#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(২৯) প্রথমাংশ
( কপি করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।)
আপাতত কিছু নিচ্ছি না।কিন্তু ফিরে এসে অবশ্যই নিবো।"
" ফিরে এসে মানে? কোথায় যাচ্ছিস তুই?"
" অফিস থেকে ট্রেনিং এ পাঠাচ্ছে ঢাকায়।সকালেই রওনা দিতে হবে।"
" ঠিক আছে সাবধানে যাস।"
নূরের হাত থেকে হুট করে ফোন কেড়ে নেওয়ায় তার খুব রাগ হয়। পায়রার সাথে ভালো করে কথাও বলতে পারলো না।নূর চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আদ্রিয়ান তাকে থামিয়ে দেয়।
" দাঁড়াও।"
হঠাৎ তাকে থামানোয় নূর খানিকটা অবাক হয়, কারণ প্রয়োজন ছাড়া তাদের মাঝে খুব একটা কথা হয় না।আদ্রিয়ান আলমারি থেকে একটা প্যাকেট বের করে নূরকে বলে,
" এখানে বসো।"
নূর বিছানায় বসতেই আদ্রিয়ান প্যাকেট খুলে এক জোড়া রুপার নূপুর বের করে নূরকে পড়িয়ে দেয়।আচমকা পায়ে হাত দেওয়ায় নূর আঁতকে উঠে। পরবর্তীতে দেখতে পায় আদ্রিয়ান তার পায়ে নূপুরজোড়া পরিয়ে দিচ্ছে।
" এসব...."
আদ্রিয়ান গলা পরিস্কার করে বললো,
" পাঁচমাস আগেই দিতাম।কিন্তু তখন বেতন কম থাকায় অপেক্ষা করতে হয়েছে।অবশ্য সাইজ একদম বরাবর হয়েছে।"
আদ্রিয়ানের কথা শুনে নূরের মনে হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখছে।আদ্রিয়ানের এতো টাকা থাকা সত্ত্বেও কিনা বেতন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো।পরমুহূর্তেই আদ্রিয়ান আবারও গম্ভীর কন্ঠে বললো,
" সবসময় যেন পায়েই থাকে। "
নূর কিছু বললো না। রাহেলা শাহ আদ্রিয়ানের কাপড় ইস্ত্রি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন।সেইসবই দিতে এসেছে এখন।আদ্রিয়ান আরেকটি প্যাকেট এগিয়ে দিলো তার মায়ের কাছে।রাহেলা শাহ বেশ উৎসাহ নিয়ে খুলে দেখলেন, একখানা শাড়ি দিয়েছে আদ্রিয়ান তাকে।
" খুব সুন্দর হয়েছে আদ্রিয়ান।আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।"
আদ্রিয়ান তার মায়ের কথায় খুশি হয়।একে একে সকল জিনিসপত্র ব্যাগে ঢুকাতে শুরু করে। রাহেলা শাহ তার শাড়ি নিয়ে খুশিই ছিলেন কিন্তু পরক্ষণে ঝনঝন শব্দ পেয়ে নূরের পায়ের দিকে তাকিয়ে রুপোর নূপুর দেখতে পেয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন।
" নূপুর কে দিয়েছে তোমাকে?"
আদ্রিয়ান তার মায়ের কথার জবাবে বললো,
" আমি বানিয়ে দিয়েছি।এতোদিন মনে ছিলো না তাই দেওয়া হয় নি।"
ছেলের সামনে কিছু বললেন না তিনি।হনহন করে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।এখন এই বাড়িতে তারা তিনজন ছাড়া আর কেউ নেই।নূর একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছে, সুরাইয়া শাহ থাকলে হয়তো তার সাথে গল্প করতে পারতো কিন্তু এখন তিনিও না থাকায় নূরের একা একা লাগছে।আদ্রিয়ানের ফোনে তখন থেকে কল আসছে কিন্তু আদ্রিয়ান ধরছে না বরং বারবার কেটে দিচ্ছে। নূর তাতে কর্ণপাত করলো না।সে নিজের মতো চুপচাপ বসে আছে।আদ্রিয়ান সব গুছিয়ে চলে গেলো গোসল করতে। এর মাঝে আবারও ফোন আসছে।পরপর চারবার ফোন আসায় নূর আদ্রিয়ানের ফোন হাতে নিয়ে দেখে একটা নাম্বার থেকে অনবরত মেসেজ আসছে। শেষের মেসেজ দেখে রীতিমতো তার হাত পা কাঁপছে।
" আদ্রিয়ান আমি তোমাকে ভালোবাসি।তুমি প্লিজ আজকে আমার সাথে দেখা করো।আমি অপেক্ষা করছি।"
মেয়েরা যতই স্বামীকে ঘৃণা করুক না কেন, তবুও অন্য নারীর সংস্পর্শে দেখতে পারে না।এতোদিন আদ্রিয়ানের বখাটেপনা, হেলাফেলা দেখলেও চরিত্র নিয়ে কিছু দেখেনি তবে আজ নিজের চোখে দেখার পর বিশ্বাস করতে পারছে না। সবকিছু আদ্রিয়ানের ইচ্ছেতে হওয়ার পরেও কেন এসব সহ্য করতে হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না।বিয়ের পর থেকে এক দিনের জন্যেও স্বামীর সঙ্গ পায়নি সে।আদ্রিয়ান বেশ কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে বের হলো। ফোনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হলো। কারণ বাথরুমে যাওয়ার আগে ফোন রেখে গিয়েছিলো চার্জে কিন্তু এখন বিছানায় অবহেলিতভাবে পড়ে থাকতে দেখে বুঝলো নূর তার ফোন ধরেছে।রুমের মাঝে নূরের কোনো অস্তিত্বই দেখতে পেল না সে। বেলকনিতে যাওয়া মাত্রই দেখতে পেলো নূরের লালবর্ণ চক্ষুদ্বয়। আচমকা এভাবে দেখতে পেয়ে আদ্রিয়ান বুঝতে পারলো না কি হয়েছে।
" কি হয়েছে তোমার? তুমি ঠিক আছো?"
নূরের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। হঠাৎ নাকের পাটা ফুলিয়ে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠলো।আদ্রিয়ান হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে তো কিছু করেনি তাহলে নূর হঠাৎ কাঁদছে কেন।
" আরে আরে! কাঁদছো কেন?"
" কেন করলেন আমার সাথে এমনটা? আমায় ছেড়েও দিচ্ছেন না আবার শান্তিতে থাকতেও দিচ্ছেন না।আমি ম'রে গেলে শান্তি পাবেন আপনি?"
" কি হয়েছে তোমার? আমি তোমার কোন শান্তি কেড়ে নিলাম এখন?"
হঠাৎ শান্ত হয়ে আসলো নূরের স্বর, হুট করে আদ্রিয়ানের কলার চেপে ধরে সে গলা নামিয়ে বললো,
" আমায় এভাবে না ঠকালেও পারতেন আদ্রিয়ান, বিয়েটা তো আপনার ইচ্ছেতেই হয়েছিলো, তবে কেন এসব করলেন? জবাব দিন আমায়!"
আদ্রিয়ান কলার থেকে নূরের হাত সরিয়ে বললো,
" কি হয়েছে খুলে বলো এভাবে কথা না পেঁচিয়ে।"
নূর তড়িঘড়ি করে আদ্রিয়ানের ফোন হাতে নিয়ে সেই মেসেজগুলো দেখালো, অত:পর কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,
" আমি ভেবেছিলাম আপনি অন্তত চরিত্রবান হবেন কিন্তু আপনি আমার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করলেন আদ্রিয়ান।"
আদ্রিয়ান বিরক্তিকর কন্ঠে নূরের দিকে তাকিয়ে বললো,
" ঠিক করে কথা বলো নূর।আমি এসব কিছুই করিনি।এটা তো....."
আদ্রিয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই নূর বলে উঠলো,
" আর কতো মিথ্যে বললেন আপনি?আপনি আমায় ঠকাতে পারলেন আদ্রিয়ান? আমার ভালোবাসায় কি কমতি ছিলো যে আপনি এমন একটা নিকৃষ্ট কাজ করতেও দুবার ভাবলেন না। বলুন কেন ঠকিয়েছেন!"
" আজব আমি ঠকাতে যাবো কেন? আগে আমার কথাটা শুনো।"
" কি শুনবো? আপনার যদি প্রেমিকা থাকতো তাহলে আমায় কেন বিয়ে করলেন? জবাব দিন।"
আদ্রিয়ান রেগে বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,
" আমার কোন প্রেমিকা নেই।মেয়ে মানুষের বুদ্ধি আসলেই হাঁটুর নিচে।"
" তুই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হো।এই মুহুর্তে দূর হো নাহয় আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন।"
হঠাৎ তুই তোকারি করায় অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে আদ্রিয়ান।
" তোমার সাহস তো কম না তুমি আমার সাথে তুই তোকারি করছো।আমি তোমার কতো বড়ো ধারণা আছে তোমার?"
রাগের মাথায় হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে নূর।সে পালটা জবাব দিয়ে বললো,
" তোর কথায় আমি ভয় পাই না। আমার চোখের সামনে থেকে দূর হো।তোকে দেখলেই আমার মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে।"
" বেয়াদব মেয়ে। আবারও তুই তোকারি করছো।পুরো কথা না শুনে যা নয় তা শুরু করেছে। "
এই প্রথম আদ্রিয়ান নূরের কথায় কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বোঝানো শুরু করলো,
" এটা তোমার চাচাতো বোনের নাম্বার। কি যেন নাম। সাইমার নাম্বার এটা। আমাকে ওইদিনের পর থেকে বিরক্ত করছে।এ পর্যন্ত ওর সাতটা নাম্বার ব্লক করেছি আমি।"
সাইমার নাম শুনে নূর থ হয়ে যায়। সাইমা এমন কিছু করবে বলে নূর কখনো ভাবেনি। শেষ পর্যন্ত কিনা বোনের স্বামীর উপর।
" আজ আমার অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। এসব মেয়েদের আদ্রিয়ান পাত্তাও দেয় না। "
এতোক্ষণে নূর শান্ত হলো তবে পুরোপুরি না।সাইমার কর্মকাণ্ডে মেজাজ এখন খুবই খারাপ। আজই ফোন করবে সাইমাকে।এতোক্ষণ ধরে আদ্রিয়ানের সাথে শুধু শুধু খারাপ ব্যবহার করায় লজ্জ্বা পেলো একটু।আদ্রিয়ান হাফ ছেড়ে বললো,
" আদ্রিয়ান শাহ এসব প্রেম ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না বুঝেছো।"
"এই মেয়ে আরেকটু হলেই আমায় পরকিয়ার ট্যাগ লাগিয়ে দিচ্ছিলো।"
নূর নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। রুশান ফোন করেছে আদ্রিয়ানকে ক্লাবে যাওয়ার জন্য। যেহেতু কাল আদ্রিয়ান চলে যাবে তাই আজ দলের সব ছেলেরা একসাথে সময় কাটাবে বলে মনস্থির করলো।নূর আদ্রিয়ানের ফোন থেকে তার মায়ের সাথে কথা বলায় আদ্রিয়ান ফোন নিলো না।ফোন ছাড়াই চলে গেলো বাইরে।নূর সাইমাকে ফোন দিতেই সাইমা সাথে সাথেই ফোন রিসিবম্ভ করে।
" আদ্রিয়ান তুমি জানো... "
" আমি নূর বলছি।"
নূরের কন্ঠস্বর পেয়ে সাইমার কথা শুকিয়ে গেলো। সে আমতাআমতা করে বললো,
" নূর তুই কেমন আছিস?"
" তোর লজ্জ্বা করে না এসব করতে? আমি আজকে খালামণিকে বললো যেন তোকে আমার তরফ থেকে ঠাস ঠাস করে চড় দেয়।"
" না লজ্জ্বা করে না।তোর স্বামী তো তোকে ভালোবাসে না।আর না তুই বাসিস। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?"
" তোর মুখে বাঁধছে না এসব বলতে? আমাদের মাঝে সম্পর্ক যেমনই হোক না কেন তাই বলে তোকে তৃতীয় পক্ষ হয়ে তো কেউ জন্য বলেনি।"
নূর ফোন কেটে মোবাইল রেখে দিলো।একটু পরেই আবারও কল এলো।নূর ভেবেছে হয়তো সাইমা ফোন করেছে কিন্তু পরক্ষনেই দেখতে পেলো শাহনাবের নাম্বার।শাহনাবের নাম্বার আদ্রিয়ানের ফোনে দেখে নূর কিছুটা অবাক হলো।কারণ তার জানামতে আদ্রিয়ান আর শাহনাব দুজনেই শত্রু তাহলে শাহনাব ভাই কেন আদ্রিয়ানকে ফোন করবে।মূলত আদ্রিয়ান সেই নূপুরের ছবি পাঠিয়েছে শাহনাবকে।তা দেখেই শাহনাব ফোন করেছে।নূর ইস্ততবোধ করে ফোন রিসিভ করলো।নূরের কন্ঠস্বর পেয়ে শাহনাব বললো,
" কেমন আছো নূর? স্বামী সংসার নিয়ে দিন কেমন কাটছে?"
শাহনাব যে নিতান্তই তাকে ব্যঙ্গ করে বলছে তা সে বুঝতে পারছে।শাহনাবের কথার জবাবে স্মিত হেসে বললো,
" এইতো চলছে।আপনার কি খবর?"
" আমার জীবন এলোমেলো অবস্থায় পরে আছে।গুছিয়ে দেওয়ার মতো তুমিটা তো অন্যকারো হয়ে গেলে।"
নূর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
" নিজের জীবনটা এবার ভালো করে গুছিয়ে নিন শাহনাব ভাই। আমার জীবন টা বহু আগেই ধ্বংস করে গেছে।"
#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(২৯) বর্ধিতাংশ
( অনুমতি বিহীন কপি করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ)
" এসব তুমি কি বলছো নূর।কি হয়েছে তোমার? আদ্রিয়ান কি তোমার সাথে খারাপ কিছু করেছে?"
শাহনাবের উত্তেজিত কন্ঠস্বর শুনে নূর খিলখিল করে হেসে ফেললো।শাহনাবের মনে হলো অনেক বছর পরের নূরের হাসির শব্দ শুনেছে সে। নূর আজ তার জন্য নিষিদ্ধ। এক সময়ের ভালোবাসা আজ এক মুহুর্তের জন্য সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে দিলো শাহনাবকে।যাকে একসময় মন চাইলেই ছুটে যেতো দেখার জন্যে আজ তাকে দেখা বারণ। নূর হাসির আড়ালে চোখের জল মুছে নিলো, অত:পর মজার ছলে বললো,
" কিছু হয়নি।ভাগ্যে যা ছিলো তাই হয়েছে।এখন নিজের জীবন নিয়ে ভাবুন।বিয়ে কবে করছেন?"
" এখনো ভাবিনি।ছয় সাত বছর যাক তারপর নাহয়.... "
" ততদিনে তো বুড়ো হয়ে যাবেন।"
বলেই কিছুটা হাসলো নূর।শাহনাবের জবাব শুনতে পেলো না তার আগেই রাহেলা শাহ তড়িঘড়ি করে রুমে ঢুকলেন। তাকে দেখে নূর ফোন কেটে দিলো।মুখের উপর কল কাটায় শাহনাবের মনে আঘাত লাগলো। অন্তত বিদায়টুকু দিতে পারতো।গতকাল থেকে অবশ্য রাহেলা শাহ ও নূরের সাথে তেমন একটা কথা বলেননি।নূরকে বসে থাকতে দেখে তিনি ধমক দিয়ে বললেন,
" বাপের বাড়ি পেয়েছো যে বসে বসে ফোনে কথা বলছো।সন্ধ্যায় চা দিতে হয় মনে নেই তোমার?"
নূর আদ্রিয়ানের ফোন রেখে মাথায় ঘোমটা দিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে চা বসায়।রাহেলা শাহ নিজেও রান্নাঘরে এলেন।
" ফ্রিজে শাক আছে আর কিছু সবজি আছে সেসব কেটে রান্না বসাও।"
নূর মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। ফ্রিজ থেকে শাকসবজি বের করে কাটতে শুরু করে। আদ্রিয়ান ক্লাব থেকে বেরিয়ে একটা টঙের দোকানের সামনে এসেছে।সেখানে ইলহাম ও দাঁড়িয়ে ছিলো।আদ্রিয়ান সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে তার সামনে আসে। ইলহামের দিকে সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
" দিবে নাকি এক টান?"
" আমি এসব ছেড়ে দিয়েছি সেই কবেই।তোর লজ্জ্বা নেই! চাচা হই তোর আর তুই আমাকে সিগারেট অফার করছিস।"
আদ্রিয়ান সিগারেট পায়ের তলায় পিষে হেসে ফেললো। আদ্রিয়ানকে হাসতে দেখে ইলহাম ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে।
" চাচা হয়েছো তো কি হয়েছে।তোমাকে আমি চাচা বলে মানি না।কয় বছরের ই বা বড়ো তুমি।"
ইলহাম আদ্রিয়ানের পিঠে চাপড় বসিয়ে বললো,
" গুণে গুণে তিন বছরের বড়ো তোর।সম্মান করতে শিখ।"
" তোমাকে আবার কিসের সম্মান।তুমি করে বলছি তাই অনেক।"
ইলহাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এই ছেলে শোধরানোর না।আদ্রিয়ান দু কাপ চা নিয়ে বসলো। এক কাপ এগিয়ে দিলো ইলহামের দিকে। চায়ে চুমুক দিয়ে ওপাশ ফিরে বললো,
" আমার প্রথম মাসের বেতন দিয়ে আজ নূরকে এক জোড়া নূপুর কিনে দিয়েছি।"
আদ্রিয়ানের কথা শুনে ইলহামের নাকে মুখে উঠে গেলো চা।কাশতে কাশতে গলার অবস্থা খারাপ পর্যায়ে। হঠাৎ ইলহামকে কাশতে দেখে আদ্রিয়ান পানি এগিয়ে দিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে জিগ্যেস করলো,
" কি হয়েছে তোমার? তুমি ঠিক আছো? "
ইলহাম অবাক করা দৃষ্টিতে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
" তুই একটু আগে যা বললি তা কি সত্যি? এ তো অবিশ্বাস্য!"
আদ্রিয়ান আশে পাশে তাকিয়ে গলা ঝেড়ে বললো,
" অবিশ্বাস্যের মতো কিছু হয়নি।"
" আমি একটা কথা বুঝলাম না। তোর চাকরির ছয় মাস চলছে।তোর একাউন্টে যথেষ্ট পরিমাণ থাকা সত্ত্বেও তুই প্রথম মাসের টাকা দিয়ে নূরকে নূপুর বানিয়ে দিলি কেন? তাও আবার ছয় মাস পরে সেই নূপুর জোড়া দিলি।"
আদ্রিয়ান আমতাআমতা করে বললো,
" আমি চেয়েছিলাম প্রথম মাসের বেতন দিয়ে বানিয়ে দিবো কিন্তু বেতন কম থাকায় ছয়মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।"
" তোর একাউন্ট থেকে নিলেই পারতি নাহয় আমাকে বললেই তো হতো।"
" আমি চেয়েছিলাম রোজগারের টাকায় দিতে।"
ইলহাম চায়ে চুমুক দিয়ে বললো,
" বুঝলাম।তাহলে এখন একটা সত্যি কথা বলতো আমায়।"
" কি?"
" নূরকে ভালোবাসিস তুই?"
ইলহামের কথায় আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
" ভালোবাসা কিনা জানিনা তবে সেদিন আমার কি হয়েছিল বুঝতে পারছিলাম না।মায়ের কথায় রাগান্বিত হয়ে নূরকে বাড়ি থেকে ঠিকই বের করে দিয়েছিলাম কিন্তু বের করে দেওয়ার পর আমার মাঝে অস্থিরতা দেখা দিলো।আমার সব কিছু শূন্য শূন্য মনে হতে লাগলো। এমন মনে হচ্ছিলো যেন আমি কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি। কোন কাজে মন বসাতে পারছিলাম না। পরে হতদন্ত হয়ে ছুটে যাই নূরকে ফিরিয়ে আনতে।এই আদ্রিয়ান শাহকে কখনো কাউকে অনুরোধ করেনি অথচ সেদিন আমি নূরকে বাড়ি ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করেছি।বেহায়ার মতো বারবার পিছু পিছু ঘুরেছি ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। আজ ও ভুল বোঝাবুঝি হওয়ার জন্য নূর আমার সাথে প্রথমবার তুই তোকারি করে কথা বলেছে অথচ নূরের জায়গায় অন্য কেউ হলে বা আগের আমি হলে পরোয়া না করে ধমক দিতাম কিন্তু আজ আমি নূরকে ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়েছি। যেই আদ্রিয়ান শাহ কাউকে কোনদিন কৈফিয়ত দেয়নি সে কিনা আজ প্রথম বার রাগ করা ছাড়া বিনা দ্বিধায় কৈফিয়ত দিয়েছে।"
" তারমানে তুই আস্তে আস্তে নূরের প্রতি দূর্বল হচ্ছিস।হয়তো ভালোবেসে ফেলেছিস।"
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
" আমি বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে। বাড়ি যাওয়া মাত্রই নূরকে দেখলে আমার অসস্থি হচ্ছে।রাগ হচ্ছে বারবার কোন কারণ ছাড়াই।অথচ আগে কখনো এমন হয়নি।আমার রুমে ঢুকলেই সব কেমন যেন এলোমেলো লাগছে।বিরক্তিকর ঠেকছে সব। এই কারণেই আমি চুপ করে ছিলাম কাল রাত থেকেই।নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম বারবার। "
ইলহাম আদ্রিয়ানের কথা শুনে কিছুটা বিচলিত হলো,হঠাৎ এমন কেন হতে যাবে।
" কতদিন ধরে চলছে এসব? "
" তিন-চার দিন ধরেই হচ্ছে এমন। "
ইলহাম হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে।তাই সে কথা না বাড়িয়ে বললো,
" নূরকে কখন খুলে বলবি সব? আর পাঁচটা দাম্পত্য জীবনের মতো কি তুই চাস তোর ও একটা সংসার হোক?"
আদ্রিয়ান চুপ করে রইলো ইলহামের কথায়।বেশ কিছুক্ষণ পর মিনমিন করে উত্তর দিলো,
" ট্রেনিং শেষ করে বাড়ি ফিরেই সব বলবো।আপাতত ট্রেনিং শেষ হোক।আর ছয় মাসের ই তো ব্যপার।"
" ঠিক আছে।তুই যা ভালো বুঝিস।"
ইলহামের ফোনে রিং বাজতেই সে ফোন নিয়ে দেখে পায়রার নাম্বার থেকে ফোন এসেছে।সে তাড়াতাড়ি ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সুরাইয়া শাহ বললেন,
" আসার সময় দই নিয়ে এসো।পায়রার দই খেতে ইচ্ছে করছে। "
সুরাইয়া শাহ যে পায়রার খুব ভালো করেই খেয়াল রাখছে তা ইলহাম বেশ বুঝতে পারছে। মূলত বাচ্চার জন্যই তার যত অপেক্ষা। দুজনেই চা শেষ করে বেরিয়ে পরলো। আদ্রিয়ান বাড়ি ফিরে দেখে নূর রান্না করছে।তাই সে উপরে চলে গেলো।কিছুক্ষণ পরেই রাহেলা শাহ চা নিয়ে ভেতরে আসলেন।আদ্রিয়ান দেখতে পায় তার ফোন বিছানায় পরে আছে।ফোন হাতে নিয়ে দেখে সাইমাকে ব্লক করে দিয়েছে নূর।আদ্রিয়ান অবশ্য তা নিয়ে মাথা ঘামালো না।রাহেলা শাহ'কে ভেতরে আসতে দেখে আদ্রিয়ান তার ক্লান্ত শরীর নিয়ে ডিভানে গা এলিয়ে দিলো।রাহেলা শাহ আদ্রিয়ানের দিকে চায় এগিয়ে দিয়ে বললেন,
" নতুন শহরে যাচ্ছো,সব সময় চোখ কান খোলা রেখে চলবে । কিছু করার আগে দুবার ভাববে। এখানে তোমার মা আছে। তোমার মায়ের তুমি ছাড়া কেউ নেই। "
আদ্রিয়ান কিছু বললো না চুপচাপ মায়ের কথা শুনছে সে।হঠাৎ রাহেলা শাহ একখানা তাবিজ আদ্রিয়ানকে দিয়ে বললো,
" এই তাবিজ তোমার ব্যাগে রাখো। বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পেতে এই তাবির আমি আনিয়েছি হুজুরকে দিয়ে। "
আদ্রিয়ান মায়ের কথায় বিরক্ত হয়ে বললো,
" এসব কি বলছেন আম্মা।আপনি এখনো সেকেলে পড়ে রয়েছেন। এইসব আজকাল কেউ মানে না। "
রাহেলা শাহ কান্নারত কন্ঠে বললেন,
" আমি তোমার ভালোর জন্য বলছি আদ্রিয়ান।মায়ের কথা ভেবে হলেও এটা সব সময় নিজের সাথে রাখবে। "
মায়ের ইমোশনাল কথা শুনে আদ্রিয়ান উপায় না পেয়ে বিরক্তিকর চাহনিতে নিজের ব্যাগে রেখে দেয়।রাহেলা শাহ তা দেখে ফিচেল হাসেন।মূল কারণ তিনি এখনো বলেননি।আদ্রিয়ান ব্যাগে রাখার পর রাহেলা শাহ চলে যান।নূর রান্না শেষে নিজের ঘরে আসছিলো ঠিক সেই সময় রাহেলা শাহ নূরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
" কোথায় যাচ্ছো? রান্না শেষ? "
নূর ওড়নায় হাত মুছে বললো,
" হ্যাঁ আম্মা শেষ। "
"আমার ঘরে এসো।তেল দিতে হবে আমার মাথায়।"
নূর ভেবেছিলো এখন আদ্রিয়ানকে বলে একটু ফোন নিবে পায়রার সাথে কথা বলতে কারণ কাল সকালে আদ্রিয়ান চলে যাবে।কিন্তু তা আর হলো কই।তবুও সে নিরাশ হলো না, ভাবলো তেল দেওয়া শেষ হলে তখন খুঁজবে। নূর একটা বাটিতে তেল নিয়ে চুলে লাগাতে শুরু করলো। প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর রাহেলা শাহ বললেন,
" কাল আদ্রিয়ানকে তাড়াতাড়ি বের হতে হবে। আমার ছেলেটাকে ভাত দিয়ে দাও।"
নূর চলে গেলো খাবার পরিবেশন করতে।রাহেলা শাহ তা দেখে মনে মনে বললেন,
" আজকেই মনে করো তোমার শেষ সুখের দিন।"
চলবে,,,,,,,,,
( গল্পে টুইস্ট আসছে কাল থেকে। সবাই রেসপন্স করুন।১.৩কে করে দিন জলদি।)
রেসপন্স করবেন সবাই।জইন হোন আমার গ্রুপে
https://facebook.com/groups/4214405902220456/