গল্পের নাম: তুই থাকলেই গল্প জমে!
পর্ব: ২
শিরোনাম: নতুন মানুষ, পুরোনো অভিমান
গতকাল মায়া আর নীলার মধ্যে যে নীরবতা তৈরি হয়েছিল, সেটা দুজনের মনেই অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি করেছিল।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মায়া নীলাকে মেসেজ দিত। কিন্তু আজ ফোন হাতে নিয়েও সে কোনো মেসেজ পাঠাল না।
অন্যদিকে নীলাও বারবার মায়ার চ্যাটবক্স খুলছিল। অনেকবার লিখল, আবার মুছেও দিল।
শেষ পর্যন্ত নীলা নিজেই মেসেজ পাঠাল।
নীলা: এই পাগলি, ঘুম থেকে উঠেছিস?
মায়া মেসেজটা দেখল, কিন্তু উত্তর দিল না।
নীলা: কী হলো? কথা বলবি না?
মায়া: বলার কী আছে?
নীলা: কাল কী হয়েছে তোর?
মায়া: কিছু হয়নি। তুই তোর নতুন বন্ধুর সঙ্গে কথা বল।
নীলা: আবার সেই একই কথা! রিমির সঙ্গে কথা বললেই কি তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে?
মায়া: আমি তো এমন কিছু বলিনি।
নীলা: তাহলে এমন করছিস কেন?
মায়া আর উত্তর দিল না।
সেদিন স্কুলে গিয়েও দুজনের মধ্যে তেমন কোনো কথা হলো না।
নীলা ক্লাসে ঢুকে প্রথমে মায়ার দিকে তাকাল। মায়া জানালার পাশে বসে ছিল। নীলা তার পাশে গিয়ে বসতে চাইলে মায়া নিজের ব্যাগটা পাশের চেয়ারে রেখে দিল।
নীলা: সর, বসব।
মায়া: জায়গা নেই।
নীলা: ব্যাগটা সরিয়ে দিলেই তো জায়গা হবে!
মায়া: অন্য কোথাও বস।
নীলা কিছুক্ষণ মায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চুপচাপ গিয়ে রিমির পাশে বসল।
রিমি সবকিছু লক্ষ করছিল।
রিমি: কী হয়েছে তোদের মধ্যে?
নীলা: কিছু না। ওর আবার অভিমান হয়েছে।
রিমি: তাহলে বুঝিয়ে বলছিস না কেন?
নীলা: কতবার বলব? ও বুঝতেই চায় না।
রিমি: তবুও চেষ্টা কর। কাছের বন্ধুর সঙ্গে অভিমান হলে চুপ করে থাকা ঠিক না।
নীলা কোনো উত্তর দিল না।
টিফিনের সময় রিমি নীলাকে নিয়ে ক্যানটিনে গেল। মায়া তখন একা বসে ছিল। তার সামনে টিফিনের বাক্স খোলা, কিন্তু সে কিছুই খাচ্ছিল না।
নীলা দূর থেকে মায়াকে দেখল। তার মনে হলো, গিয়ে একবার কথা বলে আসে। কিন্তু মায়ার আগের আচরণের কথা মনে পড়তেই সে আর এগোল না।
কিছুক্ষণ পর রিমি এসে মায়ার পাশে বসল।
রিমি: কী ব্যাপার? একা বসে আছ কেন?
মায়া: এমনিই।
রিমি: নীলার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?
মায়া: না।
রিমি: তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে খুব ভালো মানায়। কিন্তু আজকাল একসঙ্গে দেখছি না।
মায়া একটু হেসে বলল,
মায়া: ওর তো এখন নতুন বন্ধু হয়েছে। আমার সঙ্গে সময় কাটানোর দরকার কী?
রিমি: তুমি ভুল বুঝছ। নীলা তোমার কথা অনেক বলে।
মায়া: কী বলে?
রিমি: বলে, তুমি নাকি খুব ভালো। তবে একটু বেশি অভিমান করো!
মায়া কিছু বলল না।
ঠিক তখনই নীলা ক্যানটিনে ঢুকল।
নীলা: রিমি, চল। ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।
রিমি: তুই যা, আমি আসছি।
নীলা মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
নীলা: তুই কিছু খাসনি কেন?
মায়া: ক্ষুধা নেই।
নীলা: সকালেও কিছু খাসনি, এখনো খাচ্ছিস না। অসুস্থ হয়ে যাবি তো!
মায়া: আমার কী হলো, সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।
নীলা এবার একটু রেগে গেল।
নীলা: সব কথায় এমন করিস কেন? আমি কি তোর শত্রু?
মায়া: না, তুই তো এখন রিমির বেস্ট ফ্রেন্ড!
নীলা: ব্যস! আর কথা বলব না।
নীলা রাগ করে চলে গেল।
রিমি মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
রিমি: দেখলে? তোমরা দুজনেই একে অপরকে কষ্ট দিচ্ছ।
মায়া নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন স্কুল ছুটির পর মায়া একাই বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ পেছন থেকে নীলা ডাকল।
নীলা: এই মায়া! একটু দাঁড়া।
মায়া দাঁড়াল, কিন্তু পেছনে তাকাল না।
নীলা কাছে এসে বলল,
নীলা: তুই কি সত্যিই ভাবিস, রিমি আমার জায়গায় তোর জায়গা নিয়ে নিয়েছে?
মায়া: জানি না।
নীলা: তাহলে আমার দিকে তাকিয়ে কথা বল।
মায়া ধীরে ধীরে নীলার দিকে তাকাল।
মায়া: আগে তুই স্কুলে এসে আমাকে খুঁজতিস। এখন রিমিকে খুঁজিস। আগে টিফিনে আমার পাশে বসতিস। এখন ওর পাশে বসিস। আগে সব কথা আমাকে বলতিস। এখন সব কথা ওকে বলিস। তাহলে আমি কীভাবে বুঝব, কিছু বদলায়নি?
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
নীলা: তুই জানিস, রিমি নতুন স্কুলে এসেছে। এখানে ওর তেমন কেউ নেই। তাই ওর সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটাই। কিন্তু তার মানে এই না যে তোকে ভুলে গেছি।
মায়া: তুই আমাকে আগের মতো সময় দিস না।
নীলা: তাহলে তুই বললেই তো পারতিস! এভাবে কথা বন্ধ করে দিলি কেন?
মায়া: কারণ তুই বুঝবি ভেবেছিলাম।
নীলা: সবকিছু কি না বললে বুঝতে পারব?
মায়া চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর নীলা বলল,
নীলা: আচ্ছা, একটা কথা বলি?
মায়া: বল।
নীলা: তুই কি ভয় পাচ্ছিস, আমি তোকে ছেড়ে চলে যাব?
মায়া এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।
মায়া: হয়তো।
নীলা মায়ার হাতটা ধরে বলল,
নীলা: পাগলি, নতুন বন্ধু তৈরি করা যায়, কিন্তু পুরোনো স্মৃতিগুলো তৈরি করা যায় না। তোর সঙ্গে আমার কত স্মৃতি! প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত কত হাসাহাসি, কত ঝগড়া, কত পাগলামি! সেগুলো কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়?
মায়ার মুখে একটু হাসি ফুটল।
মায়া: তাহলে কাল থেকে আবার আমার পাশে বসবি?
নীলা: বসব। তবে একটা শর্ত আছে।
মায়া: আবার কী শর্ত?
নীলা: প্রতিদিন আমার জন্য টিফিন আনবি।
মায়া: বাহ! বন্ধুত্বের সুযোগ নিচ্ছিস?
নীলা: অবশ্যই! বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ার সুবিধা তো নিতে হবে!
দুজনেই হেসে উঠল।
এরপর কয়েক দিন সবকিছু আবার আগের মতো চলতে লাগল। নীলা মায়ার সঙ্গে সময় কাটাত, আবার রিমির সঙ্গেও কথা বলত। মায়াও ধীরে ধীরে বিষয়টা মেনে নিতে শুরু করল।
কিন্তু একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল, যা আবার সবকিছু বদলে দিল।
সেদিন স্কুলে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সবাই নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মায়া আর নীলা ঠিক করেছিল, তারা দুজন মিলে একটা ছোট নাটক করবে।
কিন্তু অনুষ্ঠানের আগের দিন নীলা এসে বলল,
নীলা: মায়া, একটা কথা বলব?
মায়া: বল।
নীলা: কাল আমি তোর সঙ্গে নাটক করতে পারব না।
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
মায়া: কেন? আমরা তো ঠিক করেছিলাম!
নীলা: রিমি আমাকে ওর সঙ্গে একটা কাজ করতে বলেছে। আমি ওকে কথা দিয়েছি।
মায়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
মায়া: আচ্ছা। সমস্যা নেই।
নীলা: তুই রাগ করিস না। পরে তোকে সব বুঝিয়ে বলব।
মায়া: বুঝতে হবে না। তুই যা ভালো মনে করিস, কর।
নীলা চলে গেল।
মায়া সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। সে ভাবছিল, বন্ধুত্ব কি সত্যিই আগের মতো আছে? নাকি সে শুধু নিজেকেই বোঝাচ্ছে?
পরদিন অনুষ্ঠানে মায়া একাই অংশ নিল। নীলা রিমির সঙ্গে মঞ্চের পেছনে ব্যস্ত ছিল।
অনুষ্ঠান শেষে মায়া বাড়ি ফেরার সময় শুনতে পেল, কয়েকজন মেয়ে তার সম্পর্কে কথা বলছে।
একজন বলল,
মেয়ে ১: মায়া নাকি নীলার ওপর খুব রাগ করে আছে।
মেয়ে ২: হ্যাঁ, নীলা নাকি রিমির সঙ্গে বেশি মেশে বলে ওর ভালো লাগে না।
মায়া কথাগুলো শুনে থেমে গেল।
তারপর সে দেখল, একটু দূরে নীলা আর রিমি দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
মায়ার মনে হলো, সবাই কি তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে হাসাহাসি করছে?
সে আর দাঁড়াল না। চুপচাপ বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।
সেদিন রাতে নীলা মায়াকে ফোন করল।
নীলা: হ্যালো! কী করছিস?
মায়া: কিছু না।
নীলা: আজকে তুই আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথাই বললি না কেন?
মায়া: তুই তো ব্যস্ত ছিলি।
নীলা: আবার শুরু করলি?
মায়া: নীলা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
নীলা: বল।
মায়া: তুই কি সত্যিই আমাকে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবিস?
নীলা অবাক হয়ে গেল।
নীলা: হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
মায়া: উত্তর দে।
নীলা: অবশ্যই ভাবি।
মায়া: তাহলে আমার কথা অন্যদের কাছে বলিস কেন?
নীলা: কী বলছিস তুই? আমি আবার কী বললাম?
মায়া: থাক, কিছু না।
নীলা: মায়া, পুরো কথা না বলে ফোন রাখবি না। কী হয়েছে আমাকে বল।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
মায়া: আজকে কয়েকজনকে বলতে শুনলাম, আমি নাকি তোর ওপর রাগ করি, তুই রিমির সঙ্গে মিশিস বলে। তুই কি তাদের এসব বলেছিস?
নীলা: না! আমি এমন কিছু বলিনি। তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না?
মায়া: জানি না।
নীলা: মায়া, তুই আমার বন্ধু। তোর কথা নিয়ে আমি অন্যদের কাছে হাসাহাসি করব কেন?
মায়া: তাহলে কে বলেছে?
নীলা: আমি জানি না। কাল স্কুলে গিয়ে কথা বলব।
মায়া: দরকার নেই।
নীলা: কেন?
মায়া: কারণ আমি আর এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।
নীলা ফোন কেটে দিল।
নীলা অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—
যে মেয়েটা একসময় তার প্রতিটি কথা বিশ্বাস করত, সেই মায়া আজ তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না কেন?
আর মায়ার মনে হচ্ছিল—
যে বন্ধুত্বকে সে নিজের সবচেয়ে আপন মনে করেছিল, সেখানে কি সত্যিই সে একা হয়ে যাচ্ছে?
তাদের কেউই জানত না, এই ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝিই সামনে আরও বড় ঝড়ের কারণ হতে চলেছে।
চলবে...
পর্ব ৩: ভুল বোঝাবুঝির দেয়াল।