শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৫২তম পর্ব: নীল খামের অচেনা স্বাক্ষর
সকাল থেকেই নীরার মনে অদ্ভুত অস্থিরতা।
গত রাতের ফোনকলের পর থেকে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—১৭ নম্বর লকার থেকে নীল খামটি কে নিয়ে গিয়েছিল?
আর কেনই-বা সেই ব্যক্তি বলেছিল, খামটি যার কাছে পৌঁছানোর কথা, সে এখনো নিজের পরিচয় জানে না?
নীরা অফিসে যাওয়ার আগেই আরিয়ানকে ফোন করল।
—আমরা কখন বের হব?
আরিয়ান বলল,
—রাফি গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে। তুমি তৈরি হয়ে নিচে চলে এসো।
—আবদুল মান্নান কি নিশ্চিতভাবে আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন?
—হ্যাঁ। তবে তিনি বলেছেন, রেজিস্টারটি দেখানোর আগে কিছু কথা বলতে চান।
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আশা করি এবার অন্তত একটা রহস্যের সমাধান হবে।
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—সব রহস্য একদিনে শেষ হবে না। তবে এবার আমরা আগের চেয়ে অনেকটা এগিয়েছি।
১. পুরোনো ব্যাংকের সাক্ষী
আবদুল মান্নান শহরের একটি পুরোনো বাসায় থাকতেন। বয়সের ভারে তাঁর চলাফেরা কিছুটা ধীর হয়ে এসেছে।
তাঁদের দেখে তিনি বসার ঘরে নিয়ে গেলেন।
—তোমরাই নীরা আর আরিয়ান?
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—জি। আপনার সঙ্গে ১৭ নম্বর লকারের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।
মান্নান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—অনেক বছর আগের ঘটনা। সবকিছু পরিষ্কার মনে নেই। তবে সেদিনের দৃশ্যটা ভুলিনি।
নীরা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি প্রতিনিধির মুখ মনে করতে পেরেছেন?
—মুখটা অস্পষ্ট। কিন্তু তাঁর হাতে একটা পুরোনো চামড়ার ফাইল ছিল। আর তিনি খুব সাবধানে কাগজগুলো দেখছিলেন।
—কোনো নাম বলেছিলেন?
—না। শুধু বলেছিলেন, তিনি অনুমোদিত প্রতিনিধি।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—তাহলে আপনি তাঁর পরিচয় যাচাই করেছিলেন কীভাবে?
মান্নান সাহেব একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—তখন আমাদের কাছে একটি সিল করা অনুমতিপত্র ছিল। সেটি দেখে লকার খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে বুঝেছিলাম, পরিচয় যাচাইয়ের নিয়মগুলো যথেষ্ট কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
নীরা বলল,
—আপনার কাছে কি সেই দিনের দর্শনার্থী রেজিস্টার আছে?
মান্নান সাহেব উঠে পাশের ঘরে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর একটি পুরোনো রেজিস্টার নিয়ে ফিরে এলেন।
২. অচেনা স্বাক্ষর
রেজিস্টারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে তিনি একটি নির্দিষ্ট তারিখে থামলেন।
—এই যে। সেদিনের এন্ট্রি।
নীরা আরিয়ানকে নিয়ে কাগজের দিকে তাকাল।
সেখানে লেখা—
তারিখ: ১২ সেপ্টেম্বর
লকার নম্বর: ১৭
প্রবেশের কারণ: অনুমোদিত নথি সংগ্রহ
প্রতিনিধির কোড: T-03
স্বাক্ষরের জায়গায় একটি নাম লেখা ছিল।
“এ. রহমান”
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—এ. রহমান?
আরিয়ানও নামটির দিকে তাকিয়ে রইল।
—রহমান পদবি তো আমাদের পরিবারের অনেকেরই।
মান্নান সাহেব বললেন,
—আমি তখন নামটির অর্থ বুঝিনি। পরে যখন পুরোনো কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করল, তখন রেজিস্টারটি আলাদা করে রেখেছিলাম।
নীরা স্বাক্ষরটি ভালো করে দেখল।
—এটা কি কারও পরিচিত স্বাক্ষরের সঙ্গে মেলে?
আরিয়ান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—আমাদের পরিবারের পুরোনো নথিতে এমন কয়েকজনের নাম আছে, যাঁদের নামের আদ্যক্ষর এ. রহমান হতে পারে।
নীরা বলল,
—তাহলে আমাদের সব পুরোনো স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখতে হবে।
৩. বাবার স্মৃতি
বাড়িতে ফিরে নীরা রাশেদকে রেজিস্টারের ছবিটি দেখাল।
রাশেদ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—এ. রহমান নামটা আমার পরিচিত মনে হচ্ছে। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছি না।
মাহমুদ পাশে বসে বললেন,
—আজিজুর রহমানের নামও তো এভাবে লেখা যায়।
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—কিন্তু বাবা তখন বেঁচে ছিলেন না। তাঁর মৃত্যুর পরই তো লকারের দায়িত্ব হস্তান্তর হয়েছিল।
নীরা বলল,
—তাহলে অন্য কেউ?
মাহমুদ ধীরে বললেন,
—আজহার রহমানের নামও হতে পারে। তবে তিনিও তখন আর বেঁচে ছিলেন না।
আরিয়ান বলল,
—একটা বিষয় খেয়াল করেছ? স্বাক্ষরটি পুরো নাম নয়। শুধু আদ্যক্ষর আর পদবি।
ইমরান এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। এবার সে বলল,
—এটা ইচ্ছাকৃতও হতে পারে। কেউ নিজের পরিচয় আড়াল করতে চাইলে এমন স্বাক্ষর ব্যবহার করতে পারে। আবার এটি কোনো দাপ্তরিক সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষরও হতে পারে।
নীরা বলল,
—অনুমান করে কাউকে দোষী করা যাবে না। আমাদের আসল নথি দরকার।
৪. পুরোনো নথির তুলনা
সেদিন সন্ধ্যায় সবাই মিলে পুরোনো কাগজপত্র পরীক্ষা করতে বসল।
জয়নাল আবেদিনের দেওয়া হিসাবের খাতা, আজিজুর রহমানের চিঠি, সালেহের অনুমতিপত্র—সবকিছু একসঙ্গে রাখা হলো।
আরিয়ান তিনটি স্বাক্ষরের ছবি পাশাপাশি রাখল।
প্রথমটি আজিজুর রহমানের।
দ্বিতীয়টি আজহার রহমানের।
তৃতীয়টি ১৭ নম্বর লকারের দর্শনার্থী রেজিস্টারের।
নীরা মনোযোগ দিয়ে দেখল।
—তিনটির লেখার ধরন আলাদা। কিন্তু শুধু ছবি দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
ইমরান বলল,
—ঠিক। স্বাক্ষর বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
মাহমুদ সম্মতি জানালেন।
—আর ব্যাংকের মূল রেজিস্টারও আবার পরীক্ষা করতে হবে। ছবির ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
ঠিক তখনই রাফি একটি ফোন নিয়ে ঘরে ঢুকল।
—স্যার, মান্নান সাহেব আবার ফোন করেছিলেন।
আরিয়ান ফোনটি হাতে নিল।
—কী বলেছেন?
রাফি উত্তর দিল,
—তিনি নাকি রেজিস্টারের শেষ পাতায় আরও একটি তথ্য পেয়েছেন। আমাদের জরুরি ভিত্তিতে জানাতে বলেছেন।
৫. শেষ পাতার নোট
আরিয়ান ফোনটি স্পিকারে দিল।
মান্নান সাহেব বললেন,
—আমি রেজিস্টারের শেষ পাতাটি আবার দেখছিলাম। সেখানে একটা ছোট নোট আছে। আগে খেয়াল করিনি।
নীরা দ্রুত বলল,
—কী লেখা আছে?
—লেখা আছে, “প্রতিনিধি নথি গ্রহণ করেছেন, তবে দ্বিতীয় সাক্ষীর উপস্থিতিতে।”
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—দ্বিতীয় সাক্ষী কে ছিলেন?
—সেখানেই সমস্যা। নামের জায়গায় শুধু একটি পদ লেখা আছে।
—কী পদ?
মান্নান সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,
—“ট্রাস্টের হিসাব-পর্যবেক্ষক।”
ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।
নীরা বলল,
—হিসাব-পর্যবেক্ষক? এই পদে কে ছিলেন, সেটা কি জানা সম্ভব?
—পুরোনো কর্মচারী তালিকা পাওয়া গেলে সম্ভব। তবে আমার কাছে সেই তালিকা নেই।
ইমরান হঠাৎ বলে উঠল,
—জয়নাল আবেদিনের কাছে থাকতে পারে। তিনি তো হিসাব যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে কালই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করব।
৬. নীল খামের আসল উদ্দেশ্য
রাত বাড়তে থাকল।
সবাই চলে যাওয়ার পর নীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়ান এসে তার পাশে দাঁড়াল।
—কী ভাবছ?
নীরা বলল,
—একটা খাম, একটা স্বাক্ষর, আর একজন অজানা সাক্ষী। এত বছর ধরে কত মানুষ এই কাগজগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে!
আরিয়ান শান্তভাবে বলল,
—তবু একটা ভালো দিক আছে। এখন আর আমরা অন্ধকারে নেই। প্রতিটি নথি আমাদের নতুন তথ্য দিচ্ছে।
নীরা মৃদু স্বরে বলল,
—তুমি না থাকলে হয়তো এত দূর আসতে পারতাম না।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তুমি নিজেই এত দূর এসেছ, নীরা। আমি শুধু তোমার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।
নীরা আর কিছু বলল না।
তার মনে হচ্ছিল, সত্যের সন্ধানে এগোতে গিয়ে সে শুধু পুরোনো রহস্যই খুঁজে পাচ্ছে না, নিজের চারপাশের মানুষগুলোকেও নতুন করে চিনছে।
৭. নতুন নথির সন্ধান
পরদিন সকালে জয়নাল আবেদিনের কাছ থেকে একটি ইমেইল এল।
ইমেইলের সঙ্গে একটি পুরোনো কর্মচারী তালিকা সংযুক্ত ছিল।
আরিয়ান, নীরা ও ইমরান একসঙ্গে তালিকাটি খুলল।
সেখানে ট্রাস্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নামের পাশে একটি আলাদা বিভাগ ছিল।
হিসাব-পর্যবেক্ষক — বিশেষ দায়িত্ব।
নামটি দেখে নীরা স্থির হয়ে গেল।
সেখানে লেখা—
“এ. রহমান — পারিবারিক ট্রাস্টের বাইরের নিরীক্ষক।”
আরও নিচে একটি নোট ছিল—
“এই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি পরিবারের কোনো সদস্য নন। তাঁর পরিচয় শুধু ট্রাস্টের মূল রেজিস্টারে সংরক্ষিত থাকবে।”
নীরা ধীরে বলল,
—তাহলে এ. রহমান পদবির মানুষটি পরিবারের কেউ নাও হতে পারেন!
ইমরান বলল,
—ঠিক তাই। রহমান পদবি থাকলেই তিনি রহমান পরিবারের সদস্য, এমন নয়।
আরিয়ান তালিকার নিচের অংশে চোখ রাখল।
সেখানে একটি রেফারেন্স নম্বর লেখা ছিল—
TR-17/02
তার পাশে উল্লেখ করা হয়েছিল—
“মূল পরিচয় যাচাইয়ের জন্য দ্বিতীয় খাতা খুলতে হবে।”
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—দ্বিতীয় খাতা কোথায়?
আরিয়ান জয়নালকে ফোন করল।
জয়নাল বললেন,
—দ্বিতীয় খাতার কথা আমি জানি। কিন্তু সেটি আমার কাছে নেই। আজিজুর রহমান নিজেই সেটি অন্য একজনের কাছে রেখেছিলেন।
—কার কাছে?
জয়নাল কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
—যাঁর নাম তোমরা এত দিন ধরে খুঁজছ, তাঁর কাছেই। তবে তিনি নীল খামের প্রতিনিধি নন। তিনি সেই প্রতিনিধির পরিচয় জানতেন।
নীরা আরিয়ানের দিকে তাকাল।
রহস্যের পর্দা আরও এক ধাপ সরে গেল।
কিন্তু এবার প্রশ্ন শুধু একজন অচেনা প্রতিনিধিকে নিয়ে নয়।
প্রশ্ন হলো—যিনি তাঁর পরিচয় জানতেন, তিনি এত বছর ধরে কেন নীরব ছিলেন?
চলবে…