ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 60

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

৬০তম পর্ব: মৃত মানুষের স্বাক্ষর

রাত তখন প্রায় দশটা।

আরিয়ানের অফিসের কনফারেন্স রুমে সবাই বসে আছে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে পুরোনো চিঠি, রসিদ, R-21 রেজিস্টারের কপি এবং C-14-এর ছবিগুলো।

নীরা বারবার একটি নামের দিকে তাকাচ্ছে।

আজহার রহমান।

যে মানুষটি বহু বছর আগে মারা গেছেন, তাঁর দায়িত্বের কোড ব্যবহার করে এত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিল!

নীরা বলল,

—আমার একটা প্রশ্ন আছে। আজহার চাচা যদি মারা যাওয়ার আগেই এই নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পরও D-02 কোড ব্যবহার করা হলো কীভাবে?

আরিয়ান উত্তর দিল,

—সেটা জানতে হলে তাঁর মৃত্যুর পর দায়িত্বটি কার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, তা খুঁজতে হবে।

ইমরান বলল,

—আমার মনে হয়, পুরোনো কর্মীদের তালিকা দিয়ে শুরু করা উচিত।

১. দায়িত্ব হস্তান্তরের তালিকা

পরদিন সকালে রাফি পুরোনো অফিসের সংরক্ষিত কর্মী তালিকা নিয়ে এল।

তালিকাটি ২০০৮ সালের শেষ দিকের।

সেখানে দেখা গেল—

D-02 — Special Document Authorization
মূল দায়িত্ব: আজহার রহমান
পরবর্তী দায়িত্ব: সাময়িকভাবে স্থগিত
হস্তান্তরের অনুমোদন: ট্রাস্ট বোর্ড

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—এখানে তো কারও নাম নেই!

রাফি বলল,

—জি। আজহার রহমানের মৃত্যুর পর দায়িত্বটি আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দেওয়া হয়নি।

আরিয়ান কাগজটি ভালো করে দেখল।

—তাহলে D-02 কোড ব্যবহার করে নির্দেশনা পাঠানোর অনুমতি কারও ছিল না।

মাহমুদ এতক্ষণ চুপ ছিলেন।

তিনি এবার বললেন,

—আজহার চাচা জীবিত থাকতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাছে রাখতেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেসব দায়িত্ব নিয়ে পরিবারের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম না, এই কোডের ব্যবহার বন্ধ হয়নি।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—আপনি কি জানেন, সেই সময় ট্রাস্ট বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন?

মাহমুদ মাথা নাড়লেন।

—কয়েকজনের নাম মনে আছে। তবে সম্পূর্ণ তালিকা পুরোনো অফিসেই থাকার কথা।

২. পুরোনো বোর্ডের সদস্য

সেদিন দুপুরে তাঁরা পুরোনো অফিসের আর্কাইভে গেলেন।

দায়িত্বে থাকা কর্মী তাঁদের প্রয়োজনীয় অনুমতি যাচাই করে একটি মোটা ফাইল বের করে দিলেন।

ফাইলের নাম—

Rahman Family Trust — Board Members, 2008

নীরা একে একে নামগুলো পড়তে লাগল।

১. আজহার রহমান
২. মাহমুদ রহমান
৩. সালেহ রহমান
৪. রওশন আরা রহমান
৫. জহির উদ্দিন — অস্থায়ী নথি-পর্যবেক্ষক

নীরা থেমে গেল।

—জহির চাচা!

আরিয়ান বলল,

—তাঁর নাম এখানে আছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তিনিই নির্দেশনা পাঠিয়েছিলেন। দায়িত্ব আর অনুমতি এক বিষয় নয়।

ইমরান তালিকার নিচের অংশে চোখ রাখল।

সেখানে একটি ছোট মন্তব্য ছিল—

“আজহার রহমানের মৃত্যুর পর D-02 সংক্রান্ত সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। নতুন অনুমোদন ছাড়া কোনো নির্দেশনা কার্যকর করা যাবে না।”

নীরা বলল,

—তাহলে ২১ সেপ্টেম্বরের চিঠিটি নিয়ম অনুযায়ী পাঠানোর কথা নয়।

মাহমুদ গম্ভীর হয়ে বললেন,

—ঠিক তাই।

৩. জহিরের স্বীকারোক্তি

সন্ধ্যায় জহির উদ্দিনকে আবার ডাকা হলো।

নীরা তাঁর সামনে D-02-এর তালিকাটি রাখল।

—চাচা, আপনি কি জানতেন আজহার রহমানের মৃত্যুর পর D-02 কোড স্থগিত ছিল?

জহির কাগজটি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—জানতাম।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—তাহলে ২১ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনাটি আপনার কাছে কীভাবে এসেছিল?

জহির কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

—একটি খামের মধ্যে পেয়েছিলাম। খামের ওপর আমার নাম লেখা ছিল। ভেতরে নির্দেশনা আর C-14-এর দ্বিতীয় কপি ছিল।

—প্রেরকের নাম ছিল?

—না। শুধু D-02-এর সিল ছিল।

নীরা বলল,

—আপনি কি বুঝতে পারেননি যে কোডটি স্থগিত?

জহির মাথা নিচু করলেন।

—বুঝেছিলাম। তাই আমি নির্দেশনাটি সরাসরি কার্যকর করিনি। যাচাইয়ের জন্য আলাদা করে রেখেছিলাম। কিন্তু তখন আমার উচিত ছিল ট্রাস্ট বোর্ডকে জানানো। আমি তা করিনি।

আরিয়ান বলল,

—কেন?

জহির উত্তর দিলেন,

—আমি ভয় পেয়েছিলাম। কারণ ওই কাগজে এমন কিছু তথ্য ছিল, যা প্রকাশ হলে পুরোনো ব্যবসার অনেক মানুষের নাম সামনে চলে আসত।

৪. খামের ভেতরের চিহ্ন

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—খামটি কি আপনার কাছে আছে?

জহির বললেন,

—পুরোনো ফাইলের সঙ্গে থাকার কথা।

তিনি পরদিন সকালে খামটি নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিলেন।

পরদিন সকালেই জহির একটি বাদামি খাম নিয়ে হাজির হলেন।

খামের ওপর কোনো প্রেরকের নাম নেই। শুধু লেখা—

“C-14 — দ্বিতীয় যাচাইয়ের জন্য।”

খামটি খুলে একটি ছোট কাগজ বের করা হলো।

সেখানে লেখা—

“প্রথম কপির সঙ্গে দ্বিতীয় কপির অমিল পাওয়া গেছে। মূল নথি যাচাই না করে কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা যাবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেন নথিটি নিরাপদে রাখেন।”

নিচে D-02-এর সিল।

কিন্তু এবার নীরার চোখ পড়ল খামের এক কোণে থাকা ছোট্ট দাগের দিকে।

সেটি দেখতে পুরোনো ট্রাস্টের সিলের মতো।

মাহমুদ কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন,

—এই সিলটা আজহার চাচার ব্যক্তিগত সিল নয়। এটা ট্রাস্ট অফিসের গ্রহণ সিল।

আরিয়ান বলল,

—তাহলে খামটি ট্রাস্ট অফিসের ভেতর থেকেই পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।

৫. নতুন নাম

জহির খামের পেছনের অংশটি দেখালেন।

সেখানে খুব ছোট করে একটি গ্রহণ নম্বর লেখা ছিল—

TR-21/09

ইমরান বলল,

—TR মানে Trust Register হতে পারে।

রাফি দ্রুত পুরোনো রেজিস্টারের তালিকা খুঁজতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর সে একটি তথ্য পেল।

—স্যার, TR-21/09 নম্বরের একটি রেকর্ড আছে। এটি ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ট্রাস্ট অফিসে জমা পড়েছিল।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—কে জমা দিয়েছিল?

রাফি পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—রেকর্ডে জমাদানকারীর নাম লেখা আছে সালেহ রহমান।

ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।

সালেহ রহমান!

যিনি এত দিন ধরে ট্রাস্টের কিছু নথি নিজের কাছে রেখেছিলেন এবং বলেছিলেন, তিনি শুধু আজহার রহমানের দায়িত্ব রক্ষা করছিলেন।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—সালেহ চাচার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

নীরা বলল,

—তিনি কি জানতেন D-02 কোড স্থগিত ছিল?

মাহমুদ উত্তর দিলেন না।

কারণ প্রশ্নটির উত্তর এখনো কারও জানা নেই।

৬. সালেহর ফোন

আরিয়ান সালেহ রহমানকে ফোন করল।

—চাচা, ২০০৮ সালের TR-21/09 নম্বরের একটি রেকর্ড পেয়েছি। সেখানে আপনার নাম আছে।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর সালেহ বললেন,

—তোমরা অবশেষে সেই রেকর্ড খুঁজে পেয়েছ?

নীরা ফোনের কাছে এগিয়ে এল।

—আপনি কি জানতেন, D-02 কোড ব্যবহার করে C-14-এর নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিল?

সালেহ ধীরে উত্তর দিলেন,

—আমি খামটি জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু নির্দেশনাটি আমি লিখিনি।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—তাহলে কে লিখেছিল?

সালেহ বললেন,

—সেটা জানার জন্য তোমাদের একটি জিনিস দেখতে হবে। আজহার ভাইয়ের মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে একটি আলাদা তালিকা দিয়েছিলেন। সেখানে D-02-এর প্রকৃত ব্যবহারকারীর নাম লেখা ছিল।

নীরা বিস্ময়ে বলল,

—আপনার কাছে সেই তালিকা আছে?

—আছে। কিন্তু তালিকাটি দেখার আগে তোমাদের একটি বিষয় জানা দরকার।

আরিয়ান বলল,

—কী বিষয়?

সালেহর কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।

—আজহার ভাইয়ের মৃত্যুর পর D-02 কোডটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার আগে একটি শেষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। আর সেই অনুমোদনের তারিখ ছিল—

তিনি কয়েক সেকেন্ড থামলেন।

—১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮।

নীরা আরিয়ানের দিকে তাকাল।

১৮ সেপ্টেম্বর!

যেদিন R-21 নথিটি দ্বিতীয় সাক্ষীর স্বাক্ষরের জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছিল।

তাহলে কি এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে?

সালেহ বললেন,

—কাল সকালে আমার বাড়িতে এসো। তোমাদের সেই তালিকাটি দেখাব।

ফোন কেটে গেল।

নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

এত দিনের রহস্যে এবার আরেকটি তারিখ যুক্ত হলো।

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮।

যে দিন একটি নথি অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিল, সেই দিনই D-02-এর শেষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু অনুমোদনটি কে দিয়েছিল?

আর কেন সেই নাম এত বছর ধরে আড়াল করে রাখা হয়েছিল?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 60 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন