ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 61

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

৬১তম পর্ব: শেষ অনুমোদনের গোপন নাম

সকালের আলো ফুটতেই নীরা তৈরি হয়ে গেল।

আজ সালেহ রহমানের বাড়িতে যাওয়ার কথা। তাঁর কাছে থাকা তালিকাটি হয়তো এত দিনের রহস্যের নতুন কোনো দরজা খুলে দেবে।

আরিয়ান গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

নীরাকে দেখে বলল,

—সব কাগজপত্র নিয়েছ?

—হ্যাঁ। R-21-এর কপি, C-14-এর রসিদ আর জহির চাচার দেওয়া চিঠি—সব আছে।

—তাহলে চলো।

গাড়ি চলতে শুরু করল। নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার মনে একটাই প্রশ্ন—

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ তারিখে কে শেষ অনুমোদন দিয়েছিল?

১. সালেহর বাড়িতে

সালেহ রহমান তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

সবাই বসার পর তিনি একটি পুরোনো কাঠের বাক্স সামনে আনলেন।

—এই বাক্সে আজহার ভাইয়ের দেওয়া কিছু কাগজ আছে। এত বছর ধরে এগুলো কাউকে দেখাইনি।

নীরা বলল,

—আপনি কি আমাদের এত দিন এগুলো দেখাতে চাননি?

সালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—আমি ভয় পেয়েছিলাম, অসম্পূর্ণ তথ্য দেখে তোমরা ভুল মানুষকে সন্দেহ করবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, চুপ থাকাটাও ঠিক হয়নি।

তিনি বাক্স খুলে একটি পাতলা ফাইল বের করলেন।

ফাইলের প্রথম পাতায় লেখা—

D-02 — Final Authorization Record

আরিয়ান পাতাটি হাতে নিল।

—এটাই কি সেই তালিকা?

—হ্যাঁ। তবে এটা শুধু অনুমোদনের তালিকা নয়। এখানে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগের শেষ কয়েকটি সিদ্ধান্তও লেখা আছে।

২. যে নামটি মুছে দেওয়া হয়েছিল

নীরা পাতাটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল।

প্রথমে আজহার রহমানের নাম। এরপর দায়িত্ব স্থগিতের নির্দেশ।

কিন্তু পরের লাইনে লেখা ছিল—

“১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ — বিশেষ অনুমোদন প্রদান করা হলো।”

অনুমোদনকারীর নামের জায়গায় কালো কালি দিয়ে একটি অংশ ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—নামটা মুছে ফেলা হয়েছে!

সালেহ মাথা নাড়লেন।

—আমি যখন কাগজটি পেয়েছিলাম, তখনই এমন ছিল।

ইমরান বলল,

—কিন্তু কালি দিয়ে ঢেকে রাখা অংশের নিচে কিছু লেখা আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করা সম্ভব।

আরিয়ান বলল,

—মূল কাগজটি সংরক্ষণ করে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো উচিত। নিজেরা কোনো পরিবর্তন করব না।

সালেহ ফাইলের ভেতর থেকে আরেকটি কাগজ বের করলেন।

—এটা দেখো। আজহার ভাই আলাদা করে লিখেছিলেন।

নীরা কাগজটি পড়ল।

“কোনো অনুমোদনপত্রে নাম না থাকলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয় অনুমান করে গ্রহণ করা যাবে না। মূল স্বাক্ষর এবং গ্রহণ রেজিস্টার মিলিয়ে দেখতে হবে।”

নীরা ধীরে বলল,

—আজহার চাচা যেন আগেই বুঝেছিলেন, একদিন এই কাগজ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

৩. পুরোনো চিঠির সূত্র

সালেহ এবার একটি খাম বের করলেন।

—এই চিঠিটা আজহার ভাই আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, প্রয়োজন না হলে যেন না খুলি।

খামের ওপর লেখা ছিল—

“১৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির জন্য।”

নীরা প্রশ্ন করল,

—আপনি কি কখনো খুলেছেন?

—না। আজ তোমাদের সামনে খুলছি।

খামের ভেতরে ছোট একটি চিঠি।

সেখানে লেখা—

“যে ব্যক্তি এই অনুমোদনের দায়িত্ব নিয়েছিল, সে আমার পরিবারের সদস্য নয়। কিন্তু সে পরিবারের ভেতরের সব তথ্য জানত। তার ওপর আমার বিশ্বাস ছিল। তবে বিশ্বাসের কারণে তার কাজ যাচাই না করে গ্রহণ করা যাবে না।”

নীরা থমকে গেল।

—পরিবারের সদস্য নয়, কিন্তু পরিবারের সব তথ্য জানত!

আরিয়ান বলল,

—এটা হয়তো কোনো বাইরের কর্মী, উপদেষ্টা কিংবা দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকারী হতে পারে।

ইমরান যোগ করল,

—কিন্তু এখনো কারও নাম বলা যাচ্ছে না।

৪. সালেহর স্মৃতি

সালেহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—আজহার ভাইয়ের মৃত্যুর আগে একদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন, “সালেহ, কাগজের ওপর যে নাম থাকে, সব সময় দায়িত্ব তার হাতে থাকে না। আবার যে দায়িত্ব পালন করে, তার নামও সব কাগজে থাকে না।”

নীরা বলল,

—তিনি কি কারও কথা বলেছিলেন?

—না। তবে আমার মনে আছে, সেই সময় একজন নিয়মিত ট্রাস্ট অফিসে আসতেন। তিনি পরিবারের কেউ ছিলেন না, কিন্তু অফিসের পুরোনো সব নথি কোথায় রাখা আছে, তা জানতেন।

আরিয়ান জানতে চাইল,

—নাম মনে আছে?

সালেহ চোখ বন্ধ করে ভাবলেন।

—পুরো নাম মনে নেই। তবে সবাই তাঁকে “মাসুদ সাহেব” বলে ডাকত।

ইমরান বলল,

—মাসুদ সাহেব? আমাদের পুরোনো কর্মীদের তালিকায় কি এমন কেউ ছিলেন?

রাফি সঙ্গে সঙ্গে ফোনে তালিকা খুঁজতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

—স্যার, একজন মাসুদুল হক ছিলেন। তিনি ট্রাস্ট অফিসের স্থায়ী কর্মী ছিলেন না। তাঁকে কয়েক মাসের জন্য নথি সংরক্ষণের কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

নীরা বলল,

—তাঁর কোনো ঠিকানা আছে?

রাফি উত্তর দিল,

—পুরোনো কর্মী ফাইলে একটি ঠিকানা আছে। তবে সেটা অনেক আগের।

৫. নতুন সন্দেহ নয়, নতুন অনুসন্ধান

আরিয়ান সবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমরা এখনই মাসুদুল হককে দায়ী করতে পারি না। তিনি হয়তো শুধু নথি বহন বা সংরক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন।

নীরা সম্মতি দিল।

—আমাদের জানতে হবে, তিনি অনুমোদনপত্রটি কোথা থেকে পেয়েছিলেন এবং কোথায় জমা দিয়েছিলেন।

সালেহ বললেন,

—আমি তোমাদের আরেকটি তথ্য দিতে পারি। মাসুদ সাহেবের কাছে একটি ছোট রেজিস্টার ছিল। সেখানে তিনি প্রতিটি নথি গ্রহণ ও ফেরত দেওয়ার তারিখ লিখতেন।

ইমরান অবাক হয়ে বলল,

—সেই রেজিস্টার এখন কোথায়?

—জানি না। তবে আজহার ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি অফিস ছেড়ে চলে যান। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, তাঁর কাছে থাকা সব নথি যথাস্থানে জমা দিয়েছেন।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—কোন জায়গায় জমা দিয়েছিলেন?

সালেহ উত্তর দিলেন,

—পুরোনো ট্রাস্ট অফিসে। কিন্তু সেখানে এখন আর সেই রেজিস্টার নেই।

৬. একটি অপ্রত্যাশিত ফোন

বাড়ি ফেরার পথে নীরার ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

—হ্যালো?

ওপাশ থেকে একজন বয়স্ক পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

—আমি কি নীরা রহমানের সঙ্গে কথা বলছি?

—জি, বলছি। আপনি কে?

—আমার নাম মাসুদুল হক।

নীরা অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল।

—আপনি কি আগে রহমান ফ্যামিলি ট্রাস্টে কাজ করতেন?

—হ্যাঁ। তোমরা কি ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮-এর অনুমোদনপত্র খুঁজছ?

নীরা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তারপর বলল,

—আপনি কীভাবে জানলেন?

মাসুদুল হক ধীরে বললেন,

—কারণ ওই কাগজটি আমি নিজের হাতে গ্রহণ করেছিলাম।

আরিয়ান দ্রুত ফোনের স্পিকার চালু করল।

—আপনি কি জানেন, অনুমোদনটি কে দিয়েছিল?

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মাসুদুল হক বললেন,

—নামটা আমি জানি। কিন্তু তোমাদের সামনে বলার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—কী বিষয়?

—১৮ সেপ্টেম্বরের অনুমোদনপত্রটি আমি ট্রাস্ট অফিসে জমা দিইনি। আমাকে দেওয়া হয়েছিল শুধু একটি বন্ধ খাম। বলা হয়েছিল, সেটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে পৌঁছে দিতে।

আরিয়ান বলল,

—কোন ব্যক্তির হাতে?

মাসুদুল হক উত্তর দিলেন,

—জহির উদ্দিনের হাতে।

নীরা বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।

জহির উদ্দিন!

যিনি এত দিন ধরে C-14-এর দ্বিতীয় কপি পাওয়ার কথা বলছিলেন।

মাসুদুল হক আবার বললেন,

—আর একটা কথা আছে। ওই খামের সঙ্গে আরেকটি কাগজ ছিল। সেখানে লেখা ছিল, “মূল অনুমোদনপত্রটি কখনো ট্রাস্টের সাধারণ রেজিস্টারে তোলা যাবে না।”

নীরার বুকের ভেতর প্রশ্নগুলো আরও জট পাকিয়ে গেল।

কেন একটি অনুমোদনপত্র সাধারণ রেজিস্টারে তোলা নিষেধ ছিল?

আর জহির কি জানতেন, বন্ধ খামের ভেতরে আসলে কী ছিল?

মাসুদুল হক শেষবারের মতো বললেন,

—আমি তোমাদের সব কথা জানাব। তবে দেখা করার সময় আমার কাছে থাকা একটি পুরোনো রসিদ সঙ্গে নিয়ে আসব। ওই রসিদেই প্রেরকের পরিচয় লেখা আছে।

ফোন কেটে গেল।

আরিয়ান গাড়ি থামিয়ে নীরার দিকে তাকাল।

—এবার আমাদের জহিরের সঙ্গে আবার কথা বলতে হবে।

নীরা ধীরে বলল,

—হ্যাঁ। কিন্তু এবার শুধু প্রশ্ন করব না। মাসুদ সাহেবের রসিদটাও সামনে রাখব।

গাড়ির জানালার বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

এত দিনের অনুসন্ধানে প্রথমবারের মতো তাঁরা এমন একজনের কাছে পৌঁছেছেন, যিনি নিজের হাতে সেই বন্ধ খামটি বহন করেছিলেন।

কিন্তু সেই খামের প্রেরক কে?

আর কেন মূল অনুমোদনপত্রটি রেজিস্টারের বাইরে রাখতে বলা হয়েছিল?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 61 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন