গল্পের নাম: তুই থাকলেই গল্প জমে!
পর্ব: ৩
শিরোনাম: ভুল বোঝাবুঝির দেয়াল
রাতটা মায়ার একদম ভালো কাটল না। বারবার নীলার সঙ্গে ফোনে হওয়া কথাগুলো মনে পড়ছিল। মেয়েটাকে সে কতটা বিশ্বাস করে, অথচ আজ সেই বিশ্বাসের জায়গাতেই যেন একটা দেয়াল তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে নীলাও ঘুমাতে পারছিল না। সে বারবার ভাবছিল, মায়া কেন তার কথা বিশ্বাস করল না?
পরদিন সকালে নীলা স্কুলে এসে প্রথমেই মায়াকে খুঁজল। কিন্তু মায়া তখন রিমির সঙ্গে কথা বলছিল।
নীলা কাছে এসে বলল,
নীলা: মায়া, তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।
মায়া: এখন আমার সময় নেই।
নীলা: মাত্র দুই মিনিট লাগবে।
মায়া: পরে বলিস।
নীলা: তুই কি ইচ্ছা করে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিস?
মায়া: তোর যা মনে হয় ভাব।
নীলা কিছু বলার আগেই রিমি বলে উঠল,
রিমি: তোমরা আবার ঝগড়া শুরু করেছ?
মায়া: না, আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি।
নীলা: তাহলে আমার সঙ্গে কথা বলছিস না কেন?
মায়া: সব কথার উত্তর দিতে আমার ভালো লাগে না।
এই কথা বলে মায়া ক্লাসে চলে গেল।
নীলা মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
রিমি: নীলা, তুই মন খারাপ করিস না। ওর রাগ কমে গেলে ঠিক হয়ে যাবে।
নীলা: কিন্তু আমি তো কিছু করিনি। তবুও ও আমাকে ভুল বুঝছে।
রিমি: সময় দে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
সেদিন টিফিনের সময় মায়া একা স্কুলের মাঠে বসেছিল। হঠাৎ তার এক সহপাঠী এসে বলল,
সহপাঠী: মায়া, তুই কি জানিস, নীলার নামে একটা কথা ছড়িয়েছে?
মায়া: কী কথা?
সহপাঠী: নীলা নাকি বলেছে, তুই ওর পেছনে পেছনে ঘুরিস আর ওকে অন্য কারও সঙ্গে মিশতে দিস না।
মায়া কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেল।
মায়া: কে বলেছে এসব?
সহপাঠী: আমি ঠিক জানি না। কয়েকজনের মুখে শুনেছি।
মায়া আর কিছু বলল না। তার মনে এবার সত্যিই সন্দেহ তৈরি হলো।
সে ভাবল, নীলা যদি এমন কিছু না বলে থাকে, তাহলে সবাই এসব কথা জানল কীভাবে?
কিছুক্ষণ পর রিমি মাঠে এল।
রিমি: মায়া, এখানে একা বসে আছিস কেন?
মায়া: এমনিই।
রিমি: নীলার সঙ্গে কথা বলেছিস?
মায়া: না।
রিমি: তোদের বন্ধুত্বটা নিয়ে আমার খারাপ লাগে। তোরা দুজন আগে কত ভালো ছিলি!
মায়া: তুই একটা কথা বলবি?
রিমি: বল।
মায়া: নীলা কি আমার সম্পর্কে কারও কাছে খারাপ কিছু বলেছে?
রিমি একটু থেমে বলল,
রিমি: আমি তো এমন কিছু শুনিনি। কে বলেছে তোকে?
মায়া: সবাই বলছে।
রিমি: সবাই যা বলে, সব কি সত্যি হয়?
মায়া কথাটা শুনে চুপ করে গেল।
সেদিন ছুটির পর মায়া বাড়ি না গিয়ে স্কুলের লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ সে শুনতে পেল, রিমি ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে।
রিমি: আরে, আমি তো শুধু একটু বলেছি। ওরা নিজেরাই ঝগড়া করছে। আমি আবার কী করলাম?
মায়া থমকে গেল।
রিমি আবার বলল,
রিমি: নীলা কিছুই বুঝতে পারছে না। আর মায়া তো এমনিতেই অভিমানী। একটু কথা বললেই রাগ করে।
মায়ার বুকটা কেমন করে উঠল। সে বুঝতে পারল, তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে অন্য কেউ কথা বলছে।
কিন্তু রিমি কি সত্যিই তাদের মধ্যে সমস্যা তৈরি করছে?
মায়া কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেল।
বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর নীলাকে ফোন করল।
নীলা ফোন ধরতেই বলল,
নীলা: হ্যালো! মায়া?
মায়া: তোর সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে।
নীলা: বল, আমি শুনছি।
মায়া: তুই কি কখনো আমার সম্পর্কে রিমির কাছে খারাপ কিছু বলেছিস?
নীলা: না তো! কেন?
মায়া: আজকে ওকে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলতে শুনেছি। আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে কথা বলছিল।
নীলা: কী বলছিল?
মায়া: বলছিল, আমরা নাকি নিজেরাই ঝগড়া করছি।
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
নীলা: মায়া, একটা কথা বলি? আমারও কয়েক দিন ধরে রিমির কিছু আচরণ ভালো লাগছে না।
মায়া: কেন?
নীলা: ও মাঝে মাঝে তোর সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলে, যেগুলো শুনে আমার খারাপ লাগে। আবার তোর কাছে এসে বলে, আমি নাকি তোর কথা অন্যদের কাছে বলি।
মায়া: তাহলে আমরা দুজনেই ভুল বুঝেছি?
নীলা: মনে হচ্ছে তাই।
মায়া: কিন্তু তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন?
নীলা: তুই তো আমার সঙ্গে কথাই বলছিলি না!
মায়া একটু চুপ করে থেকে বলল,
মায়া: সরি রে।
নীলা: আমিও সরি। আমারও তোকে আগে সব খুলে বলা উচিত ছিল।
মায়া: তাহলে কাল স্কুলে দেখা করবি?
নীলা: অবশ্যই। তবে একটা কথা আছে।
মায়া: আবার কী?
নীলা: কাল আমার জন্য দুই প্যাকেট চিপস আনবি।
মায়া: কেন?
নীলা: এতদিনের অভিমান ভাঙাতে তো খাওয়াতে হবে!
মায়া: তুই একটা অসভ্য!
নীলা: জানি। তবুও তোর বেস্ট ফ্রেন্ড!
দুজনেই হেসে ফেলল।
পরদিন স্কুলে মায়া আর নীলা একসঙ্গে বসেছিল। অনেক দিন পর তাদের মুখে আবার আগের মতো হাসি দেখা গেল।
কিন্তু রিমি দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।
সে কাছে এসে বলল,
রিমি: কী ব্যাপার? তোদের আবার বন্ধুত্ব হয়ে গেল?
নীলা: আমাদের বন্ধুত্ব তো কখনো শেষ হয়নি।
রিমি: ওহ্, তাই নাকি?
মায়া: হ্যাঁ। আর একটা কথা, আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে আমরা নিজেরাই কথা বলে ঠিক করে নেব। অন্য কারও কথায় আর ভুল বুঝব না।
রিমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
এরপর সে বলল,
রিমি: আমি তোদের বন্ধুত্ব নষ্ট করতে চাইনি।
নীলা: তাহলে আমাদের নিয়ে অন্যদের কাছে কথা বলার দরকার কী ছিল?
রিমি মাথা নিচু করে বলল,
রিমি: আমার ভুল হয়েছে। আসলে তোদের এত ভালো বন্ধুত্ব দেখে মাঝে মাঝে আমার খারাপ লাগত। মনে হতো, তোদের মাঝে আমার কোনো জায়গা নেই। তাই হয়তো এমন করেছি।
মায়া একটু নরম গলায় বলল,
মায়া: বন্ধুত্বে জায়গা তৈরি করতে হয় বিশ্বাস দিয়ে, অন্যের বন্ধুত্ব ভেঙে দিয়ে নয়।
রিমি: সরি।
নীলা: ভুল সবাই করে। কিন্তু একই ভুল বারবার করা ঠিক না।
রিমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সেদিন তিনজনই একসঙ্গে টিফিন খেল। তবে মায়া আর নীলার মধ্যে আগের মতো একটা আলাদা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল।
স্কুল ছুটির পর নীলা মায়াকে বলল,
নীলা: জানিস, কাল রাতে আমি একটা কথা বুঝেছি।
মায়া: কী?
নীলা: বন্ধুত্ব শুধু প্রতিদিন কথা বলার নাম নয়। বন্ধুত্ব মানে ভুল বোঝাবুঝি হলেও একে অপরের কথা শোনার চেষ্টা করা।
মায়া: আর বিশ্বাস করা।
নীলা: একদম!
মায়া হেসে বলল,
মায়া: আচ্ছা, এত জ্ঞান কোথায় পেলি?
নীলা: ইউটিউবে!
মায়া: ধুর! তোর সঙ্গে সিরিয়াস কথা বলাই ভুল!
নীলা: হাহাহা!
দুজন হাসতে হাসতে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।
কিন্তু গল্পের সবচেয়ে কঠিন সময়টা তখনও আসেনি।
কয়েক দিন পর মায়ার পরিবারে এমন একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে, যার কারণে মায়াকে হঠাৎ করেই স্কুল ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হতে পারে।
আর নীলা যখন খবরটা জানবে, তখন সে কী করবে?
বন্ধুত্ব কি দূরত্বের কাছে হেরে যাবে?
নাকি দুজন মিলে সব বাধা পার করবে?
চলবে...
পর্ব ৪: দূরত্বের ওপারে বন্ধুত্ব।