শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৫৩তম পর্ব: দ্বিতীয় খাতার রক্ষক
জয়নাল আবেদিনের শেষ কথাগুলো শোনার পর ঘরের পরিবেশ বদলে গেল।
এত দিন তাঁরা খুঁজছিলেন নীল খামের প্রতিনিধি কে ছিলেন। অথচ এখন জানা যাচ্ছে, এমন একজন মানুষ আছেন, যিনি সেই প্রতিনিধির পরিচয় জানতেন।
কিন্তু তিনি কে?
আর এত বছর ধরে কেন চুপ করে ছিলেন?
নীরা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমাদের কি আবার জয়নাল সাহেবের সঙ্গে দেখা করা উচিত?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—অবশ্যই। তবে এবার তাঁকে জিজ্ঞেস করতে হবে, দ্বিতীয় খাতার রক্ষকের নাম তিনি জানেন কি না।
ইমরান বলল,
—জয়নাল সাহেব হয়তো জানেন, কিন্তু এত দিন বলেননি। কারণ থাকতে পারে।
মাহমুদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
—কারণ যা-ই হোক, এবার সত্যটা জানা প্রয়োজন।
১. জয়নালের নতুন তথ্য
পরদিন সকালে তাঁরা জয়নাল আবেদিনের বাড়িতে গেলেন।
জয়নাল তাঁদের দেখে বললেন,
—আমি জানতাম, তোমরা আবার আসবে।
আরিয়ান সরাসরি প্রশ্ন করল,
—দ্বিতীয় খাতাটি কার কাছে রাখা হয়েছিল?
জয়নাল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—আজিজুর রহমান খাতাটি একজনের কাছে দিয়েছিলেন। তিনি পরিবারের সদস্য ছিলেন না, কিন্তু পরিবারের অনেক গোপন নথির দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—নামটা কী?
জয়নাল বললেন,
—তাঁর নাম ছিল মতিউর রহমান।
নীরা নামটি মনে করার চেষ্টা করল।
—এই নাম তো আগে কখনো শুনিনি।
জয়নাল বললেন,
—শোনার কথাও নয়। তিনি মূলত ট্রাস্টের বাইরের নিরীক্ষক ছিলেন। পরিবারের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে তাঁর কোনো ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু হিসাবের গরমিল এবং নথির সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব তাঁর ছিল।
ইমরান প্রশ্ন করল,
—তিনি এখন কোথায়?
জয়নাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—অনেক বছর আগে তিনি কাজ ছেড়ে চলে যান। তবে যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিলেন, দ্বিতীয় খাতাটি কখনো কারও হাতে তুলে দিতে হলে আগে তার উদ্দেশ্য বুঝে নিতে।
২. পুরোনো ঠিকানা
জয়নাল একটি ছোট কাগজ বের করলেন।
সেখানে একটি ঠিকানা লেখা।
মতিউর রহমান
পুরোনো ডাকঘর সড়ক, নারায়ণগঞ্জ।
আরিয়ান কাগজটি হাতে নিয়ে বলল,
—এই ঠিকানায় তিনি এখনো থাকেন কি না, সেটা জানতে হবে।
জয়নাল বললেন,
—আমি নিশ্চিত নই। তবে তাঁর এক আত্মীয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—আপনি আগে আমাদের বলেননি কেন?
জয়নাল শান্ত গলায় বললেন,
—কারণ আমি নিজেও নিশ্চিত ছিলাম না, তিনি এখনো বেঁচে আছেন কি না। আর এত বছর পর কাউকে খুঁজে বের করার আগে তোমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ থাকা দরকার ছিল।
মাহমুদ বললেন,
—আপনি কি জানতেন, দ্বিতীয় খাতায় কী লেখা আছে?
—পুরোটা নয়। শুধু জানতাম, সেখানে আর্থিক হিসাবের পাশাপাশি কিছু নথি গ্রহণের তারিখ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিচয় লেখা ছিল।
নীরা বলল,
—তাহলে ওই খাতাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় সূত্র।
৩. নারায়ণগঞ্জের পথে
পরদিন সকালে নীরা, আরিয়ান, মাহমুদ ও ইমরান নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দিল।
গাড়ির ভেতর নীরা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
আরিয়ান পাশে বসে বলল,
—কী হয়েছে?
—ভাবছি, এত বছর ধরে সবাই একটা সত্য লুকিয়ে রেখেছিল কেন?
—সবাই একই কারণে চুপ ছিল না। কেউ ভয় পেয়েছে, কেউ নিজের ভুল ঢাকতে চেয়েছে, আবার কেউ হয়তো ভেবেছে সত্য প্রকাশ করলে আরও ক্ষতি হবে।
নীরা বলল,
—কিন্তু চুপ থাকার কারণে নির্দোষ মানুষও কষ্ট পেয়েছে।
আরিয়ান তার কথার সঙ্গে একমত হলো।
—সেটাই সবচেয়ে বড় অন্যায়।
কিছুক্ষণ পর নীরা বলল,
—একটা কথা বলব?
—বলো।
—তুমি সব সময় আমার পাশে থেকেছ। কিন্তু কখনো কখনো ভয় হয়, এই রহস্যের কারণে আমাদের সম্পর্কের ওপর চাপ পড়বে না তো?
আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—সত্য জানার পথ কঠিন হতে পারে। কিন্তু আমি চাই না কোনো ভুল বোঝাবুঝি আমাদের সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করুক। আমরা যা-ই জানি, প্রমাণ দেখে সিদ্ধান্ত নেব।
নীরা আর কোনো কথা বলল না। তবে তার মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এল।
৪. মতিউর রহমানের বাড়ি
পুরোনো ঠিকানায় পৌঁছে তাঁরা একটি একতলা বাড়ি দেখতে পেলেন।
বাড়িটির দরজায় কড়া নাড়তেই একজন মধ্যবয়সী নারী বেরিয়ে এলেন।
আরিয়ান পরিচয় দিয়ে বলল,
—আমরা মতিউর রহমান সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
নারীটি তাঁদের কিছুক্ষণ দেখে বললেন,
—আপনারা কি পুরোনো রহমান কোম্পানির ব্যাপারে এসেছেন?
মাহমুদ অবাক হলেন।
—আপনি কীভাবে বুঝলেন?
—বাবা অনেক বছর ধরে ওই কোম্পানির কিছু কাগজ নিজের কাছে রেখেছেন। মাঝে মাঝে সেগুলো নিয়ে কথা বলেন।
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—তিনি কি বাড়িতে আছেন?
—আছেন। তবে শরীর ভালো নেই। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন।
কিছুক্ষণ পর একজন বয়স্ক মানুষ ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করলেন।
তাঁর হাতে একটি লাঠি।
তিনি মাহমুদকে দেখে থমকে গেলেন।
—মাহমুদ সাহেব?
মাহমুদ উঠে দাঁড়ালেন।
—আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
মতিউর মৃদু হাসলেন।
—আপনাকে ভুলব কীভাবে? এত বছর পর দেখা হলো!
৫. দ্বিতীয় খাতার কথা
সবাই বসার পর মতিউর রহমান বললেন,
—আমি জানতাম, একদিন কেউ না কেউ এই খাতার খোঁজে আসবে।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—খাতাটি কি আপনার কাছে আছে?
মতিউর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আছে। কিন্তু সেটি দেখানোর আগে তোমাদের একটা বিষয় বুঝতে হবে।
আরিয়ান বলল,
—কী বিষয়?
—এই খাতায় যাদের নাম আছে, তাদের সবাই অপরাধী নয়। কেউ দায়িত্ব পালন করেছে, কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, আবার কেউ নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অন্যের নির্দেশে কাজ করেছে।
ইমরান বলল,
—আমরা কাউকে প্রমাণ ছাড়া দোষী করতে চাই না।
মতিউর মাথা নাড়লেন।
—ভালো। কারণ এই খাতায় এমন একজনের নাম আছে, যাঁকে তোমরা এত দিন ভুলভাবে সন্দেহ করে এসেছ।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—কে তিনি?
মতিউর উত্তর না দিয়ে পাশের ঘরে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর একটি পুরোনো কাঠের বাক্স নিয়ে ফিরে এলেন।
বাক্সটি খুলে ভেতর থেকে একটি মোটা খাতা বের করলেন।
খাতার মলাটে লেখা—
“Rahman Family Trust — Secondary Register”
নীরার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
এটাই সেই দ্বিতীয় খাতা!
৬. অজানা দায়িত্বের তালিকা
মতিউর খাতাটি খুলে কয়েকটি পাতা উল্টালেন।
প্রথম পাতায় বিভিন্ন তারিখ ও নথির নম্বর লেখা।
তারপর একটি পাতায় এসে থামলেন।
সেখানে তিনটি কলাম ছিল—
১. নথি গ্রহণকারী
২. নথি যাচাইকারী
৩. চূড়ান্ত সংরক্ষক
নীরা নামগুলো পড়তে শুরু করল।
নথি গ্রহণকারী হিসেবে জহির উদ্দিনের নাম।
যাচাইকারী হিসেবে মিজানুর রহমানের নাম।
কিন্তু চূড়ান্ত সংরক্ষকের জায়গায় লেখা—
“T-03 — পরিচয় গোপন থাকবে।”
আর নিচে একটি মন্তব্য—
“এই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশের আগে ১৭ নম্বর লকারের নীল খামের নথি যাচাই করতে হবে।”
আরিয়ান বলল,
—তাহলে নীল খাম আর দ্বিতীয় খাতা একই পরিকল্পনার অংশ ছিল।
মতিউর বললেন,
—ঠিক তাই। তবে খাতাটি আমি তৈরি করিনি। আজিজুর রহমানের নির্দেশে হিসাবের তথ্যগুলো এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—T-03 কি নীল খামের প্রতিনিধি?
মতিউর মাথা নাড়লেন।
—না। T-03 ছিল চূড়ান্ত সংরক্ষকের কোড। নীল খাম সংগ্রহকারী আর খাতার চূড়ান্ত সংরক্ষক একই ব্যক্তি কি না, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না।
৭. শেষ পাতার লেখা
খাতার শেষের দিকে একটি পাতায় আলাদা করে কিছু লেখা ছিল।
মতিউর বললেন,
—এই পাতাটি আজিজুর রহমান নিজে লিখেছিলেন। আমি শুধু খাতার সঙ্গে রেখে দিয়েছিলাম।
মাহমুদ কাগজটি হাতে নিলেন।
সেখানে লেখা—
“যে ব্যক্তি সত্য সংরক্ষণের দায়িত্ব নেবে, তাকে পরিবারের পক্ষ বা বিপক্ষ হতে হবে না। তার দায়িত্ব হবে শুধু নথির সত্যতা রক্ষা করা।
কেউ যদি নিজের স্বার্থে এই দায়িত্ব ব্যবহার করে, তবে তার পরিচয় প্রকাশ করা হবে।
কিন্তু তার আগে একটি বিষয় যাচাই করতে হবে—১৭ নম্বর লকার থেকে নেওয়া নীল খামের মূল কাগজটি কোথায় আছে।”
নীরা বলল,
—তাহলে এত দিন আমরা শুধু নীল খামের প্রতিনিধির স্বাক্ষর খুঁজেছি। কিন্তু আসল কাগজটাই তো পাইনি!
মতিউর ধীরে মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। কারণ নীল খামের কাগজটি আমার কাছে আসেনি।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—তাহলে কার কাছে গিয়েছিল?
মতিউর কিছুক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—আজিজুর রহমান আমাকে বলেছিলেন, নীল খামের কাগজটি এমন একজনের কাছে রাখা হয়েছে, যিনি এই পরিবারের নন, আবার পরিবারের বাইরেও নন।
নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,
—এমন মানুষ আবার কে?
মতিউর খাতার ভেতর থেকে একটি ছোট কাগজ বের করলেন।
সেখানে একটি নাম লেখা ছিল।
“সামিরা বেগম।”
নীরা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
তার খালা সামিরা?
যিনি এত দিন ধরে নীরার পাশে ছিলেন, যিনি পুরোনো কিছু কাগজ হারিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন—তাঁর কাছেই কি নীল খামের আসল কাগজ রাখা হয়েছিল?
নীরা কাঁপা গলায় বলল,
—আপনি কি নিশ্চিত, নামটি আমার খালার?
মতিউর উত্তর দিলেন,
—আমি শুধু নামটি জানি। তিনি কাগজটি পেয়েছিলেন কি না, সেটা জানি না।
আরিয়ান নীরার দিকে তাকাল।
—আমাদের সামিরা খালার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
নীরা কিছু বলল না।
তার চোখ আটকে রইল সেই ছোট কাগজের ওপর।
এত দিনের রহস্যের সূত্র এবার এসে পৌঁছেছে তার নিজের পরিবারের দরজায়।
চলবে…