শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৬২তম পর্ব: বন্ধ খামের প্রেরক
মাসুদুল হকের ফোন পাওয়ার পর থেকে নীরার মনে অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছিল।
জহির উদ্দিনের হাতে বন্ধ খাম পৌঁছে দিয়েছিলেন মাসুদুল হক। অথচ জহির এত দিন ধরে বলছেন, তিনি শুধু একটি দ্বিতীয় কপি পেয়েছিলেন।
তাহলে মূল অনুমোদনপত্রটি কোথায় গেল?
পরদিন সকালে আরিয়ান নীরাকে ফোন করল।
—মাসুদ সাহেব আজ বিকেলে দেখা করতে রাজি হয়েছেন।
—তিনি কি রসিদটি সঙ্গে আনবেন?
—হ্যাঁ। তবে একটা শর্ত দিয়েছেন।
—কী শর্ত?
—তিনি চান, তাঁর বক্তব্যের আগে কেউ যেন তাঁকে কোনো অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে।
নীরা শান্তভাবে বলল,
—আমরা কাউকে দোষী করতে যাচ্ছি না। শুধু সত্যটা জানতে চাই।
১. মাসুদুল হকের সাক্ষাৎ
বিকেলে একটি ছোট রেস্তোরাঁর নিরিবিলি অংশে তাঁদের সঙ্গে দেখা করলেন মাসুদুল হক।
বয়সের ভারে তাঁর চলাফেরা ধীর হয়ে এসেছে। হাতে একটি পুরোনো ফাইল।
তিনি বসেই বললেন,
—আমি জানি, তোমরা অনেক দিন ধরে পুরোনো ঘটনাগুলো খুঁজছ। কিন্তু আমার কাছে যা আছে, তা দিয়ে পুরো ঘটনা প্রমাণ করা সম্ভব হবে না।
আরিয়ান বলল,
—আমরা সেটা বুঝি। তবুও আপনার কাছে থাকা তথ্যগুলো আমাদের কাজে লাগতে পারে।
মাসুদ ফাইল থেকে একটি রসিদ বের করলেন।
রসিদে লেখা—
প্রেরণ নম্বর: D-02/1809
তারিখ: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
প্রাপক: জহির উদ্দিন
মাধ্যম: বিশেষ নথি হস্তান্তর
নীরা নিচের অংশে চোখ রাখল।
সেখানে প্রেরকের নামের জায়গায় লেখা—
মাহবুব আলম।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—মাহবুব আলম!
ইমরান বলল,
—তিনি তো বাইরের প্রশাসনিক উপদেষ্টা ছিলেন।
মাসুদ মাথা নাড়লেন।
—ঠিক তাই। তিনি ট্রাস্টের স্থায়ী সদস্য ছিলেন না। কিন্তু কিছু বিশেষ নথি যাচাইয়ের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছিল।
২. মাহবুবের নির্দেশনা
আরিয়ান রসিদটি ভালো করে দেখল।
—আপনি কি নিশ্চিত, খামটি মাহবুব আলমের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন?
—আমি তাঁকে নিজে চিনতাম। তিনি আমার হাতে খামটি দিয়েছিলেন। তবে খামের ভেতরে কী ছিল, তা জানতাম না।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—তিনি কি কিছু বলেছিলেন?
মাসুদ একটু ভেবে বললেন,
—বলেছিলেন, “এই কাগজটি জহির সাহেবের কাছে পৌঁছে দেবেন। তিনি যেন দ্বিতীয় কপির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। আর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মূল নথির উৎস যাচাই করেন।”
ইমরান বলল,
—তাহলে মাহবুব আলম নিজেই নথি যাচাই করতে বলেছিলেন!
—হ্যাঁ। তবে তিনি কেন নিজের নাম সাধারণ রেজিস্টারে রাখতে চাননি, সেটা আমি জানি না।
নীরা বলল,
—আপনি কি জানতেন, আজহার রহমানের মৃত্যুর পর D-02 কোড স্থগিত ছিল?
মাসুদ মাথা নাড়লেন।
—আমি তখন স্থায়ী কর্মকর্তা ছিলাম না। আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেটুকুই পালন করেছি।
৩. জহিরের মুখোমুখি
সেদিনই জহির উদ্দিনকে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে বলা হলো।
তিনি এসে রসিদটি দেখেই চিনতে পারলেন।
—এই রসিদটা তোমরা কোথায় পেলে?
আরিয়ান বলল,
—মাসুদুল হক আমাদের দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আপনার হাতে একটি বন্ধ খাম পৌঁছে দিয়েছিলেন।
জহির কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
নীরা বলল,
—আপনি কি জানতেন, খামটি মাহবুব আলম পাঠিয়েছিলেন?
—না। খামের ভেতরে একটি নির্দেশনা ছিল, কিন্তু প্রেরকের নাম ছিল না।
মাসুদ শান্তভাবে বললেন,
—আমি খামটি আপনার হাতে দিয়েছিলাম। খামের বাইরের রসিদে মাহবুব সাহেবের নাম ছিল।
জহির রসিদটি আবার দেখলেন।
—সম্ভবত আমি তখন রসিদটি দেখিনি। খামটি সরাসরি আমার হাতে দেওয়া হয়েছিল।
নীরা প্রশ্ন করল,
—তাহলে আপনি কি বলতে চাইছেন, খামের প্রেরক কে ছিলেন, তা আপনার জানা ছিল না?
—হ্যাঁ। তবে এখন বুঝতে পারছি, বিষয়টি আমার আরও ভালোভাবে যাচাই করা উচিত ছিল।
৪. দ্বিতীয় কপির আসল উদ্দেশ্য
ইমরান এবার প্রশ্ন করল,
—মাহবুব আলম কেন আপনাকে দ্বিতীয় কপি যাচাই করতে বলেছিলেন?
জহির উত্তর দিলেন,
—কারণ প্রথম কপিতে আর্থিক হিসাব এবং হাসপাতালের সংযুক্ত নথি একসঙ্গে ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় কপিতে কিছু তথ্যের অমিল দেখা গিয়েছিল।
নীরা বলল,
—সেই অমিল কি শুধু হাসপাতালের কাগজে ছিল?
—না। আর্থিক হিসাবের কয়েকটি পাতাতেও পার্থক্য ছিল।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে দুটি বিষয় আলাদা করে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়াটা যুক্তিসংগত ছিল।
জহির মাথা নাড়লেন।
—ঠিক। মাহবুব আলম সম্ভবত চেয়েছিলেন, কেউ যেন একটি সমস্যার কারণে অন্য সমস্যাকে চাপা না দেয়।
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—কিন্তু এত বছর ধরে মূল কপিটি কোথায় আছে, কেউ বলতে পারছে না।
জহির বললেন,
—আমি একটি কথা বলতে পারি। দ্বিতীয় কপি যাচাইয়ের পর আমাকে একটি ছোট নোট দেওয়া হয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল, মূল কপি ট্রাস্টের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
—কে পাঠিয়েছিল?
—সেই নামটি আমি জানি না।
৫. রসিদের পেছনের গোপন তথ্য
মাসুদুল হক এবার রসিদটি উল্টে ধরলেন।
—তোমরা কি পেছনের অংশ দেখেছ?
নীরা কাগজটি হাতে নিল।
পেছনে পেন্সিল দিয়ে লেখা ছিল—
“প্রেরকের ব্যক্তিগত কপি সংরক্ষিত। প্রয়োজন হলে M.A. Locker 06-এর রেকর্ড যাচাই করতে হবে।”
আরিয়ান বলল,
—M.A. Locker 06!
ইমরান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—মাহবুব আলমের ব্যাংক লকারের কথা মনে আছে? তাঁর মেয়ের কাছ থেকে আমরা আগে সেই লকারের তথ্য পেয়েছিলাম।
নীরা বলল,
—কিন্তু আমরা তো জানতাম, তাঁর লকার থেকে ডায়েরি আর কয়েকটি কাগজ পাওয়া গেছে।
মাসুদ বললেন,
—এই রসিদের পেছনে লকারের নম্বর লেখা থাকার কারণ নিশ্চয়ই আছে।
আরিয়ান বলল,
—নওরীন আলমের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করতে হবে।
৬. নওরীনের নতুন তথ্য
আরিয়ান নওরীনকে ফোন করল।
সব কথা শোনার পর নওরীন বললেন,
—বাবার লকার থেকে পাওয়া কাগজগুলোর মধ্যে একটি ছোট খামের কথা আমার মনে পড়ছে। কিন্তু সেটি তখন খোলা হয়নি।
নীরা দ্রুত বলল,
—খামটি কি এখনো আপনার কাছে আছে?
—হ্যাঁ। বাবার পুরোনো কাগজপত্রের সঙ্গে রেখেছি।
—ওটার ওপর কি M.A. Locker 06 লেখা ছিল?
নওরীন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—হ্যাঁ। আর খামের ওপর আরও একটি লাইন ছিল।
আরিয়ান জানতে চাইল,
—কী লেখা ছিল?
নওরীন ধীরে উত্তর দিলেন,
—“যে কাগজের সত্য প্রমাণ করা যায়নি, তার মূল সাক্ষ্য এখানে রাখা হলো।”
নীরার চোখ বড় হয়ে গেল।
তাহলে মাহবুব আলম শুধু নির্দেশনা দেননি, তিনি নিজের কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যও সংরক্ষণ করেছিলেন!
নওরীন বললেন,
—তোমরা চাইলে আগামীকাল আমার কাছে আসতে পারো। খামটি তোমাদের দেখাব।
৭. শেষ প্রশ্ন
ফোন রাখার পর নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কী ভাবছ?
—মাহবুব আলম কেন এত কিছু নিজের কাছে রেখেছিলেন? তিনি কি কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না?
আরিয়ান বলল,
—হতে পারে তিনি জানতেন, কিছু নথি ঠিকভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে না। তবে অনুমান করে লাভ নেই। খামটি দেখলেই হয়তো কিছু বোঝা যাবে।
নীরা মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই ইমরানের ফোনে একটি বার্তা এল।
বার্তাটি নওরীনের কাছ থেকে।
সঙ্গে একটি পুরোনো খামের ছবি।
ছবির খামের নিচে ছোট করে লেখা—
“M.A. — Personal Evidence”
কিন্তু নীরার চোখ আটকে গেল খামের ওপর থাকা আরেকটি লেখায়।
সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা—
“এই নথির দ্বিতীয় সাক্ষীকে কখনো জানানো হয়নি যে তাঁর স্বাক্ষর কোন কাজে ব্যবহার করা হবে।”
নীরা ধীরে বলল,
—দ্বিতীয় সাক্ষীকে না জানিয়ে তাঁর স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছিল?
আরিয়ান ছবিটি বড় করে দেখল।
—তাহলে আমাদের পরের প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সে নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—সেই দ্বিতীয় সাক্ষী কে ছিলেন?
নীরা উত্তর দিল না।
কারণ তার মনে একটাই নাম ভেসে উঠছিল—
আবদুল করিম।
কিন্তু তিনি তো ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, তিনি শুধু একটি যাচাই-নোটে সাক্ষী ছিলেন।
তাহলে কি তাঁর স্বাক্ষর অন্য কোনো নথিতেও ব্যবহার করা হয়েছিল?
নাকি দ্বিতীয় সাক্ষী ছিলেন সম্পূর্ণ অন্য কেউ?
চলবে…