ফন্ট সাইজ:
থিম:
মন প্রাঙ্গনের বৃষ্টি

২৭তম পর্ব

লেখক: কংকা চৌধুরী

#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি

#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী

(২৭)

কপি করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ

ভ্যাপসা গরমে অসহ্য লাগছে আদ্রিয়ানের।পায়রা ও ইলহাম আজ থাকবে এখানটায় অথচ আদ্রিয়ানকে একটিবার ও থাকতে বললো না নূর।এমন ভাব করছে যেন আদ্রিয়ানের কোন অস্তিত্বই নেই এখানে।অবশেষে সব কাজ কর্ম সেরে নূর তার ঘরে গেলো বিশ্রাম নিতে।চারদিকে চোখ বুলিয়ে যেন প্রাণ জুড়িয়ে গেলো।কতো মাস পর আবারও এই ঘরে পা রেখেছে সে। এই ঘর এই বাড়ির সবকিছুই তার, একান্তই তার।এখানে তাকে বাঁধা দেওয়ার মতো কেউ নেই। ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিলো সে।কানে ভেসে আসছে পানির শব্দ। তারমানে তার ঘরে কেউ আছে।তার ঘরে তো কেউ আসার কথা না তবে কে এলো।হয়তো পায়রা এসেছে।সে ছাড়া আর কেই বা আসবে।পায়রার কথা ভেবে নূর চোখ বুজে রইলো। গত কালকের সব মুহুর্ত ভেসে উঠছে চোখের সামনে।এতো অপমান আগে কেউ কখনো করেনি।চোখের কোণা দিয়ে গড়িয়ে পড়লো এক ফোটা জল।

কারো পায়ের শব্দ পেয়ে চোখ মেলে তাকালো নূর।আদ্রিয়ান দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।শার্টের হাতা ফোল্ড করছে। আদ্রিয়ানকে এই রুমে হঠাৎ করে দেখে নূর অবাক হয়ে জিগ্যেস করে,

" আপনি এখানে কি করছেন?"

" তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো আমি তোমার স্বামী। আমার তোমার রুমেই থাকার কথা। "

নূর কোন জবাব দিলো না আদ্রিয়ানের কথায়।আদ্রিয়ান হাত মুখ মুছে নূরের উদ্দেশ্যে বললো,

" তৈরি হয়ে নাও।বাড়ি ফিরছি আমরা।"

" বাড়ি ফিরছি মানে?"

আদ্রিয়ান বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,

" তোমাকে আমি কোন কঠিন ভাষা বলিনি।সহজ ভাষায় বলেছি।যাও তৈরি হয়ে নাও। "

" আমি আর ওই বাড়ি ফিরবো না।আমি একেবারের জন্যেই এই বাড়িতে চলে এসেছি।"

আদ্রিয়ান নূরের কথা শুনে বাঁকা হেসে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,

" ভুলে যেও না তোমার মা অসুস্থ। এই অবস্থায় কিছু একটা করলে উনার জন্য সুবিধার হবে বলে আমার মনে হয় না।"

আদ্রিয়ানের কথা ভালো ঠেকলো না নূরের নিকট। সে বিচলিত কন্ঠে বললো,

" কি বলতে চাইছেন আপনি? কি করবেন?"

" চুপচাপ তৈরি হয়ে নাও নয়তো আদ্রিয়ান শাহ ও কোন কোন অংশে কম নয়।"

নূরের চোখে জল টলমল করছে। সে আর কোন উপায় না পেয়ে তৈরি হয়ে নেয়।আদ্রিয়ান তার ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে রুম থেকে বেরোতে নিয়েও আবার পিছু হটে নূরের কানে ফিসফিস করে বলে,

" আমার কাছ থেকে তুমি পালাতে পারবে না নূর।সেই ঘুরে ফিরে আমার আস্তানায় হাজির হতে হবে তোমায়।"

আদ্রিয়ান মৃদু হেসে হেলে দুলে চলে গেলো, পিছুটানে ফেলে গেলো নূরকে। মোরশেদা বেগম বিছানায় শুয়ে আছেন।অ্যাপেন্ডিক্সের অপারেশন করানো লাগবে উনার।তাই নিয়েই চিন্তিত রেজাউল খান। এই মুহূর্তে এতগুলো টাকা কোথায় পাবেন তিনি। মোরশেদা বেগমের পাশে বসে আছে পায়রা। কিছু সময় পর নূর ও আদ্রিয়ান সেই ঘরে প্রবেশ করলো।পায়রা চেয়েছিল তার পরিবারকে আদ্রিয়ানের সকল কথা জানাবে কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সে বলার সাহস পেল না । নূর ও আদ্রিয়ান মোরশেদা বেগমকে সালাম করলো।নূর নীরবতা ভেঙ্গে বললো,

" আম্মু, আমরা আসছি।"

" আজকেই চলে যাবি মা?"

নূর আদ্রিয়ানের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

" উনার অফিস আছে আম্মু।অন্য একদিন আসবো।"

নূরকে এখনো কেউ মোরশেদা বেগমের ঠিক কি অসুখ হয়েছে জানায়নি। সাইমা সেই ঘরে দৌড়ে এসে বললো,

" বড়ো খালামণি আপনার নাকি অ্যাপেন্ডিক্সের অপারেশন করানো লাগবে।"

সাইমার কথা শুনে নূর বাকরুদ্ধ। সে এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেলো,অত:পর পায়রার দিকে তাকিয়ে ও স্পষ্ট কন্ঠে বললো,

" এসব কি শুনছি আপু।এসব কি সত্যি?"

মোরশেদা বেগম কাতর কন্ঠে বললেন,

" আমার কিচ্ছু হয়নি, আমি কিছুদিন পর এমনি ঠিক হয়ে যাব। "

নূর শুনলো না মায়ের কথা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মাকে জড়িয়ে ধরে।

" তোমরা আমাকে কিছু বলোনি কেন? সবাই সবকিছু জানতে অথচ আমিই জানতাম না শুধু। "

" কাঁদিস না মা। কার কপালে কখন মৃ'ত্যু লিখে রেখেছে কেউ জানে না।"

আদ্রিয়ান গলা পরিস্কার করে বললো,

" তাহলে তো তাড়াতাড়ি অপারেশন করিয়ে ফেলতে হবে। আপনার বরং আজকেই সব ব্যবস্থা করে ফেলুন। "

রেজাউল খান পায়চারি করতে করতে চিন্তা মাখা সুরে উত্তর দিলেন,

" এই মুহূর্তে এতগুলো টাকা হাতে নেই। কিভাবে জোগাড় করবো বুঝতেও পারছিনা। দক্ষিণ পাশে যে জমিটা আছে সেটা আজ বিক্রি করার কথা ছিলো,কিন্তু যে কিনবে সে আসেনি। "

" আপনি টাকার চিন্তা করছেন কেন? আপনি শুধু ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যান বাকি ব্যবস্থা আমি করছি। "

আদ্রিয়ানের কথায় ভরসা পেলেন তিনি।এক প্রকার নিশ্চিন্ত হলেন। আদ্রিয়ান নূরকে ইশারা দিতেই সে উঠে চলে আসে।সাইমা দূর থেকে তাদের দেখছে। নূরের এতো সুখ দেখে রীতিমতো রাগে ফুসছে সে।নূর আদ্রিয়ানের বাইকে উঠে বসতেই আদ্রিয়ান স্টার্ট করে।ইশিতা সাইমার পাশেই ছিলো। সে সাইমাকে বললো,

" নূর আপুর জামাই কত বড়োলোক দেখেছো।এতগুলো টাকা সে একাই দিবে বলেছে। নূর আপুর কপাল খুব ভালো। ভালো জামাই পেয়েছে তাও কতো বড়োলোক।"

সাইমা ইশিতাকে ধমক দিয়ে বললো,

" বেশি নূর আপু নূর আপু করবি না।কানের সামনে তখন থেকে চেঁচাচ্ছে। "

ইশিতা ধমকে চলে গেল, সাইমা নিজের ফোন বের করে আদ্রিয়ানের নাম্বার দেখে বাঁকা হাসলো।মোরশেদা বেগম যখন নিজের ফোন রেখে বাহিরে গিয়েছিলেন সেই সময়ই চুপিসারে আদ্রিয়ানের নাম্বার নিয়ে নেয় সাইমা।মনে মনে কিছু একটা ভেবে সে ফিচেল হাসে।

রাহেলা শাহ আদ্রিয়ানের ঘরের কোণে তাবিজ ঝুলিয়ে পানিপড়া দিয়ে গেলো। আজ বাড়ি ফিরলেই কাজ করতে হবে।আদ্রিয়ানের গাড়ির শব্দ পেয়ে দ্রুত মেইন গেইটে এসে দেখেন, আদ্রিয়ানের সাথে নূর ও ফিরে এসেছে। নূর সম্পূর্ণরূপে অনাকাঙ্ক্ষিত ঠেকেছে উনার নিকট। নূর যে ফিরে আসবে এ কথা তার স্বয়ংবরেও নেই।তার হাসিমাখা অধরযুগল মুহুর্তেই গম্ভীরতায় রুপ নেয়।নূর বুঝে গিয়েছে এই লোক তাকে কিছুতেই শান্তি দিবে না। তাকে না পেলে তার পরিবারকে ধ্বংস করে দেবে।আদ্রিয়ান গাড়ি থেকে নেমে তার মায়ের কাছে এসে বলে,

" নূরকে ফিরিয়ে এনেছি মা।"

রাহেলা শাহ শুকনো মুখে বললেন,

" ভালো করেছো।"

অত:পর নূরের দিকে তাকিয়ে বললো,

" ভেতরে এসো। "

আদ্রিয়ান ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফায় বসলো।বাড়িতে পা রাখতেই যেন সকল ক্লান্তি তার শরীরে ভর করেছে।নূর বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই আদ্রিয়ান তাকে পরখ করলো ভালো করে।চুরি, নাকফুল এসব ছাড়া বউ বউ লাগছে না তাকে।নূর কোন কথা না বলে রুমে চলে গেলো। আদ্রিয়ানের ভেতর কেমন যেন অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। চোখ বুজে সোফায় হেলান দিতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো নূরের ছুড়ে ফেলা চুরি ও নথ।মুহুর্তেই চোখ আপনাআপনি খুলে গেলো তার।দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখলো দরজার সামনে যেখানে ছুড়ে ফেলেছিলো।রাহেলা শাহ মুখ ভার করে তার পাশে বসে আছেন।আদ্রিয়ান গম্ভীর স্বরে তাকে বললো,

" নূরের চুরি ও নথ দেখেছেন মা?"

রাহেলা শাহ হেয় কন্ঠে বললেন,

" সেই তো দেমাগ দেখিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছিলো আমি কিভাবে দেখবো?"

আদ্রিয়ান কথা বাড়ালো না।নিজের ঘরে এসে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।আদ্রিয়ান রুমে আসায় নূর বেরিয়ে যায় সুরাইয়া শাহ'র ঘরে। তিনি শুয়ে ছিলেন, নূর আসায় পানের বাটা বের করে নূরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

" তোমার হাতের বানানো পান খাইনি কতদিন।দেখি একখানা পান বানিয়ে দাও তো।"

নূর স্মিত হাসে তার কথায়।বুড়ো হয়েছেন,বয়স বেড়েছে । বয়সের সাথে সাথে কথা গুলিয়ে ফেলছেন। কখনো তুমি করে বলে আবার কখনো তুই করে। এতে অবশ্য নূর কিছু মনে করে না।তার কাছে বুড়িকে ভালোই লাগে।নূর পান বানিয়ে দিতে দিতে এই ফাঁকে সুরাইয়া শাহ আচলের গিট্টু থেকে তার নথ ও চুরি বের করে দেয়। নূর অবাক হয় এসব উনার কাছে দেখতে পেয়ে।

" এসব আপনি রেখে দিয়েছেন?"

নূরের হাতে চুরি পড়াতে পড়াতে তিনি বললেন,

" নাতির সংসার ভাঙতে দেখবো? আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম।"

নূর তাচ্ছিল্য হেসে বললো,

" ওরকম সংসার আমার কপালে নেই দাদি।"

" এসব মুখে আনতে নেই।মেয়েদের স্বামী সংসারই সব।যে নারী প্রথম সংসারে সুখ পায় না সে নারীর কপালে দ্বিতীয়বার আর সুখ আসে না।"

নূর চুপ করে রইলো তার কথায়।বিয়ের সাতমাস পূর্ণ হতে চলেছে অথচ এই সংসারে সে সুখের মুখ দেখলো না।বছর পুরোতে যাবে আর কিছুমাস পর।আদ্রিয়ান ফ্রেশ হয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখলো অচেনা এক নাম্বার হতে মেসেজ এসেছে।মেসেজের ধরণ দেখে মনে হচ্ছে কোন নারী।আদ্রিয়ান জবাব দিলো না সেই মেসেজের।পরপর চার পাঁচটা মেসেজ আসার পর আদ্রিয়ান বুঝলো এ আর কেউ নয় সাইমা।একটি ছবিও পাঠিয়েছে আদ্রিয়ানকে।মূলত পায়রার কাছ থেকে সাইমা শুনেছে আদ্রিয়ান ও নূরের সম্পর্কের ব্যপারে। আদ্রিয়ান সেই নাম্বার ব্লক করার সাথে দ্বিতীয় আরও একটি নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে দেখতে পেলো।বিরক্ত চেপে ধরেছে তাকে।মেজাজ উগ্র হয়ে আছে তার।নূর দরজা খুলে ভেতরে আসতেই আদ্রিয়ানের অসহ্য লেগে উঠলো নূরকে।সে বুঝতে পারছে না এসব কেন হচ্ছে।এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সে অফিসের ফাইল নিয়ে বসলো কাজ করতে।আজ ছুটি নিয়ে আসায় সব কাজ জমা হয়ে আছে তার।নূর ও আগ বাড়িয়ে কোন কথা বললো না তাকে।

হাসপাতালে অপেক্ষা করছে ইলহাম ও পায়রা। পায়রা ফুটিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। ইলহাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো,

" কিচ্ছু হবে না আম্মা'র।একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে।"

কিছু সময় পর অপারেশন শেষ হলে মোরশেদা বেগমকে বেড রেস্টে দেওয়া হয়।ইলহাম ও পায়রা কিছু সময় হাসপাতালে অবস্থান করে বাড়ি ফিরে আসে।সামনে ইলেকশন হওয়ায় এখন প্রচুর কাজ এখন।পায়রার হঠাৎ শরীর গুলাতে শুরু করে।

" আমার বমি বমি পাচ্ছে।"

" হয়তো আজ জার্নি বেশি করায় শরীর খারাপ লাগছে। "

ইলহাম বেরিয়ে দুটো তেতুল আচার কিনে নেয় পায়রার জন্য। কিছু সময়ের মাঝেই তারা পৌঁছে যায় তাদের বাড়িতে।পায়রার শরীরে জোর নেই আপাতত। ইলহাম তালা খুলে প্রবেশ করতে পায়রা গলগল করে বমি করে দেয়।হঠাৎ বমি করায় ইলহাম পায়রাকে কোলে করে ভেতরে নিয়ে যায়।পায়রাকে বিছানায় বসিয়ে ভেজা কাপড় দিয়ে ময়লা পরিস্কার করে নেয় কোক দ্বিধা ছাড়া। পায়রা ইলহামের দিকে তাকিয়ে আছে, লোকটা কোনপ্রকার অভিযোগ ছাড়াই কিভাবে কাজ করছে।সব শেষে ইলহাম ভাত ও ডাল মাছ ভাজা বের করে নিয়ে যায়। পায়রার মুখে খাবার তুলে দিতেই সে নাক সিটকে বলে,

" ইশ কি গন্ধ।আমি খাবো না।"

পায়রার কথা শুনে ইলহাম কপাল কুঁচকে তাকায়।নিজে নাকের সামনে গন্ধ শুকে দেখে কোন গন্ধ সে পাচ্ছে না।

" আমি তো কোন গন্ধ পাচ্ছি না।"

" না আমার গন্ধ লাগছে।"

চলবে,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন