ফন্ট সাইজ:
থিম:
মন প্রাঙ্গনের বৃষ্টি

৩১তম পর্ব

লেখক: কংকা চৌধুরী

#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি

#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী

(৩১) এর প্রথমাংশ

( অনুমতি বিহীন কপি করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ)

প্রায় সাড়ে সাত ঘন্টা পর ঢাকায় পৌঁছায় আদ্রিয়ান।রাস্তায় জ্যাম থাকায় দেরি হয়েছে।অফিস থেকে তাদের বারো জনের জন্য একটা বাংলো দেওয়া হয়েছে গাজীপুরে।যেখানে তারা থাকবে।বাংলো থেকে কিছুটা দূরেই তাদের অফিস অবস্থিত। আদ্রিয়ান তার জন্য বরাদ্দ করে দেওয়া রুমে।আদ্রিয়ান চারপাশে তাকিয়ে দেখলো এই জায়গাটা কিছুটা গ্রামের পরিবেশের মতো। কিছুদূরে একটা নদী রয়েছে সেখানে কিছুসংখ্যক জেলে মাছ ধরছে।সব মিলিয়ে নিরিবিলি পরিবেশে আদ্রিয়ানের ভালোই লাগছে।সে ব্যাগ থেকে তার সমস্ত জিনিসপত্র বের করে আলমারিতে রাখলো। টিফিন বক্স টা হাতে নিতেই নূরের কথা মনে পড়লো তার।ভাবলো ভিডিও কল দিয়ে দেখাবে নূরকে এখানকার পরিবেশ।যেই ভাবা সেই কাজ, ফোন করলো নূরের জন্য রাখা সেই ফোনটিতে। যেটা সে তার মাকে দিয়েছিলো। রাহেলা শাহ পান বানিয়ে মুখে দিবেন ঠিক তখনই আদ্রিয়ানের দেওয়া ফোনে কল আসতে শুরু করলো।তিনি পান চিবুতে চিবুতে ফোন হাতে নিয়ে দেখলেন আদ্রিয়ানের কল এসেছে। রাহেলা শাহ ফোন রিসিভ করে জিগ্যেস করলেন,

" মা আমি পৌঁছে গিয়েছি।"

" রাস্তায় কোন অসুবিধে হয়নি তো?"

" না কোন অসুবিধা হয়নি।নূর কোথায়?"

নূরকে কাজ করতে বলে তিনি সেই যে নিজের ঘরে এসে বসেছেন, নূরের কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলেন।তিনি আমতাআমতা করে বললেন,

" নূর তো গোসল করছে এইসময়।তুমি বরং পরে কথা বলো।"

আদ্রিয়ান মনক্ষুন্ন হলেও বুঝতে দিলো না।মলিন কন্ঠে বললো,

" রাখছি তাহলে।"

আদ্রিয়ান ফোন কেটে হতাশাগ্রস্থ হয়ে বিছানায় বসলো।এতো সুন্দর পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও আদ্রিয়ানের মন টিকলো না এখানে।বাড়িতে থাকলে অবশ্য এক নজর দেখতে পারতো কিন্তু এখন সেটাও পারবে না।রাতে না ঘুমানোয় শরীর ক্লান্ত লাগছে অনেকটা। আদ্রিয়ান ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পরলো। রাহেলা শাহ ফোন রেখে ছাদের দিকে রওনা হলেন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করেছে। তিনি ছাদে গিয়ে নূরকে দেখতে পেলেন না।নূরকে দেখতে না পেয়ে মেজাজ গরম হয়ে গেল তার।খানিকটা সামনে এগিয়ে দেখলো মেঝেতে পরে আছে নূরের দুর্বল দেহখানা। বৃষ্টির টিপটিপ ফোটা নূরের শরীরে পরছে।তিনি নূরের সামনে এসে শরীরে হাত দিয়ে দেখলেন শরীর একদম ঠান্ডা হয়ে আছে।। নূরকে বেশ কয়েকবার ডাকলেন তিনি কিন্তু তবুও কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। অত:পর জোরে জোরে ঝাকাতে লাগলেন নূরের শরীর, এরপরেও নূরের কোন পরিবর্তন দেখতে না পেয়ে তিনি কিছুটা ভয় পেয়ে যান। কলের গোড়ায় গিয়ে হাতে পানি নিয়ে নূরের মুখে ঝাপটা দেওয়ার পর নূর পিটপিট করে চোখ খুললো।মধ্যাহ্নের প্রখর রোদে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো সে।রাহেলা শাহ দেখলেন অর্ধেক পাতিল এখনো ধোয়া হয়নি।তা দেখে তিনি কটুক্তি করে বললেন,

" এতো খাওয়ার পরেও শরীর দূর্বল কি করে হয় বুঝিনা। বাকি পাতিলগুলো কি তোমার পরিবার এসে ধুয়ে দিয়ে যাবে?"

" আসলে আম্মা সকাল থেকে না খেয়ে ছিলাম তো তাই.... "

" ওসব কথা আমাকে বলতে এসো না।একদিন না খেলে কেউ ম*রে যায় না। "

নূর আর কিছু বলার সাহস পেলো না। আস্তে আস্তে বাকি পাতিলগুলো ভালোভাবে পরিস্কার করে ফেললো।রাহেলা শাহ নিচে এসে টেবিলে বসলেন দুপুরের খাবার খেতে।নূর হাতের কাজ শেষ করে দ্রুত চলে গেলো গোসল করতে। বড্ড খিদে পেয়েছে তার। সকালে সব কাজ করতে করতে আর খাওয়া হয়ে উঠেনি।গোসল করে এখন কিছুটা ক্লান্তি দূর হয়েছে তার।রান্নাঘরে গিয়ে ভাতের পাতিলে হাত দিতেই দেখে পাতিল খালি।এক পাতিল ভাত রান্না করেছিলো সে অথচ এখন কিছুই অবশিষ্ট নেই। খিদের চোটে কান্না আসছে তার। সে পাতিল হাতে রাহেলা শাহ'র সামনে এসে দাঁড়ালো।

" আম্মা এখানে তো এক পাতিল ভাত ছিলো কিন্তু এখন তো .... "

রাহেলা শাহ নূরের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলেন,

" ভাত খেতে হলে রান্না করে খেতে হবে।"

ভাতগুলো যে রাহেলা শাহ কিছু একটা করেছেন তা সে ভালোই বুঝতে পারছে।পেটে খিদে নিয়ে নূর রান্নাঘরে এসে আবারও ভাতের হাড়ি চড়ালো।শ্বশুরবাড়ির ভাতের ঠিক কতটা দাম তা সে বেশ বুঝতে পারছে। রাতের রান্না করা মাংস ও পটলের তরকারি ছিলো।তরকারির পাতিলের ঢাকনা উঠাতেই দেখতে পায় সামান্য ঝোল আছে শুধুমাত্র। আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।নূর ফ্রিজ খুলতে গেলে দেখতে পায় ফ্রিজে তালা দেওয়া।অতএব তরকারি ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখেছেন তিনি।যতটুকু ঝোল অবশিষ্ট আছে সেইটুকু দিয়ে যে তার পেট ভরবে না তা সে বুঝতে পারছে।ভাত হতে আরও কিছু সময় বাকি।বিস্কিটের পট থেকে দুটো বিস্কিট নিয়ে খেতে শুরু করলো সে।এর মাঝে ভাত ও হয়ে এলো।প্লেটে ভাত বেড়ে অবশিষ্ট ঝোল টুকু নিয়ে নিলো নূর। ভাতের নলা মুখে দিতেই দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। এই কিছুদিন ঠিকই ছিলো কিন্তু আজ থেকে তার কি হবে।শুকনো ভাত গিলতে কষ্ট হচ্ছে তার।বাকি ভাতটুকু লবণ দিয়ে মেখে খেয়ে নিলো। খাওয়া শেষে ঘর মুছার বালতি নিয়ে পুরো বাড়ির ফ্লোর মুছতে শুরু করলো।রাহেলা শাহ নিয়ম করেছে আজ থেকে প্রতিদিন ঘর মুছতে হবে ও গোয়াল ঘর পরিষ্কার করতে হবে। খাওয়ার পর শরীরে আর জোর আসছে না।ইচ্ছে করছে বাবার বাড়ি চলে যেতে। নূর ভাবলো একবার রাহেলা শাহ'কে বলে দেখবে কিনা।রাহেলা শাহ নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিলেন।নূর তার সামনে এসে বললো,

" আম্মা।আমি চাইছিলাম কিছুদিনের জন্য বাবা-মায়ের কাছে যেতে।"

রাহেলা শাহ পানের পিক ফেলে ব্যাঙ্গার্থ স্বরে বললেন,

" কাজ না করার ধান্ধা আমি বুঝতে পারবো না ভেবেছো? কোথাও যেতে হবে না।আমার কথার বাইরে এই বাড়ি থেকে এক পা বের হলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে। "

নূর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও ফিরে এলো নিচে।মেইন দরজা লক করে রাখা হয়েছে। নূর আবারও বসে পড়লো ঘর মুছতে।একটু এদিক ওদিক হলে রাহেলা শাহ তাকে ছাড়বে না।ঘন্টা দুয়েক পরে ঘর মুছা হলে নূর রাহেলা শাহ'র কাছে এসে আমতাআমতা করে বলে,

" আম্মা,উনি আমার জন্য একটা ফোন দিয়ে গিয়েছিলেন আপনার কাছে।ফোনটা একটু দিবেন।"

" কে বলেছে তোমার জন্য ফোন দিয়েছে আমার ছেলে।শুধুমাত্র ফোন এলে তোমায় দিতে বলেছে।ফোন এলে আমি ঠিক দিয়ে যাবো।"

নূর মলিন কন্ঠে বললো,

" আসলে আম্মা আপাকে একটা ফোন করার ছিলো। "

" এতো কিসের কথা পায়রার সাথে তোমার? সুযোগ পেলেই বাপের বাড়ির লোকের সাথে কথা বলার বাহানা।দুটো কাজ করতে দিলে শরীর খারাপের নাটক শুরু হয়ে যায় অথচ ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে কথা বলতে গেলে কোন সমস্যা হয় না। তোমার এসব নাটক অন্য কেউ না বুঝলেও আমি ঠিকই বুঝি। "

নূর ডুকরে কেঁদে উঠলো হঠাৎ। অত:পর কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো,

" আম্মা দয়া করে একবার ফোনটা দিন।আমার আম্মুর শরীর ভালো না।"

নূরের কান্না দেখেও রাহেলা শাহ'র মন গললো না।তিনি ফিরেও তাকালেন না নূরের দিকে।

" কানের সামনে ঘ্যানঘ্যান না করে গরুকে ভুসি মাখিয়ে দিয়ে এসো।আজ থেকে নিয়ম করে প্রতিদিন গোয়ালঘর পরিষ্কার করবে। "

নূর গেলো না রাহেলা শাহ'র সামিনে থেকে।আকুতি মিনতি করতে লাগলো কিন্তু রাহেলা শাহ তাকে পাত্তা দিলেন না।হঠাৎ ফোনে কল আসায় রাহেলা শাহ দেখতে পান আদ্রিয়ান ফোন করেছে নূরের জন্য দেওয়া ফোনটিতে। নূর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে রাহেলা শাহ'র দিকে।এখন হয়তো তাকে ফোন দিবে কথা বলার জন্য। তাকে অবাক করে দিয়ে রাহেলা শাহ বললেন,

" কি বললাম তোমার কানে যায়নি? নিজের ঘরে যাও। "

নূর রাহেলা শাহ'র কথা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেও দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে।আদ্রিয়ান ফোন করে জিগ্যেস করে,

" আম্মা নূরকে ফোন দেননি?"

রাহেলা শাহ বরাবরের মতো মিথ্যে বললেন,

"নূর ফোন নিতে আসেনি।আমি বলেছিলাম।"

আদ্রিয়ান চেয়েছিলো ঘুম থেকে উঠে নূরের সাথে কথা বলতে কিন্তু তা আর হলো কোথায়।আদ্রিয়ান মনে মনে ভাবে,

" নূর কি ইচ্ছে করে আমার সাথে কথা বলতে চায় না।আমি তো বলে এসেছিলাম মায়ের কাছে ফোন দিয়ে এসেছি।"

আদ্রিয়ানের মায়ের কথায় পুরোপুরি নিজের মনকে শান্ত করতে পারলো না।সে কিছুক্ষণ থেমে আবারও জিগ্যেস করলো,

" আম্মা নূরকে একবার ফোন দিন।আমার কিছু বলার ছিলো।"

" নূর বলেছে সে এখন ঘুমাতে চায়।তাকে যেন আমি বিরক্ত না করি।"

" ঠিক আছে আম্মা।"

আদ্রিয়ান ফোন কেটে দেয়। নূর আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলে উঠে,

" আম্মা আমি কখন আপনাকে বললাম যে আমি ফোন নিতে চাই না।"

রাহেলা শাহ নূরকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে কিছুটা ভরকে গেলো।অত:পর রাগান্বিত স্বরে বললেন,

" চুরির পাশাপাশি কান পেতে শোনার অভ্যাস ও আছে দেখছি তোমার।"

#মন_প্রাঙ্গণের_বৃষ্টি

#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী

(৩১) এর বর্ধিতাংশ

( কপি করা সম্পুর্ণরুপে নিষিদ্ধ। "

এটা তো অন্যায় আম্মা।আপনি উনাকে মিথ্যে বলেছেন।"

"তোমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।নিজের কাজ করো যাও।"

" আমার ফোন দিন আপনি।"

" কোন ফোন পাবে না তুমি।"

নূর মনে মনে বেজায় ক্রুদ্ধ হলেও কি বললো না। হঠাৎ বেল বাজায় নূর নিচে আসে দরজা খুলতে।এই সময় আবার কে আসবে।দরজা খুলতেই দেখতে পায় নূরের মা-বাবা ও পায়রা এসেছে।নূর ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাদের।পায়রার প্রেগন্যান্সির খবর শোনার পর তারা পায়রাকে দেখতে এসেছিলো।এই ফাঁকে নূরকেও দেখে যেতে চেয়েছিলো।নূর তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

" আমার কথা তোমাদের মনেই পড়ে না। বিয়ে দিয়ে যেন পর হয়ে গিয়েছি আমি "

মোরশেদা বেগম মেয়ের অভিমান বুঝতে পেরেছেন।তিনি নিজেও কেঁদে ফেলেছেন মেয়েকে কাঁদতে দেখে।

" তুই আমার কত শখের জানিস।তোর কথা মনে পড়বে না তো কার কথা মনে পড়বে।"

রাহেলা শাহ নিজের ঘরে ছিলেন কিন্তু নিচে মানুষজনের আওয়াজ শব্দ পেয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে এসে দেখতে পান নূরের মা-বাবা ও পায়রা এসেছে। নূরের মা-বাবা কে দেখেছে তিনি বেজায় বিরক্ত হোন।প্রথম থেকে কোন গরীব করা আত্মীয়তা করতে চাননি।কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নূরের সাথে আদ্রিয়ানের বিয়ে হওয়ায় নূরকে মেনে নিতে বাধ্য হোন তিনি। নূর তাদের বসতে বলে নাস্তা বানাতে গেলো।পায়েশ বসিয়ে চা বানাতে গেলো।পায়রা ও রান্নাঘরে এসেছে নূরের কাছে।এতদিন পর বোনকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরলো নূর।পায়রা নূরের কাজে টুকটাক সাহায্য করছে আর গল্প করছে।

" আদ্রিয়ান তোকে যাওয়ার পর একবার ও ফোন দেয়নি? "

নূর আটা মাখতে মাখতে বললো,

" দিয়েছিলো কিন্তু কথা বলার সুযোগ হয়নি। "

" কেন?"

নূর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

" আম্মার কাছে ফোন দিয়ে গিয়েছিল কিন্তু উনি ফোন করলে আম্মা আমাকে দেয় না।"

পায়রা অবাক হলো নূরের কথায়।স্বামী তার স্ত্রীর সাথে কথা বলবো অথচ সেখানেও এতো বাধা বিপত্তি!পায়রা মিনমিন করে জিগ্যেস করলো,

" বড় ভাবি তোর সাথে এমন ব্যবহার করছে কেন? যবে থেকে তোর বিয়ে হয়েছে তো উনি তোকে দুই চোখে সহ্যই করতে পারেন না।"

নূর স্মিত হেসে বললো,

" হয়তো আরো ভালো মেয়ে আনতে চেয়েছিলো কিন্তু পারেনি তাই হয়তো আমার উপর এত বিরক্ত। "

" তুই কি কখনো আদ্রিয়ানের মনে নিজের জন্য কিছু দেখেছিস? দেখ বিয়ে ছেলেখেলা নয়।তুই চাইলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।"

নূর চুপ করে রইলো কিছুক্ষণের জন্য। অত:পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

" দেখেছি।গত দুদিন ধরে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি আমি।"

" মেহমানকে চা না দিয়ে বসিয়ে রেখেছো কেন?"

রাহেলা শাহ'র কথা শুনে নূর দ্রুত নাস্তা সাজিয়ে নিয়ে গেলো তার মা-বাবার সামনে।মোরশেদা বেগম মন ভরে মেয়েকে দেখছেন। এই কয়মাসে কতটা সাংসারিক হয়ে উঠেছে নূর।অথচ একসময় তাকে ভাত খাইয়ে দিতে হতো। নূর তাদের সামনে নাস্তার প্লেট সাজিয়ে রাখা সত্ত্বেও মোরশেদা বেগম মুখে তুললেন না সেই খাবার।নূর বিচলিত হয়ে জিগ্যেস করলো,

" তোমার কি নাস্তা পছন্দ হয়নি আম্মু? খাচ্ছো না কেন? "

মোরশেদা বেগম নূরকে তার পাশে বসিয়ে এক চামচ তার মুখের সামনে ধরলেন,মেয়েকে ফেলে খেতে পারলেন না তিনি।নূরের চোখে জল টলমল করছে। একমাত্র মা-ই হয়তো বুঝতে পারে মেয়ের মনের কথা। নূরকে খাইয়ে দিয়ে পায়রাকেও খাইয়ে দিলো মোরশেদা বেগম। রাহেলা শাহ আড়চোখে সবটা দেখছেন।তার কাছে এসব নিতান্তই অতিরিক্ত মনে হচ্ছে।

সন্ধ্যা নামতে ধরণীতে একরাশ বিষন্নতা ছড়িয়ে পড়লো। গোধূলির আবছা আলোয় ছেয়ে গিয়েছে আকাশ।নূরের মা-বাবা বেরিয়ে পরেছে কিছুক্ষণ আগেই।পায়রা নিজের ঘরে বসে আছে। নতুন কাজের নেয়ে পাপিয়া ডালিম ফল কেটে তার সামনে দিয়ে গেলো।ডাক্তার বলেছে তার রক্ত শূন্যতা তাই ইলহামের কঠোর নির্দেশ যেন প্রতিদিন দুবার ফল খায় পায়রা। ইলহাম এখন বাহিরে গিয়েছে তার কাজে।সুরাইয়া শাহ পায়রার পৃষ্ঠদেশে তেল মালিশ করে দিচ্ছে।তার ভাষ্যমতে এইসময় তেল মালিশ করা শরীরের জন্য ভালো। পাপিয়া শুকনো মরিচ টেলে ভর্তা বানাচ্ছে।পায়রার ঝাল ঝাল ভর্তা খেতে ভীষণ ইচ্ছে করছিলো তাই এতো পায়তারা।

নূর রান্নাঘর পরিস্কার করে পড়তে বসেছে।কাল থেকে আবারও তার কলেজ শুরু। আর সাত মাস পরেই তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। টেস্ট পেপার কেনা হয়নি এখনো। হিসাববিজ্ঞান বিষয়টা কিছুতেই বুঝতে পারছে না সে।অংক গুলো খুব একটা বুঝতে পারছে না সে। ফোন থাকলে হয়তো কিছুটা সহজ হতো তবে এখন সেই উপায়টুকুও নেই। আপাতত নিজের মতো করেই পড়ছে সে। কাল আদেও কলেজ যেতে পারবে কিনা বুঝতে পারছে না।রাহেলা শাহ যদি আবার যেতে না দেয়।আজ সারাদিনের ক্লান্তি এসে ভর করেছে তার শরীরে । রাহেলা শাহ এদিক দিয়েই যাচ্ছিলেন,নূরকে পড়তে দেখে তিনি বললেন,

" নূর। আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে এসো।আমার মাথাটা ভীষণ ধরেছে। সাথে গরম তেল ও নিয়ে এসো।"

পড়ার সময় রাহেলা শাহ'র কথা শুনে মেজাজ কিছুটা খারাপ হয়ে যায় নূরের। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে সে চুপ হয়ে যায়। কাল কলেজ থেকে সোজা পায়রার বাসায় যাবে সে। সেখানে আপাতত কিছুদিন থাকবে সে নয়তো রাহেলা শাহ তাকে বাঁচতে দিবে না।বই বন্ধ করে চলে গেলো চা বানাতে।একটা বাটিতে নারিকেল তেল গরম করে নিয়ে গেলো রাহেলা শাহ'র মাথায় লাগাতে শুরু করলো। তিনি আরাম করে বসেছেন।

ইলহামের কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে পায়রা।ইলহাম বাজার থেকে এসেছে কিছুক্ষণ আগেই।পায়রার পছন্দের শশা কিনে এনেছে সে। পায়রা তখন থেকে আপেলের টুকরো চিবুচ্ছে অথচ এখনো অনেকখানি অবশিষ্ট রয়েছে।গর্ভবতী জানার পর থেকে ইলহামের যত্ন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে পায়রার প্রতি। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ন’টা ছুঁইছুঁই। পুরো বাড়ি কেমন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। শদেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ ও ভারী আবহাওয়ায় আরও গভীর হয়ে উঠেছে রাত্রি। নূর রাহেলা শাহ'র মাথায় আলতো স্পর্শে তেল দিয়ে দিচ্ছে।রাহেলা শাহ চোখ বন্ধ রেখে হুট করে বলে উঠলেন,

"কাল থেকে আর কলেজে যাওয়ার দরকার নেই তোমার। সংসারের কাজ সামলানোই হলো মেয়েদের আসল কাজ।। এতো পড়াশোনা করে কি হবে? "

রাহেলা শাহ'র কথা শুনে নূরের হাত থেমে গেলো এক মুহূর্তের জন্য। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো তার। একটু আগেও মনে মনে যে ভয়টা ছিলো , এখন যেন সেটাই সত্যি হয়ে সামনে দাঁড়ালো।

নূর ধীরস্বরে বললো,

"পরীক্ষা তো সামনে আম্মা, আর মাত্র সাত মাস বাকি। "

"পরীক্ষা দিয়ে কি হবে?শাহ বাড়ির বউরা চাকরি করে না। এতো মাস্টারগিরি করার কোন প্রয়োজন নেই।"

নূরের ভেতর টা শুকিয়ে যাচ্ছে। যদি পরীক্ষা দিতে না দেয়।তেল দেওয়া শেষ হলে রাহেলা শাহ বললেন,

" যাও। এবার আমি ঘুমাবো।"

নূর তার কথায় সায় জানিয়ে চলে যায় নিজের ঘরে।ফোনটাও নেই। এখন কি করবে সে।এ কোন বিপদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাকে। সকালে তারাতাড়ি ঘুম থেকে উঠায় ক্লান্ত লাগছে তার উপর সারাদিন এতো ধকল গিয়েছে তার উপর।

ভোরের আলো ফুটেনি এখনো। একটু পরেই আগমন হবে নতুন প্রহরের। নিস্তব্ধ ঘরে বিছানার এক কোণায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে নূর।হঠাৎ অস্থির অস্থির লাগছে।বুকের ভেতর এক অজানা ভয় ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করেছে সবেমাত্র। নূর বেলকনিতে গিয়ে বাহিরের মনোরম দৃশ্য দেখতে। ফ্যাকাসে অন্ধকার কেটে গিয়ে পুরোপুরি সকাল হয়ে গিয়েছে।এক রাশ মুগ্ধতা গ্রাস করে নিয়েছে নূরকে।ভোরের স্নিগ্ধ আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পরেছে চারদিকে।আজ অস্বাভাবিক ক্লান্তি লাগছে নূরের।সে ভেবেছে হয়তো কাল অতগুলো কাজ করায় এমন লাগছে। খিদেও পায়নি তার।অথচ রাতেও খায়নি।খাবারের প্রতি অনীহা চলে এসেছে।হঠাৎ কি হলো বুঝতে পারছে না।।বুকে খানিকটা ব্যথাও হচ্ছে। নূর বুঝতে পারছে না তার সাথে এসব কি হচ্ছে।শরীর অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগায় সে গোসল সেরে নেয় একেবারে। নিচে গিয়ে দেখতে পায় রাহেলা শাহ এখনো উঠেনি।নূর প্রতিদিনের মতো আজও ঝারু নিয়ে ঝাট দিতে গেলে বুকে ব্যথা লেগে উঠে। সে ওসবে পাত্তা না দিয়ে কাজ করে নেয়।এর মাঝে রাহেলা শাহ ও উঠে গিয়েছেন ঘুম থেকে। তিনি দেখতে পান নূর চা বসিয়ে দিয়েছে তবে কোন নাস্তা বানাচ্ছে না,নাক চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।তিনি রান্নাগজরে এসে নূরের সামনে এগিয়ে এসে বললেন,

" কি হয়েছে?"

নূর তাকে ইশারায় দেখায় ভাঙা ডিমের অংশ।মূলত ডিমের গন্ধে তার বমি আসছে।রাহেলা শাহ বুঝতে পারছেন না কাল থেকে নূরের হলো টা কি।সব কিছুতেই বমি বমি ভাব। সকাল সকাল বমি করলে বিষয়টা খারাপ দেখায় তাই তিনি নাক সিটকে বললেন,

" নাস্তা আমি বানাচ্ছি।তুমি সরো এখান থেকে।"

নূর রাহেলা শাহ'র পাশ কেটে সরে যায় সেখান থেকে।রাহেলা শাহ পাউরুটি দিয়ে ডিম টোস্ট করলেন।টেবিলে এনে রাখতেই নূর ছুটে যায় বেসিনে। রাহেলা শাহ তাতে মনোযোগ দিলেন না। নূর কিছুক্ষণ পরে তার সামনে এসে বললো,

" আমার শরীর গুলিয়ে বমি আসছে শুধু।খাবারে গন্ধ লাগছে।"

রাহেলা শাহ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।তিনি আতঙ্কিত হয়ে জিগ্যেস করলেন,

" কি বলছো তুমি এসব।"

রীতিমতো হাত পা কাঁপা শুরু করেছে তার।তিনি ডাক্তারকে ফোন করে নিজের ঘরে চলে যান।দরজা আটকে কাউকে ফোন করার দু-তিন মিনিটের মাঝেই সে ফোন রিসিভ করতেই রাহেলা শাহ বলে উঠেন,

" আমি যা সন্দেহ করছি তাই হবে হয়তো। এমন হলে সব সম্পত্তি নূরের সন্তান পাবে।এই সম্পত্তি,এই বাড়ি কিছুতেই আমি ওই মেয়ের অধীনে যেতে দিবো না।"

অপর পাশ থেকে বলে উঠলো,

" মে'রে ফেলো।এছাড়া আর কিছু করার নেই।এমন ভাবে কাজ করতে হবে যেন সাপ ও না ম'রে লাঠিও না ভাঙে।"

চলবে,,,,,,,

" আপনাদের কথা ভেবে গল্প দিয়ে দিয়েছি।একদিনে দুই পর্ব।রেসপন্স করুন।১.৩কে করে দিন আপনারা।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন