না। নূর চা বসিয়ে দিয়ে আটা নিলো রুটি বানানোর জন্য। অন্য সময় হলে নূরকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হলেও কথা শুনাতেন। তবে আজ কিছুটা ভিন্ন পরিস্থিতি দেখে নূর নিজেও কিছুটা অবাক হলো যেন ঝড় আসার আগের পরিস্থিতি । চা হয়ে এলে নূর রুটি তাওয়ায় বসিয়ে দেয়, অত:পর রুটি ও চা ট্রেতে সাজিয়ে তাদের সামনে নিয়ে যায়। রাহেলা শাহ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,
"আজ চা বেশ হয়েছে।"
প্রথমবার রাহেলা শাহ'র মুখ থেকে প্রশংসা শুনে বাকরুদ্ধ নূর। আজ হঠাৎ এতো ভালো ব্যবহার! কাম্য হলো না নূরের নিকট। নূর এসব ভাবতে ভাবতে আদ্রিয়ানের জন্য চা নিয়ে হাজির হলো উপরে। আদ্রিয়ান তখনো ঘুমাচ্ছিলো, কিন্তু নূরের উপস্থিতি যেন আদ্রিয়ানের নিকট বিরক্তিকর ঠেকলো। নূর আদ্রিয়ানের ফেলে রাখা জুতা ও ঘড়ি তুলে নিলো ঠিক করে রাখার জন্য, ঠিক সেই সময়ই আদ্রিয়ান হঠাৎ ধমকে উঠলো,
"এই মেয়ে সাহস কি করে হয় তোমার ; আমার জিনিসপত্র স্পর্শ করার?"
নূর ভ্রু কুঁচকে তাকালো আদ্রিয়ানের দিকে। আগে তো হুকুম করতো ঘর যেন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখে তাহলে আজ কেন এসব বলছে।
" ঘর নোংরা হয়ে আছে তাই।"
" তোমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।পরের বার থেকে আমার কোন জিনিসে যেন আমি তোমার স্পর্শ না দেখি।"
নূর হাতে থাকা ঘড়িটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে বললো,
"ঠিক আছে করবো না।"
হঠাৎ এভাবে ছুড়ে ফেলায় আদ্রিয়ানের মেজাজ গরম হয়ে যায়, সে নূরের দিকে তেড়ে এসে বলে উঠলো,
" ঘড়িটা ছুড়ে ফেললে কেন? এর দাম জানো?"
নূর তার কাপড় গুছাতে গুছাতে বলে,
"আপনি বলেছেন আপনার কোন জিনিস যেন স্পর্শ না করি, তাই যেখানে পেয়েছিলাম সেখানেই রেখে দিয়েছি।"
আদ্রিয়ান নূরের চুলের মুঠি চেপে ধরলো মুহুর্তেই।
" আমার সাথে চালাকি করতে আসবি না একদম।তোকে আমার দুচোখে সহ্য হচ্ছে না। বেরিয়ে যা এই ঘর থেকে।"
আদ্রিয়ান নূরকে ঘর থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলো, রাহেলা শাহ বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। নূরের এই পরিণতি দেখে তিনি স্মিত হেসে কাউকে ফোন করলেন।আদ্রিয়ানের কথায় নূর বেরিয়ে গেলো সেই ঘর থেকে। কি হচ্ছে বুঝতে পারছে না কিছুই।
নূর কিছুটা বিচলিত হয়ে নিচে নেমে আসলো, ফারজানা শুটকি ভর্তা বানাচ্ছে। ফারজানার ভর্তা বানানো শেষ হলে নূর ফ্রিজ থেকে মাংস বের করে ভেজাতে দেয়। মাংস রান্নার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার মাঝেই শুনতে পায় তাদের ঘর থেকে কিছু শব্দ ভেসে আসছে। কি হয়েছে দেখার জন্য নূর উপরে গেলে দেখতে পায় আদ্রিয়ান নূরের সকল জিনিসপত্র এদিক ওদিক ছুড়ে ফেলছে। তার ব্যবহৃত সকল জিনিসপত্র এক এক করে ফেলে দিচ্ছে যা দেখে নূর হতভম্ব হয়ে যায়।
"কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন?"
আদ্রিয়ানের এরুপ আচরণে নূর ভয় পেয়ে যায়, বুঝতে পারছে না এসব কি হচ্ছে। আদ্রিয়ানের চেঁচামেচিতে বাড়ির সকলে উপস্থিত হয় দরজার সামনে। রাহেলা শাহ এগিয়ে আসতেই আদ্রিয়ান একদম শান্ত হয়ে গেলো। আদ্রিয়ান তার মাকে দেখতে পেয়ে অস্থির কন্ঠে বললো,
" মা নূরকে এই মুহুর্তে আমার চোখের সামনে থেকে চলে যেতে বলুন। ওকে দেখলেই আমার মাথা চড়া দিয়ে উঠছে। সহ্য করতে পারছি না একদম।"
রাহেলা শাহ আদ্রিয়ানের কথায় নূরের দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বললেন,
"আদ্রিয়ান কি বলছে শুনতে পাওনি? নিচে যাও। "
ফারজানা নূরকে ইশারা করায় সে নিচে নেমে আসে। ঘরের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার সকল জিনিসপত্র। ফারজানা নূরের উদিগ্ন চাহনি দেখে জিগ্যেস করলো,
" ভাবিমনি কি হয়েছে তোমার?কোন কিছু নিয়ে কি চিন্তা করছো?"
" কিছু না। আদ্রিয়ান উনি একটু আগেই পাগলের মতো আচরণ করছিলেন যেই না আম্মা উনার কাছে গেলো উনি একদম শান্ত হয়ে গেলেন।"
" জানো ভাবিমনি, জাদু টোনা করলে মানুষ এমন পাগলের মতো আচরণ করে,শুধু শুধু চেঁচায়।"
নূর ফারজানার কথায় বিশ্বাস করলো না, এসব কালোজাদু কুফুরিতে সে বিশ্বাসী নয়। আদ্রিয়ানকে কেই বা এসব করতে যাবে। আপাতত ওই ঘরে যেতে চাইছে না সে। সুরাইয়া শাহ ধীর পায়ে সোফায় এসে বসলেন।নূর তার পাশে বসে ইস্ততবোধ করতে লাগলো, কিছু একটা জিগ্যেস করতে চেয়েও করতে পারছে না। সুরাইয়া শাহ নূরের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন,
" কি হলো নূর? আদ্রিয়ানকে নিয়ে চিন্তিত? আমিও বুঝতে পারছি না হঠাৎ কি এমন হলো যে হঠাৎ এমন আচরণ করছে। "
"আপনার ফোনটা একটু দেওয়া যাবে দাদী? আমার ফোন ভেঙে গিয়েছে তাই।"
সুরাইয়া শাহ নিজের ফোন নূরের দিকে এগিয়ে দিতেই সে তার মাকে ফোন করে,
" কেমন আছো আম্মু?"
" আমরা ভালো আছি,তোরা কেমন আছিস?"
নূর ডুকরে কেঁদে উঠলো তার মায়ের কথায়, ঠোঁট কামড়ে কান্না লুকিয়ে বললো,
"আমি ভালো নেই আম্মু।রোজকার এই অশান্তি ভালো লাগছে না।"
" কি হয়েছে? পায়রা কেমন আছে?"
নূর উত্তর দেওয়ার আগেই রাহেলা শাহ রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে ডাকলেন নূরকে।হঠাৎ এভাবে চিৎকার করে ডাকায় নূর ছুটে গেল রান্নাঘরে। তরকারি পুড়ে ছাই হয়ে আছে, এমনকি পাতিল সহ পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। রাহেলা শাহ নূরকে দেখতে পেয়ে সেই পাতিল ছুড়ে ফেলে বললেন,
" আপনি কোথায় ছিলেন মহারানী? এতগুলো তরকারি যে পুড়ে ছাই হয়ে গেল আপনার নাকে গন্ধ যায়নি? "
নূর বুঝতে পারছে না তরকারি পুড়লো কি করে,সে তো তরকারিটা চুলোয় বসায়নি। তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কেউ করেছে।
" আমি তরকারি বসিয়ে যাইনি।আমি বুঝতে পারছিনা কি করে পুড়ে গেলো।"
রাহেলা শাহ রাগান্বিত স্বরে বললেন,
" আজকাল দোষ করার সাথে সাথে মিথ্যে বলাও শুরু করেছো। হতচ্ছাড়ি মেয়ে। এবার আমরা দুপুরে খাবো কি?"
" আমি কিছু একটা রান্না করছি, আপনি চিন্তা করবেন না।"
" আড়াই কেজি গরুর মাংস পুড়িয়ে ফেলেছো অলুক্ষণে মেয়ে। কোনোদিন ভাত পুড়িয়ে ফেলছো কোনোদিন তরকারি পুড়িয়ে ফেলছো।এসব কি তোমার বাপের বাড়ি থেকে আসবে? "
ফারজানা পুড়া পুড়া গন্ধ পেয়ে রান্নাঘরে এসে দেখে সব তরকারি পড়ে গিয়েছে। আসলে সে নিজেই তরকারি গরম করতে দিয়ে শাড়ি আইরন করতে গিয়েছিলো, কিন্তু তরকারি পুড়ে যাবে এই কথাটা তার মাথায়ও ছিল না। ফারজানা দোষ স্বীকার করার কথা বলতে গিয়েও বলতে পারেনি।রাহেলা শাহ'র রাগান্বিত চেহারা দেখে ভয়ে সাহস হয়ে উঠেনি বলার। নূরকে যা নয় তা বলে রাগে ফুসতে ফুসতে বেরিয়ে গেলেন রান্নাঘর থেকে। ফারজানা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলো নূরের সামনে। নূর চোখের জল মুছে পটল ও মুরগীর মাংস বের করে রান্না করার জন্য। ফারজানা তার সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় কন্ঠে বললো,
" আসলে ভাবিমনি, তরকারি আমি বসে গিয়েছিলাম। কিন্তু শাড়ি আইরন করতে করতে আমার মনেই ছিল না তরকারির কথা। আমি বলতাম কিন্তু চাচিকে রেগে থাকতে দেখে বলার সাহস হয়নি।আমাকে ক্ষমা করে দাও ভাবি।"
" আমি বুঝতে পেরেছি। কারণ আমি তো রান্নাঘরে তরকারি বসিয়ে দিয়ে যাইনি, তাহলে পুড়বে কি করে। "
"আমায় ক্ষমা করে দাও ভাবিমনি। আমার জন্য এতোগুলো কথা শুনতে হলো তোমার।"
নূর তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
" এগুলো নিত্যদিনের আচরণ। অত ভেবে লাভ নেই।"
আবার নতুন করে রান্না বসালো তারা দুজন।নূরের মাথা ব্যথা করছে হঠাৎ করে। হয়তো মাইগ্রেনের ব্যথাটা বেড়েছে। ভয়ে ভয়ে তাদের ঘরের সামনে এসে দেখে আদ্রিয়ান নেই গোসল করতে গিয়েছে। এই ফাঁকে সে দ্রুত ড্রয়ারে ঔষধ খুঁজতে লাগলো।কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, তন্ন তন্ন তন্ন খোঁজার পরেও মাইগ্রেনের কোন ওষুধ খুঁজে পাওয়া গেল না। ব্যথাটা বেড়েছে ভীষণ। আর কোন উপায় না পেয়ে আদ্রিয়ানের পকেট থেকে টাকা নেওয়ার জন্য যেতেই দেখতে পেল এক হাজার টাকার তিনটা নোট। আর কিছু না ভেবে মাথায় উড়না দিয়ে সে বেরিয়ে পরলো ফার্মেসীর উদ্দেশ্যে। কিন্তু হায়! একটা ফার্মেসীতেও মাইগ্রেনের ঔষধ পেলো না। উপায় না পেয়ে কিছুটা দূরে গেলো খোঁজার জন্য। বেশ কিছুক্ষণ পরেই পেয়ে গেল তার কাঙ্খিত ঔষধ। ঔষধ কিনে বাড়ি ফিরতেই দেখতে পেলো আদ্রিয়ান ও রাহেলা শাহ সোফায় বসে আছেন।নূরকে দেখতে পেয়ে তার দিকে এগিয়ে এসে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিলো আদ্রিয়ান।অত:পর বললো,
" কার সাথে দেখা করতে গিয়েছিস তুই?"
নূরকে খুঁজে না পেয়ে রাহেলা শাহ নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে দেখতে পান নূর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। নূরকে বেরিয়ে যেতে দেখে আদ্রিয়ানের ঘরে এসে দেখলো আদ্রিয়ান ফোনে গান শুনছে। তিনি আদ্রিয়ানের সামনে গিয়ে বললেন,
" দেখো আদ্রিয়ান, এই ভরদুপুরে তোমার স্ত্রীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখো কার সাথে দেখা করতে গিয়েছে।"
সকাল থেকে নূরকে বিরক্ত লাগছে তার, এখন মায়ের মুখে এসব শুনে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।নিচে এসে নূরের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে সে কিন্তু ঘন্টা দুয়েক পার হওয়ার পরেও তার কোন হদিশ নেই।
" আমি কারো সাথে দেখা করতে যাইনি।"
নূর ভেতরে প্রবেশ করতে গেলে আদ্রিয়ান নূরের পথ আটকে বলে,
" বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে।তোর মতো মেয়ের মুখ আমি দেখতে চাই না।"
চলবে,,,,৷
গ্রুপে জইন হোন সকলে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/